ফয়েরবাখ সম্বন্ধে থিসিসসমূহ | কার্ল মার্কস

সত্য, বাস্তব ঘটনা, সামাজিক সত্য, মানবিক সত্য, বস্তুবাদ, যান্ত্রিক বস্তুবাদ ও সমাজ পরিবর্তনে দর্শনের ভূমিকা সংক্রান্ত গূঢ়-সুসংবদ্ধ আলাপ সন্নিবেশিত হয়েছে মার্কসের এ রচনাটিতে। ১৮৪৫ সালের বসন্তকালে মার্কস কর্তৃক লিখিত ১৮৮৮ সালে এঙ্গেলস কর্তৃক তাঁর ‘ল্যুদভিগ ফয়েরবাখ ও চিরায়ত জার্মান দর্শনের অবসান’ গ্রন্থের স্বতন্ত্র সংস্করণে পরিশিষ্ট হিসাবে এটি প্রথম প্রকাশিত হয়। এরপর থেকে থিসিস মডেল হিসাবে রচনাটি আজ অবধি সমাদৃত হয়ে আসছে। রচনাটির মান এমনই যে, এর গূঢ়ার্থ উদ্ধারে গভীর মনোযোগ ও পর্যালোচনা আবশ্যক।

১।
পূর্ববর্তী সমস্ত বস্তুবাদের- এবং ফয়েরবাখের বস্তুবাদও তার অন্তর্ভুক্ত- প্রধান দোষ এই যে, তাতে বস্তু (gegenstand), বাস্তবতা বা সংবেদ্যতাকে কেবল বিষয় (object) রুপে বা ধ্যান রূপে ধরা হয়েছে, মানবিক সংবেদনগত ক্রিয়া হিসাবে, ব্যবহারিক কর্ম হিসাবে দেখা হয়নি, কর্তার দিকে থেকে (subjectively) দেখা হয়নি। ফলে বস্তুবাদের বিপরীতে সক্রিয় দিকটি বিকশিত করেছে ভাববাদ, কিন্তু তা কেবল অমূর্তভাবে, কেননা অবশ্যই ভাববাদ বাস্তব সংবেদনগত ক্রিয়া ঠিক যা সেইভাবে তাকে জানে না। ফয়েরবাখ চান সংবেদনগত বিষয়কে চিন্তাগত বিষয় থেকে সত্যই পৃথক করতে, কিন্তু খোদ মানবিক ক্রিয়াটাকে তিনি বস্তুগত (gegenstandliche) ক্রিয়া হিসাবে ধরেন না। অতএব ‘খ্রীষ্টধর্মের মর্মবস্তু’ গ্রন্থে তিনি একমাত্র তাত্ত্বিক ক্রিয়াকেই খাঁটি মানবিক ক্রিয়া বলে গ্রহণ করেন; অপরপক্ষে ব্যবহারিক কর্মকে তিনি তার নোংরা দোকানদারী চেহারায় কল্পনা করেন ও সেইভাবেই তাকে স্থিরবদ্ধ করে রাখেন। তাই ‘বৈপ্লবিক’ ‘ব্যবহারিক-সমালোচনামূলক’ ক্রিয়ার তাৎপর্য তিনি বুঝতে পারেন না।

২।
মানবিক চিন্তার বস্তুগত সত্য আছে কিন্তু এ প্রশ্ন তত্ত্বগত নয়, ব্যবহারিক। ব্যবহারের ক্ষেত্রে মানুষকে তার চিন্তার সত্যতাকে অর্থাৎ বাস্তবতা ও শক্তিকে, ইহমুখিতাকে প্রমাণ করতে হবে। ব্যবহার থেকে বিচ্ছিন্ন, চিন্তার বাস্তবতা ও অবাস্তবতা সংক্রান্ত প্রশ্ন নেহাৎই পন্ডিতী কুতর্ক।

৩।
মানুষ পরিবেশ ও পরিপালনের ফল, অতএব পরিবর্তিত মানুষ হল পরিবর্তিত পরিবেশ ও পরিপালনেরই ফল, এই বস্তুবাদী মতবাদ ভুলে যায় যে, মানুষই পরিবেশকে পরিবর্তিত করে এবং স্বয়ং পরিপালককেই পরিপালিত করা প্রয়োজন। অতএব এই মতবাদ অনিবার্যভাবেই সমাজকে দুই অংশে ভাগ করে, তার মধ্যে একাংশ সমাজের ঊর্ধ্বে (যথা, রবার্ট ওয়েনের ক্ষেত্রে)।
পরিবেশের পরিবর্তন এবং মানবিক ক্রিয়ার পরিবর্তনের মধ্যে মিলটাকে ধারণা করা ও যুক্তিসঙ্গতভাবে বোঝা সম্ভব একমাত্র বিপ্লবী ব্যবহারিক কর্ম হিসাবে।

৪।
ফয়েরবাখ শুরু করেন ধর্মমূলক আত্ম-অন্যীভবন- জগৎকে একটা ধর্মীয় কল্পিত জগৎ ও বাস্তব জগৎ রূপে দ্বিগুণিত করার ঘটনাটা থেকে। ধর্মীয় জগৎকে তার ইহলৌকিক ভিত্তিতে পর্যবসিত করাই হল তাঁর কাজ। তিনি এইটে উপেক্ষা করেন যে, উক্ত কার্য সমাধার পর প্রধানতম কাজটিই বাকি থেকে যায়; কেননা, ইহলৌকিক ভিত্তিটি যে নিজের কাছ থেকে নিজে বিচ্ছিন্ন হয়ে এক স্বাধীন এলাকা হিসাবে মেঘলোকে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করে, এই ঘটনার একমাত্র প্রকৃত ব্যাখ্যা হল এই ইহলৌকিক ভিত্তিটিরই স্ববিভাগ এবং স্ববিরোধিতা। অতএব শেষোক্তটাকে প্রথমে তার স্ববিরোধের দিক থেকে বুঝতে হবে, তারপর এই বিরোধ দূর করে ব্যবহারিক ক্ষেত্রে তার বৈপ্লবিক পরিবর্তন করতে হবে। ফলে, যেমন ধরা যাক, পবিত্র পরিবারের রহস্য পার্থিব পরিবারের আবিস্কৃত হবার পর, পার্থিব পরিবারটিকেই তত্ত্বগতভাবে সমালোচনা করা এবং ব্যবহারিক বৈপ্লবিকভাবে পরিবর্তিত করা প্রয়োজন।

৫।
অমূর্ত চিন্তায় অতৃপ্ত হয়ে ফয়েরবাখ সংবেদনগত ধ্যানের দ্বারস্থ হন, কিন্তু সংবেদ্যতাকে তিনি ব্যবহারিক, মানবিক সংবেদনগত ক্রিয়া রূপে দেখেন না।

৬।
ধর্মীয় সারার্থকে ফয়েরবাখ মানবীয় সারার্থে পর্যবসিত করেন। কিন্তু মানবীয় সারার্থ এমন একটা অমূর্ত কিছু নয় যা প্রতিটি ব্যক্তি মানুষের মধ্যে নিহিত। বাস্তবপক্ষে তা হল সামাজিক সম্পর্ক সমূহের যোগফল।
এই আসল সারার্থের সামলোচনায় প্রবৃত্ত হননি বলেই ফয়েরবাখ বাধ্য হন;
ক) ঐতিহাসিক বিকাশ থেকে বিচ্ছিন্ন হতে ও ধর্মীয় অনুভূতিকে (Germut) আলাদা কিছু একটা জিনিস হিসাবে স্থিরবদ্ধ করে তুলতে এবং একটা অমূর্ত- বিচ্ছিন্ন- ব্যক্তি মানবকে ধরে নিতে।
খ) তাই মানবিক সারার্থকে তাঁর পক্ষে কেবল ‘বংশসত্ত্বা’ (genus) হিসাবে, একটি অভ্যন্তরীণ মূক সাধারণ গুণ হিসাবে গ্রহণ করাই সম্ভব যা দিয়ে বহু ব্যক্তি মানুষকে মেলানো যায় কেবল প্রাকৃতিক বন্ধনে।

৭।
তাই ফয়েরবাখ দেখতে পান না যে, ‘ধর্মীয় অনুভূতি’ নিজেই হল একটা সামাজিক সৃষ্টি এবং যে অমূর্ত ব্যক্তিটির বিশ্লেষণ তিনি করেন সেও প্রকৃতপক্ষে কোনো একটা নির্দিষ্ট সমাজরূপে অন্তর্ভুক্ত।

৮।
সামাজিক জীবন মূলতই ব্যবহারিক। যে সব রহস্য তত্ত্বকে অতীন্দ্রিয়বাদের পথে বিভ্রান্ত করে সেই সব রহস্যেরই যুক্তিসিদ্ধ সমাধান পাওয়া যায় মানবিক ব্যবহারিক কর্মের মধ্যে এবং তা প্রণিধানের মধ্যে।

৯।
মননসর্বস্ব বস্তুবাদের অর্থাৎ যে বস্তুবাদ সংবেদ্যতাকে ব্যবহারিক কর্ম হিসাবে বোঝে না, তার অর্জিত চরম বিন্দুটি হল ‘নাগরিক সমাজের’ অন্তর্ভুক্ত ব্যক্তি বিশেষকে নিয়ে ধ্যান।

১০।
পুরনো বস্তুবাদের দৃষ্টিকোণ হল ‘নাগরিক’ সমাজ; নতুন বস্তুবাদের দৃষ্টিকোণ হল মানবিক সমাজ বা সমাজীকৃত মানবজাতি।

১১।
দার্শনিকেরা এতকাল কেবল নানাভাবে জগৎকে ব্যাখ্যা করেছেন, কিন্তু আসল কথা হল তাকে পরিবর্তন করা।

————–
মার্কসের পান্ডুলিপির সঙ্গে মিলিয়ে দেখা ১৮৮৮ সালের সংস্করণের পাঠ অনুসারে জার্মান থেকে ইংরেজী অনুবাদের ভাষান্তর। একই অনুবাদের বর্তমান সংস্করণটি নেয়া হয়েছে সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে চার খন্ডে প্রকাশিত মার্কস-এঙ্গেলস রচনা সংকলনের অবিকল প্রতিলিপি থেকে, যা ২০১০ সালে কলকাতার ন্যাশনাল বুক এজেন্সি পুনঃমুদ্রণ করে।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৩ thoughts on “ফয়েরবাখ সম্বন্ধে থিসিসসমূহ | কার্ল মার্কস

  1. মার্কস সাহিত্যগুলো খুব আগ্রহ
    মার্কস সাহিত্যগুলো খুব আগ্রহ নিয়ে পড়ি। বাংলায় অনলাইনে মার্কসের লেখাগুলো আমাদের পড়ার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য আপনার প্রতি কৃতজ্ঞতা।

  2. মার্কসবাদ সম্পর্কে ইস্টিশনে
    মার্কসবাদ সম্পর্কে ইস্টিশনে অনেক কিছু জেনেছি। আপনার থেকেও জানছি। নিয়মিত মার্কসের এই রচনা পড়তে চাই।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

84 − = 82