মার্কসবাদের তিনটি অঙ্গ ও তিনটি উৎস | লেনিন

গোটা সভ্য জগৎজুড়ে বুর্জোয়াবিজ্ঞানের (সমাজবিজ্ঞান) সবগুলোর (সরকারী ও উদারনৈতিক উভয়টির) মধ্যেই মার্কসের শিক্ষাবলী উদ্রেক করে থাকে চরম বৈরিতা ও ঘৃণা, যা মার্কসবাদকে মনে করে এক ধরণের ‘অতীব ক্ষতিকর সংকীর্ণ গোষ্ঠি’ (sect) বলে। অবশ্য এছাড়া অন্য কোনো মনোভাব প্রত্যাশাও করা যায় না, কারণ শ্রেণীসংগ্রামের ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত একটি সমাজে কোনো ‘নিরপেক্ষ’ সমাজবিজ্ঞান থাকতেই পারে না।

সমস্ত সরকারী ও উদারনৈতিক বিজ্ঞান কোনো না কোনোভাবেই পক্ষাবলম্বন করে মজুরী দাসত্বের, পক্ষান্তরে মার্কসবাদ ওই দাসত্বেরই বিরুদ্ধে ঘোষণা করে বিরামহীন যুদ্ধ। পুঁজির মুনাফা কমিয়ে শ্রমিকদের মজুরী বাড়ানো হবে কিনা সেই প্রশ্নে কারখানা মালিকদের কাছে নিরপেক্ষতা আশা করাটা যেমন নির্বোধ সারল্য, তেমনি মজুরী দাসত্বের সমাজে ওই সমাজবিজ্ঞানের নিরপেক্ষতা প্রত্যাশা করাটাও সমান বোকামিপূর্ণ সারল্য।

কিন্তু এটাই সব কথা নয়। দর্শনের ইতিহাস আর সমাজবিজ্ঞানের ইতিহাস যথার্থ স্পষ্টতা সহকারেই দেখিয়ে দিচ্ছে যে, সংকীর্ণতার গন্ডিতে আবদ্ধ, প্রস্তরীভূত এক মতবাদ, বিশ্বসভ্যতার বিকাশধারার মূল স্রোত থেকে বহু দূরে উদ্ভূত এক মতবাদ- এই অর্থে সংকীর্ণতাবাদের সাথে মার্কসবাদের কোনোই মিল নেই। বিপরীতপক্ষে, মানবজাতির শ্রেষ্ঠ মনীষীদের মনোজগতে ইতোমধ্যেই যেসব জিজ্ঞাসা দেখা দিয়েছিল যথার্থভাবে সেসবের উত্তর প্রদানের মধ্যেই নিহিত রয়েছে মার্কসের প্রতিভার বৈশিষ্ট্য। দর্শন, রাজনৈতিক অর্থনীতি ও সমাজতন্ত্রের শ্রেষ্ঠ প্রতিনিধিদের শিক্ষাবলীর প্রত্যক্ষ ও আশু ধারাবাহিকতা হিসেবেই উদ্ভূত হয়েছিল মার্কসের মতবাদ।

মার্কসীয় মতবাদ সর্বশক্তিমান, কারণ তা হলো সত্য। এই মতবাদ উপলব্ধিযোগ্য ও সঙ্গতিপূর্ণ, আর তা মানুষকে এমন এক অখন্ড বিশ্ব দৃষ্টিভঙ্গীর যোগান দেয় যা যেকোনো রূপের কুসংস্কার, প্রতিক্রিয়া বা বুর্জোয়া নিপীড়নের পক্ষ সমর্থনের সাথে বৈসাদৃশ্যপূর্ণ (irreconcilable)। জার্মান দর্শন, ইংলিশ রাজনৈতিক অর্থশাস্ত্র আর ফরাসী সমাজতন্ত্রবাদের প্রতিরূপে ঊনবিংশ শতাব্দীতে মানুষের যা কিছু শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি তারই বৈধ উত্তরাধিকারী হলো মার্কসবাদ।

মার্কসবাদের এই তিনটি উৎস নিয়েই আমরা এখন সংক্ষেপে আলোচনা করব, যেগুলো হচ্ছে তার অপরিহার্য অঙ্গও বটে।

১।
মার্কসবাদের দর্শন হলো বস্তুবাদ। ইউরোপের আধুনিক ইতিহাসজুড়ে আর বিশেষ করে অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষের দিকে ফ্রান্সে, যখন প্রতিটি রকমের মধ্যযুগীয় জঞ্জালের বিরুদ্ধে, প্রাতিষ্ঠানিক ও ধ্যান ধারণাগত ক্ষেত্রে ভুমিদাস প্রথার বিরুদ্ধে, এক সুদৃঢ় সংগ্রাম পরিচালিত হয়েছিল, তখন বস্তুবাদই প্রতিপাদ্য হলো একমাত্র দর্শন যা সঙ্গতিপূর্ণ, প্রকৃতিবিজ্ঞানের সমস্ত শিক্ষাবলীর প্রতি বিশ্বস্ত আর কুসংস্কার, ধর্মীয়, ভন্ডামি, ইত্যাদি বিরোধী। গণতন্ত্রের শত্রুরা তাই, সবসময় তাদের সমস্ত প্রচেষ্টা নিবদ্ধ করেছে বস্তুবাদকে ‘খন্ডন করা’র জন্য, তাকে হেয় প্রতিপন্ন করা ও অপবাদে জর্জরিত করার জন্য, আর সর্বদা প্রচার করেছে নানারূপের দার্শনিক ভাববাদ, যা সর্বদাই, এক বা অন্য পন্থায়, পর্যবসিত হয়েছে ধর্মের রক্ষা-সমর্থন অথবা পক্ষাবলম্বনে।

মার্কস ও এঙ্গেলস সবচেয়ে দৃঢ়ভাবেই সমর্থন করেছেন দার্শনিক বস্তুবাদকে আর এই ভিত্তি থেকে প্রতিটি বিচ্যুতি কীরূপ সুগভীরভাবে ভ্রান্ত তা বারবার ব্যক্ত করেছেন। তাঁদের এই মতামত সবচেয়ে স্পষ্ট ও পরিপূর্ণভাবে ব্যাখ্যা লাভ করেছে এঙ্গেলসের রচনা ল্যুদভিগ ফয়ারবাখ এবং এ্যান্টি-ড্যুরিঙ বই দুটিতে, যেগুলো কমিউনিস্ট ইশতেহারের মতোই প্রত্যেক শ্রেণীসচেতন শ্রমিকের কাছে নিত্যপাঠ্য পুস্তক।

কিন্তু অষ্টাদশ শতাব্দীর বস্তুবাদেই মার্কস থেমে থাকেননি। তিনি দর্শনকে উন্নীত করেছেন আরো উচ্চস্তরে। তিনি একে সমৃদ্ধ করেছেন জার্মান চিরায়ত দর্শনের অবদানসমূহ, বিশেষ করে হেগেলীয় পদ্ধতি দিয়ে, যা পালাক্রমে এগিয়ে গিয়েছিল ফয়েরবাখের বস্তুবাদে। এক্ষেত্রে প্রধান অবদানটি ছিল দ্বন্দ্বতত্ত্ব, অর্থাৎ পূর্ণতম-গভীরতম আর সবচেয়ে বোধগম্য রূপে বিকাশের তত্ত্বমত, যে মানবজ্ঞান শ্বাশ্বত রূপে বিকাশমান বস্তুর এক প্রতিফলন আমাদের যোগাচ্ছে সেই মানবজ্ঞানের আপেক্ষিকতার তত্ত্বমত (doctrine)। পুরনো ও অবক্ষয়গ্রস্ত ভাববাদের মধ্যেই যে বুর্জোয়া দার্শনিকেরা ‘নতুন’ প্রত্যাবর্তন ঘটিয়েছিল সেটা সহযোগে ওই বুর্জোয়া দার্শনিকদের শিক্ষাবলী সত্ত্বেও রেডিয়াম, ইলেক্ট্রন, মৌলের রূপান্তর সাধন- প্রকৃতিবিজ্ঞানের এসব আধুনিকতম আবিষ্কার ছিল মার্কসের দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদেরই এক লক্ষণীয় স্বীকৃতি।

দার্শনিক বস্তুবাদকে মার্কস গভীরতর ও বিকশিত করেন পূর্ণ মাত্রায়, আর প্রকৃতি সম্পর্কিত জ্ঞানকে প্রসারিত করে নিয়ে যান মানবসমাজ সম্পর্কিত যে-জ্ঞান সেটাকেও তার অন্তর্ভূক্ত করার দিকে। তাঁর ঐতিহাসিক বস্তুবাদ ছিল বৈজ্ঞানিক চিন্তার ক্ষেত্রে এক মহান কীর্তি। ইতিহাস ও রাজনীতি সম্পর্কিত দৃষ্টিভঙ্গীর ক্ষেত্রে এতকাল যে বিশৃঙ্খলা ও স্বেচ্ছাচারিতার রাজত্ব চলছিল তার স্থলে অধিষ্ঠিত হলো লক্ষণীয়রূপে অখন্ড ও সামঞ্জস্যপূর্ণ বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব, যা দেখিয়ে দেয়, উৎপাদিকা শক্তিসমূহের বৃদ্ধি-বিকাশের ফলশ্রুতিতে কীভাবে সমাজজীবনের এক ব্যবস্থাপদ্ধতি বিকাশ লাভ করে অন্য ও উচ্চতর ব্যবস্থাপদ্ধতিতে- দৃষ্টান্তস্বরূপ কীভাবে সামন্ততন্ত্র থেকে বিকাশ ঘটে পুঁজিবাদের।

মানুষের অস্তিত্ব-নিরপেক্ষভাবেই যে প্রকৃতি বিদ্যমান, মানুষের জ্ঞান হলো ঠিক যেমন সেই প্রকৃতিরই (অর্থাৎ বিকাশমান বস্তুর) প্রতিফলন, তেমনি মানুষের সামাজিক জ্ঞান (অর্থাৎ দর্শন, ধর্ম, রাজনীতি ইত্যাদি সম্পর্কিত তার বিভিন্ন মতামত ও তত্ত্ব) হলো সমাজের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রতিফলন। রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলি হলো অর্থনৈতিক বুনিয়াদের উপর প্রতিষ্ঠিত উপরিকাঠামো। দৃষ্ঠান্তস্বরূপ, আমরা দেখতে পাই যে, আধুনিক ইউরোপীয় রাষ্ট্রসমূহের রাজনৈতিক রূপ যাই হোক না কেন তা সর্বহারাশ্রেণীর উপর বুর্জোয়াদের আধিপত্য জোরদার করার কাজটাই করে থাকে।

মার্কসের দর্শন হল সুসম্পূর্ণ দার্শনিক বস্তুবাদ, যা মানবজাতিকে, আর বিশেষ করে শ্রমিকশ্রেণীকে প্রদান করেছে জ্ঞানের শক্তিশালী হাতিয়ার।

২।
অর্থনৈতিক ব্যবস্থাই হলো ভিত্তি যার উপর দাঁড়িয়ে আছে রাজনৈতিক উপরিকাঠামো- একথা উপলব্ধি করার পর মার্কস তাঁর সর্বোচ্চ মনোযোগ নিবদ্ধ করেন এই অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যবেক্ষণে। মার্কসের প্রধান রচনা পুঁজি নিয়োজিত রয়েছে আধুনিক, অর্থাৎ পুঁজিবাদী সমাজের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার অধ্যায়ন-পর্যবেক্ষণে।

মার্কসের পূর্বেই, চিরায়ত রাজনৈতিক অর্থনীতির উদ্ভব ঘটে পুঁজিবাদী দেশসমূহের মধ্যে সবচেয়ে বিকশিত দেশ ইংল্যান্ডে। অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নিয়ে তাঁদের অনুসন্ধানকর্মের মধ্য দিয়ে অ্যাডাম স্মিথ ও ডেভিড রিকার্ডো স্থাপন করে যান মূল্যের শ্রম-তত্ত্বের ভিত্তি। তাঁদের কাজটাই এগিয়ে নিয়ে যান মার্কস, তিনি এই তত্ত্বের প্রমাণ উপস্থিত করেন এবং সঙ্গতিপূর্ণভাবে তার বিকাশ সাধন করেন। তিনি দেখিয়ে দেন যে, প্রতিটি পণ্যের মূল্যই র্নিধারিত হয় সেটা উৎপাদন করতে গিয়ে ব্যয়িত সামাজিকভাবে আবশ্যক শ্রম-সময়ের পরিমাণ দ্বারা।

বুর্জোয়া অর্থনীতিবিদেরা যেখানে দেখেছিলেন দ্রব্যের সাথে দ্রব্যের সম্পর্ক (এক পণ্যের সাথে অন্য পণ্যের বিনিময়) মার্কস সেখানে উদঘাটিত করলেন মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্ক। পণ্যের বিনিময় অভিব্যক্ত করে বাজারের মাধ্যমে স্বতন্ত্র উৎপাদকদের মধ্যেকার সংযোগ-সম্পর্ক। মুদ্রার তাৎপর্য হলো এই যে, এই সংযোগ-সম্পর্কটা ঘনিষ্ঠ থেকে ঘনিষ্টতর হচ্ছে, একট অখন্ড সমগ্রতায় স্বতন্ত্র উৎপাদকদের গোটা অর্থনৈতিক জীবনকে অবিচ্ছেদ্যরূপে তা এক সূত্রে গ্রথিত করছে। পুঁজির তাৎপর্য হলো এই সংযোগ-সম্পর্কের আরো অধিক বিকাশ- মানুষের শ্রমশক্তি হয়ে উঠেছে পণ্য। মজুরী-শ্রমিক তারা শ্রমশক্তি বিক্রি করছে জমির, ফ্যাক্টরির এবং শ্রমের যন্ত্রগুলোর মালিকদের কাছে। শ্রমিক দিনের একটা অংশ ব্যয় করে নিজের ও পরিবারের ভরণ-পোষণের খরচা তোলার জন্য (মজুরী), অন্যদিকে দিনের বাকী অংশটা সে কাজ করে বিনা মজুরীতে, সৃষ্টি করে পুঁজিবাদী উদ্বৃত্তমূল্য, যা হলো পুঁজিপতি শ্রেণীর মুনাফার উৎস, সম্পদের উৎস।

উদ্বৃত্ত-মূল্যের তত্ত্বমত হলো মার্কসের অর্থনৈতিক তত্ত্বের ভিত্তিমূল।

শ্রমিকেরই শ্রমে সৃষ্ট পুঁজি পিষে মারে শ্রমিককেই, ক্ষুদে উৎপাদকদের করে ধ্বংস আর সৃষ্টি করে বেকারদের বাহিনী। শিল্পের ক্ষেত্রে, বৃহদায়তন উৎপাদনের বিজয় অবিলম্বেই স্পষ্টত প্রতীয়মান হয়, কিন্তু একই ঘটনা লক্ষ্য করা যায় কৃষির ক্ষেত্রেও, যেখানে বৃহদায়তন পুঁজিবাদী কৃষির শ্রেষ্ঠত্ব প্রবলতর হয়, বৃদ্ধি পায় যন্ত্রপাতির ব্যবহার, আর মুদ্রা-পুঁজির ফাঁদে পড়ে, কৃষক-অর্থনীতির ঘটে অবক্ষয় এবং পশ্চাদপদ কৃৎ-কৌশলের বোঝা কাঁধে নিয়ে পতিত হয় ধ্বংসের মুখে। ভিন্ন ভিন্ন রূপ পরিগ্রহ করলেও কৃষিতে ক্ষুদ্রায়তন উৎপাদনের অবক্ষয় এক তর্কাতীত সত্য।

ক্ষুদ্রায়তন উৎপাদনের ধ্বংস সাধনের ম্যাধমে, পুঁজি সুচনা করে শ্রমের উৎপাদনশীলতার ক্ষেত্রে বৃদ্ধি এবং বৃহৎ পুঁজিপতিদের সঙ্ঘগুলির (associations) জন্যে একচেটিয়া অবস্থানের সৃষ্টি। উৎপাদন খোদ হতে থাকে উত্তরোত্তর সামাজিক- লক্ষ লক্ষ এবং কোটি কোটি শ্রমিক একত্রে বাঁধা পড়ে এক সুসংবদ্ধ অর্থনৈতিক সত্তায় (regular economic organism)- কিন্তু এই যৌথ শ্রমের ফল আত্মসাৎ করে নেয় মুষ্টিমেয় পুঁজিপতিরা। উৎপাদনের নৈরাজ্য, সংকট, বাজারের জন্যে উন্মক্ত ছোটাছুটি এবং ব্যাপক জনসাধারণের জীবনযাত্রার অনিশ্চয়তা হয়ে উঠে তীব্র।

পুঁজির উপর শ্রমিকদের নির্ভরশীলতা বৃদ্ধি করে, পুঁজিবাদী ব্যবস্থা সৃষ্টি করে সম্মিলিত শ্রমের বিশাল শক্তি।

পুঁজিবাদের বিকাশকে মার্কস অনুসন্ধান করেছে ভ্রূণাকারের পণ্য-অর্থনীতি থেকে, সরল বিনিময় থেকে শুর করে তার সর্বোচ্চ রূপ, বৃহদায়তন উৎপাদন পর্যন্ত।

আর পুরানো ও নতুন- সবরকম পুঁজিবাদী দেশের অভিজ্ঞতা প্রতি বছরেই ক্রমবর্ধমান সংখ্যক শ্রমিকদের কাছে স্পষ্টত প্রদর্শন করছে এই মার্কসীয় মতবাদের সত্যতা।

সমস্ত বিশ্বজুড়েই পুঁজিবাদ বিজয় লাভ করেছে, কিন্তু এই বিজয় হলো শুধু পুঁজির উপর শ্রমের বিজয়েরই ভূমিকা স্বরূপ।

৩।
সামন্ততন্ত্রের উচ্ছেদ যখন ঘটলো আর দুনিয়ার বুকে আবির্ভূত হলো ‘স্বাধীন’ পুঁজিবাদী সমাজ, তখন তাৎক্ষণিকভাবেই একথা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে, শ্রমজীবী জনগণের উপর নিপীড়ন ও শোষণের এক নয়া ব্যবস্থাই হলো এই স্বাধীনতার অর্থ। এই নিপীড়নের এক প্রতিফলন এবং এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হিসেবে অবিলম্বেই উদ্ভূত হয় বিভিন্ন সমাজতান্ত্রিক মতবাদ। কিন্তু প্রারম্ভিক সমাজতন্ত্র ছিল কল্পলৌকিক সমাজতন্ত্র (utopian socialism)। পুঁজিবাদী সমাজের তা সমালোচনা করেছে, জানিয়েছে নিন্দাবাদ, আর বর্ষণ করেছে অভিশম্পাত, স্বপ্ন দেখেছে তার ধ্বংসের, কল্পনা করেছে এক উন্নততর ব্যবস্থার আর শোষণ যে নীতি-বিগর্হিত তা বোঝানোর চেষ্টা করেছে ধনীদের।

কিন্তু সত্যিকার সমাধানের কোন পথ নির্দেশ করতে পারেনি কল্পলৌকিক সমাজতন্ত্র। পুঁজিবাদের অধীনে মজুরী দাসত্বের আসল প্রকৃতি তা করতে পারেনি ব্যাখ্যা, পারেনি পুঁজিবাদী বিকাশের নিয়মাবলী উদ্ঘাটন করতে, কিংবা কোন সামাজিক শক্তি নুতন সমাজের নির্মাতা হওয়ার ক্ষমতা রাখে তা দেখিয়ে দিতে।

ইতোমধ্যে, ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ যে বিপ্লবসমূহ ইউরোপের সর্বত্র, বিশেষ করে ফ্রান্সে, সাথে নিয়ে আসে সামন্ততন্ত্রের, ভূমিদাস প্রথার পতন, সেগুলো উত্তরোত্তর স্পষ্টরূপে উদ্ঘাটন করে দেয়- শ্রেণীসমূহের সংগ্রামই হলো সমস্ত বিকাশের ভিত্তি ও চালিকাশক্তি।

সামন্তশ্রেণীর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক স্বাধীনতার কোন একক বিজয়ও অর্জিত হয়নি তাদের প্রতিরোধ চুর্ণ না করে। পুঁজিবাদী সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীর মধ্যকার জীবন-মরণ সংগ্রাম ছাড়া কম বা বেশী মুক্ত ও গণতান্ত্রিক ভিত্তিতে কোন একটি পুজিবাদী দেশেরও ঘটেনি উদ্ভব।

বিশ্ব ইতিহাস যে শিক্ষা তুলে ধরেছে তা থেকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা এবং সেই শিক্ষাকে সুসঙ্গতরূপে প্রয়োগ করায় সর্বাগ্রগামী হওয়ার মধ্যেই নিহিত রয়েছে মার্কসের প্রতিভার বৈশিষ্ট্য। এক্ষেত্রে যে সিদ্ধান্তটি তিনি গ্রহণ করেন তা হল শ্রেণী-সংগ্রামের তত্ত্বমত।

সমস্ত ধরনের নৈতিক, ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও সামাজিক বুলি, ঘোষণা ও প্রতিশ্রুতির পেছনে কোন না কোন শ্রেণীর স্বার্থ আবিষ্কার করতে না শেখা পর্যন্ত রাজনীতির ক্ষেত্রে মানুষ সবসময়ই হয়ে এসেছে প্রবঞ্চনা বা আত্মপ্রবঞ্চনার নির্বোধ শিকার, আর সবসময়ই তারা তা হয়ে আসবে। পুরনো ব্যবস্থার রক্ষকদের কাছে সবসময় সংস্কার ও উন্নয়ন সাধনের সমর্থকরা প্রতারিত হয়েই আসবে, যে পর্যন্ত না তারা উপলদ্ধি করবে যে, যত বর্বর ও জরাজীর্ণ প্রতিপন্ন হোক না কেন প্রতিটি পুরনো প্রতিষ্ঠানই টিকে থাকে নির্দিষ্ট শাসকশ্রেণীর শক্তির জোরে। আর ওইসব শ্রেণীর প্রতিরোধ চূর্ণ করার শুধু একটি উপায়ই আছে, তা হলো, সেই শক্তিকেই খুঁজে পেতে হবে আর সংগ্রামের জন্য ওই শক্তিকে জ্ঞানালোকপ্রাপ্ত ও সংগঠিত করতে হবে, খোদ ওই সমাজেই যে শক্তিটি আমাদের চার পাশ ঘিরে রয়েছে- আর তাদের সামাজিক অবস্থানের কারণে- যে শক্তিটি পুরনোকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করতে ও নতুনকে সৃষ্টি করতে পারে এবং অবশ্যই সে তা করবে।

যে মানসিক দাসত্বের মধ্যে আজ অবধি সমস্ত নিপীড়িত শ্রেণীসমূহ হতাশায় মনমরা হয়ে পড়েছিল তা থেকে বেরিয়ে আসার পথ সর্বহারাশ্রেণীকে দেখিয়ে দিয়েছে একমাত্র মার্কসের দার্শনিক বস্তুবাদ। মার্কসের অর্থনৈতিক তত্ত্বই একমাত্র ব্যাখ্যা করছে পুঁজিবাদের সাধারণ ব্যবস্থাটির মধ্যে সর্বহারাশ্রেণীর সত্যিকার অবস্থান।

আমেরিকা থেকে জাপান আর সুইডেন থেকে দক্ষিণ আফ্রিকা- সমস্ত বিশ্বজুড়েই সর্বহারাশ্রেণীর স্বাধীন সংগঠনসমূহ বহুগুণে বেড়ে চলেছে। শ্রেণীসংগ্রাম পরিচালনা করে সর্বহারাশ্রেণী আলোকপ্রাপ্ত ও শিক্ষিত হয়ে উঠছে; বুর্জোয়া সমাজের কুসংস্কার থেকে তারা নিজেদের মুক্ত করছে; আরো ঘনিষ্ঠভাবে তারা নিজেদের সারির মধ্যে সমবেত হচ্ছে আর নিজেদের সাফল্যের খতিয়ান মাপতে শিখছে; নিজেদের শক্তিকে তার ইস্পাতদৃঢ় করছে আর বেড়ে চলেছে অপ্রতিরোধ্যভাবে।

[নোট : মার্কসবাদের তিনটি উৎস ও তিনটি অপরিহার্য অঙ্গ- লেনিনের এই রচনাটিতে মার্কসবাদের প্রতিষ্ঠাতাদের বিশ্ব দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে ওঠার প্রেক্ষাপট আলোচিত হয়েছে। এক কথায়, মার্কসীয় মতাদর্শের সারাংশ, মর্মবস্তু ও তাৎপর্য এতে ধরা পড়েছে। রচনাটি প্রথম প্রকাশ হয় ১৯১৩ সালের মার্চে। ১৯৬৮তে মস্কো থেকে প্রকাশিত লেনিন রচনা সংকলনের ১৯তম খন্ড থেকে এটি গৃহীত। সেরাজুল আনোয়ার কৃত বাংলা অনুবাদটি এখানে অনুসরণ করা হয়েছে। মহামতি লেনিনের প্রয়াণ দিবসে আজ তার এই অপরিসীম গুরুত্বপূর্ণ রচনাটি অনলাইনের সব পাঠকদের তুলে দিলাম। লেখাটি কাজে লাগলে আমাদের উদ্যোগ সার্থক হবে।]

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “মার্কসবাদের তিনটি অঙ্গ ও তিনটি উৎস | লেনিন

  1. লেখাটির একদম শুরুতেই লেনিন
    লেখাটির একদম শুরুতেই লেনিন বিজ্ঞানের ওপর শ্রেণীর আধিপত্যের প্রশ্নটি তুলে ধরেছেন। এরপর পুঁজিবাদীদের চরিত্র ব্যাখ্যা করে এগিয়েছেন এর মূলোৎপাটন তথা মার্কসবাদের দিকে। মার্কসবাদের এত সরল, সংক্ষিপ্ত আলোচনা দুর্লভই বলা চলে। শেষ দিকে এসে ঘোষণা করেছেন এক অমোঘ সত্য।

    বলেছেন, ”সমস্ত ধরনের নৈতিক, ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও সামাজিক বুলি, ঘোষণা ও প্রতিশ্রুতির পেছনে কোন না কোন শ্রেণীর স্বার্থ আবিষ্কার করতে না শেখা পর্যন্ত রাজনীতির ক্ষেত্রে মানুষ সবসময়ই হয়ে এসেছে প্রবঞ্চনা বা আত্মপ্রবঞ্চনার নির্বোধ শিকার, আর সবসময়ই তারা তা হযে আসবে।”

    অসাধারণ এই রচনাটি পড়ুন, এবং ছড়িয়ে দিন। লেনিনের প্রয়াণ দিবস উপলক্ষ্যে তার লেখা তথা মার্কসবাদী শিক্ষাকে জনগণের নিকট পৌঁছে দেয়াটাই তাকে শ্রদ্ধা জানানোর সর্বোত্তম উপায়।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 2 = 1