মদিনার সনদ

৬২২ খ্রীস্টাব্দের ২৪শে সেপ্টেম্বর ইসলাম ধর্মের নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) মদিনা নগরীতে হিজরতের করেন এবং মদীনা/মদীনায় ইসলামী রাষ্ট্রের প্রথম রাজধানী স্থাপন করেন। এসময় সেখানে বসবাসরত বিভিন্ন সম্প্রদায় গুলোর মধ্যে ছিল গোষ্ঠীগত হিংসা-বিদ্বেষ। তাই কলহে লিপ্ত বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে ভাতৃত্ব্য ও সম্প্রীতি স্থাপন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে হযরত মুহাম্মদ (সা:) ৪৭ ধারার একটি সনদ বা সংবিধান প্রণয়ন করেন যা পৃথিবীর ইতিহাসে মদিনার সনদ নামে পরিচিত। এর প্রথম ১০ ধারায় বলা হয় যে, মুহাজির (দেশত্যাগী বা যারা মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করেছিল), বনু আউফ, বনু সাইদা, বনু হারিস, বনু জুশাম, বনু নাজ্জার, বনু আমর, বনু নবীত ও বনু আউস পূর্বহারে মুসলমানদের মধ্যে প্রচলিত নিয়মনীতি এবং ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে পণের মাধ্যমে বন্দীদের মুক্ত করবে। ১১ থেকে ২০ ধারায় মুসলমানদের পারষ্পরিক সম্পর্ক সম্পর্কিত আইন বিধৃত হয়। ২১ থেকে ২৬ ধারায় হত্যাকারীর শাস্তি, কোনো মুসলমান কোনো অন্যায়কারীকে আশ্রয় দিলে তার শাস্তি, কোনো বিষয়ে মতবিরোধ দেখা দিলে তার মীমাংসা পদ্ধতি, ধর্মীয় স্বাধীনতা ইত্যাদী বিষয়ক আইন সন্নিবেশিত হয়। ২৭ থেকে ৩৬ ধারায় সন্নিবেশিত হয় বিভিন্ন গোত্রের স্বরুপ সম্পর্কিত বিধান। পরবর্তী ধারাসমূহে যুদ্ধনীতি, নাগরিকদের ক্ষতির ক্ষতিপূরণ, নিজ নিজ ব্যয় নির্বাহ, এ সনদে অংশগ্রহণকারীদের বিরুদ্ধে কেউ যুদ্ধে লিপ্ত হলে তার ব্যাপারে ব্যবস্থা, বন্ধুর দুষ্কর্ম, যুদ্ধের ব্যয় নির্বাহ, নাগরিকের অধিকার, আশ্রয়দানকারী ও আশ্রিতের সম্পর্ক, নারীর আশ্রয়, সনদের স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে শান্তি ভঙ্গের আশন্কা দেখা দিলে করণীয়, কুরাইশদের ব্যাপারে ব্যবস্থা, মদীনার উপর অতর্কিত আক্রমণ হলে করণীয় ইত্যাদী সন্নিবেশিত হয়। বিশ্বের ইতিহাসে এটিই প্রথম লিখিত চুক্তি ও সংবিধান। ঐতিহাসিক পি.কে. হিট্টির মতে-” Out of the religious community of all Madinah the later and largest state of Islam arose” অর্থ্যাৎ মদীনা প্রজাতন্ত্রই পরবর্তীকালে ইসলামী সাম্রাজ্যের ভিত্তিমূল স্হাপন করে। উক্ত সংবিধানে সকল পক্ষ মেনে নিয়ে স্বাক্ষর দান করেছিল।
মদীনা সনদের মূল বিষয়বস্তু ছিল:
১) সনদপত্রে স্বাক্ষরকারী সম্প্রদায়সমূহ ইসলামী রাষ্ট্রের অধীনে একটি সাধারণ জাতি গঠন করবে।
২.হযরত মুহাম্মদ (স) ইসলামী রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধান থাকবেন।
৩) কোন সম্প্রদায় গোপনে কুরাইশদের সাথে কোন প্রকার সন্ধি করতে পারবে না কিংবা মদীনা বা মদীনাবাসীদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে কুরাইশদের কোনরুপ সাহায্য-সহযোগীতা করতে পারবে না।
৪) মুসলিম, খ্রীস্টান, ইহুদী, পৌত্তলিক ও অন্যান্য সম্প্রদায় ধর্মীয় ব্যাপারে পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করবে। কেউ কারো ধর্মীয় কাজে কোন রকম হস্তক্ষেপ করতে পারবে না।
৫) মদিনার উপর যে কোন বহিরাক্রমণ কে রাষ্ট্রের জন্য বিপদ বলে গণ্য করতে হবে। এবং সেই আক্রমণ কে প্রতিরোধ করার জন্য সকল সম্প্রদায়কে এক জোট হয়ে অগ্রসর হতে হবে।
৬) রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের অধিকার ও নিরাপত্তা রক্ষার ব্যবস্থা থাকবে।
৭) অসহায় ও দূর্বলকে সর্বাবস্থায় সাহায্য ও রক্ষা করতে হবে।
৮) সকল প্রকার রক্তক্ষয়, হত্যা ও বলাৎকার নিষিদ্ধ করতে হবে এবং মদীনাকে পবিত্র নগরী বলে ঘোষণা করা হবে।
৯) কোন লোক ব্যক্তিগত অপরাধ করলে তা ব্যক্তিগত অপরাধ হিসেবেই বিচার করা হবে। তজ্জন্য অপরাধীর সম্প্রদায় কে দায়ী করা যাবে না।
১০) মুসলমান, ইহুদী ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের লোকেরা পরষ্পর বন্ধুসুলভ আচরণ করবে।
১১) রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিরোধ নিষ্পত্তির অধিকার থাকবে রাষ্ট্রপ্রধানের এবং তিনি হবেন সর্বোচ্চ বিচারালয়ের সর্বোচ্চ বিচারক।
১২) মুহাম্মদ (সাঃ) এর অনুমতি ব্যতীত মদীনাবাসীগণ কারও বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে পারবে না।
১৩) মুসলমানদের কেউ যদি অন্যায় কিংবা বিশ্বাসঘাতকতা করে তবে সবাই মিলে তার বিরুদ্ধে যথোচিত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। নিজ সন্তান বা আত্নীয় হলেও এ ব্যাপারে তাকে ক্ষমা করা যাবে না।

সুত্র ঃউইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৮ thoughts on “মদিনার সনদ

  1. প্রধানমন্ত্রী বললেন মদীনার
    প্রধানমন্ত্রী বললেন মদীনার সনদ অনুযায়ী দেশ চলবে। তবে ১ নং ধারা (১) সনদপত্রে স্বাক্ষরকারী সম্প্রদায়সমূহ ইসলামী রাষ্ট্রের অধীনে একটি সাধারণ জাতি গঠন করবে।)অনুযায়ী সংবিধানে আল্লাহর উপর আস্থা ও বিশ্বাস স্থাপনে অরাজি কেন? রাজনীতিবিদদের লজ্জা থাকে না। তাই বলে প্রধানমন্ত্রীও এমন হাস্যকর কথা বলবেন!

  2. ১২) মুহাম্মদ (সাঃ) এর অনুমতি

    ১২) মুহাম্মদ (সাঃ) এর অনুমতি ব্যতীত মদীনাবাসীগণ কারও বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে পারবে না

    এই সনদটা যুগোপযোগী। খালেদা-হাসিনা-উত্তর কোরিয়া-দক্ষিন কোরিয়া-চীন-সমগ্র আরব বিশ্ব এই সনদটাকে মনে প্রাণে মানে।

    আমাদের প্রধানমন্ত্রী কিন্তু বলে নাই মদিনা সনদের এত নম্বর সনদের আলোকে দেশ গড়ব। তিনি পুরা মদিনা সনদের কথা বলেছেন। সেখান থেকে যেটা পছন্দ সেটা বেছে নেবেন। তার মধ্যে ১২ নম্বরটা বেশী যুতসই। এখন যদি আমরা মনে করে বসি আমাদের প্রধানমন্ত্রী পুরা মদিনা সনদ বাস্তবায়নের কথা বলেছেন, তাহলে ভুল করবেন। পুরা মদিনা সনদের আলোকে বিশ্বের কোন দেশই চলে না। ইজমা-কিয়াসের মত ইনডেমনিটি দিয়া যার যার পছন্দ অনুযায়ী মদিনা সনদের আলোকে বিশ্বজাহানকে আলোকিত করছে।

    1. মদীনার সনদের এমন কিছু দ্বারা
      মদীনার সনদের এমন কিছু দ্বারা আছে,যেটা প্রধানমন্ত্রী বলার পূর্ব থেকেই আমাদের দেশে চলে আসছে। এখন আলাদাভাবে বলার অর্থ কী? নিশ্চয় হেফাজতীদের কথা মাথায় রেখে কথাটা বলেছেন। একটু মাথা খাটান। সবকিছু স্পষ্ট পেয়ে যাবেন।
      মদীনার সনদের সবকিছু বাস্তবায়ন সম্ভব না কথা সত্য। কিন্তু যেসব সম্ভব সেসব মানলে তো সংবিধানে আল্লাহর উপর আস্থা ও বিশ্বাস এবং বিসমিল্লাহ চলে আসে। এই দাবীটা তো কঠিন কিছু না।

      1. শুনেন ভাই, ক্ষমতার প্রয়োজনে
        শুনেন ভাই, ক্ষমতার প্রয়োজনে আওয়ামীলীগ পুরা মদিনা সনদ বাস্তবায়নে দ্বিধা করবেনা। ওদের প্রয়োজন মসনদ। বায়াত্তরের সংবিধান বাস্তবায়ন না হইয়া পুরা মদিনা সনদ বাস্তবায়নের বিনিময়ে যদি আরো পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকার নিশ্চয়তা পাওয়া যায়, তাতে আওয়ামীলীগ এক পায়ে খাড়া। হেফাজত যদি সরকারের সাথে সমাঝোতায় না আসে প্রয়োজনে আওয়ামীলীগ ‘ইনসাফে ইসলাম’ নামে নতুন মোল্লাদের গ্রুপ চাঙ্গা করবে। তার লক্ষন কিন্তু দেখা যাচ্ছে। সংবিধানে বিসমিল্লাহ থাকলেও খালেদা রাতে ঘুমানোর আগে কয়েক প্যাগ মদ গিলে ঘুমাতে যাবে, না থাকলেও যাবে। মাঝখানে দেশটা ক্রমশ কট্টর মৌলবাদীতার দিকে প্রবেশ করবে।

  3. স্বাধীনতার পর দেশ গঠনের সময়
    স্বাধীনতার পর দেশ গঠনের সময় বা স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের যে কোন রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে ভারতের হস্থক্ষেপ ব্যপক ছিল বলে শোনা যায়।বাস্তবতা টাও এরকমি বলে।তো অইসময় সেকুলারিজম বেপারটা সুনিদিষ্ট প্লাটফর্মে ছিলনা বা প্রাতিষ্ঠানিকতা ছিলনা।যেটা এখনও পরিষ্কার না এমনকি স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যেও না।

  4. যারা মদিনা সনদকে
    যারা মদিনা সনদকে ধর্মনিরপেক্ষতা বলে ভাবেন
    তারা আসলে বাস্তব সত্য জানেন
    না বা জেনেও সেই
    বাস্তবতা মেনে নিতে পারেন না। মদিনা সনদ
    বা সমঝোতা কখনও ধর্মনিরপেক্ষতা ছিলনা।
    কারণ সে সনদে পৌত্তলিকদের সাথে কোন
    সমঝোতা হয়নি। সেটি ছিল এক
    আল্লাহতে বিশ্বাসী ধর্মীয়দের সহ অবস্থান
    মাত্র। মদিনা সনদে শুধু মাত্র এক
    আল্লাহতে বিশ্বাসী ধর্ম গোত্রকে তাদের
    ধর্ম কর্ম তাদের বিশ্বাস
    অনুযায়ী চালিয়ে যাবার স্বাধীনতা দিয়েছিল
    তেমনি এক আল্লাহয় বিশ্বাসী ধর্ম অন্য এক
    আল্লাহয় বিশ্বাসী ধর্মের প্রতি কোন
    প্রকার বৈরী প্রচারণা চালাতে নিষেধ ও
    করেছিল। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী মদিনার
    ইহুদিরা সে সমঝোতাকে সম্মান করে নাই
    যার ফলে মুসলিম ইহুদী সংঘাত অনিবার্য
    হয়ে উঠেছিল। তাছাড়া মদিনা সনদে গোত্র
    ভিত্তিক সরকার ব্যবস্থাও বহাল ছিল!
    মদিনা সনদে রাসুল সাঃকে সর্বময় চুড়ান্ত
    ক্ষমতা দেয়া হয়েছিল। উনার সিদ্ধান্তই
    চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত
    হবে বলে সমঝোতা হয়েছিল।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

27 − 17 =