মূল্যের রূপ এবং পণ্যের রহস্যময়তা (মার্কসীয় অর্থনীতি বিশ্লেষণ) | আনু মুহাম্মদ

মূল্যের সাধারণ রূপ বলতে মার্কস বোঝাচ্ছেন পণ্য যখন একক পণ্য হিশেবে এক ও অভিন্ন পণ্যের মূল্যের প্রাথমিক রূপ প্রকাশ করে। তিনি পণ্যের মূল্য প্রকাশের তিনটি রূপ নির্দিষ্ট করে আলোচনা করছেন। প্রথমটি হলো অন্য আরেকটি পণ্যের সঙ্গে তুলনা করে মূল্য প্রকাশ অর্থাৎ যাকে বলা হয় বিনিময় মূল্য। দ্বিতীয়টি হলো যখন তা ব্যবহারিক মূল্য আকারে প্রকাশ করে। আর তৃতীয়টি আরও বিকশিত রূপ। তাতে একটি পণ্যের সাপেক্ষেই দুনিয়ার অন্য আর সব পণ্যের মূল্য প্রকাশিত হয়।

এখানে মার্কস আনছেন পণ্যের সামাজিকভাবে স্বীকৃত রূপ ধারণাটি। বলছেন, এটা ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে যে, যেহেতু মূল্য হিসেবে পণ্যের অস্তিত্ব সম্পূর্ণ সামাজিক, সেই সামাজিক অস্তিত্ব কেবলমাত্র তাদের সামাজিক সম্পর্কের সম্পূর্ণতা দিয়েই করা যাবে। তার ফলে মূল্যের এই রূপটিকে অবশ্যই সামাজিকভাবে স্বীকৃত একটি রূপ হতে হবে।

সাধারণ মূল্য রূপ আসলে বিভিন্ন ধরনের প্রকৃত শ্রম বা মানবিক শ্রমশক্তির যে ব্যয় তার সংক্ষিপ্ত রূপ। এর কাঠামোর মধ্য দিয়ে এই সত্যটিই প্রকাশিত হয় যে, এটি পণ্য-দুনিয়ার সামাজিক বহিঃপ্রকাশ। এবং এতে যে শ্রম যুক্ত থাকে তার সুনির্দিষ্ট সামাজিক চরিত্র আছে।

তুল্য রূপ
মার্কস এই পর্যায়ে মূল্যের তুল্যরূপের উপরই গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি বলছেন, মূল্যের আপেক্ষিক রূপের বিকাশ তুল্যমূল্যের বিকাশের উপর নির্ভরশীল। এটাও মনে রাখতে বলছেন যে, দ্বিতীয়টি প্রথমটির বিকাশের ফল ও তারই অভিব্যক্তি। মূল্যের তিনটি রূপ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার পর মার্কস শনাক্ত করছেন তুল্যমূল্য রূপ যা সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা পায়। এই তুল্যমূল্য যে কোন পণ্য দিয়ে হতে পারে, কিন্তু একটি পণ্য যখন তুল্য হিসেবে স্বীকৃত হয় তখন তা অন্য সব পণ্য থেকে ভিন্ন সত্তা গ্রহণ করে, কিংবা এই ভিন্ন সত্তা গ্রহণের পরই কেবল তা সর্বজনীন স্বীকৃতি পায়। এই নির্দিষ্ট পণ্য যার শরীরী রূপে তুল্যরূপ সামাজিকভাবে স্বীকৃত হয় সেটাই মুদ্রা পণ্য যা মুদ্রা হিসেবে কাজ করতে থাকে। মুদ্রা হিসেবে ভূমিকা পালন এই পণ্যের বিশেষ সামাজিক কাজ এবং পণ্যের দুনিয়ায় তুল্যমূল্য হিসেবে এটি তার সামাজিকভাবে একচেটিয়া ভূমিকা।

বিভিন্ন পণ্যের মধ্যেকার বিনিময় সম্পর্ক নিয়ে দৃষ্টান্তসহ বিস্তারিত আলোচনার পর মুদ্রাপণ্যের বিষয়টি ব্যাখ্যার জন্য লিনেন-এর বদলে মার্কস স্বর্ণ দিয়ে বিনিময় মূল্য দেখিয়েছেন। দুই তোলা স্বর্ণ তৎকালীন সময়ে তুল্য হচ্ছে ২০ গজ লিনেন, ১টি কোট, ১০ পাউন্ড চা, ৪০ পাউন্ড কফি, আধ টন লোহা ইত্যাদি। প্রথম থেকে দ্বিতীয় ও দ্বিতীয় থেকে তৃতীয় রূপে যাত্রায় যে-পরিবর্তন হয় মার্কস তাকে নির্দেশ করছেন মৌলিক পরিবর্তন হিসেবে। আবার তৃতীয় রূপ থেকেও আরও বিকাশ ঘটে। একটি যে কোন পণ্য থেকে, উদাহরণ স্বরূপ লিনেন থেকে বিকশিত হয়ে নির্দিষ্ট একটি সর্বজনীনভাবে স্বীকৃত রূপ যেমন স্বর্ণের তুল্য হিসেবে আবির্ভাব এটির পরবর্তী পর্ব। মার্কস-পরবর্তী কালে আমরা এর আরও বিকাশ দেখেছি। পরবর্তীতে এই বিষয়ে আমরা আরও কথা বলবো।

মার্কস বলছেন, স্বর্ণ নিজেই অন্য আর দশটি পণ্যের মতো একটি সাধারণ পণ্য ছিল। কিন্তু কালক্রমে এটি অন্য সকল পণ্যের সূত্রে, বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার মধ্যেও, সর্বজনীন তুল্য বা মুদ্রা হয়ে উঠলো। এবং দুনিয়ার সকল পণ্যের মূল্য প্রকাশের একচেটিয়া মাধ্যম হয়ে দাঁড়ালো। সেকারণে মার্কস বলছেন, সাধারণ পণ্য রূপ ছিল মুদ্রারূপেরই ভ্রুণ।

পণ্যের অন্ধভক্তি এবং তার রহস্য
মার্কস পণ্য বিষয়ে এই পর্যায়ে আরও গভীরে প্রবেশ করছেন। বলছেন, প্রথম দর্শনে পণ্যকে একটি মামুলি ব্যাপার মনে হয়, মনে হয় এটা খুব সহজেই বোধগম্য। কিন্তু এর বিশ্লেষণ দেখায় যে, বাস্তবে এটি খুবই অদ্ভুত বা রহস্যজনক বিষয়, অধিবিদ্যক ও ধর্মতাত্ত্বিক সূক্ষ্ম নানা উপাদানে আচ্ছন্ন। যতক্ষণ এটি একটি ব্যবহারিক মূল্য হিসেবে উপস্থিত থাকে ততক্ষণ, এর গুণাবলী দ্বারাই এটি মানুষের প্রয়োজন মেটাতে পারে। সেই হিসেবে এটি মানবশ্রমের ফসল, আমরা তাকে যেভাবেই ব্যাখ্যা করি না কেন, এর মধ্যে রহস্যের কিছু নেই। মধ্যাহ্নের মতো এটি স্বচ্ছ হয়ে ওঠে যে, প্রকৃতির মধ্যেকার নানা বস্তুকে মানুষ তার পরিশ্রম দ্বারা এমনভাবে রূপান্তরিত করে যাতে তা তার নিজের জন্য ব্যবহার-উপযোগী হয়।

মার্কস সহজ দৃষ্টান্ত টেনেছেন, যেমন ধরা যাক, গাছ থেকে কাঠ ও পরে তা দিয়ে টেবিল বানানো। তারপরও প্রতিদিনের ব্যবহারে এটি কাঠই। কিন্তু যখনই এটি পণ্যে পরিণত হয়, তখনই এটি অজ্ঞেয় একটা কিছুতে পরিবর্তিত হয়। এটা তখন যে শুধু পায়ের উপর দাঁড়ায় তা নয়, অন্যসব পণ্যের পরিপ্রেক্ষিতে মাথার উপরও দাঁড়ায়। সেজন্য, মার্কস বলছেন, পণ্যের যে রহস্যজনক চরিত্র তা তার ব্যবহারিক মূল্য থেকে জন্ম নেয় না। তাহলে? মূল্য নির্ধারণের অন্য দিকগুলো মার্কস ক্রমে আরও স্পষ্ট করছেন। প্রথমত, ব্যবহার উপযোগী শ্রমের বা উৎপাদনশীল তৎপরতার ধরন যতরকমই হোক না কেন, এটি একটি শরীরী বিষয়, এগুলো মানব দেহের বিভিন্ন অঙ্গ প্রত্যঙ্গ যেমন মস্তিষ্ক, স্নায়ু বা পেশীর ব্যবহারের ফসল। দ্বিতীয়ত, মূল্যের পরিমাণগত দিক অর্থাৎ এই শ্রমব্যয়ের সময়কাল বা শ্রমের পরিমাণ বিচার করলে বোঝা যায় এর পরিমাণ ও গুণগত দিকের মধ্যেকার স্পষ্ট তফাৎ। সব সমাজেই মানুষের টিকে থাকার উপায়সমূহ উৎপাদন করতে কতটা শ্রম লাগে তাতে মানুষের মনোযোগ পাবারই কথা, যদিও উন্নয়নের সকল স্তরে এই আগ্রহ একরকম দেখা যায় না।১ এবং তৃতীয়ত, যেই মুহূর্ত থেকে মানুষ একজন আরেকজনের জন্য কাজ করতে শুরু করেছে তখন থেকেই তাদের শ্রম সামাজিক রূপ নিয়েছে।

শ্রমে উৎপাদিত দ্রব্য পণ্যের রূপ নেবার সাথে সাথে কখন থেকে হেঁয়ালিপূর্ণ আচরণ করছে? এই প্রশ্ন করে মার্কস উত্তর দিচ্ছেন, স্পষ্টতই এই আচরণের উদ্ভব এই নির্দিষ্ট রূপ থেকেই। সবরকম মানব শ্রমের সমানতা তাদের উৎপাদিত দ্রব্যে নিহিত মূল্যের সমানতা দিয়ে প্রকাশিত হয়; মানব শক্তির ব্যয় পরিমাপ হয় তার সময়ের দৈর্ঘ্য দিয়ে; এবং সর্বোপরি, উৎপাদকদের পারস্পরিক সম্পর্ক, যার মধ্যে তাদের শ্রমের সামাজিক চরিত্র আরও স্পষ্ট, উপস্থিত হয় উৎপাদিত দ্রব্যের সামাজিক সম্পর্ক হিসেবে। পণ্যের চরিত্র, মার্কস বলছেন, তাই রহস্যময়। কারণ উৎপাদন-কারীদের মধ্যেকার সামাজিক সম্পর্ক আর তাদের নিজেদের মধ্যে থাকে না, তা তাদের শ্রমের ফসলের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হয়। এটাকেই মার্কস বলছেন মানুষের শ্রমের ফসল পণ্যের প্রতি মানুষেরই অন্ধভক্তি বা পূজা।

সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী ব্যবহারযোগ্য নানা জিনিষ পণ্য হয়ে ওঠে এই কারণে যে, বিভিন্ন একক ব্যক্তি বা গোষ্ঠী পরস্পরের থেকে স্বাধীনভাবে এগুলো উৎপাদন করে। এইসব একক ব্যক্তির শ্রম যুক্ত হয়ে সমাজের সামষ্টিক শ্রম গঠন করে। যেহেতু এইসব উৎপাদক যতক্ষণ পর্যন্ত নিজেদের উৎপাদিত দ্রব্য বিনিময় না করে ততক্ষণ পর্যন্ত নিজেদের মধ্যে কোন সামাজিক সম্পর্ক হয় না, সেজন্য বিনিময় সম্পর্ক ছাড়া প্রতিটি উৎপাদকের শ্রমের নির্দিষ্ট সামাজিক চরিত্র নিজেকে উপস্থিত করে না। অন্য কথায়, মার্কস আবার বলছেন, একজন ব্যক্তির শ্রম সমাজের শ্রমের অংশ হিসেবে নিজেকে জাহির করতে পারে কেবল প্রত্যক্ষভাবে পণ্য বিনিময় সম্পর্কের মধ্যে এবং তার সূত্র ধরে পরোক্ষভাবে উৎপাদনকারীদের সম্পর্কের মধ্য দিয়ে। একজন ব্যক্তির শ্রমের সাথে বাকি সবার শ্রমের যোগসূত্র তাই সরাসরি বিভিন্ন কর্মরত ব্যক্তির মধ্যেকার সামাজিক সম্পর্ক হিসেবে প্রকাশিত হয় না, প্রকাশিত হয় বিভিন্ন ব্যক্তির মধ্যেকার বস্তুগত সম্পর্ক এবং বিভিন্ন পণ্যের সামাজিক সম্পর্ক হিসেবে। উপযোগ লাভের বিভিন্ন বস্তুর অস্তিত্ব যাই হোক না কেন কেবলমাত্র বিনিময়ের মধ্য দিয়েই শ্রমের ফসল একটি অভিন্ন সামাজিক মর্যাদা লাভ করে বা মূল্য হিসেবে আবির্ভূত হয়।

প্রয়োজনীয় বস্তু ও মূল্য, একটি দ্রব্যের এই বিভাজন তখনই সামাজিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনার বিষয় হয়ে ওঠে যখন বিনিময় তৎপরতা এই পর্যায়ে যায় যে, প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি উৎপাদিত হয় বিনিময়ের জন্য। এই সময় থেকে ব্যক্তি-উৎপাদকের শ্রমও সামাজিকভাবে দুই চরিত্র লাভ করে। একদিকে সামাজিক শ্রমবিভাগের অংশ হিসেবে এটিকে অবশ্যই নির্দিষ্ট সামাজিকভাবে ব্যবহার-উপযোগী শ্রম হতে হবে যা নির্দিষ্ট সামাজিক চাহিদা পূরণ করে। অন্যদিকে, এটি ব্যক্তি-উৎপাদকের বহুবিধ চাহিদাও পূরণ করতে পারে, সবরকম ব্যক্তিক শ্রমের পরস্পরের বিনিময়যোগ্যতা যা সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত, তার মধ্য দিয়ে প্রতিটি উৎপাদকের ব্যক্তিক উপযোগী শ্রম অন্যসকলের সাথে একটি সমানতা অর্জন করে।

এরকম বিভাজনের মধ্যে এই শর্তটি ক্রমে জোরদার হয় যে, উৎপাদিত দ্রব্যটি শুধু কাজের বা ব্যবহার উপযোগী হলে হবে না, অন্যের জন্যও তা কাজের হতে হবে। এবং সবরকম শ্রমের সমানতা এখানেই দাঁড়ায় যে, যা কিছু উৎপাদিত হচ্ছে তা বস্তুগতভাবে ভিন্ন ভিন্ন হলেও সবগুলোরই একটি উপাদান অভিন্ন, সেটি হল: মূল্য। মার্কস আরও বলছেন, মূল্য হিসেবে এগুলোকে যখন আমরা সম্পর্কিত দেখি তখন এটা নয় যে, আমরা এসব পণ্যকে সমরূপ মানব শ্রমের আধার হিসেবে বিবেচনা করছি। বরঞ্চ ঠিক তার উল্টো, যখনই আমরা মূল্যের বিনিময়ের মাধ্যমে বিভিন্ন পণ্যের মধ্যে সমানতা আনি তখন একইসঙ্গে তার মধ্যে যুক্ত বিভিন্ন ধরনের মানবশ্রমের মধ্যেও সমানতা আনি। এ সম্পর্কে সতর্ক না থেকেও আমরা এই কাজটিই করি। এই প্রসঙ্গে ইটালীয় তাত্ত্বিক গালিয়ানির সূত্র টেনে মার্কস বলছেন, যখন গালিয়ানি বলছেন মূল্য হল বিভিন্ন ব্যক্তির মধ্যেকার সম্পর্ক, তখন তাঁর আরও যোগ করা উচিৎ যে, মূল্য হল বিভিন্ন দ্রব্যের মধ্যেকার সম্পর্ক দ্বারা প্রকাশিত ব্যক্তিদের মধ্যেকার সম্পর্ক।

সামাজিকভাবে আবশ্যকীয় শ্রম ও রবিনসন ক্রুশো
নির্দিষ্ট ধরনের উৎপাদন অর্থাৎ পণ্য উৎপাদনের অন্তর্গত বিষয়ে মার্কস এরপর টানছেন সামাজিকভাবে আবশ্যকীয় শ্রমের প্রসঙ্গ। বিভিন্ন ধরনের পণ্যে আকস্মিক ও সার্বক্ষণিক ওঠানামার বিনিময় সম্পর্কের মধ্যে এইসব পণ্যের উৎপাদনের জন্য সামাজিকভাবে আবশ্যকীয় শ্রমসময় প্রাকৃতিক বিধির মতোই নিজেকে জারি রাখে। এটা পড়ে যেতে-থাকা বাড়ির উপর যেভাবে মাধ্যাকর্ষণ শক্তি কার্যকর থাকে ঠিক সেরকম। যদিও শ্রমসময় দিয়ে মূল্যের পরিমাণ নিরূপণের বিষয়টি পণ্যের আপেক্ষিক মূল্যের আপাত ওঠানামার আড়ালে গোপন থাকে।

সমাজ জীবনের রূপ সম্পর্কে মানুষের সাধারণ উপলব্ধি এবং সেই সূত্রে এই রূপ সম্পর্কে তাঁর বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ কোন দিকে যায়? মার্কসের বক্তব্য, সাধারণভাবে তা সমাজ জীবনের প্রকৃত ঐতিহাসিক বিকাশের উল্টোদিকে পরিচালিত হয়। কারণ, মানুষের বিশ্লেষণ শুরু হয় তাঁর সামনে উপস্থিত বিকাশ প্রক্রিয়ার ফলাফল দিয়ে। এর কারণে পণ্যের দাম দিয়েই তার মূল্য পরিমাপ শুরু হয় কেননা সব পণ্যের সাধারণ অভিব্যক্তি হয় মুদ্রায়। কিন্তু পণ্য-বিশ্বের এই মুদ্রারূপ ব্যক্তি-শ্রমের সামাজিক চরিত্র এবং ব্যক্তি-উৎপাদকদের সামাজিক সম্পর্ককে প্রকাশ করবার বদলে প্রকৃতপক্ষে তাকে গোপনই করে। কিন্তু মানুষ যখন তার উৎপাদিত কোট বা বুটের সঙ্গে লিনেন বা স্বর্ণ বা রৌপ্যের সঙ্গে তুলনা করে তখন সে আসলে বিমূর্তভাবে তাদের ব্যক্তিক শ্রমের সঙ্গে সমাজের সামষ্টিক শ্রমেরই তুলনা করে।

মার্কসের সময়কালে এবং পরেও রবিনসন ক্রুশোর দৃষ্টান্ত ছিল অর্থশাস্ত্র আলোচনার জনপ্রিয় দিক। অন্যান্যদের মতো রিকার্ডোও রবিনসনের গল্প টেনেছেন। মার্কস তাই সেই সূত্রেই তাঁর ভিন্ন বিশ্লেষণ উপস্থিত করেছেন। মার্কস বলছেন, দ্বীপে একক রবিনসন খুবই সীমিত চাহিদা দ্বারা চালিত হলেও সেগুলো পূরণের জন্য তাঁকে কাজও করতে হয়েছে। প্রার্থনার মতো বিষয়গুলো বাদ দিয়েও মাছ ধরা, শিকার করা, আসবাবপত্র বা যন্ত্রপাতি তৈরী সবগুলোই কাজ হিসেবে বিবেচনা করছেন মার্কস। বলছেন, কাজের নানা মাত্রা থাকা সত্ত্বেও রবিনসন ঠিকই জানতেন যে, এগুলো এক এবং অদ্বিতীয় রবিনসনেরই মানবশ্রমের ভিন্ন ভিন্ন রূপ। প্রয়োজনের কারণেই তাঁকে বিভিন্নরকম কাজে হাত দিতে হয়েছে। কোন কাজে বেশি কোন কাজে কম সময় বা শ্রম লাগলো তা নির্ভরশীল ছিল সেই পরিস্থিতিতে কোন কাজ কতটা সহজ বা কতটা কঠিন তার উপর।

ক্রমে অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে, ‘প্রকৃত ব্রিটিশ অধিবাসীর’ মতো তিনি সবকিছুর তালিকা করেছেন। যে তালিকায় আছে তাঁর মালিকানাধীন প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি, এগুলো উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় তৎপরতা এবং সর্বোপরি এগুলোর জন্য তাঁর কতটা শ্রম সময় লেগেছে তার হিসাব। রবিনসন এবং এসব দ্রব্যের সম্পর্ক এতই সহজ যে তা বোঝার জন্য খুব একটা বুদ্ধি ব্যয় করতে হয় না। তারপরও এই সম্পর্ক এমন সব বিষয়ই উপস্থিত করে যা মূল্য নিরূপণের জন্য অপরিহার্য।

বিষয়টি আরও পরিষ্কার করবার জন্য মার্কস এরপর ‘আলোয় ভরা রবিনসনের দ্বীপ’ থেকে ‘অন্ধকারাচ্ছন্ন ইউরোপীয় মধ্যযুগে’ নিয়ে গেছেন আমাদের। বলছেন, এখানে স্বাধীন একজন মানুষের বদলে আমরা সবাইকে পাই নির্ভরশীল হিসেবে: ভূমিদাস ও ভূস্বামী, প্রজা ও সামন্তপ্রভু, সাধারণ মানুষ ও ধর্মযাজক। এখানে ব্যক্তিগত নির্ভরশীলতা উৎপাদনের সামাজিক সম্পর্ক ততটুকু নির্দেশ করে যতটুকু করে উৎপাদনের সঙ্গে সম্পর্কিত জীবনের অন্যান্য দিককে। এখানে বিনিময়ের ধরন পণ্য উৎপাদনভিত্তিক সমাজের মতো নয়, সমাজের বিনিময় ক্ষেত্রে এখানে ভিন্ন ধরন, দ্রব্যে লেনদেন হয় সেবা বা দ্রব্যাদি। এখানে বাস্তব অবস্থা থেকে শ্রম ও তার উৎপাদিত দ্রব্যসমূহের খুব ভিন্ন রূপ নেবার দরকার হয় না। এই সমাজে বাধ্যতামূলক শ্রম, পণ্য উৎপাদনকারী শ্রমের মতোই, সময় দিয়েই পরিমাপ করা যায়। কিন্তু তফাৎ আছে, তা হল, প্রত্যেক ভূমিদাসের জানা আছে যে, তিনি শুধু তাঁর প্রভুর জন্য যে সেবা দিচ্ছেন তা তাঁর নিজস্ব ব্যক্তিক শ্রমশক্তিরই একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ। বিভিন্ন শ্রেণীর বিভিন্ন অংশ হিসেবে নানাজন যতভাবেই শ্রম দিক না কেন তা তারা প্রতিটি ক্ষেত্রেই দিচ্ছে প্রত্যক্ষ পারস্পরিক সম্পর্কের ভিত্তিতেই। কোনভাবেই তা শ্রমউৎপাদিত দ্রব্যের সামাজিক সম্পর্কের আকারে লুক্কায়িত সম্পর্ক নয়। এই সম্পর্কই পরে বিকশিত হয়ে পণ্য উৎপাদনের বর্তমান স্তরে গেছে।২

এখানে মার্কস একটি কৃষক পরিবারের পিতৃতান্ত্রিক উৎপাদন ব্যবস্থার উদাহরণও টেনেছেন। এই পরিবার উৎপাদন করে শস্য, গবাদিপশু, সুতা, লিনেন এবং ঘরে ব্যবহার্য কাপড়। একটি পরিবারের মধ্যে হলেও সেখানে শ্রম কতকিছু উৎপাদনেই ব্যবহৃত হচ্ছে। তবুও সেগুলো পণ্য নয়। পণ্য উৎপাদনের উপর প্রতিষ্ঠিত সমাজ, যেখানে শ্রমবিভাজন বিকশিত, সেখানে যেমন, তেমনই পরিবারের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের শ্রম যেমন চাষবাস, পশুপালন, সুতাবোনা, কাপড় তৈরী ইত্যাদি সবই পরিবারের ক্রিয়ার মধ্য দিয়ে প্রত্যক্ষ সামাজিক ক্রিয়া। পরিবারের মধ্যে শ্রমবিভাজন, বিভিন্ন সদস্যের শ্রমঘণ্টা নির্ধারণ সবই হয় বিভিন্ন মৌসুমের প্রয়োজন আর সেই সাথে বয়স ও লিঙ্গ অনুযায়ী। প্রতিটি ব্যক্তির শ্রমশক্তি, পরিবারের সামগ্রিক শ্রমঘণ্টার নির্দিষ্ট অংশ হিসেবে ব্যয়িত হয়। সেজন্য বিভিন্ন ব্যক্তির শ্রমশক্তি ব্যয়ের পরিমাপ শ্রমের সামাজিক চরিত্র হিসেবেই আবির্ভূত হয়।

এরপর মার্কস স্বাধীন ব্যক্তির একটি জনগোষ্ঠীর দৃষ্টান্ত টেনেছেন যেখানে উৎপাদনের উপায় অভিন্ন, যেখানে বিভিন্ন ব্যক্তির ভিন্ন ভিন্ন শ্রমশক্তিকে ঐ জনগোষ্ঠীর একত্রিত শ্রমশক্তির অংশ হিসেবে সচেতনভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। রবিনসন ক্রুশোর সবকিছুই এখানে পুনরাবৃত্তি হয়, পার্থক্য একটাই, একটি সামাজিক আরেকটি ব্যক্তিগত। জনগোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের মোট উৎপাদিত দ্রব্য হল সামাজিক উৎপাদন। এর মধ্যে একটি অংশ উৎপাদনের নতুন উপায় হিসেবে ব্যবহৃত হবার কারণে সামাজিকই থেকে যায়, অন্য অংশ সমপ্রদায়ের সদস্যরা টিকে থাকার জন্য ভোগ করেন। উৎপাদিত দ্রব্যের এই বিতরণ সমপ্রদায়ের উৎপাদনশীল সংগঠন এবং উৎপাদকদের ঐতিহাসিক বিকাশের মাত্রার উপর নির্ভর করে। শ্রম ও শ্রমের ফসল, উৎপাদন ও বিতরণ সব দিক থেকেই ব্যক্তি উৎপাদকদের সামাজিক সম্পর্ক এই ক্ষেত্রে খুবই সরল ও বোধগম্য।

সমাজ গঠন ও তার অভিব্যক্তি
মার্কস এই প্রসঙ্গে এই জগত ও ধর্ম বিষয় নিয়ে কিছু কথা বলেছেন। বলছেন, ধর্মীয় দুনিয়া হল বাস্তব দুনিয়ার প্রতিফলন। সেই কারণে দুনিয়ার পরিবর্তন ধর্মকেও পরিবর্তিত করে বা উপযোগী ধর্মের আবির্ভাব ঘটে। এই সম্পর্কে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলছেন, যে-সমাজ পণ্য উৎপাদনের উপর প্রতিষ্ঠিত, যেখানে সকল উৎপাদক তাদের পণ্য ও মূল্য বিনিময়ের মধ্য দিয়ে একটি সামাজিক সম্পর্কের মধ্যে সম্পর্কিত হয় এবং তার মাধ্যমে তারা তাদের ব্যক্তিক নিজস্ব শ্রমকে একটি সমরূপ মানব শ্রমে নামিয়ে আনে সেখানে বিমূর্ত মানব সত্তার ভক্তিনির্ভর খ্রিস্টান ধর্ম, প্রটেস্টান্টবাদ, বিভিন্ন ধরনের একাত্মবাদী ধর্মই সবচাইতে উপযোগী। প্রাচীনকালে বণিক জাতি বলতে যা বোঝানো হয় প্রকৃতপক্ষে তার অস্তিত্ব শুধুমাত্র ফাঁকে ফাঁকে দেখা যায়, যেমন এপিকিউরাস দেবতা বা পোলিশ সমাজের প্রান্তে ইহুদীরা। বুর্জোয়া সমাজের সাথে তুলনায় উৎপাদনের এই প্রাচীন সমাজ সংগঠনগুলো খুবই সরল এবং স্বচ্ছ। কিন্তু হয় তারা ব্যক্তি-মানুষের অপরিণত বিকাশের ফল যারা তখন পর্যন্ত আদিম গোত্রীয় সমাজের সাথে বাঁধা, নয়তো প্রত্যক্ষভাবে অধস্তনতার সম্পর্কে শৃঙ্খলিত। তাদের সীমিত জীবনের প্রতিফলন হল, প্রাচীন প্রকৃতি পূজা বা অন্যান্য ধরনের জনপ্রিয় ধর্ম। সেজন্য মার্কস বলছেন, বাস্তব দুনিয়ার ধর্মীয় প্রতিফলন দূর হতে পারবে তখনই যখন মানুষের সাথে মানুষের ও মানুষের সাথে প্রকৃতির দৈনন্দিন বাস্তব সম্পর্ক স্বচ্ছ ও নিখুঁতভাবে বোধগম্য হবে।

মার্কস এই পর্যায়ে ভবিষ্যৎ সমাজের ইঙ্গিত দিয়ে বলছেন, সমাজের জীবন-প্রক্রিয়া যা সমাজের বস্তুগত উৎপাদন-প্রক্রিয়ার উপর ভিত্তি করেই গড়ে ওঠে, তা তার চারদিকে ঘিরে-থাকা রহস্যময় পর্দা সরাতেই পারে না যতক্ষণ না তা স্বাধীনভাবে সংগঠিত মানুষদের দ্বারা পরিচালিত হয় এবং একটি নির্দিষ্ট পরিকল্পনার অধীনে সবকিছু বিন্যস্ত হয়। আরও বলছেন, এরকম সমাজ গড়ে উঠতে গেলে বস্তুগত ভিত্তি ও শর্তাবলী তৈরি হতে হবে যা বিকাশের এক দীর্ঘ ও বেদনাদায়ক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই আসতে পারে।

ক্লাসিকাল অর্থশাস্ত্র
মার্কসের সময়কালে রাজনৈতিক অর্থনীতি ছিল, যাঁদের তিনি ক্লাসিকাল বলে অভিহিত করেছেন তাঁদের হাতে। এই ক্লাসিকাল ধারা ও তার পূর্বোক্ত ধারাসমূহের বিভিন্ন চিন্তাবিদ অর্থনীতিবিদ ও তাঁদের প্রধান কাজগুলো নিয়ে পর্যালোচনা মার্কসের সমগ্র পুঁজি গ্রন্থ জুড়েই পাওয়া যায়। মূল্য সম্পর্কে ক্লাসিকাল ধারার অন্যতম প্রধান তাত্ত্বিক ডেভিড রিকার্ডো (১৭৭২-১৮২৩) সম্পর্কে তিনি বলেছেন, ‘এ বিষয়ে অন্যান্যদের মধ্যে তাঁর বিশ্লেষণই সবচাইতে ভালো।’ রিকার্ডোর মূল্য সম্পর্কিত বিশ্লেষণের পরিচয় দিতে গিয়ে এখানে তিনি একটা দীর্ঘ উদ্ধৃতি দিয়েছেন। রিকার্ডো বলছেন, ‘এটা নিশ্চিত যে, আমাদের শারীরিক ও মানসিক সামর্থ্য আমাদের মৌলিক সম্পদ। এগুলোর ব্যবহার, কোন না কোন ধরনের শ্রম ব্যবহার আমাদের একমাত্র মৌলিক অবলম্বন। এবং শুধুমাত্র সবসময় এর ব্যবহারের মধ্য দিয়েই অন্য সবকিছুর সৃষ্টি হয়।…এটাও নিশ্চিত যে, ঐসব জিনিষ কেবলমাত্র সেই শ্রমকেই প্রতিনিধিত্ব করে যা তাদেরকে সৃষ্টি করেছে।’৩

রিকার্ডোর শক্তিশালী বিশ্লেষণের প্রশংসা করেও তার সীমাবদ্ধতা নিয়ে মার্কস পুঁজি গ্রন্থের ৩য় ও ৪র্থ খণ্ডে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। এখানে তিনি এই বিষয়ে কিছু প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন মাত্র। বলছেন, রিকার্ডো নিজেও মূল্যের দ্বৈত রূপ সম্পর্কে খুব কম মনোযোগ দিয়েছেন। আরও বলছেন, রাজনৈতিক অর্থনীতি অসম্পূর্ণভাবে হলেও মূল্য এবং তার পরিমাণ নিয়ে অনেক বিশ্লেষণ করেছে এবং এসব রূপের পেছনে কী আছে তাও আবিষ্কার করেছে। কিন্তু তা কখনো এই প্রশ্নটা করেনি যে, কেন দ্রব্যের মূল্য শ্রমকে প্রতিনিধিত্ব করে, মূল্যের পরিমাণ কেন প্রতিনিধিত্ব করে শ্রমসময়কে? এমনকি এই ধারার সবচাইতে যোগ্য মুখপাত্র এ্যাডাম স্মীথ (১৭২৩-১৭৯০) ও ডেভিড রিকার্ডো মূল্যের রূপ নিয়ে, এর সাথে পণ্যের অন্তর্নিহিত গুণাবলীর সাথে তার সংযোগ সম্পর্কে কোন গুরুত্ব দেননি। এটা শুধু এই কারণে নয় যে, তাদের পূর্ণ মনোযোগ মূল্যের পরিমাণ বিশ্লেষণেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। এর কারণ রয়েছে আরও গভীরে।

মার্কস দেখাচ্ছেন, শ্রমের উৎপাদনের মূল্যরূপ শুধু যে সর্বোচ্চ মাত্রায় বিমূর্ত তাই নয়, বুর্জোয়া উৎপাদনব্যবস্থার মধ্যে এটি সবচাইতে বেশি সর্বজনীন রূপ। এটি বুর্জোয়া উৎপাদনকে সামাজিক উৎপাদনের একটি নির্দিষ্ট ধরন হিসেবে চিহ্নিত করে এবং তার মধ্য দিয়ে একে এর বিশেষ ঐতিহাসিক চরিত্র দান করে। আমরা যদি এই উৎপাদন পদ্ধতিকে প্রতিটি সমাজস্তরের জন্য প্রকৃতি নির্ধারিত একটি শাশ্বত ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা করি তাহলে মূল্যরূপের বিভিন্ন ধরন, পর্যায়ক্রমে এর পণ্য রূপ, আরও বিকাশ ধারায় মুদ্রারূপ, পুঁজিরূপ ইত্যাদির ভিন্ন ভিন্ন নির্দিষ্ট সত্তাকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করবো। মার্কস তৎকালীন সময় পর্যন্ত প্রধান অর্থনীতিবিদদের কাজ উল্লেখ করে বলছেন যে, সবাই এই বিষয়ে একমত যে, মূল্যের পরিমাণের পরিমাপক হল শ্রমসময়, তারপরও মুদ্রা বিষয়ে তাদের চিন্তা খুবই বিস্ময়কর ও স্ববিরোধী।

পুঁজিবাদকে শাশ্বত হিসেবে বিবেচনা থেকে অনেকগুলো ভ্রান্তি ও সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। মার্কস বলছেন, বুর্জোয়ারা বুর্জোয়া রূপের পূর্বেকার সামাজিক উৎপাদনের রূপসমূহকে ঠিক সেইভাবে বিবেচনা করে যেভাবে চার্চের যাজকেরা খ্রিস্টপূর্ব ধর্মগুলোকে বিবেচনা করে। সেইসময়ে খুবই প্রভাবশালী চিন্তাবিদ, রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ বাস্তিয়াত (১৮০১-১৮৫০) সম্পর্কে মার্কস বলছেন, তিনি কল্পনা করেছেন প্রাচীন গ্রীক ও রোমানরা শুধুমাত্র লুণ্ঠনের উপরই টিকে ছিল। কিন্তু যখন কোন গোষ্ঠী শতাব্দী ধরে লুণ্ঠন করতে থাকে তখন নিশ্চয়ই সেখানে লুণ্ঠন করবার মতো কিছু না কিছু উৎপাদন তৈরী হয়, এবং পুনরুৎপাদনও হতে থাকে। তার মানে হল, এমনকি সেই গ্রীক বা রোমানদেরও কোন না কোন ধরনের উৎপাদন প্রক্রিয়া মানে অর্থনীতি ছিল। সেটাই তৎকালীন ব্যবস্থার বস্তুগত ভিত্তি তৈরি করেছে, যেমন আমাদের সময়ে করেছে বুর্জোয়া অর্থনীতি। যদি কথাটা এরকম হয় যে, দাসপ্রথার উপর প্রতিষ্ঠিত উৎপাদন পদ্ধতি লুণ্ঠনের ব্যবস্থার উপরই টিকে থাকে, তাহলে সেটাও এক বিপজ্জনক বক্তব্য। মার্কস ব্যঙ্গ করে বলছেন, যদি এরিস্টটলের মতো বিশাল চিন্তাবিদ দাস শ্রমকে সমর্থন করে ভুল করে থাকেন তাহলে বাস্তিয়াতের মতো বামুন অর্থনীতিবিদ কেন মজুরি শ্রমের প্রশংসা করে সঠিক প্রমাণিত হবেন?

এই প্রসঙ্গে মার্কস তাঁর লেখা অর্থনীতির পর্যালোচনা গ্রন্থ (১৮৫৯) নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রকাশিত এক জার্মান পত্রিকার সমালোচনার কথা টেনেছেন। ঐ গ্রন্থে মার্কসের বক্তব্য ছিল, প্রতিটি উৎপাদন পদ্ধতিতেরই তার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ সামাজিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এর উপরই বিচার ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানও দাঁড়ায়, সাধারণভাবে উৎপাদন পদ্ধতিই সামাজিক, রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক জীবন গঠন করে। কিন্তু এই গ্রন্থের সমালোচনায় বলা হয়েছে, এটা এই সময়ের জন্য ঠিক হলেও প্রাচীন গ্রীক, রোমে রাজনীতি বা মধ্যযুগের জন্য ক্যাথেলিকবাদই প্রধান পরিচালিকা শক্তি ছিল। মার্কস জবাবে বলছেন, মধ্যযুগ নিশ্চয়ই ক্যাথেলিকবাদ দিয়েই বাঁচেনি, কিংবা প্রাচীন দুনিয়া বাঁচেনি কেবল রাজনীতি দিয়ে। বরঞ্চ উল্টোভাবে যে পদ্ধতিতে তাদের জীবন জীবিকা গঠিত হয়েছে সেটাই ব্যাখ্যা করতে পারে কেন এখানে ক্যাথেলিকবাদ সেখানে রাজনীতি প্রাধান্য বিস্তার করেছিল। রোমান প্রজাতন্ত্রের ইতিহাস সম্পর্কে একটু জানা থাকলেই এটা পরিষ্কার হবে যে, এর গোপন ইতিহাস হল ভূসম্পত্তির ইতিহাস।

যে উৎপাদন পদ্ধতিতে উৎপাদিত দ্রব্য পণ্যের আকার নেয়, অর্থাৎ যেখানে উৎপাদন হয় সরাসরি বিনিময়ের জন্য, সেটাই বুর্জোয়া উৎপাদনের খুবই সাধারণ এবং ভ্রূণাবস্থা। এর আবির্ভাব ইতিহাসের প্রথমেই ঘটেছে। কিন্তু তা এই সময়ের মতো সর্বব্যাপী চরিত্র নিয়ে হাজির হয়নি। তার ফলে এর অন্ধভক্তিমূলক চেহারা অনেক শক্তিশালী। আমরা যখন আরও সুনির্দিষ্টভাবে বিষয়গুলোর দিকে তাকাই তখন এর সরলতাও দূর হয়ে যায়। মার্কস প্রশ্ন করছেন, মুদ্রাব্যবস্থার বিভ্রম বা মায়াটা কোথা থেকে আসে? এই ব্যবস্থায় যখন স্বর্ণ বা রৌপ্য মুদ্রা হিসেবে ভূমিকা পালন করতে থাকে তখন তা উৎপাদকদের মধ্যেকার সামাজিক সম্পর্ককে প্রতিফলিত করে না বরঞ্চ অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য নিয়ে তা প্রাকৃতিক বস্তু রূপে হাজির হয়। সমাজ থেকে নয়, ভূমি থেকে খাজনার উদ্ভব হচ্ছে এরকম ভূমিবাদীদের তাত্ত্বিক মায়ার হাত থেকে আমরা মুক্ত হয়েছি কতদিন?

মার্কস বলছেন, যদি পণ্যসমূহ নিজেরা কথা বলতে পারতো তাহলে তারা বলতো, আমাদের ব্যবহার-মূল্য নিয়ে মানুষের উৎসাহ থাকতে পারে, কিন্তু তাতো বস্তুগতভাবে আমাদের অংশ নয়। যা আমাদের তা হল, আমাদের মূল্য। পণ্য হিসেবে আমাদের লেনদেনই তার যেন স্বাক্ষ্য দেয়। পণ্য বলে, ‘আমাদের পরস্পরের দৃষ্টিতে আমরা তো বিনিময় মূল্য ছাড়া আর কিছু নই’।

তথ্যসূত্র
১. মার্কস এখানে প্রাচীন জার্মানীর সূত্র টেনে বলেছেন যে, সেখানে জমির একক পরিমাপ করা হত দিনে সেই জমিতে কতটা ফসল ফলানো যায় সেই হিসাব করে।
২. এই পর্যায়ে মার্কস অন্যান্য সমাজে বিদ্যমান শ্রম সম্পর্ক বিষয়ে তাঁর অর্থশাস্ত্রের পর্যালোচনা গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃতি টেনেছেন। বলেছেন, স্লাভদের মধ্যে বিশেষ করে রাশিয়ানদের মধ্যে সাধারণ সম্পত্তির সম্পর্ক এখনও বিদ্যমান যে প্রাচীন সম্পর্ক রোমানদের মধ্যে দেখা যায়। অবশেষ হলেও এরকম সম্পর্ক তখনও মার্কস ভারতে বিদ্যমান দেখেছেন। রোমান এবং টিউটোনিক (জার্মান)দের প্রাচীন ব্যক্তিগত মালিকানা ভিত্তিক সম্পর্ক, তিনি বলছেন, ভারতে বিদ্যমান নানা রূপের এই সাধারণ সম্পত্তি সম্পর্ক থেকে টানা যায়।
৩. David Ricardo, The Principles of Political Economy, 3 Ed, London, 1821, p. 334

[নোট : ত্রৈমাসিক ‘নতুন দিগন্ত’ অক্টোবর-ডিসেম্বর ২০০৮ সংখ্যায় এ লেখাটি ‘মূল্যের রূপ এবং পণ্যের রহস্যময়তা’ শিরোনামে ছাপা হয়। স্বতন্ত্র প্রবন্ধের মর্যাদা পেলেও লেখাটি মূলত মার্কসীয় অর্থনীতি সংক্রান্ত দীর্ঘ আলোচনার অংশ। ]

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

22 − 15 =