নূহ-এর মহাপ্লাবন কি আসলে ঘটেছিল? | জিসান হাসান

 

 

মুসলমানরা নুহ্‌, ইব্রাহিমসহ অন্যান্যদের কাহিনীগুলোকে বাস্তবে সংঘটিত হয়েছিল বলেই বরাবর ধরে নিয়েছেন, প্রথাগত দৃষ্টিভঙ্গি কোরআনের বর্ণনাকে ইতিহাসতুল্য জ্ঞান করে। যা হোক, বিশ শতকের ধর্মীয় পণ্ডিতরা অনেকগুলো বাইবেলীয় কাহিনীর সঠিকত্ব নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন। কোরআনেও ঐ কাহিনীগুলোর অনেকক’টি স্থান পেলেও এবং এ কারণেই একই ধরনের বিশ্লেষণের উপযুক্ত হলেও বাইবেলের ঐতিহাসিকতা বিষয়ক এই বির্তক থেকে মুসলমানদের বৃহদাংশই সর্বদা দূরে সরে থেকেছেন। এই বিতর্কটি পূর্ণরূপে করার জন্য নুহ এর কাহিনীটি পর্যালোচনা করা যাক।

শুরুতেই বাইবেলে নুহ-এর কাহিনীর প্রাচীনতম রূপটির দিকে তাকানো যাক। এখানে বস্তুত দু’টি বিবরণ আছে, গল্পদু’টির বুননও ঘনিষ্ঠ। পুরাতনটি একটি ইয়াহউইস্ট উৎসের (বা ‘জে’) অংশ, এটি প্রাচীন ইসরায়েলি গোত্রের মহাকাব্য। ‘জে’ ঈশ্বরকে ‘ইয়াহ্‌ওয়ে’ নামে সম্বোধন করে, ইংরেজীতে ‘লর্ড’ হিসেবে যিনি সম্বোধিত, এটির উদ্ভব সম্ভবত খ্রিস্টপূর্ব ১২০০ সাল নাগাদ। রিচার্ড ই. ফ্রিডম্যান পুরনো লিপিগুলোকে পুনর্নির্মাণ করেছেন, তাঁর গ্রন্থ বাইবেলের লেখক কে? অনুযায়ী জে’র প্লাবনের বিবরণ নিম্নরূপ:

আর ইয়াহওয়ে দেখলেন পৃথিবীর মানুষের পাপ ভীষণাকৃতির হয়ে গিয়েছে, আর দিনব্যাপী তাদের হৃদয়ের সকল চিন্তার ঝোঁক পাপেরই প্রতি। ইয়াহওয়ে পৃথিবীতে মানব সৃষ্টির জন্য অনুতাপ করলেন, আর তাঁর মনও বিষিয়ে গিয়েছিল। আর ইয়াহওয়ে বললেন, ‘যে মানুষ আমি সৃষ্টি করেছি তাকে, মানুষ থেকে শুরু করে পশুকূল, সরীসৃপসহ আসমানের পক্ষীকূল আমি পৃথিবীর বুক থেকে মুছে ফেলব, কেননা আমি তাদের সৃষ্টি করেছি বলে অনুতপ্ত।’ কিন্তু নুহ-র প্রতি ইয়াহওয়ে তুষ্ট ছিলেন। (জেনেসিস ৬:৫-৮)

ইয়াহওয়ে নুহ-কে বললেন, ‘তুমি আর তোমার সমগ্র পরিবার কিস্তিতে আসো, কেননা এই প্রজন্মে আমার চোখে আমি তোমাকেই কেবল সদাচারী হিসেবে দেখতে পেয়েছি। পাক জানোয়ারদের মাঝ থেকে মাদী-মর্দা মিলিয়ে সাত জোড়া সাথে নাও, আর নাপাক জানোয়ারদের মাঝ থেকে নাও দুই জোড়া, আর আসমানের পাখিদের মাঝ থেকে নাও সাত জোড়া, যাতে তারা পৃথিবীর বুকে বেঁচে থাকতে পারে। কেননা আর সাত দিনের মাঝে আমি চল্লিশ দিন চল্লিশ রাত ধরে বৃষ্টি বর্ষণ শুরু করব, আর আমি পৃথিবীর বুক থেকে যা কিছু সৃষ্টি করেছি তা মুছে ফেলব।’ আর নুহ ইয়াহওয়ের হুকুম অনুযায়ী সকল কার্য সম্পন্ন করলেন। (জেনেসিস ৭:৭)

আর নুহ ও তার পুত্ররা এবং তার স্ত্রী ও তার পুত্রবধূরা প্লাবনের পানি আসার আগেই কিস্‌তিতে আরোহণ করল। (জেনেসিস ৭-৭)
আর সাত দিন পর পৃথিবীতে প্লাবন শুরু হল। (জেনেসিস ৭:১০)
আর চল্লিশ দিন ও চল্লিশ রাত ধরে পৃথিবীতে বৃষ্টি ঝরতে থাকল। (জেনেসিস ৭:১২)

তারপর ইয়াহওয়ে এটা তার জন্য বন্ধ করে দিলেন। চল্লিশ দিন আর চল্লিশ রাত ধরে বন্যা চলতে থাকল, পৃথিবীতে পানি বহুগুণ বৃদ্ধি পেল, আর কিস্‌তিটা ভাসল পানির ওপর। পৃথিবীর ওপর পানি ক্রমাগত বেড়ে চলল, আর তারা আসমানের নিচের সবচেয়ে উঁচু পাহাড়ও ডুবিয়ে দিল। পাহাড়গুলো ডুবিয়ে দিয়ে পানি আরও পনেরো হাত ওপরে উঠল। (জেনেসিস ৭: ১৬-২০)

যা কিছু নাসারন্ধ্র দিয়ে নিঃশ্বাস নিয়ে বাঁচে, যা কিছু শুকনা জমিনে থাকে, সবই নিহত হল। আর তিনি পৃথিবীর বুক থেকে মুছে ফেললেন মানুষ থেকে জানোয়ার, মাটিতে হামাগুড়ি দেয়া থেকে শুরু করে আসমানের পাখি, যা কিছু জীবন্ত ছিল, আর তাদের মুছে ফেলা হল পৃথিবী থেকে, আর শুধু নুহ আর তার সাথে যারা ছিল বেঁচে গেল। (জেনেসিস ৭:২২-২৩)

আর আসমান থেকে বৃষ্টি পড়া বন্ধ করা হল। আর পৃথিবী থেকে পানি ক্রমশঃ কমতে লাগল। (জেনেসিস ৮:২-৩)
আর চল্লিশ দিন শেষে নুহ তার তৈরী কিস্তির জানালা খুললেন। (জেনেসিস ৮:৬)

আর তিনি পৃথিবীতে পানি কমে গেছে কিনা দেখার জন্য একটি পায়রাকে বাইরে পাঠালেন। পায়রাটি পা রাখার মত কোন ভূমি পৃথিবীতে না পেয়ে কিস্তিতে তার কাছে ফিরে গেল, কেননা পৃথিবীর বুকটি তখনও পানিতে আবৃত ছিল, আর তিনি তার হস্ত প্রসারিত করে সেটিকে আবার কিস্‌তির ভেতর নিয়ে নিলেন। আর তিনি আরও সাত দিন অপেক্ষা করলেন, আর তিনি আরো একটি পায়রাকে কিস্‌তির বাইরে পাঠালেন। সন্ধ্যার সময়ে পায়রাটি নুহের কাছে ফিরে এলো, আর তার চঞ্চুতে ছিল একটি ছিন্ন জলপাই পাতা, আর নুহ বুঝলেন পৃথিবীতে পানি কমে গেছে। আর তিনি আরও সাত দিন অপেক্ষা করলেন, আর তিনি একটি পায়রাকে পাঠালেন, আর এটা কখনোই তার কাছে ফেরত আসেনি। (জেনেসিস ৮:৮-১২)

আর নুহ (কিস্তির) আবরণ খুলে ফেললেন আর তাকিয়ে দেখলেন, আর পৃথিবীর বক্ষ শুকিয়েছে। (জেনেসিস ৮:১৩)

আর নুহ ইয়াহওয়ের প্রতি একটা বেদী নির্মাণ করলেন, আর তিনি প্রতিটি পাক পশু ও পাক পাখীদের মাঝ থেকে কয়েকটিকে নিলেন, আর তাদেরকে বেদীতে কোরবানী দিলেন। ইয়াহওয়ে সেই প্রীতিকর গন্ধ নিলেন, আর ইয়াহওয়ে মনে মনে বললেন, ‘আর কখনো আমি মানুষের কারণে ভূমিকে অভিশপ্ত করবো না, কেননা মানুষের মতি তো প্রথম থেকেই অশুভের দিকেই, আর যেমনটা আমি করেছি, সেটাতে সকল প্রাণীকে আঘাত করবো না। পৃথিবীর বাকি দিনগুলোতে শস্যবোনা আর ফসলতোলা, তাপ আর শৈত্য, গ্রীষ্মকাল আর শীতকাল, দিবা আর রাত্রি কখনো ব্যাহত হবে না।’ (জেনেসিস ৮:২০-২২)

জেনেসিসের যে বর্ণনা এখানে এসেছে তার ক্রমের দিকে তাকালে দেখা যাবে কিছু বাদ দেয়া আছে। কারণ প্লাবনের জে’র বিবরণ পুরোহিতদের থেকে প্রাপ্ত উৎস- এর (পি সোর্স: প্রিস্টলি সোর্স) সাথে আন্তঃবুনিত হয়েছে। যাইহোক, জে উৎস পি উৎস থেকে প্রাচীনতর, দ্বিতীয়টি সম্ভবত খ্রিস্ট পূর্ব ৬ষ্ঠ শতকে ব্যাবিলনে ইসরায়েলিদের নির্বাসনের সময় নাগাদ রচিত। কাজেই নুহ এর কাহিনীর উৎপত্তি বিষয়ক যে কোন পর্যালোচানায় বাইবেলের জে উৎসটিই প্রাসঙ্গিক।

যেভাবে এটি ঘটে তাতে এই উৎপত্তিটি বাইবেলীয় নয়, বরং মেসোপটেমীয় বলেই প্রতীয়মান হয়। প্রায় সকলেই নুহ এর কাহিনীর সাথে পরিচিত হলেও খুব কম মানুষই এ বিষয়ে সচেতন যে প্রাচীন মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমাদের পর্যন্ত টিকে থাকা পৃথিবী প্লাবিত হবার এটিই একমাত্র কাহিনী নয়। বস্তুত, প্লাবনের কাহিনীটি অতি প্রাচীন আর বেশ ক’টি মেসোপটেমীয় সংস্কৃতিতে তা বর্তমান। এই গল্পেরই দুটো প্রাচীনতর কথন এখনও টিকে আছে; একটি হলো ‘নুহ’-এর ব্যাবিলনীয় সংস্করণ রূপ উটনাপিসটিম-এর কাহিনী। উটনাপিসটিম-এর কাহিনী আবার বিবৃত হয়েছে ‘গিলগামেস এর মহাকাব্যে’, যেটি নিজেই আবার পুরনো পৃথিবীর টিকে যাওয়া প্রাচীনতম কাহিনীগুলোর একটি। ‘আটরাহাসিস’ নামের আর একটি বিকল্প প্লাবন-কাহিনীও টিকে আছে, এটিরও নামকরণ করা হয়েছে এর নুহ-রূপী নায়কের নামে; এটা প্রায় একই রকমের হলেও গিলগামেস-সংস্করণের তুলনায় দীর্ঘতর এবং খুঁটিনাটির বর্ণনাও বেশি। এই দু’টি বর্ণনা নিশ্চতভাবেই পরস্পর সম্পর্কিত; গিলগামেসের কাহিনীতে উটনাপিসটিমকে এমনকি কয়েকস্থানে ‘আটরাহাসিস’ নামেও ডাকা হয়েছে। আটরাহাসিস-এর লিপিফলকগুলোর বয়স নির্ণীত হয়েছে ১৭০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ নাগাদ, যে কোন বাইবেলীয় ভাষ্যের চেয়ে যা প্রাচীনতর। গিলগামেসের মহাকাব্য থেকে উটনাপিসটিম-এর বন্যার কাহিনী নিচে দেয়া হলো:

উৎনাপিসটিম বললেন গিলগামেসকে
‘গিলগামেস, অবশ্যই বলব তোমাকে
অতি গোপনীয় কিছু,
বলব দেবতাদের গোপন কিছু কথা।
সুরিপ্পাক নগরী, তুমি নিশ্চয় চেন-
সেই তোমাদের ইউফ্রেতিস নদীর তীরে,
চেন?
খুবই প্রাচীন, পূজ্য দেবতা যারা আছেন
ওখানে তাদের মতোই প্রাচীন।
দেবতারা সবাই পরামর্শ করে ঠিক করলেন
ঘটাবেন মহাপ্লাবন-
অ্যানু, তার বাবা, দুর্ধর্ষ এন্‌লিল পরামর্শদাতা,
আর তাদের সহকারী নিনুরতা।
ছিলেন জলসেচন-পরিদর্শক, এন্নুজ, সবাই ছিলেন,
ছিলেন নিনিগিকুয়াও।

মহাপ্লাবনের বর্ণনা
নিনিগিকুয়া দেবতাদের বার্তা প্রচার করলেন-
ঘর বাড়ী, দেয়াল এসব ঠুনকো,
শোন সবাই, সব ভেসে যাবে, ঘর বাড়ী পশু পাখী সব।
সুরুপ্পাকের সবাই শোন,
যে জাহাজটি গড়তে হবে
তার দৈর্ঘ্য প্রস্থ হবে এক,
আপসুর মতো ছাদ থাকে যেন তার।

শুনে বললাম ঈয়াকে-আমার প্রভুকে :
দেখুন প্রভু, আপনার মতো চলব অবশ্যই।
কিন্তু কী বলব নগরীকে-
নগরবাসীদের এবং বয়োজ্যেষ্ঠদের?
বলব কি পালাচ্ছি আমি স্বার্থপরের মতো,
মরো তোমরা যতো সব অভিশপ্ত!

বলবে তাদের :
‘জানতে পেরেছি এন্‌লিল, দেবতা এন্‌লিল
শত্রুভাবাপন্ন আমাদের প্রতি,
তাই আমি আর থাকছি না এইখানে, এই নগরীতে,
এন্‌লিলের অধীনস্থ কোন রাজ্যতে
আমি রাখব না আর পা।
যাব পাতালরাজ্যে,
যাব রসাতলে, থাকব আমার ইষ্ট
দেবতা ঈয়া’র আশ্রয়ে।
তিনি তোমাদেরও দেবেন প্রাচুর্য,
শ্রেষ্ঠতম পাখী, অমিল সব মৎস্য,
মাঠে ফলবে তোমাদের অঢেল ফসল
গোধূলি বেলায় যারা প্রার্থনা জানাবে
সবুজ-তুষের জন্য,
তাদের ওপর বর্ষিত হবে উৎকৃষ্ট গমের বর্ষা।’

পরদিন প্রাতে-প্রভাতের প্রথম আভাতেই
চারদিকের লোকগুলো জড়ে হলো আমার চতুর্দিকে।
ছোটরা বয়ে আনলে আল্‌কাতরা,
বড়োরা আনলে প্রয়োজনীয় যা কিছু।
পঞ্চম দিনে তৈরী করলাম জাহাজের কাঠামো,
এক একর জুড়ে তার আয়তন,
দেয়ালগুলোর, এক একটা দশ ডজন ফুট উচ্চতা,
দিগ্বিজয়ী বীরের মতো সুদীর্ঘ তার মাথা।
বর্গক্ষেত্রের মতো জাহাজটার
প্রতিপ্রান্ত দশ ডজন ফুট,
সম্মোন্নতি রেখাগুলো পেতে দিলাম, জোড়া হলো এক সাথে।
তৈরী করলাম ছয়টা পাটাতন,
জাহাজটা বিভক্ত করলাম সপ্তম বিভাগে।
তার ডেকটা ভাগ করলাম নবম খণ্ডে,
হাতুরী মেরে শক্ত করে বসিয়ে দিলাম একই সঙ্গে।

তাকালাম লগির দিকে
সরবরাহ যা কিছু দিলাম রেখে।
আটচল্লিশ হাজার গ্যালন আলকাতরা রাখলাম চুল্লিতে,
চল্লিশ হাজার গ্যালন আলকাতরাও রাখলাম সংরক্ষিত।
ঝুড়ি-বাহকরা বয়ে নিয়ে এলো চব্বিশ হাজার গ্যালন তৈল।
আট হাজার টন তৈল টেনে নিল,
ষোল হাজার টন তৈল সযত্নে জমা রাখল নাবিক।
সমবেত জনতার জন্য জবাই করলাম বলদ,
মেষ-পাল প্রতিদিন।
লাল-মদ্য, তৈল, শ্বেত মদ্য
যোগালাম শ্রমিকদের স্রোতের মতো অজস্র,
যেন নববর্ষ, শুভ দিনে উপভোগ্য
মহান এক ভোজসভা।
দিবা রাত পরিশ্রান্ত ক্ষত বিক্ষত হস্ত
মলম বের করে লাগালাম তাতে।
সপ্তম দিনে সম্পূর্ণ হলো জাহাজ।

কিন্তু, জলে নাবানোটা বিরাট এক সমস্যা।
বিবেচিত হলো সরিয়ে রাখা
ওপর নীচের-মেঝের ছাদের সব তক্তা
যতক্ষণ পর্যন্ত জাহাজের এক-তৃতীয়াংশ
ডুবে গেল জলে।

তারপরে যা কিছু ছিল তাই দিয়ে সাজালাম,
যা ছিল রূপো তাই চাপালাম,
যা কিছু ছিল সোনা তাও চাপালাম
জীবন্ত প্রাণী যা যা ছিল সবাইকে নিলাম।
যা ছিল আমার সব নৌকায় নিলাম,
জীবন্ত সব কিছু-
পরিবার, আত্মীয়স্বজন,
প্রান্তরের পশু, তৃণভূমির গো মহিষ,
কর্মকার, মণিকার, গণৎকার সব।
উঠলাম আমি সবার শেষে
বন্ধ করলাম দরজাটা,
ঠিক তখন উঁকি ঝুঁকি দিচ্ছিল শিশু প্রভাতটা
সূর্যোদয়ের সূর্যের হাসি হাসি মুখ।

নীলাম্বরটা ছিল যে বিমুখ
কেন্দ্র-বিন্দু থেকে হঠাৎ
বেরিয়ে এলো এক টুকরো মেঘ-
কোকিল কালো মেঘ;
বড়ো হতে হতে সব কিছুকে দিলে
ঘোর অমাবশ্যায় ঢেকে।
ভাই দেখলে না ভাইকে, জননী দেখলে না সন্তানকে,
খেচররা কেউ চিনলো না কাওকে।

দেবতারা জানেন। যেই দেখলেন মহাপ্লাবন সমাগত
দৌড় দৌড় দৌড়-
ছুটতে ছুটতে হাঁপাতে হাঁপাতে অ্যানুর স্বর্গে
করলেন আরোহণ,
প্রাচীর গাত্রে শুয়ে পড়লেন নিম্নাঙ্গে
মাথা গুঁজে থাকা সারমেয়র মতন।

সামাস নির্দিষ্ট করে দিয়েছিলেন
একটি সময় :
‘যে নৈশকাল অস্বস্তির কারণ,
সে যখনই বর্ষণ করবে এক ঝলক উজ্জ্বল আলো
তখনই উঠবে জাহাজে, রুদ্ধ করে দেবে প্রবেশ দ্বার।’

সেই নির্দিষ্ট সময় এলো :
যে রাত্তিরে করে অস্বস্তির সূচনা, সে-ই
বর্ষণ করলে এক ঝলক আলো
আবহাওয়ার চেহারা দেখে নিলাম চকিতে,
ভয়ংকর চেহারা তার! ভয়ার্ত চিতে
উঠে পড়লাম ত্রস্তে, রুদ্ধ করলাম দ্বার
তার অভ্যন্তরে ছিল আদাদ বজ্রপাত,
সুল্লত এবং হানিস চলছিল আগে আগে
পাহাড় সমভূমির ঊর্ধ্বে ওরা যেন পথপ্রদর্শক,

এরাগল-মৃত্যুপুরীর রাজা,
ভেঙ্গে দিলেন পৃথিবীর বাঁধ, এগিয়ে এলেন নিনূরতা
বন্যাকে ডাকলেন ‘এগিয়ে এসো, এগিয়ে এসো!’
অ্যানুনাকি আলো ফেললেন পৃথিবীর সর্বত্র,
আদাদের বিস্ময় ও আতঙ্ক স্পর্শ করলে স্বর্গ।

ছয় দিন দিনরাত
শুধু ঝর জল-তারপরে বন্যা,
ড্রাগনের মতো হিংস্র-
ল্যাজের আঘাতে আঘাতে জলভাগ
স্থল ভাগ করে দিল এক,
গোগ্রাসে গিলে খেল পৃথিবীটাকে।
যা কিছু ভাস্বর ছিল হয়ে গেল অন্ধকার।
বিস্তির্ণ ভূভাগ ভেঙ্গে চুরমার
যেন সাধারণ মৃত্তিকা পাত্র।
দক্ষিণা ঝঞ্ঝার দাপট সর্বত্র
ক্ষণে-ক্ষণে বাড়ে জোর, পর্বতশীর্ষও
জলময়, বুঝিবা তলিয়ে যাবে অতলে।
জল, শুধু জল-অশান্ত দূর্বিনীত জল
যেন অসংখ্য হিংস্র নাগ
ফোঁস ফোঁস শব্দে ছুটে চলে জোরে, আরও জোরে।

সপ্তম দিন প্রভাতে
হিংস্র দানব প্রবেশ করলে তার খোলসে।
রেখে গেল শুধু বন্যা, শান্ত বন্যা-
যেন কোটি কোটি শত্রু-সেনা,
কালো কালো সব মাথা।

জাহাজটা হেলতে দুলতে আসে নিশির পর্বতে,
পর্বত পরমাদরে তাকে রেখে দিলে বক্ষেতে।
চাঞ্চল্যে নড়ে নড়ে ওঠে।

এক দিন, দ্বিতীয় দিন, নড়া চড়া নেই জাহাজটার।
তৃতীয় দিন, চতুর্থ দিন
নিশির পর্বতের আলিঙ্গনাবদ্ধ তার
নড়বার শক্তি নেই।
পঞ্চম দিন, ষষ্ঠ দিন।
অবোধ শিশুর মতো জাহাজ
গা এলিয়ে পড়ে থাকে পর্বত শিখরে।

সপ্তম দিন ঘুঘু পাখী ছেড়ে দিলাম-উড়ে গেল।
উড়ে উড়ে ফিরে এল, ঘুঘুটা গেল, ফিরে ফিরে এল।
ছেড়ে দিলাম একটা চড়ুই-উড়ে গেল-উড়ে উড়ে ফিরে এল-
ওটা গেল, ঘুরে ঘুরে ফিরে এল।
মুক্তি পেল একটা কাক-
উড়ে গেল-কা কা কা,
গেল, জল খেল, জল ছিটোল-
মনের আনন্দে উঠল ডেকে ডেকে,
আর ফিরল না।

মহাপ্লাবনের পর
তারপরে ছেড়ে দিলাম সব কিছু-
পশু পাখী সরীসৃপ যা ছিল নৌকায়।
দেবতাদের উদ্দেশ্যে নিবেদন করলাম যজ্ঞ।
পর্বত শিখরে তর্পণ, হোম, ঘৃতাহুতি।
সাত সাতটা ধর্মানুষ্ঠান-পাত্র সজ্জিত।
কী বিরাট সেই আয়োজন!
তাদের পায়ায় জমিয়েছিলাম যত সীডারকুরি এবং মেদিকটির
সুগন্ধী খণ্ড।
কী গন্ধ, আহা, সে কী গন্ধ!

মিষ্টিগন্ধে, সুগন্ধে জড়ো দেবতারা চতুর্দিকে
যেন মৌমাছির ঝাঁক।
সব শেষে এলেন ঈশতার, দেবীদের মধ্যে মহোত্তম
বেছে বেছে তুলে নিলেন ঐ মহামূল্য হীরে জহরত-
অবশ্য অ্যানুই তৈরি করেছিলেন তাঁর পছন্দ মতো।
যা চেয়েছিলেন তাই পেয়ে খুব খুশি স্বভাবতঃ
‘দেবতারা, সবাই শোন,
এই যে মানবধ্বংস এ কার ষড়যন্ত্র!’
সব শুনে নিনুরতা বললে-
‘সব ঈয়ার ষড়যন্ত্র, সব পরিকল্পনাই জানে।
সব কিছু’তে একমাত্র তারই নখদর্পণে।’

ঈয়া বলল সন্তর্পণে :
জ্ঞানী শ্রেষ্ঠ দেবতা এনলিল, নায়ক বটে তুমি,
কোন যুক্তিতে পৃথিবীকে ফেললে মহাপ্লাবনের মুখে?
যারা পাপী শাস্তি দাও তাদেরে,
যারা অবজ্ঞা করেছে আজই শাস্তি দাও তাদের!
কিন্তু এতটুকু বিজ্ঞতা’ত চাই,
সমূলে বিনষ্ট হবে কেন মানুষ
পশুপাখী আর যতো প্রজাতি!
পৃথিবীর ভার লাঘব করবে
জনসংখ্যা কমাবে যদি
ছেড়ে দেওয়া যেত না একটা সিংহকে,
মহাপ্লাবন না এনে একটা নেকড়েকে
ছেড়ে দেওয়া যেত না মানুষের মাঝে,
মহাপ্লাবন সৃষ্টি না করে
করা যেত না দুর্ভিক্ষের সূচনা?
মহাপ্লাবনকে আহ্বান না করে
সৃষ্টি করা যেত না মহামারী মড়কের?
মানব জাতির বিরুদ্ধে বিধ্বংসী
যুদ্ধের জানিয়েছিলাম আহ্বান,
আমিই যাদের জন্ম দিয়েছিলাম তাদের
কেন এইভাবে ধ্বংস হবে-
কেন এইভাবে শেষ হয়ে যাবে তারা!
আজ তারা মৃতদেহ হয়ে ভাসে
সমুদ্রে যেন মাছের চাড়া!

আনুনাকি দেবতারাও কাঁদলে, তার
সঙ্গে মেলালে সুরে সুর,
দেবতারা সবাই লজ্জিত, অবনতমুখী,
সবার মুখ ভাসে, অশ্রুসিক্ত বিয়োগবিধুর।

খুললাম জলদ্বার, উজল আলো
বিদ্ধ করলো চোখ মুখ,
নতজানু হয়ে বসে পড়লাম, কাঁদলাম, খুব কাঁদলাম।
বন্যার মতো অশ্রু ভাসিয়ে দিচ্ছিল দুটো গণ্ড।
সমুদ্র তীরবর্তী পৃথিবীর দিকে তাকালাম
দেখলাম-প্রতি চতুর্দশ অঞ্চলে সৃষ্টি হয়েছে এক একটা পর্বত।
গলায় পরেছি যা তা খুবই দুর্লভ,
কখনো ভুলব না দিনটার কথা।
মনে রাখব দিনগুলো,
রেখে দেব মনের মণিকোঠায়।

দেবতারা, সবাই আনন্দ কর, এ-যজ্ঞে সবাই আনন্দ কর।
কিন্তু, এন্‌লিলকে দিও না কাছে ঘেঁষতে।
অযুক্তি অবুদ্ধি ঢেঁকি ও-ই মহাপ্লাবনের নায়ক
আমার লোকগুলোকেও প্ররোচিত করেছে ধ্বংসকার্যে।

মানব-মৃত্তিকায় ঢাকা মৃন্ময় পৃথিবী,
চিন্ময় রূপ তার নেইক কোথাও।
পলি মাটি পৌঁছে গেছে ছাদে,
পলি মাটি সু-উচ্চ পর্বত শীর্ষে
সলিল সমাধি পেয়েছে পৃথিবীর প্রাণ।

সব দেখে শোকার্ত ঈশ্‌তার।
বংশীর মতো সুরেলা কণ্ঠে তার
শুরু করলেন বিলাপ-
গেল, গেল, সব গেল,
সুপ্রাচীন পৃথিবীর সব গেল কোথা,
পৃথিবী যে শুধু কর্দমাক্ত কাদা।
কারণ কি এইটাই যে
দেবতাদের সমাবেশে আমিই
বলেছিলাম-ধরার সহে না আর
ভয়ংকর পাপের বোঝা
বিহিত কর তোমরা কিছু একটা।
কেন যে বললাম, কেন যে বলেছিলাম,
কেন যে সেইদিন ঢংকা বাজিয়েছিলাম!

অবশেষে এন্‌লিলও উপস্থিত।
জাহাজ দেখে চক্ষুস্থির, রাগে অগ্নিশর্মা
যতো রাগ স্বর্গের দেবতাদের ওপর।
বেঁচে গেছে কি কোন জীবন্ত আত্মা?
না, এ-আমার মহাযজ্ঞে কেউ প্রাণ নিয়ে
পালাতে পারে না!

নতুন সৃষ্টি
বন্যা, মহাপ্লাবন, মহাপ্রলয়ের পর
পৃথিবীতে আবার মনুষ্যস্থাপন বাসনা দেবতাদের মনে।
নিজেদের মধ্যে পরামর্শ চলে।
দেবতা নিন্‌তুকে বললে একজন-
‘আমার মানব প্রজাতি, সে যে নিশ্চিহ্ন আজি!’

নিন্‌তু বললে : মানুষ শুধু নয়, পৃথিবী
আবার সাজাব সর্বরকম প্রজাতি দিয়ে,
মানুষ ফিরে যাবে যে যার বাসস্থানে,
নগর নগরীর যারা, তারা স্বর্গীয় ইচ্ছা
মতো গড়ে নেবে সুদৃশ্য আলয়-
শান্তির ছায়া বিছিয়ে দেব সবার ওপর।
আমাদের জন্য, আমাদের জন্যও
পবিত্র জায়গায় গড়বে তারা মন্দির,
আমাদের মন্ত্রণাগারও নিশ্চয় গড়ে দেবে
সর্বত্র পবিত্র ভূমিতে।

প্রথমে অ্যানু, তারপরে এন্‌লিল, এন্‌কি, নিনহারসাগ
অবয়ব দিলে কালো কালো মাথাওয়ালা মানুষদের।
কচি কচি পাতা মাথা চাড়া
দিলে পৃথিবী বক্ষ থেকে,
চতুষ্পদ পশুরা সমভূমিতে শুরু করলে নিজেদের চারণ,
তারপরে স্বর্গ থেকে নেমে এলেন
রাজা, উদ্দেশ্য প্রজাপালন।
উন্নত কিরীট এবং রাজার
সিংহাসন পাঠানো হলো স্বর্গ থেকে,
তিনি উদ্‌যাপন করলেন যতো পবিত্র ধর্মীয়-আচার,
প্রচার করলেন স্বর্গীয় অধ্যাদেশ।
বাছা বাছা পাঁচটি পবিত্র সঙ্গমে
মাথা চাড়া দিল পাঁচ পাঁচটি অপূর্ব সুদৃশ্য নগরী,
এদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ এরিদু’র
অধিষ্ঠাতা দেবতা জলের নুদিম্মাড এন্‌কি
দ্বিতীয় নগরীর নাম বাদটিবিরা,
অধিষ্ঠাতা…
তৃতীয় নগরী শিপ্পা হলো
উতু’র নামে উৎসর্গীকৃত
চতুর্থ নগরী সুরুপ্পাকে’র অধিশ্বর এন্‌লিলের স্ত্রী নিন্‌লিল।

ঈয়া এক একটা নগরীর ভারপ্রাপ্ত
এক এক দেব দেবীর হাতে করলেন অর্পণ
এক একটা নগরী-বৃহৎ মহান ধর্মানুষ্ঠান কেন্দ্র।
হলো প্রতিটা ছোট ছোট নদী নির্মল বিশুদ্ধিকরণের
সুচিন্তিত সাবলীল ব্যবস্থা।
তারপরে জিউসুদ্র সৃষ্টির প্রতিপালক,
সব্জী উদ্ভিদসমূহের রক্ষক,
মানব-প্রজাতির বীজ সংরক্ষক,
শুরু করলেন জীবনযাত্রা সেইখানে যেখানে
সূর্যের আলো জাগে প্রথমে-
সেইখানে যে দেশের নাম ডিল্‌মুন-
সেই স্থানে সুদূর সৌরলোকের
স্পন্দন প্রথম জাগে যেখানে।

এন্‌লিল দেখলে সবকিছু, শুনলে সব কথা,
উঠলো গিয়ে জাহাজে।
আমাকে হাত ধরে বসাল তাতে,
জায়া ছিল পাশে, তাকেও।
দু’জনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ললাট স্পর্শ করলে আমাদের :
আজ পর্যন্ত তোমরা ছিলে মানব,
আজ থেকে তোমরা আমাদের সমাজের-
অমর হলে, আজ থেকে দেবতা তোমরাও।
সেই থেকে এই নদী-মোহনায় আমি দেবতা, অমর।
আরও বলেছিলেন এনলিল :
দেবতাদের বলছি সমবেত হতে সভাকক্ষে,
যাতে যে জীবন চাও তুমি, তাই তুমি পাও।

গিলগামেসের নিজের অমরত্বর সন্ধানের মাঝখানটাতে উটনাপিসটিম-এর অনন্ত জীবন লাভের কাহিনী স্থাপন প্লাবন বিষয়ে আরেকটি বিষয় চিত্রিত করে; ব্যাবিলনে প্লাবন ইতিহাসের একটি পর্বের সমাপ্তি চিহ্নিত করে যখন মানুষ দেবতাদের মত অমর হতে পারতো। বাইবেলে মানুষের পক্ষে দেবতা হওয়া সম্ভব নয়; যদিও নুহ প্লাবনের পূর্বে জন্মানোর সুবাদে অতিদীর্ঘ জীবন পেয়েছিলেন:
প্লাবনের পর নুহ তিনশ’ পঞ্চাশ বছর আয়ু পেয়েছিলেন। নুহের প্রতিটি দিন ছিল নয়শ’ পঞ্চাশ বছরের সমান; তারপর তিনি মৃত্যুবরণ করলেন।

আমরা নুহের কাহিনীর সাথে তুলনীয় যে প্রাচীনতর ব্যাবিলনীয় কাহিনীগুলো দেখলাম তা এই সত্য নির্দেশ করে যে বাইবেলীয় কাহিনীটি স্রেফ কেবল ক্রুদ্ধ দেবতাগণ কর্তৃক পৃথিবী প্লাবিত করার অপেক্ষাকৃত প্রাচীন পৌরাণিক গাথারই একটি আঞ্চলিক হিব্রু সংস্করণ। বাইবেলে নৈতিকতা-তাড়িত একক উপাস্য ইয়াওয়ে কর্তৃক ব্যাবিলনীয় নৈতিকতা-অসাপেক্ষ দেবকূল কেবল প্রতিস্থাপিত হয়েছে। এভাবে এটা দৃশ্যমান হয় যে, নুহ-এর গল্প ইতিহাস নয়, পৌরাণিক কাহিনী। বাইবেলে এই পৌরাণিক কাহিনীটি ইসরায়েলীদের নিজস্ব গোত্রগত আবাস-ভূমির দাবির ন্যায্য প্রতিপালনের ক্ষেত্র প্রস্তুত করার ভূমিকাটি পালন করেছে, যা জে বর্ণিত নুহ নবীর কাহিনীর পরবর্তী অংশে বর্তমান-
শেম, হ্যাম ও যাফেথ নামে নুহের তিন পুত্র তার সাথে কিস্‌তি থেকে বের হল। হ্যাম ছিল কেনান-এর পিতা। এরাই ছিল নুহের পুত্রগণ, আর এদের দ্বারাই পৃথিবী আবার জনঅধ্যুষিত হয়েছিল। নুহ ছিলেন কৃষিজীবী, আর তিনিই প্রথম দ্রাক্ষা রোপন করেন। দ্রাক্ষাজাত কিছু সুরা পান করে তিনি মাতাল হয়ে পড়েন এবং তাঁর তাবুতে অনাবৃত হয়ে পড়ে থাকেন। কানান-এর পিতা হাম তার পিতার নগ্নতা দেখে ফেলে এবং বাইরে তার ভাইদের তা বলে। এবার শেম ও যাফেত একটা পোশাক নিয়ে উভয়ের ঘাড়ে বিছিয়ে নেয় এবং উল্টোমুখে হেঁটে তা দিয়ে পিতার নগ্নতা ঢেকে দেয়; তাদের মুখগুলো ফেরানো ছিল, আর তারা তাদের পিতার নগ্নতা দেখেনি। নুহ জেগে উঠে তার প্রতি কনিষ্ঠ পুত্রের আচরণের সংবাদ পেয়ে বললেন, ‘কেনান অভিশপ্ত হোক; সে তার ভাইদের দাসগণের মাঝে ইতরতম হবে।’ (জেনেসিস ৯:১৮-২৬)

যদিও হাম-এর অনৈতিক আচরণটি ঠিক কি প্রকৃতির ছিল তা অপরিষ্কার, ‘নিজের পিতার নগ্নতা অনাবৃত করা’ বাইবেলের অন্যত্র ভয়ঙ্কর যৌন অপরাধ হিসেবে দেখান হয়েছে, সেখানে এর অর্থ নিজের মায়ের সাথে মিলিত হওয়া।
তোমরা তোমাদের পিতার নগ্নতা অনাবৃত করবে না, এটা তোমাদের মায়েরই নগ্নতা, সে তোমার মাতা, অবশ্যই তার নগ্নতা অনাবৃত করবে না। (লেভিটিকাস ১৮:৭)

জে-এর নুহের কাহিনীতে একই শব্দপ্রয়োগ ইঙ্গিত দেয় যে হ্যাম দৃশ্যত ঘুমন্ত নুহের সাথে কোন ধরনের সমকামী যৌনঅসদাচরণের জন্য শাস্তি প্রাপ্ত হয়েছে। এই অনুচ্ছেদের রাজনৈতিক মাজেজা খুব পরিষ্কার; হ্যাম কেনানের পিতা, যাকে বাইবেল কেনানীয়দের পূর্বপুরুষ হিসেবে উল্লেখ করেছে। এরাই সেই জাতি, মুসার সাথে মিশরে ফেরাউনের কাছ থেকে পালিয়ে আসার পর তাদের আবাস হতে যাচ্ছিল যে ভূমিটি, সেইখানে ইসরায়েলীরা যাদের বাসিন্দা হিসেবে দেখতে পায়। বাইবেলের বর্ণনা দাউদ আর সোলায়মানের রাজ্য স্থাপনের জন্য ইসরায়েলীরা কেনানভূমি অধিকৃত করে। হ্যাম-এর পাপের কথা পুনর্ব্যক্তকরণ এভাবে পরবর্তীকালে ইসরায়েলীদের দ্বারা ঐ ঐশী অভিশাপের রূপায়ন হিসেবে তার বংশধরদের বিনাশকে বৈধতা দেবার কাজটি করে।

বস্তুত বাইবেলে ইসরায়েলীদের গোত্রগত প্রতিপক্ষকে অবমাননা করার লক্ষ্যে তাদের পূর্বপুরুষদের যৌন অজাচারের দোহাই পাড়ার কৌশল একাধিকবার ব্যবহার করা হয়েছে, যেটা এমনকি ইব্রাহিম-এর ভ্রাতুষ্পুত্র লুত-এর কন্যাদের নিম্নবর্ণিত কাহিনীতে এটি দেখা যাবে। খোদা কর্তৃক সডোম নগরী ধ্বংস এবং গোমরাহ কর্তৃক পার্শ্ববর্তী নগরগুলোর (এবং লুত ও তার কন্যারা যতদূর চিনত, সমগ্র পৃথিবীর) বাসিন্দাদের হত্যার পর এটি সংঘটিত হয়।

এবার লুত জোয়ার অঞ্চলের বাইরে চলে গেলেন এবং তার দুই কন্যাসহ পাহাড়ে বসতি করলেন, কেননা তিনি জোয়ারে বাস করতে ভয় পাচ্ছিলেন; কাজেই তিনি একটি গুহায় তার দুই কন্যাসহ বাস করতেন। তাদের মধ্যে জেষ্ঠ্যাজন কনিষ্ঠা-কে বলল, ‘আমাদের পিতা বৃদ্ধ, আর পৃথিবীর নিয়মে আমাদের কাছে আসতে পারবে এমন একটি পুরুষও নেই। আস, আমরা আমাদের পিতাকে মদ্যপান করাই, আর আমরা তার সাথে শয়ন করব, যাতে আমরা আমাদের পিতার মাধ্যমে বংশধারা রক্ষা করতে পারি।’ কাজেই তারা সেই রাতে তাদের পিতাকে মদ পান করাল; আর জেষ্ঠ্যা ভেতরে গেল, এবং তার পিতার সাথে শয়ন করল; তিনি জানলেনও না কখন সে শয়ন করল বা কখন সে উঠে গেল। পরদিন জেষ্ঠ্যা কনিষ্ঠাকে বলল, ‘দেখ, আমি কাল রাতে পিতার সাথে শয়ন করেছি; চলো আজও তাকে আমরা মদ্য পান করাই; তারপর তুমি ভেতরে যাও এবং তার সাথে শয়ন কর, যাতে আমরা আমাদের পিতার মাধ্যমে বংশধারা রক্ষা করতে পারি।’ কাজেই তারা সেই রাতে তাদের পিতাকে মদ্য পান করাল; আর কনিষ্ঠা ভেতরে গেল, এবং তার পিতার সাথে শয়ন করল; তিনি জানলেনও না কখন সে শয়ন করল বা কখন সে উঠে গেল। এভাবে লুত-এর উভয় কন্যাই তাদের পিতা কর্তৃক গর্ভবতী হল। জেষ্ঠ্যা একটি পুত্র প্রসব করল, তার নামকরণ করলো মোয়াব; সেই বর্তমান কালের মোয়াবীদের পূর্বপুরুষ। কনিষ্ঠাও একটি পুত্র প্রসব করে এবং তার নাম রাখে বেন-আম্মি; সে বর্তমান কালের আম্মোনীয়দের পূর্বপুরুষ। (জেনেসিস ১৯:৩০-৩৮)

বাইবেলের বিবরণ এখানে এই সবগুলো নামের অর্থ নিয়ে মস্করা করছে; হিব্রুতে মোয়াব আর ‘একই পিতা হইতে’ শুনতে প্রায় একই রকম শব্দ, আর বেন-আম্মি মানে ‘আমার পৈতৃক আত্মীয়ের পুত্র’। মোয়াবীয় ও আম্মোনীয়-রা ইসরায়েলীদের প্রতিবেশী গোত্র ছিল। এভাবে তাদের পূর্বপুরুষগণের অজাচার-সূত্রে উৎপত্তি চিত্রিত করা হয়েছে। আর এভাবেই গোত্রগত শ্রেষ্ঠত্বের ইসরায়েলী ধারণাকে সমর্থন জোগান হচ্ছে, হ্যাম আর কেনান-এর বেলায়ও যেমনটিই ঘটেছে।

বাইবেলীয় প্লাবনের কাহিনী যদি প্লাবন সম্পর্কিত মেসোপটেমীয় কিংবদন্তীরই পুনর্কথন হয়, তবে নুহের কোরআনীয় বিবরণের কি ঘটে? এর উত্তর দেয়ার জন্য আমাদের দরকার নুহের কোরআনীয় বিবরণ পরখ করা। প্রথম যে বিষয়টি আমাদের নজরে আসে সেটি হলো নুহের সম্প্রদায় যে পাপসমূহের জন্য শাস্তিপ্রাপ্ত হলো, তার অনেক বেশি খুঁটিনাটি বর্ণনা কোরআনে আছে, এবং হজরত মোহাম্মদের (দঃ) যে কোন প্রথাগত জীবনী পাঠকারীর কাছে এগুলোর বর্ণনা খুবই পরিচিত বলে মনে হবে:

এবং আমরা নুহকে তার স্বজনদের কাছে পাঠালাম: ‘আমি তোমাদের জন্য একজন সতর্ককারী, আর শুভবার্তাবহনকারী, আল্লাহ ছাড়া কারও দাসত্ব করো না। আমি তোমাদের জন্য একটা যাতনাময় শাস্তির দিনের আশঙ্কা করছি।’ তার জনগোষ্ঠীর অবিশ্বাসীদের পরিষদ তাকে বলল, ‘আমরা তো তোমাকে আমাদের মতই একজন নশ্বর হিসেবেই দেখতে পাচ্ছি,; না, আমরা বরং মনে করি তোমরা মিথ্যাবাদী।’ তিনি বললেন,…‘হে আমার গোষ্ঠী, আমি এ জন্য তোমাদের কাছে ধনরত্ন চাই না; আল্লাহই আমার মজুরি দেবেন।’…‘আমি তোমাদের বলি না ‘আমি আল্লাহর রত্নশালার অধিকারী;’ আমি অদৃশ্যকে দেখতে পাই না; আর আমি বলিও না যে ‘আমি একজন ফেরেশতা’।’ তোমাদের চোখে যা বিতৃষ্ণাকর তাও আমি বলি না, ‘আল্লাহ তাদের জন্য মঙ্গলকর কিছুই করবেন না,’ তাদের হৃদয়ে কি আছে তা আল্লাহই সবচেয়ে ভাল জানেন। নিশ্চয়ই সেক্ষেত্রে আমি খারাপ লোকদের মাঝেই একজন হবো।’…অথবা তারা কি বলে, ‘সে এটা জালিয়াতি করেছে’? বল: ‘যদি আমি এটা জালিয়াতি করতাম, আমার পাপ আমার ওপর পতিত হবে; আর আমি তোমাদের পাপ থেকে মুক্ত থাকব।’ (কোরআন ১১:২৭-৩৭)

এটা একটা নতুন উপাদান যা নুহের গল্পের বাইবেলীয় সংস্করণে ছিল না; আরো কৌতূহলোদ্দীপক হলো নুহ আর তার সম্প্রদায়ের মাঝের যুক্তিতর্কগুলো এবং হজরত মুহাম্মদের প্রাথমিক অনুসারীদের সাথে মক্কার কোরাইশদের মাঝে তাদের প্রতিপক্ষের মধ্যে সম্ভবত যে বিতর্ক হয়েছে, তা একই। মক্কার প্রতিপক্ষ তার বিরুদ্ধে যেসকল অভিযোগ এনেছিল, তার মধ্যে অতিঅবশ্যই সবচেয়ে সাধারণ অভিযোগ ছিল হজরত মুহাম্মদ কোরআন বানিয়েছেন, আর সেটা নিচের আয়াতগুলোতে দৃশ্যমানও হয়:

আল্লাহ ছাড়া আর কেউ কোরআন বানাতে পারে না; কিন্তু এটা নিশ্চিত করে এর আগে কি ছিল, আর অন্য সকল গ্রন্থ থেকে এটি পৃথক কেননা এতে কোন সন্দেহ নেই যে সকল অস্তিত্বের প্রভুর কাছ থেকে এটি এসেছে। কিংবা তারা কি বলে, ‘কেন, সে নিজেই এটা বানিয়েছে?’ বল: ‘তবে এর মত একটি সুরা তোমরা তৈরী কর, আর আল্লাহ ছাড়া যে কাউকে পরখ করতে বল, যদি তোমরা সত্যবাদী হও।’ (কোরআন ১০:৩৮,৩৯)

উপরন্তু, নুহের সম্প্রদায় আপত্তি করেছে যে কেবল ‘ইতর’ বা নিচু শ্রেণীর লোকজনই নুহের বার্তায় আস্থা স্থাপন করেছে; আবারও, এটাও খুব সহজেই কোরাইশদের মাঝে হজরত মুহাম্মদের প্রসঙ্গেও প্রযোজ্য। যেহেতু তিনি দরিদ্রদের জন্য সহানুভূতিসম্পন্ন হিতোপদেশ প্রচার করছিলেন, এটা খুবই স্বাভাবিক ছিল যে মক্কার দরিদ্রতমরাই তাঁকে অনুসরণ করবে। মক্কাবাসীগণ কর্তৃক নও-মুসলিমদের ওপর পীড়নের অসংখ্য গল্প থেকেও সে ইঙ্গিতই পাওয়া যায়; মালিকদের শাস্তি থেকে রক্ষার জন্য কি ভাবে তিনি মুসলমান-হওয়া ক্রীতদাসদের মুক্ত করেছিলেন তা নিয়ে সুনির্দিষ্টভাবে আবু বকরেরই বেশ কিছু কাহিনী আছে।

আবু কুহাফা তার পুত্র আবু বকরকে বললেন, ‘পুত্র, আমি দেখতে পাচ্ছি তুমি দুর্বল ক্রীতদাসদের মুক্ত করছ। তুমি যা করছো, তা যদি সত্যিই করতে চাও তবে কেন শক্তিমান ব্যক্তিদের মুক্ত করছ না, যারা তোমাদের নিরাপত্তা দিতে পারবে এবং রক্ষা করতে পারবে?’ তিনি বললেন, ‘আমি কেবল তাই করার চেষ্টা করছি যা আমি আল্লাহর উদ্দেশ্যে করতে সচ্‌ষ্েট।’ (পৃষ্ঠা ১৪৪, লাইফ অব মুহাম্মদ; আলফ্রেড গুইলামে কর্তৃক ইবনে ইসহাক এর সিরাত রসুল আল্লাহ গ্রন্থের ইংরেজি অনুবাদ)।

নিম্ন শ্রেণীর মুসলমানদের ওপর নিপীড়নই ছিল মক্কা থেকে আবিসিনিয়ায় প্রথম হিজরতেরও কারণ।
যখন নবী তার সাহাবীদের দুর্দশা দেখলেন, এবং আল্লাহ ও আবু তালিবের সমর্থনের কারণে তিনি নিজে রেহাই পেলেও তাদের তিনি রক্ষা করতে ব্যর্থ হচ্ছেন দেখে তাদের বললেন, ‘যদি তোমরা আবিসিনিয়ায় যেতে…’ (পৃষ্ঠা ১৪৬, লাইফ অব মুহাম্মদ; আলফ্রেড গুইলামে কর্তৃক ইবনে ইসহাক এর সিরাত রসুল আল্লাহ গ্রন্থের ইংরেজী অনুবাদ)।

আবু তালিবের মত প্রভাবশালী ব্যক্তির ওপরও মুসলিমরা নিরাপত্তার জন্য নির্ভর করতে পারতেন না, এই সত্যটি এই ইঙ্গিত করে যে তারা মক্কার সমাজের নিচু বর্গগুলো থেকে আগত। নুহের গল্প এভাবে দৃশ্যত মুসলমান জমায়েতে অংশগ্রহণে মক্কাবাসীদের অভিজাতসুলভ নিরাসক্তিকে আক্রমণ করা হয়েছে, দৃশ্যত প্রায় শুরু থেকেই যে সম্প্রদায়ে বেশ ক’জন দাস অন্তর্ভুক্ত ছিল।
উপরন্তু, কোরআনে নুহের পুত্রের অবিশ্বাস ও নিমজ্জিত হবার কাহিনীও (হ্যাম-এর নামটির উল্লেখ আর পাওয়া যাচ্ছে না) খুবই তাৎপর্যপূর্ণ:

আর নুহের প্রতি এটা নাজেল হলো এই কথা, “ইতিমধ্যেই যারা বিশ্বাস করেছে, তারা ছাড়া আপনার জাতির আর কেউই বিশ্বাস আনবে না; কাজেই তারা যা করবে তার কারণে বিপর্যস্ত হবেন না। আমাদের চোখের সামনে কিস্‌তিটি স্থাপন করে রাখুন, যেভাবে আমরা অবতীর্ণ করেছি; আর যারা অসৎ কাজ করে তাদের প্রতি আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করবেন না, তারা নিমজ্জিত হবে।’ কাজেই সে কিস্‌তিটিকে …যতক্ষণ না, আমাদের নির্দেশ হাজির হয়,…আমরা বললাম ‘প্রত্যেক ধরনের দুটিকে তুলে নাও, আর নাও তোমার পরিবারকে- শুধুমাত্র তাকে ছাড়া যার বিরুদ্ধে ইতিমধ্যেই শব্দ উচ্চারিত হয়ে গেছে-আর যারা বিশ্বাস করে তাদেরকে।’ আর সেখানে অল্প কয়েকজনই বিশ্বাসী ছিল…কাজেই তাদের মাঝে ছুটে এল পর্বতপ্রমাণ ঢেউ; আর নুহ তার যে পুত্র পৃথক দাঁড়িয়ে ছিল, তাকে বললেন, “আমাদের সাথে উঠে পড় পুত্র, আর অবিশ্বাসীদের সাথে থেকো না!’ সে বলল ‘আমি এক পর্বতে আশ্রয় নেব, সেটা আমাকে পানির হাত থেকে রক্ষা করবে’…আর ঢেউগুলো তাদের মাঝে চলে এল, আর সেও ডুবে মারা গেল। আর এটা বলা হল, ‘পৃথিবী, তোমার পানি গিলে ফেল, আর আকাশ, ক্ষান্ত হও!’ আর সেই পানি নিষ্ক্রান্ত হল, লক্ষ্য অর্জিত হলে কিসতিটি এল-জুদি পর্বতে স্থির হল।, আর বলা হল, ‘অসৎ সঙ্গ থেকে বিরত হও!’ আর নুহ তার প্রভুকে ডাকলেন, আর বললেন, ‘হে আমার প্রভু, আমার পুত্র আমার পরিবারের সদস্য, আর তোমার প্রতিজ্ঞা সুনিশ্চিতভাবেই সত্য। তুমি সকল বিচারকের মাঝে ন্যায্য বিচারকারী।’ তিনি বললেন, ‘নুহ, সে তোমার পরিবারের সদস্য নয়; এটা এমন একটা কাজ যা যথোচিত নয়। তোমার জ্ঞান নেই এমন কোন কিছু নিয়ে আমাকে অনুরোধ করো না। আমি তোমাকে সতর্ক করছি, যেন তুমিও অজ্ঞানদের একজনে পরিণত না হও।’ তিনি বললেন, ‘হে আমার প্রভু, আমি তোমার কাছেই আশ্রয় নেই, যেন আপনাকে এমন কোন বিষয়ে জিজ্ঞেস না করি যে বিষয়ে আমার জ্ঞান নেই; কেননা তুমি যদি আমাকে ক্ষমা না করো, আর আমার প্রতি যদি দয়া না দেখাও, আমিও বিনাশপ্রা্‌প্তদেরই একজন হব।’ (কোরআন ১১:৩৮-৫০)

স্বীয়মতে পুত্রের প্রত্যয় উৎপাদনে নুহের ব্যর্থতা লক্ষণীয়ভাবে আল তাবারীর বর্ণনায় চাচা আবু তালিবকে ইসলামে দীক্ষা দিতে হজরত মুহাম্মদের প্রচেষ্টার ব্যর্থতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ:

মুহাম্মদ তার চাচার দিকে ফিরলেন…আর তাকে ডেকে বললেন, ‘একটা বাক্য উচ্চারণ করুন যা দিয়ে আমি পুনরুত্থানের দিন আপনার পক্ষে সাক্ষ্য দেব। বলুন ‘আল্লাহ ছাড়া আর কোন উপাস্য নেই’।’
তিনি উত্তর দিলেন, ‘যদি সকল আরবরা এটা তোমাদের (সকলের) জন্য লজ্জাজনক বলে না ভাবতো, আর না বলতো যে আমি মৃত্যুর ভয়ে ভীত, আমি তোমার অনুরোধ রাখতাম; কিন্তু আমি অবশ্যই আমার পূর্বপুরুষের ধর্মে অটল থাকব।’ তারপরই এই আয়াত নাজিল হলো: ‘যাকে তুমি ভালোবাস তাকে তুমি পথ দেখাও না, বরং আল্লাহ যাকে চান পথ দেখান।’(পৃষ্ঠা ৯৫, আল তাবারির ইতিহাস, ৬ষ্ঠ খণ্ড; মুহাম্মদ অ্যাট মক্কা, ডব্লিউ এম ওয়াট ও এম ভি ম্যাকডোনাল্ড কর্তৃক অনূদিত।)

চাচা আবু তালিবকে ধর্মান্তরে হজরত মুহাম্মদের ব্যর্থতা নিশ্চিতভাবেই বিশেষভাবে যন্ত্রণাদায়ক ছিল, তিনি তাকে মক্কার দাওয়াতের দিনগুলোতে কুরাইশ গোত্রীয় শত্রুদের হাত থেকে রক্ষা করতেন; নুহের পুত্রের ডুবে যাবার কাহিনী মনে হয় এটাকেই উদ্দেশ্য করেছে।
নুহের প্লাবনের কোরআনীয় ও বাইবেলীয় সংস্করণ খুঁটিনাটি বর্ণনা ও উদ্দেশ্যর দিক থেকে খুবই আলাদা হলেও একই সময়ে আবার কোরআন নুহের আয়ুষ্কাল প্রসঙ্গে একই সংখ্যাগত বিবরণ দিয়ে বাইবেলীয় সংস্করণের সাথে তার সাধারণ মিলগুলোর ওপরও গূরুত্ব দিয়েছে:

বস্তুত, আমরা নুহকে তার জনগোষ্ঠীর নিকট প্রেরণ করি, আর সে পঞ্চাশ কম এক হাজার বছর ধরে তাদের মাঝে অবস্থান করে; কাজেই প্লাবন তাদের গ্রাস করলো, যেহেতু তারা ছিল পাপী। (কোরআন ২৯:১৪)

এখন নুহের সত্যি কাহিনী কোনটি সে প্রশ্ন উঠতে পারে; কিন্তু আমাদের অনুসন্ধান এই ইঙ্গিত দেয় যে এই প্রশ্নটিই ভ্রমাত্মক। আমরা যে প্লাবনের কাহিনীগুলো দেখলাম, তাদের মাঝে সবচেয়ে সনাতন এবং কাজে কাজেই সবচেয়ে ‘খাঁটি’ প্লাবনের কাহিনী হলো গিলগামেশেরটি, যেটি শুধু বহুত্ববাদীই নয়, বরং এই অর্থে অনৈতিকও যে ব্যাবিলনের ঈশ্বররা বাইবেল বা কোরআনে যে নৈতিক কারণসমূহ দেখান হয়েছে, সে রকম কোন কারণ ছাড়াই মানবজাতিকে ধ্বংস করে ফেলার সিদ্ধান্ত নেন। গিলগামেসের গল্পটি এই অর্থে পুরোপুরি অনৈতিক বলে মুসলিম বা ইহুদী-খ্রিস্টান প্রেক্ষিত থেকে এটা ধর্মীয় সত্য হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না। কিন্তু সে ক্ষেত্রে আমাদের কেবল থাকছে পরবর্তীকালের বাইবেলীয় ও কোরআনীয় প্লাবনের কাহিনীগুলো, আর নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে এগুলো গিলগামেসের পরেকার বলে তা ঐতিহাসিক সত্য হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না। আমাদের বাকি থাকল কেবল নুহের প্লাবনের কোরআনীয় সংস্করণ, যেটিকে ইসলামী প্রেক্ষিত থেকে ঐতিহাসিক সত্য নয়, কেবল ধর্মীয় সত্য হিসেবে দাবি করা যেতে পারে; অন্য কথায় এটা একটা ইসলামী পুরাণ।

নুহের কাহিনীকে পৌরাণিক হিসেবে মূল্যায়ন করাটা এই সত্য থেকে আরও সমর্থিত হয় যে কোরআনে প্লাবনের কাহিনীটির খুঁটিনাটি বর্ণনা নুহের চেয়ে হজরত মুহাম্মদের পয়গম্বরী-জীবনের সাথেই বেশী সম্পর্কিত বলেই প্রতিভাত হয়। দৃশ্যতঃ এটা ঐতিহাসিক সত্যতার প্রশ্নটিকেই ঝেঁটিয়ে একপাশে সরিয়ে দিয়েছে, কেননা প্রথম পর্যায়ের মুসলমান সমপ্রদায়ের জন্য নৈতিক সমর্থন প্রদানই কোরআনীয় কাহিনীটির লক্ষ্য। নিচের আয়াতটি বিবেচনা করলে আমরা এর মর্মার্থ বুঝতে পারবো:

আর আপনার সাথে অতীতের যে পয়গম্বরদের ইতিহাস সম্পর্কিত করা হয়, তার উদ্দেশ্য আপনার মনোবল বৃদ্ধি করা; এর মধ্য দিয়ে আপনার প্রতি সত্য এবং হুঁশিয়ারি অবতীর্ণ হয়েছে, আর সত্যবাদীর জন্য রয়েছে তাগিদ। (কোরআন ১১:১২২)

এখানে কোরআন নিজেই বলছে যে ইতিপূর্বের নবীদের সম্পর্কিত তার গল্পগুলোর লক্ষ্য হলো উদাহরণ দিয়ে হজরত মুহাম্মদ ও তার সাহাবীদের প্রেরণা প্রদান। এই কাহিনীগুলো সত্যিকারের ইতিহাস তুলে ধরে এই দাবি থেকে এটা একেবারেই আলাদা। এর (প্রমাণ) হলো স্রেফ নুহের ইতিহাস বলে যাওয়ার বদলে নুহের কাহিনীটির বরাত দিয়ে কোরআন আদি মুসলিম সমপ্রদায়টিকে সমর্থন করছে। একটি পৌরাণিক কাহিনী হিসেবে প্লাবনের গল্পটি মুসলিম সম্প্রদায়টির প্রতি সরাসরি প্রযোজ্য হবার নমনীয়তা অর্জন করেছে; আর এভাবেই এটা ইতিহাসের চেয়ে অনেক বেশী কার্যকর।

রক্ষণশীলরা এই সিদ্ধান্তে আতঙ্কিত হয়ে উঠবেন, কেননা তাঁরা সর্বদাই ঘোষণা করে এসেছেন যে কোরআনের কাহিনীগুলোর ঐতিহাসিক সত্যতা সুনিশ্চিত। ধর্মীয় দিক থেকে কোরআনের সত্যতা তার গল্পগুলো নৈতিকভাবে সত্য কি না, তা দিয়েই বিবেচিত হওয়া উচিত, ঐতিহাসিক সত্যতা দিয়ে নয়। ঐতিহাসিক সত্যতার নির্ধারণের বিষয়টি ঐতিহাসিক অনুসন্ধানের জন্যই রেখে দেয়া উচিত, যেমন বৈজ্ঞানিক সত্যতা খোঁজা উচিত বৈজ্ঞনিক অনুসন্ধানে, কেতাবে নয়। আমরা এটা নিয়ে ভাবলেই এটাকে সম্পূর্ণ যুক্তিসঙ্গত বোধ হবে, কেননা ইতিহাস কার্যত ‘সামাজিক বিজ্ঞান’ হিসেবেই নিজেকে দাবি করে: ঐতিহাসিক অনুসন্ধান অতীতের যে নিদর্শনগুলো তুলে ধরে, হোক সেগুলো গিলগামেসের মহাকাব্যের কীলকাকৃতির বর্ণমালাওয়ালা মাটির ফলক বা ‘জে’ এর মত লিখিত উৎস, এগুলো বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণেরই ঐতিহাসিক সমতুল্য, ঐতিহাসিক সত্য বিষয়ে যে কোন প্রকল্প গ্রহণের আগেই এগুলো অবশ্যই বিবেচনায় নিতে হবে। ঐশী বাণীর কাজ ইতিহাসের সত্য উপস্থাপন নয়, তার কাজ স্বতন্ত্র; সেটা হলো যে সুনীতিগুলো নিয়ে আমরা বেঁচে থাকি, সেগুলোকে রূপদান করে যে কাহিনী (কিংবা পুরাণ), সেগুলো প্রদান করা।

[নোট : জিসান হাসান লিখিত অসম্ভব গুরুত্বপূর্ণ এ রচনাটি ইতোপূর্বে ত্রৈমাসিক নতুন দিগন্ত-এর জুলাই-সেপ্টম্বর ২০০৮ সংখ্যায় ‘মহাপ্লাবনের ইতিহাস’ শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।]

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১৬ thoughts on “নূহ-এর মহাপ্লাবন কি আসলে ঘটেছিল? | জিসান হাসান

  1. সেমিটিক ধর্মগুলোর
    সেমিটিক ধর্মগুলোর ধর্মপ্রচারকরা তাদের প্রচার করা ধর্মতত্ত্বকে ঐ সময়ের মানুষদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য করার জন্য পুর্ববর্তী ধর্মীয় পুরাণসমূহ সুকৌশলে নিজেদের তৈরি ধর্মগ্রন্থসমূহে অর্ন্তভুক্ত করেছে। এই অর্ন্তভুক্তির সময় মুল কাহিনীকে অনুসরণ করে নিজের প্রচারিত ধর্মের উপযোগী করে কাহিনীর বিস্তার ঘটিয়েছে। এজন্যই নূহ বা এই ধরনের ধর্মীয় পৌরণিক কাহিনীগুলো ধর্মের ভিন্নতানুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন রূপ আমরা দেখতে পাই। যদি ধর্মীয় পুরাণগুলো সত্যিই এক ঈশ্বরের হত, তবে অবশ্যই সকল ধর্মে পূর্বের দেবতা বা ধর্মপ্রচারকদের ঘটে যাওয়া কাহিনী অভিন্ন হত। আধুনিক সভ্যতার কাছে ধর্ম স্বাভাবিকভাবেই বিজ্ঞান ও যুক্তির মারপ্যাচে বাতিল হয়ে যাচ্ছে এবং বাতিল হতে বাধ্য।

  2. স্রষ্টা চাইলে যা ইচ্ছা সৃষ্টি
    স্রষ্টা চাইলে যা ইচ্ছা সৃষ্টি করতে পারেন, যা ইচ্ছা ধ্বংস করতে পারেন।

    এরপরও,
    ধ্বংস করার জন্য মহাপ্লাবনের দরকার পরেছিল তার,
    বাচিয়ে রাখার জন্য একটা নৌকার প্রয়োজন হয়েছিল।
    কেমনে কি?

    আর জলজ প্রানীগুলোই বা কিভাবে ধ্বংস হয়েছিল তখন?

  3. অসাধারন রচনা। নূহের কাহিনী যে
    অসাধারন রচনা। নূহের কাহিনী যে মনগড়া তা বিবর্তন এর জ্ঞান দিয়েই প্রমান করা যায়। নারায়ন সেনের ডারউইন থেকে ডিএনএ এবং চারশো কোটি বছর বইতে জিওলজি আর শিলাস্তরের ঘটনের উপর ভিত্তি করে নানা তত্ত উপাত্ত দিয়ে বিষয়টির ব্যাখা করা হয়।

  4. যেমন বৈজ্ঞানিক সত্যতা খোঁজা

    যেমন বৈজ্ঞানিক সত্যতা খোঁজা উচিত বৈজ্ঞনিক অনুসন্ধানে, কেতাবে নয়।

    জি হ্যা জনাব আসলে নূহের মহাপ্লাবন নিয়ে ইতিপুর্বে বিস্তর গবেষণা হয়েছে এবং এটা নিয়ে বিজ্ঞানভিত্তিক ও ব্যাপক উনুসন্ধান করেছেন কলম্বিয়া উনিভার্সিটির দুজন মেরিন বায়োলজিস্ট Ryan এবং Pitman। কৃষ্ণ সাগরের আশে-পাশের শিলালিপি থেকে তারা প্রমাণ করেন যে প্রায় ৭৫০০ বছর আগে বড় ধরনের প্লাবন হয়েছিল, যেটিই মূলত নূহের প্লাবন হিসেবে পরিচিত–

    তারা তাদের গবেষণালব্ধ তথ্য আর উপাত্ত নিয়ে নীচের চমৎকার বই লিখেছেন–

    নোট : জিসান হাসান লিখিত অসম্ভব গুরুত্বপূর্ণ এ রচনাটি ইতোপূর্বে ত্রৈমাসিক নতুন দিগন্ত-এর জুলাই-সেপ্টম্বর ২০০৮ সংখ্যায় ‘মহাপ্লাবনের ইতিহাস’ শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।]

    আগ্রহী পাঠকেরা উপরের বইটি পড়লে নূহের প্লাবন সম্পর্কে বিজ্ঞানভিত্তিক অনেক তথ্য আর উপাত্ত পেতে পারেন, যেগুলো জিসান হাসানের ধারনা ভিত্তিক প্রবন্ধের চাইতে অনেক বেশী প্রমাণভিত্তিক আর গ্রহনযোগ্য।

    1. বড় ধরণের বন্যা পৃথিবীর অনেক
      বড় ধরণের বন্যা পৃথিবীর অনেক জায়গায় হয়েছে। আমাদের দেশেও হয়েছে। হয়ত এরকম কোনো এক বড় ধরণের বন্যাকে কেন্দ্র করে নুহের প্লাবনের মিথ চালু হয়েছে। সমস্ত পৃথিবী জুড়ে বন্যা হওয়া বিভিন্ন কারণে অসম্ভব। এই লেখাটি পড়ে দেখুন

      মহাপ্লাবনের বাস্তবতা : পৌরাণিক অতিকথন বনাম বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান

      1. পৃথিবী জুড়ে বন্যা হওয়া

        পৃথিবী জুড়ে বন্যা হওয়া বিভিন্ন কারণে অসম্ভব।

        সমস্ত পৃথিবীজুড়ে বন্যা হয়েছিল, এমন দাবী কোরানে করা হয় নি।

        এই লেখাটি পড়ে দেখুন
        মহাপ্লাবনের বাস্তবতা : পৌরাণিক অতিকথন বনাম বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান

        সেই তো মুক্তমনা আর অভিজিত রায়।চিন্তার দৈন্যতার কারনে এর বাইরে আসলে আপনারা কিছু ভাবতে পারেন না। অনন্ত বিজয় দাসের লিখার চাইতে মেরিন বায়োলজিস্ট Ryan এবং Pitman গবেষণালবদধ বইটি অনেক তথ্য সমৃদ্ধ আর গ্রহনযোগ্য। পড়েই দেখুন না।

        1. সমস্ত পৃথিবীজুড়ে বন্যা

          সমস্ত পৃথিবীজুড়ে বন্যা হয়েছিল, এমন দাবী কোরানে করা হয় নি।

          তাহলে নুহের বন্যা কোথায় হয়েছিল ? এ বিষয়ে কোরানে কি দাবী করা হয়েছে ? সেটা কি বিস্তারিত বলা যাবে ?

  5. নুহ আলাইহিস সালামের ঘটনা কোনো
    নুহ আলাইহিস সালামের ঘটনা কোনো গল্প নয়। এটি সত্যঘটনা। এর সঙ্গে মুসলমানদের ঈমানের প্রশ্ন জড়িত।
    আর যে-কেউ কোনো সত্যঘটনার বিকৃত-ব্যাখ্যা দিলেই তা বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা হয়ে যায় না।

    1. নুহ আলাইহিস সালামের ঘটনা কোনো

      নুহ আলাইহিস সালামের ঘটনা কোনো গল্প নয়। এটি সত্যঘটনা। এর সঙ্গে মুসলমানদের ঈমানের প্রশ্ন জড়িত।

      আপনি ঠিক বলেছেন। এটা আসলে ইমানের ব্যাপার। যত আজগুবিই হোক না কেন , নুহের বন্যাকে বিশ্বাস করতেই হবে , কারন তা না করলে ইমান থাকবে না , ইমান না থাকলে দোজখে যেতে হবে।

  6. এই প্রবন্ধে দেখানো হয়েছে যে,
    এই প্রবন্ধে দেখানো হয়েছে যে, নূহ-এর ঘটনাবলী কোরানে এসেছে সংশোধিত আকারে। কিন্তু এর আগে এটা আরও অনেক কাহিনীতে এসেছিল। সেসব কাহিনীর মধ্যেকার ফারাকগুলো এখানে আলোচনা হয়েছে এবং এই গল্পের মিথ নির্ভরতার বিবর্তন এখানে বিবৃত হয়েছে। তবে এটা মহাপ্লাবন সংক্রন্ত কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দেয়ার প্রবন্ধ নয়। এজন্যই পূর্বোক্ত মন্তব্যে বলেছিলাম, লেখাটা পড়ে মন্তব্য করা উচিৎ।

    1. যারা আপত্তি জানাচ্ছে, তারা না
      যারা আপত্তি জানাচ্ছে, তারা না পড়েই আপত্তি জানাচ্ছে। পোস্টে নূহ’র প্লাবণকে বাতিল করা হয়েছে বলে মনে হয় নাই। বিভিন্ন ধর্মে কাহিনীর ভিন্নতা উপস্থাপন করা হয়েছে। মুসলমানরা বলদের জাতি। না বুঝেই চিল্লাচিল্লি করে।

    2. এই গল্পের মিথ নির্ভরতার

      এই গল্পের মিথ নির্ভরতার বিবর্তন এখানে বিবৃত হয়েছে। তবে এটা মহাপ্লাবন সংক্রন্ত কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দেয়ার প্রবন্ধ নয়।

      নুহের মহাপ্লাবন যে মিথ নির্ভর কিছু সেটি আসলে এই পোস্ট থেকে প্রমাণিত হয় নি।গিলগিমাসের মিথই যে তাওরাত, ইঞ্জিল আর কোরানের তথ্যের উতস সেটারই বা প্রমাণ কি?গিলগিমাস আর নূহের মহাপ্লাবন তো সম্পুর্ন আলাদা কিছুও নয়,সেটাই বা আমরা বুঝব কিভাবে?

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

9 + 1 =