মন স্বস্তি পাচ্ছে না……

৬ই মার্চের এক সন্ধ্যা রাতে’র ঘটনা।আটটা কি সাড়ে আটটার মত বাজে হয়তবা।সে আর এমন কি রাত।প্রতি দিনের মত ঐ দিনও কাজ শেষে বাড়ি ফিরছি।থাকি জয়দেবপুরে।চৌরাস্তা থেকে বাসা অবধি যেতে নিদেনপক্ষে দুই দফা যান মাড়িয়ে তারপর। বাস রিক্সা অথবা টেম্পো রিক্সা এই ক্রমে।সেই রাতে,মাত্র চৌরাস্তা মোড়ে দাঁড়ালাম।মানুষ গিজগিজ করছে;শয়ে শয়ে;হাজারো মানুষের উপচে পড়া ভিড়।সবার চোখে মুখে আতঙ্ক আর অপেক্ষা।যানশূন্য মহাসড়ক।

পরদিন মহান হরতাল দিবস।এমনি এক সময় হঠাৎ পাশেই পার্ক করা পুলিশের বড় সাইজের দুইটি ভ্যান ও একটি রেকার ধেয়ে চলে গেল জদেবপুরের দিকে।দৃশ্যটা এমন যে,পিছন থেকে ধাওয়া খেয়ে প্রান ভয়ে পালানোর মত করে হুশ করে বের হয়ে যাওয়া কিছু একটা।পাবলিক এই ফিল্মি দৃশ্যে হতভম্ব,মোটামোটি স্তম্ভিত।কিন্তু আমি যা বুঝার বুঝে ফেললাম ততোক্ষণে।

ফুটপাথে দাড়িয়ে একটা সিগারেট ধরালাম;জন প্লেয়ার গোল্ডলিফ।এই চৌরাস্তার বিভিন্ন মোড়ে প্রায় সবসময় পুলিশ অথবা র‍্যাবের টহলরত এক বা একাধিক ভ্যান দেখা যায়।এইদেশে মহান হরতাল দিবসের আগের রাতে হরতাল প্রিয় ভাইয়েরা উৎসব করেন ভিন্ন কায়দায় সন্ত্রাস আর জ্বালাও পোড়াও তাণ্ডব চালিয়ে।আমরা শান্তিপ্রিয় মানুষেরা চাঁদ রাতে যেরকম প্রিয়জন বেষ্টিত হয়ে উল্লাসে আর প্রানের উৎছাসে মাতি।ভাল খারাপ মিলিয়ে আজব এক মিল।

রাস্তায় ভিড় ক্রমেই বাড়তে থাকল।আর স্পষ্ট হতে থাকল অপেক্ষায় থাকা মানুষ গুলোর চোখে মুখে ক্লান্তি আর শ্রান্তির ছাপ।যখনি একটা টেম্পো বা বাস আসছে তখনি “রেসিডেন্ট ইভিল” সিনেমার কোন সিকুয়েন্স।হঠাৎ যখন “এলিস” ম্যাডাম আসলেন অথবা তার কোন কো-ফাইটার,আমরা শয়ে শয়ে,হাজারও ভেম্পায়ার তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ছি।বুঝতেই পারছেন যানবাহনের কথা বলছি।বাড়ি যেতে হবে যে।আহ কি শান্তি!রিয়েল লাইফে ফিল্মি ফ্লেভার।তো,এইভাবে একটি বাসে শেষতক্ উঠলাম।ভালোই হল।এই টাইমে টেম্পো অথবা স্কুটার জার্নি একটু রিস্কিও বটে।এইসব সাত পাঁচ হিসাব করছি আর বাসও ভদ্র লোকের হাঁটার গতিতে এগুচ্ছে।অল্প জার্নি বলে সবার যাত্রীর ভাড়া কাটা সম্ভব হয়না;তাই বাসও ভদ্রলোকের হাঁটার গতিতে এগোন।ডিরেক্ট ক্যাশ ফ্লো মিস্বলে কথা।অল্প এগুতেই যা দেখলাম আমার বুঝা আরও পরিষ্কার হতে লাগল।বুঝতে লাগলাম পুলিশ ভ্যান ,রেকার নিমেষে হারিয়ে যাওয়ার কারন।সামনে দেখি আগুনে দগ্ধ একটা সি এন জি উল্টে চিৎ হয়ে আছে রাস্তার কিনার মাঝ বরাবর।

ভীত সন্তস্ত্র মানুষ দুই ধারের ফুটপাত উপচে এমনকি রাস্তা ভরেও পিলপিল করে এগুচ্ছে অনেকটা দিক বিদিক দিশেহারা ছুটাছুটি।এই ছুটাছুটির মাঝেও সেই স্কুটার চালক প্রায় একেবারেই পুড়ে যাওয়া উলটে চিৎ হয়ে থাকা সি এন জি স্কুটার সচলকরতে,টানটান সোজা হয়ে দাঁড়ানোতে প্রানান্ত চেষ্টায় ব্যস্ত।আধো আলো আধো অন্ধকারে ব্যস্ততা মিশ্রিত সেই সি এন জি চালকের আসহায়,মলিন মুখচ্ছবি আর উল্টে যাওয়া দগ্ধ সি এন জি স্কুটার যেন নষ্ট হয়ে যাওয়া,ভেঙ্গে খানখান হয়ে যাওয়া,চিৎ হয়ে যাওয়া সাম্প্রদায়িক সমাজ ব্যবস্থার প্রতিচ্ছবি।মনে হচ্ছিল বাস থেকে নেমে ভিড়ের মধ্যে ঢুকে যাই,হারিয়ে যাই।হাউমাউ করে চিৎকার করি।প্রানভয়ে ছুটাছুটি করা মানুষ গুলো কে থামিয়ে শরীরের সর্বশক্তি দিয়ে বলি “আমার সমাজ আজ কিছু দুর্বৃত্তের দ্বারা দগ্ধ হয়ে চিৎ হয়ে উল্টে পরে আছে”।

আমার বাস পিকেটিং এর ভয়ে গতি বাড়িয়ে দিল।সত্যি বলতে কি,বাস চালক ও কিছুটা কনফিওসড ছিল সামনে এগুনোর বেপারে।কিছুদূর যাওয়ার পর বাস চালক তার সমূহ ক্ষতির সংশয় দেখিয়ে আমাদের বাস থেকে নামিয়ে দিল।এম্নিতে পুড়ে যাওয়া সেই দৃশ্য ভিতরে ভিতরে আমার মনকেও পোড়াতে লাগলো,সাথে যোগ হল বাস থেকে নামিয়ে দেওয়ার রাগ।আবারো একটা জন প্লেয়ার গোল্ডলিফ।মাথা নিচু করে ফুটপাথ ধরে হাটছি।আমাকে কষ্ট করে হাঁটতে হচ্ছে না মনে হচ্ছে,জনস্রোতই আমাকে সামনে নিয়ে জাচ্ছে।এভাবেমাথা নিচু করে মিনিট দুয়েক যাওয়ার পর মনে হল সামনে অনেক বেশি আলো।মাথা তুলে তাকাতেই চোখ চরক গাছ।”ফায়ার ফ্লেম”–অল্প দূরে দাউদাউ করে জ্বলছে প্রায় কোটি টাকা মুল্যের একটি বাস।কিছুটা ভয় পেলাম।হাঁটা থামাচ্ছি না।হাটছি তো হাটছি।এক পর্যায় আগুনের উত্তাপ পেতে লাগ্লাম।আমি হেটেই চলছি।উত্তাপ কমতে লাগল।হাটতে হাটতে হরতালপ্রিয় সন্ত্রাসীদের কুকীর্তির সাক্ষী সেই লেলিহান শিখাকে কখন যে পেড়িয়ে এসেছি টের পাইনি অন্যমনস্কতায়।হটাৎ মুঠো ফোনের শব্দে অন্যমস্কতার সুতা কাটে।বেজেই জাচ্ছে তো বেজেই জাচ্ছে।বাসার সবাই হয়ত চিন্তা করছে।’মা চিন্তিত।টিভি নিউজের একটার পর একটা চ্যানেল বদলাচ্ছেন।ফোনে আশ্বস্ত করলাম যে, আমি নিরাপদে আছি।এভাবে বাকী পথ টুকু আনমনে হাঁটতে হাঁটতে বাসায় আসলাম।বাসায় ঢোকা মাত্র ‘মা স্বস্তি পেলো তার সন্তান কে কাছে পেয়ে,ভাই স্বস্তি পেলো তার ভাইকে পেয়ে,বোন স্বস্তি পেলো তার ভাইকে পেয়ে,স্বস্তি পেলামনা শুধু আমি।

পারলামনা চিৎকার করে হাউ মাউ করে কাঁদতে,পারলামনা ভিড়ের মধ্যে ঢুকে যেতে,পারলামনা সেই দগ্ধ উল্টে চিৎ হয়ে যাওয়া সি এন জি স্কুটার টাকে টানটান সোজা করে দাড় করাতে,পারলামনা দলা করে থুথু মারতে দাউদাউ করে জলতে থাকা বাসটা নিভানোর চেষ্টা না করে মোবাইলে জ্বলন্ত বাসের গনগনে আগুনের ভিডিও ধারনে ব্যস্ত পুলিশ গুলোর মুখে।বলতে পারলাম না পর্যন্ত ‘মার কাছে,”মাগো আমার সমাজ জ্বলে পুড়ে,উলটে পড়ে যাচ্ছে।মাগো মন স্বস্তি পাচ্ছেনা”

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৫ thoughts on “মন স্বস্তি পাচ্ছে না……

  1. ইস্টিশন বিধিটা একটু পড়েন।
    ইস্টিশন বিধিটা একটু পড়েন। তারপর পোস্ট দেন। আজকে সর্বমোট কয়টা লেখা পোস্ট করবেন বলে ভেবেছেন?

    1. বেপারটা আসলেই স্বাভাবিক
      বেপারটা আসলেই স্বাভাবিক কিন্তু প্রত্যক্ষ ভাবে অভিজ্ঞতা আছে এ বেপারে যাদের তারা কেবল বুঝবে।খুব ভয় লাগছিল সেই দিন।আর অবাক লাগে সম্পদের ক্ষতি করা কিভাবে গনতান্ত্রিক অধিকার হয়?

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 3 = 6