একজন নারী অধিকার সচেতন মানুষকে অবশ্যই সকল ধর্মগ্রন্থকে অস্বীকার করতে হবে।

কিছুদিন আগে ফেইসবুকে একটা চার লাইনের স্ট্যাটাস দিয়েছিলাম। লক্ষ্য করলাম অনেক প্রগতিশীল বন্ধুরা দ্বিমত পোষন করেছেন। তাই মনে করলাম বিষয়টাকে ব্যাখ্যা দিয়ে উপস্থাপন করা যেতে পারে।

আমি লিখেছিলাম, একজন নারীবাদী, একজন নারী অধিকার সচেতন মানুষ কখনই আস্তিক হতে পারে না। তাকে প্রথমেই সকল ধর্মকে অস্বীকার করতে হবে। ধর্মকে অস্বীকার না করে নারী স্বাধীনতার কথা বলা একপ্রকার হিপোক্রেসি।

চৈতালি সেন। এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজেই তার বেড়ে ওঠা। কিন্তু তাই বলে সে কখনোই ছাড় দেয়নি এক ফোটা। নিজের অধিকারের ব্যাপারে সে খুব সচেতন। সে একটা পরিচয়ের জন্যই সংগ্রাম করে চলেছে, ‘মানুষ’ নারী কিংবা পুরুষ নয় প্রত্যেকের পরিচয় হবে ’মানুষ’। ‍সে নারীস্বাধীনতার কথা বলে বেশ উচ্চ বাচ্চে। কিস্তু তিনি ইশ্বরের অস্তিত্বকেও বিশ্বাস করে থাকেন। হ্যা আমি ’কিন্তু’ শব্দটি খুব সর্কতার সাথেই ব্যবহার করেছি। কারন, এখানে সামান্য কিছু রেফারেন্স উল্লেখ করলাম। যা চৈতালি সেনের ধর্ম(হিন্দু ধর্ম) থেকে নেয়া হয়েছে।
১. নারীরা কোনো নিয়মানুবর্তিতা মেনে চলে না। তাদের কোন বুদ্ধিমত্তা নেই বললেই চলে(রগ্বেদ ৮:৩৩:১৭)

২. নারীরা শক্তিহীন বা কর্তৃত্বহীন। তারা পৈত্রিক সম্পত্তির কেনো অংশ পাবে না। (যজুর্বেদ ৬:৫:৮:২)

৩. একজন স্বামী যতই খারাপ হোক না কেন, তথাপি একজন কর্তব্যনিষ্ঠ স্ত্রী স্বামীকে দেবতা হিসেবে ক্রমাগত পূজা করবে (মনুসংহিতা ৫:১৫৪)

৪. শৈশবকালে একজন নারী তার পিতার অধীনে থাকবে, যৌবনে তার স্বামীর অধিকারে থাকবে, স্বামী মারা গেলে তার পুত্রের অধীনে থাকবে। নারীরা কখনোই স্বাধীন হতে পারবে না। এমনকি তাদের স্বাধীন হবার যোগ্যতাই নেই। (মনুসংহিতা ৫:১৪৮, ৯:৩)

৫. নারীদেরকে অবশ্যই দিন রাত নিজ পরিবারের পুরুষদের অধীনে থাকতে হবে। তারা যদি কোনো রকম ইন্দ্রিয়াসক্তিতে জড়িয়ে পড়ে তাহলে তাদেরকে অবশ্যই কারো নিয়স্ত্রনে রাখতে হব্ (মনুসংহিতা ৯:২)

এরকম শত শত নারীবিদ্বেষী উক্তি হিন্দু ধর্মের ধর্মিয় গ্রন্ধগুলোর প্রতিটি আনাচে কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। এখানে মাত্র ৫টি দেয়া হলো। এই ৫টি দিয়েই চৈতালি সেনকে কি জিজ্ঞাসা করা যেতে পারে না? তাকে কি আমি হিপোক্রেট বলতে পারিনা? সে একই সাথে সমান অধিকারের জন্য গলা ফাটাচ্ছে আবার অপরদিকে সে এই আবর্জনায় ভর্তি ধর্মকে বিশ্বাস করছে। তাকে যেকোন একটিকে বেছে নিতে হবে, হয় তার অধিকারের জন্য সংগ্রাম, নয়তো তার পবিত্র(!) ধর্ম।

তাই একজন মানুষ যে, সমান অধিকারের কথা বলে, নারীদের এগিয়ে সকল বাধাকে অতিক্রম করতে বলে, তাকে অবশ্যই সর্বপ্রথম নাস্তিক হতে হবে।

এবার আসি মোহাম্মদ জাকিরের কাছে। জাকির একজন প্রগতিশীল ব্যাক্তি। তিনি একজন নারীবাদি পরিচিত মুখ। সভা সেমিনারে ঝাঝালো বক্তৃতা দেন নারী স্বাধীনতার কথা বলে। টকশোতে বেশ চমতকার ভাবে উপস্থাপন করেন, কিভাবে নারীদের এগিয়ে যেতে হবে। কিন্তু সারা সপ্তাহ মিস হলেও শুক্রবারের জুম্মার নামাজ তার মিস হয় না। সে মনে করে ইসলাম ধর্মই একমাত্র ধর্ম যেখানে নারীকে দেয়া হয়েছে সুমহান মর্যাদা!

১. তোমাদের স্ত্রীগণ তোমাদের শস্যক্ষেত্র, সুতরাং তোমরা তোমাদের শস্যক্ষেত্র যে প্রকারে ইচ্ছা অবতীর্ন হও। (সূরা-২: বাক্কারাহ, আয়াত:২২৩)

২. পুরুষগন নারীদিগের উপর কর্তৃত্বশীল, এই কারনে যে, আল্লাহ উহাদের কাহাকেও কাহারও উপর মর্যাদা প্রদান করিয়াছেন, এবং পুরুষেরা স্বীয় মাল হইতে তাহাদের অর্থ ব্যয় করিয়াছে, ফলে পুন্যবান রমনীগন অনুগত থাকে, অজ্ঞাতেও তত্বাবধান করে, আল্লাহর তত্ত্বাবধানের মধ্যে এবং যাহাদের অবাধ্যতার সম্ভাবনা দেখিতে পাও, তাহাদিগকে উপদেশ দাও এবং তাহাদের সহিত শয্যা বন্ধ কর এবং তাহাদিগকে সংযতভাবে প্রহার কর, তারপর যদি তোমাদের নির্দেশ অনুযায়ী চলিত থাকে, তাহা হইলে তাহাদের উপর নির্যাতনের পন্থা অবলম্বন করিও না, নিশ্চয়ই আল্লাহ সুউচ্চ মর্যাদাশীল মহান। (সূরা-৪:নিসা, আয়াত:৩৪)

৩. নিজেদের ইচ্ছা অনুযায়ী দুই, তিন, চার রমনীকে বিবাহ কর, কিন্তু তোমরা যদি আশংকা কর যে, সমতা বজায় রাখতে পারবে না, তদবস্থায় একই স্ত্রী কিংবা তোমার অধীনস্ত দাসী, ইহা অবিচার না হওয়ারই অতি নিকটতর।(সূরা-৪:নিসা, আয়াত:৩)

নারীরা পিরিয়ডের সময় অপবিত্র, নারীরা কাফনের সময় থাকতে পারবে না কারন তারা অপবিত্র, সম্পত্তি ভাগের বিষয় তো সবারই জানা, এছাড়াও এই ধুরন্ধর ইসলাম ধর্মের ‍সবথেকে ধুরন্ধর ব্যাক্তিটির জীবনী লক্ষ করলে আমরা কি দেখতে পাই?

এখন মোহাম্মদ জাকির একাধারে এইগুলোকে বিশ্বাস করবে আবার অন্যদিকে নারীস্বাধীনতার কথা বললে তাকি কি বলা যায়?

এছাড়াও খিষ্টান ধর্মের দিকে তাকান,

১. নারীরা চার্চের মধ্যে চুপচাপ থাকবে। চার্চের মধ্যে কথা বলা তাদের জন্য লজ্জাজনক। তারা চুপচাপ তাদের স্বামীদের কাছে খেতে সকল প্রকার বশীভূতকরণের মাধ্যমে শিক্ষা নেবে। নারীরা শিক্ষা দিতে পারবে না, এবং পুরুষদের উপর কর্তৃত্ব করার অধিকারও তাদের নেই।( ১ করিথিয়ান্স ১৪:৩৪-৩৫, ১ টিমেথি ২:১১-১২)

২. পুরুষকে নারীর জন্য সৃষ্টি করা হয়নি, কিন্তু নারীকে পুরুষের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে(১ করিথিয়ান্স ১১:৮-৯)

৩. নারীকে পুরুষের পাজরের হাড় থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে (জেনেসিস ২:২২)

৪. গর্ভধারন এবং সন্তান প্রসব এক ধরনের শাস্তি। (জেনেসিস ৩:১৩)

অনেককেই দেখেছি তারা এইসকল ধর্মগ্রন্থের সাথে দ্বিমত থাকলেও বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি রয়েছে এক দুর্বলতা। আর সেই ধর্ম নারীর বিষয়ে বলেছে, নারীরা হলো উস্মুক্ত মলের মত দুর্গন্ধমুক্ত!!!!

এখন জাকির কিংবা চৈতালিরা কতটুকু সঠিক? আমাদের সমাজে এদর সংখ্যা অনেক। এবং আমার চারলাইনের ফেইসবুক স্ট্যাটাসটিতে এই চৈতিালিরাই বেশি দ্বিমত পোষন করেছেন।

যাক এখন আসল কথায় আসি। তাহলে সেই আগের প্রশ্নটাই আরেকবার করি, একজন নারীবাদী, একজন নারী অধিকার সচেতন মানুষ কখনোই কি আস্তিক হতে পারে? তাকে কি প্রথমেই এই দুর্গন্ধময় ধর্মগ্রন্থকে অস্বীকার করা উচিত না? আর যদি সে অস্বিকার না করে এবং নারী অধিকারের কথাও বলে যায় তাহলে তাকে কি হিপোক্রেট ছাড়া আর কিছু বলা যায়?

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১২ thoughts on “একজন নারী অধিকার সচেতন মানুষকে অবশ্যই সকল ধর্মগ্রন্থকে অস্বীকার করতে হবে।

  1. ধর্মগ্রন্স্থ আর ধর্ম যেই
    ধর্মগ্রন্স্থ আর ধর্ম যেই বেক্তি দের নিয়ে গঠিত হয়েছে দুইটা আলাদা জিনিস নয় কি? যিশুর core message-এ দেখাতে পারবেন উনি নারী বিদ্বেষ কিছু বলেছেন? অথবা কৃষ্ণের কথায় নারী বিদ্বেষ কিছু আছে? অথবা সিদ্দার্থ গৌতমের চয়নে? আপনার facebook status ছিলো যে ‘নারী স্বাধীনতায় বিশ্বাস করতে হলে নাস্তিক হতে হবে’, আর এখন বলছেন ‘একজন নারী অধিকার সচেতন মানুষকে অবশ্যই সকল ধর্মগ্রন্থকে অস্বীকার করতে হবে।’ এই দুইটা sentence এর meaning সম্পূর্ণ আলাদা।

    আপনার এই বক্তব্যের সাথে আমি একমত। কারণ আধুনিক মানুষ সব ধর্ম গ্রন্থ কেই সম্পূর্ণ ভাবে অস্বিকার না করলেও আংশিক ভাবে অস্বিকার করেই। ধর্ম ঈশ্বর এর কথা বলে, কিন্তু ঈশ্বর যে ধর্মের উর্ধে। আর ঈশ্বর এর বিশ্বাস যে ধর্মনিরপেক্ষ হতে পারে যেমন একজন deist ও হতে পারে।

    culture আর religion এর বাইরে গিয়ে বিপ্লব অনেকেই করেছেন। কিন্তু সফল পরিবর্তন এনেছেন তারাই যারা culture এবং religion এর ভিতর থেকে এনেছেন। যেমন ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর, রাজা রামমোহন ইত্যাদি।

    নাস্তিকতাকে নারী স্বাধীনতার সাথে সম্পৃক্ত করে আবার নতুন এক ধর্ম সৃষ্টি করে না ফেলুন।

  2. ধর্মগ্রন্স্থ আর ধর্ম যেই
    ধর্মগ্রন্স্থ আর ধর্ম যেই বেক্তি দের নিয়ে গঠিত হয়েছে দুইটা আলাদা জিনিস নয় কি? যিশুর core message-এ দেখাতে পারবেন উনি নারী বিদ্বেষ কিছু বলেছেন? অথবা কৃষ্ণের কথায় নারী বিদ্বেষ কিছু আছে? অথবা সিদ্দার্থ গৌতমের চয়নে? আপনার facebook status ছিলো যে ‘নারী স্বাধীনতায় বিশ্বাস করতে হলে নাস্তিক হতে হবে’, আর এখন বলছেন ‘একজন নারী অধিকার সচেতন মানুষকে অবশ্যই সকল ধর্মগ্রন্থকে অস্বীকার করতে হবে।’ এই দুইটা sentence এর meaning সম্পূর্ণ আলাদা।

  3. আচ্ছা শাম্মী দি, আপনি কি জন্ম
    আচ্ছা শাম্মী দি, আপনি কি জন্ম থেকেই আবাল? নাকি জন্মের পর আবাল হইছেন? নাকি আবালগীরির ট্ৰেনিং নিতাছেন?

  4. শাম্মী হক, আপনার বক্তব্যের
    শাম্মী হক, আপনার বক্তব্যের সাথে দ্বিমতের কোনও সুযোগ নেই। কিন্তু একটা প্রশ্ন করতে চাই, আধুনিক নারীর প্রতিদিনের জীবনে যে চ্যালেঞ্জ তাতে কি আসলে ধর্মই প্রধান বাধা? আপনি কি আমাকে একটু জানাতে পারবেন জার্মানিতে কি একই পদে কাজ করা একজন নারী ও পুরুষ সমান বেতন পায়?

  5. যে ব্যক্তি ধর্ম পালন করছে সেই
    যে ব্যক্তি ধর্ম পালন করছে সেই ধর্মটি ইশ্বর প্রেরিত বলেই অন্ধভাবে পালন করছে। এখন ইশ্বরের বানীর কিছু অংশ মানি, কিছু অংশ মানিনা এটা কি বিশ্বাসযোগ্য? যে সকল ধর্মের কথা উল্লেখ করা হলো সেগুলো পালন করা মানেই সেই ধর্মের ইশ্বরকে স্বীকার করা। সুতরাং নারীর অধিকার মানা আর একই সঙ্গে ধর্ম মানা ওরফে ইশ্বর মানা পাশাপাশি চলতে পারেনা, যদি চলতে চায় সেটা হবে হিপোক্রেসী। সোজা হিসাব।

  6. নারীবাদ মানে কি পুরষের
    নারীবাদ মানে কি পুরষের বিরধীতা করা?নারীবাদ মানে কি বিশেষ সুবিধা নেওয়া?আজ বিশ্বের অনেক রাষ্ট্রের চেয়ে আমাদের দেশের নারীরা অনেক এগিয়ে।নারীবাদী নয় পুর্নাঙ্গ মানুষ হতে নাস্তিক হতে হবে।

  7. আচ্ছা, সব ধর্মের ধর্ম গ্রন্থ
    আচ্ছা, সব ধর্মের ধর্ম গ্রন্থ মোতাবেক নারী স্বাধিনতার অংশটি টানলেন এবং বেশ ভালোভাবে কিছু ধর্মিয় গ্রন্থের রেফারেন্সও দিলেন | কিন্তু বৌদ্ধ ধর্মের ক্ষেত্রে দিলেন না কেন ?
    নারী হল, উৎকট দুর্গন্ধযুক্ত মলের মত ! এই কথাটি শুধুমাত্র আউড়ালেই তো আর হবেনা, রেফারেন্স লাগবে | সঠিক রেফারেন্স ছাড়া, এখন আর কেউ কোন কিছু গিলে না |

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

58 + = 61