ভারতবর্ষের আদি অধিবাসী ও সভ্যতার জনক কারা ? সিন্ধু সভ্যতা কিভাবে ধংস হলো ?

আমরা ভারত বর্ষেরই একজন মানুষ কিন্তু আমাদের পূর্ব ইতিহাস কি আমরা জানি । সবাই বলে আর্যরাই আদি ভারতীয় । আসলেই কি তাই ? আসুন একটু পিছন ফিরে তাকাই –
কোন অঞ্চলের আদি জানতে হলে সেখানকার আদি সভ্যতা জানাটা অনেক জরুরী । সেই মতে এখনও পর্যন্ত ভারতের আদি সভ্যতা সিন্ধু সভ্যতা ( হরপ্পা – মহেঞ্জোদাড়ো সভ্যতা )। যার জন্ম খৃষ্ট পূর্ব ৩৫০০ অব্দে । কি ছিল ঐ সভ্যতায় !!

প্রত্মতাত্তিক খননের ফলে ঐ সভ্যতায় পাওয়া গেছে- প্রশস্ত রাস্তা, পানি সরবরাহ, পয়ঃনিস্কাষন ব্যাবস্থা, বৃহৎ স্নানাগার, শষ্যাগার, দুর্গ, বৃহৎ হলঘর ও পোড়া ইটের বহুতল বাড়ি । বিভিন্ন লিপি বা চিত্র সম্বলিত সিল, মাটির টেরিকোটা, চিত্র শিল্প এবং ব্রোঞ্চ দিয়ে বানানো নৃত্যরত নারীমূর্তির নিদর্শন দেখে বুঝা যায় তাদের সভ্যতায় নৃত্যকলার চর্চা হতো । তারা তামা ও টিন মিলিয়ে ব্রোঞ্চ এবং স্বর্ন ও রৌপ্য মিলিয়ে ইলেকট্রন তৈরি সহ নানান ধাতু বিদ্যায় তাদের জ্ঞানের পরিচয়ও পাওয়া যায় । এছাড়াও পানি নিরোধের জন্য তারা বিটুমিনের ব্যবহারও জানতো । ১৬ সংখ্যার হিসাব (যেমন ১৬ আনায় এক টাকা, ১৬ ছটাকে ১ সের ) যে ঐ সভ্যাতাতেই জন্ম হয়েছিল বলে প্রত্নতাত্তিকগন প্রমান প্যেছেন । এক কথায় প্রত্নতাত্তিক উৎখননের ফলে ঐ সভ্যতাকে আধুনিক সভ্যতা বলতে কোন বিশেষজ্ঞই কুন্ঠিত তো হনই নাই বরং বিস্ময় প্রকাশ করেছেন ।
আমরা কি জানি ঐ সভ্যতা কাদের এবং কবে এই সভ্যতা ধংস হয়েছে ও কিভাবে ধংস হয়েছে ? আসুন একটু একটু করে সেটাও জানার চেষ্টা করি ।
মহেঞ্জোদারো সভ্যতার মত একটা সভ্যতাতো এমনি এমনিই ধংস হতে পারে না তাই না ? অনেকেই বলেন এই সভ্যতার জনক আর্যরা, কেউ বলেন সুমেরিয়দের সৃস্ট, কেউ বলেন দ্রাবিড় দের সৃস্ট । সকল মতবাদের বিপরীতে যুক্তি তর্ক ও প্রত্মতাত্ত্বিক নিদর্শনের উপর ভর করে এবং হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারোতে পাওয়া নর কঙ্কাল, মাথার খুলি, চোয়াল পরিক্ষা শেষে সেখানে অন্তত ৩টা মানব গোষ্ঠীর অস্তিত্ব পাওয়া যায় । এই ৩ মানব গোষ্ঠী হচ্ছে- ১) প্রোটো- অস্ট্রালয়েড (চ্যাপ্টা নাক পুরু ঠোট) ২) মেডিটারেনিয়ান (ভুমধ্যসাগরীয় জাতি) এবং ৩) মংগোলীয় গোত্রের আলপাইন ।

অবশেষে বিভিন্ন টেরিকোঠা, প্রত্মতাত্ত্বিক নিদর্শন, সিল মোহর, লিখন পদ্ধতি, ধর্মাচার, মৃত দেহের সতকার পদ্ধতি সহ নানান উপাদান নিয়ে গবেষনা করে প্রত্মতাত্ত্বিক গন এক মত হয়েছেন সে শুধু মাত্র একটা জাতিই সিন্ধু সভ্যতার জনক । মিশ্র কোন জাতি এই সিন্ধু সভ্যতার জন্ম দেয় নাই । সংখ্যা তত্ত্বের বিচারে মংগোলিয়ানদেরকে সিন্ধু সভ্যতার জনকের দাবী থেকে দূরে সরিয়ে দেন । কারন এরা খুব সম্ভবত এসেছিল নেপাল / আসাম / চিন থেকে ।মেডিটারেনিয়ান ও প্রোটো- অস্ট্রালয়েড এই দুই জাতি গোষ্ঠীর মধ্যেই কোন এক গোষ্ঠী এই সভ্যতার জনক হিসাবে দাবীদার । তাহলে কোন সেই জাতি !! আর্য্য নাকি দ্রাবিড় !!
সিন্ধু সভ্যতা খনন করে প্রাপ্ত নিদর্শন ও আর্যদের বৈদিক সাহিত্য ও সভ্যতা বিচার বিশ্লেষন করে প্রত্নতাত্তিকগন অনেক অসংগতি পেয়েছেন । যেমন আর্যরা ঘোড়া ও লোহার ব্যবহার জানতো , কৃষিতে তারা তেমন দক্ষ ছিল না ফলে তারা ছিল কিছুটা যাযাবর জাতি । তাদের মূল পেশা ছিল পশু পালন ও যুদ্ধবাজী । আর্যরা লিংগ পূজা, ষাড় পূজা করত না । আর্যরা ছিল পুরুষ তান্ত্রিক সমাজ প্রথার প্রতিষ্ঠাতা , গাভী পূজা, যাগ যজ্ঞ ঈন্দ্র ছিল তাদের মূল দেবতা । তারা মৃত দেহ সতকার করত আগুনে পুড়িয়ে কিন্তু সিন্ধু সভ্যতা ছিল কৃষি নির্ভর, শিল্প, সংস্কৃতিও ছিল বেশ সমৃদ্ধ । কবর দেওয়া লিংগ, শিব ও মাতৃ পূজার প্রচলন ছিল, ছিল মাতৃতান্ত্রিক সমাজ । সিন্ধু সভ্যতা ছিল নগর কেন্দ্রিক তারা হাতি ব্যবহার করতো কিন্তু আর্য সভ্যতা গ্রাম কেন্দ্রিক । ভারতে আর্যদের প্রাচীন নিদর্শন পাওয়া যায় ২০০০খৃষ্ট পুর্ব অথচ সিন্ধু সভ্যতার গোড়া পত্তন হয়েছিল প্রায় ৩৫০০ খৃষ্ট পূর্বে । সেই সময়ে আরযদের কোন লিপিও ছিল না কিন্তু সিন্ধু সভ্যতায় লিপির প্রচলন ছিল । আর্যরা বেদ মুখে মুখে আবৃতি করেই যুগের পর যুগ পার করেছেন । আর্যদের এই সমস্ত অসংগতির কারনে প্রত্নতাত্তিক গন সিন্ধু সভ্যতার জনক হিসাবে আর্যদেরকে অব্যহতি দিয়েছেন ।

যদিও দক্ষিন ভারতীয়দের মধ্যে এখনও প্রোটো- অস্ট্রালয়েড ও মেডিটারেনিয়ান জাতির মিশ্রন দেখা যায় । তবুও এখন পর্যন্ত তাদেরকেই দ্রাবিড়দের বংশের বলেই সবাই অভিমত দেন । সিন্ধু সভ্যাতায় লিপির ব্যবহার , ধর্ম, দেহ গত বৈশিষ্ট, সহ বিভিন্ন যৌতিক কারনেই অধিকাংশ প্রত্মতাত্ত্বিক গন সিন্ধু সভ্যতার জনক হিসাবে দ্রাবিড়দেরকেই বেশী প্রাধান্য দিয়েছেন । সেই হিসাবে এখনও পরযন্ত আমরা ধরে নিতে পারি দ্রাবিড়রাই ছিল সিন্ধু সভ্যতার জনক ।

এবারে আসি কে ধংস করল বা কিভাবে ধংস হলো এই সিন্ধু সভ্যতা এবং প্রতিষ্ঠা করল এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা ? একদিনে যে এই সভ্যতা ধংস হয় নাই এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগেও যে ধংস হয় নাই তার প্রমান পাওয়া গেছে খনন করে পাওয়া ঐ সভ্যতার বাড়ি ঘরের নির্মান শিল্পের অবনতি, দুর্ভিক্ষের চিহ্ন থেকে । আভ্যন্তরিন সংকট ও বহিঃ শত্রু আক্রমণের বিভিন্ন প্রত্নতাত্তিক নিদর্শনও পাওয়া গেছে । যেমন রাস্তায় সিড়িতে মানুষের কঙ্কালই শত্রু আক্রমনের সাক্ষ্য বহন করে । কিন্তু কারা ছিল ঐ শত্রপক্ষ ? স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্নের আংগুল যায় ভারতের আদি সভ্যতার জনক হিসাবে দাবীদার আর্যদের দিকেই তাই না ? কিন্তু প্রমান ছাড়া তো কাউকে দোষী সাব্যস্ত করাও গ্রহন যোগ্য নয় । আসুন এবার প্রমান খুজি ।

এক্ষেত্রে কাজটি সব চেয়ে সহজ করে দিয়েছেন দেবী প্রসাদ চট্টপধ্যায় । তিনি তার লেখা “ভারত দর্শন” বইতে ঋক বেদ থেকে বিভিন্ন উদৃতি দিয়ে প্রমান দিয়েছেন এই আর্যরাই ধংস করেছে সিন্ধু সভ্যতা (বিস্তারিত জানতে পড়ুন দেবী প্রসাদের- “ভারত দর্শন” এবং রণদীপম বসুর – “চার্বাকের খোজে” )। প্রায় সকল প্রত্নতাত্তিক গনই দেবী প্রসাদের প্রমানকে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছেন । যারা ঋক বেদ পড়েছেন তারা ভেবেছেন ঈন্দের সাথে যুদ্ধ হয়েছে মনে হয় স্বররগের অসুর দের কিন্তু আসল সত্য এই দ্রাবিড় গোষ্ঠীকেই আর্যরা অসুর হিসাবে বর্ননা করেছেন । যেমন রামায়নে দ্রাবিড়দের জাতি ভাই শ্রীলংকানদেরকে চিহ্নিত করেছে রাক্ষস হিসাবে । এই আর্য্রাই তাদের আধিপত্য বিস্তারের জন্য ধংস করেছে সিন্ধু সভ্যতার মত প্রচীন কিন্তু অমূল্য সভ্যতাকে । মিটিয়ে দিয়েছে ঐ সভ্যতার নাম ও নিশানা । ধংস করেছে মাতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা, কৃষি ব্যবস্থা, ভারতে প্রতিষ্ঠা করেছে বৈদিক ধর্ম নামের নিজেদের কু-কৃত্তির স্বাক্ষী হিসাবে ঈশ্বরের বানী রূপে বেদ ( যা প্রথমে মুখে মুখে প্রচারিত থাকলেও অনেক পরে তা লিখিত আকারে সংকলিত হয়েছে )। প্রতিষ্ঠা করেছে ব্রামন্যবাদ । যাদের মাধ্যমে বংশ পরাক্রমে নিয়ন্ত্রন করেছে সমাজ ও রাস্ট্রকে । হত্যা করেছে মানবতা ।

তবে কি সবাইকেই ধর্ম ও ঈশ্বরের দোহাই দিয়ে উন্নত সভ্যতা ধংস করে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠা করতে হয়েছে ? যার মূল উদ্দেশ্যই থাকে সাম্রাজ্যবাদ !!! যেমন ওমর কতৃক ধংস হয়েছে বিশ্বের সরব বৃহত “আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরী” ও “রয়েল লাইব্রেরী অফ পারস্য”, এবং বখতিয়ার কতৃক ধংস হয়েছে ভারতের নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় !! এভাবে সভ্যতা ধংস করে সেই ধার্মিকরা ইতিহাস ও সভ্যতার নিশানা মুছে দিয়ে নিজেদের তথাকথিত সভ্যতাকে সব থেকে উত্তম বলে প্রতিষ্ঠা করেছে । যাতে সবাই ভাবে তারাই সভ্যতার জনক । এভাবে যুগে যুগে ইতিহাস স্বাক্ষী দিয়ে যাচ্ছে ধর্ম মানুষের কোন কাজেই লাগে নাই শুধু মাত্র সাম্রাজ্যবাদের হাতিয়ার হওয়া ছাড়া । অর্থাৎ এখানেও আর্যরা অস্ত্র দিয়েই তাদের ধর্ম প্রতিষ্ঠার নামে নিজেদের ক্ষমতা ও ভোগ নিশ্চিত করেছে । কথায় আছে – “অপরাধী কোন না কোন নিদর্শন রেখেই যায়, বুদ্ধিমানদের কাজ সেটা খুজে বের করা” । এজন্য ধর্ম এবং অপরাধী ইতিহাসের মুখোমুখি হতে ভয় পায় । এই সিন্ধু সভ্যতা ধংস করেছে আর্যরা, আর্য্য দ্রাবিড় জৈন বৌদ্ধ মিলে গঠিত হিন্দু সভ্যতা ধংস করেছে মুসলিমরা । যার কারনে সিন্ধু সভ্যতার মত এক সভ্যতা থাকার পরেও আজ এই বিংশ শতাব্দিতেও পায়খানা করে কিভাবে হাত পরিস্কার করতে হয় তা টিভি দেখে আমাদের শিখতে হচ্ছে । ছল চাতুরি আর বিশ্বাস ঘাতকতা সহ সভ্যতা ধংসই ধর্মের শ্রেষ্ঠ অবদান । তাই এক কথায় বলা যায় – “ধর্ম দেয় না শুধু কেড়েই নেয় “। যে যত অন্ধ বিশ্বাসী তাকে দিতেও হয় ঠিক ততই । আর এই দেওয়ার ফলেই ধর্মের ধ্বজা ধারীরা দিন দিন লোভী হয়ে উঠে ।

কে ছিল এই আর্যরা ? আচ্চছা সেটা নিয়েও আলোচনা হবে কোন একদিন, যদি সেই পর্যন্ত

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৯ thoughts on “ভারতবর্ষের আদি অধিবাসী ও সভ্যতার জনক কারা ? সিন্ধু সভ্যতা কিভাবে ধংস হলো ?

  1. শিব সেনা , আর এস এস , ধর্মীয়
    শিব সেনা , আর এস এস , ধর্মীয় জাতীয়তা বাদী দল । এরা না আর্য না দ্রাবিড় । এরা হিন্দুত্যবাদী । মন্তব্যের জন্য পাতা ছাড়া শুধু ধইন্যা লন ।

  2. ইতিহাস নিয়ে ইদানিং দারুন
    ইতিহাস নিয়ে ইদানিং দারুন আগ্রহবোধ করছি। দীর্ঘ বিরতির পর আপনার ইতিহাস ভিত্তিক ব্লগপোস্ট উপভোগ করছি। আবার ব্লগে ফেরার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

    1. আমার ব্লগে ফেরার সকল সফলতা ,
      আমার ব্লগে ফেরার সকল সফলতা , নুর নবী দুলাল ভাইয়ের । যাক লেখাটা যে আপনার ভাল লেগেছে তা জেনে নিজেরও খুব ভাল লাগছে । পড়া ও কমেন্টের জন্য ধন্যবাদ ।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 1 = 3