মাও ও গণযুদ্ধ | আন্তর্জাতিক দলিল | শেষ পর্ব

নোট : ১৯৯৮ সালের ডিসেম্বর মাসে মাও সেতুং-এর ১০৫ তম জন্মবার্ষিকীতে ইউরোপে এক আন্তর্জাতিক সেমিনার আয়োজন করা হয়েছিল। সেমিনারের বিষয় ছিল ‘মাও ও গণযুদ্ধ’। কমিউনিস্ট পার্টি অব ফিলিপাইনস্ (সিপিপি), কমিউনিস্ট পার্টি অব তুরস্ক (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী) অর্থাৎ (টিকেপি-এমএল) এবং কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী) (পিপলস্ ওয়ার) অর্থাৎ সিপিআই (এমএল-পিপলস্‌ ওয়ার) এই সংগঠনত্রয় ছিল সেমিনারটির আহ্বায়ক। ওই সেমিনারে যোগ দিয়েছিল প্রায় ২৭টি পার্টি ও সংগঠন। সিপিআই (এমএল-পিপলস ওয়ার) বর্তমানে যা সিপিআই (মাওবাদী) নামে পরিচিত, তারা সর্বহারা শ্রেণীর নেতা, মহান শিক্ষক মাও সেতুং-এর ১০৭তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষ্যে ২৬ ডিসেম্বর, ২০০০ ওই সেমিনারের নির্বাচিত অংশ বাংলায় অনুবাদ করে প্রকাশ করে। রচনাটি দীর্ঘ হওয়ায় এটিকে তিন খণ্ড করতে হয়েছে, এটি শেষ পর্ব।

চতুর্থ পর্ব । বিশ্ব সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের অংশ হিসেবে ভারতীয় বিপ্লব
বিশ্ব সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের অংশ হিসেবে ভারতীয় বিপ্লব যতই অগ্রসর হতে থাকে ততই তা বিশ্বব্যাপী সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতার উল্লেখযোগ্য অংশ হিসেবে পরিগণিত হয়। ফিলিপিনস, পেরু, নেপাল প্রভৃতি দেশের মহান বিপ্লবী সংগ্রাম তথা উন্নত দেশগুলোর সর্বহারাদের সংগ্রাম ভারতীয় বিপ্লবকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করে। পৃথিবীর এইসব বিপ্লবী আন্দোলনগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা শুধুমাত্র আন্দোলনগুলোর ক্ষেত্রে সহায়ক হয় না, বিশ্বব্যাপী সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আন্দোলনকেও উন্নত করে। তাই সারা পৃথিবীর সব প্রকৃত কমিউনিস্ট পার্টি যারা তত্ত্ব ও প্রয়োগে মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাও চিন্তাধারা ও গণযুদ্ধের পথ অনুসরণ করছে, তাদের জরুরি কর্তব্য হল পারস্পরিক নৈকট্য বৃদ্ধি করা, কার্যকলাপের মধ্যে সংযোগস্থাপন করা, অভিজ্ঞতা বিনিময় ও পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করা। অন্যান্য প্রকৃত সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী শক্তিগুলোকে নিয়ে একটা আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক কেন্দ্র তৈরি করতে পারলে তা সম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সামজতন্ত্রের জয়ের লক্ষ্যকে আরও নিশ্চিত করবে।

এই সম্মেলন নিঃসন্দেহে এই লক্ষ্যে একটা সঠিক পদক্ষেপ- মাও-এর নীতি ও গণযুদ্ধের পথ অনুসরণকারী আন্তর্জাতিক সর্বহারাদের একত্রিক করার দিকে এক বৃহৎ উদ্যোগে। সি.পি.আই(এম-এল)(পিপলস ওয়ার) বিশ্বব্যাপী বিপ্লবী শক্তির মৈত্রী স্থাপনে, নিপীড়িত মানুষের সাম্রাজ্যবাদ ও প্রতিক্রিয়াশীল বিরোধী সংগ্রামের সহযোগিতায় আন্তর্জাতিক কর্তব্য পালনে সর্বতোভাবে সচেষ্ট থাকবে। এই উপলক্ষ্যে প্রতিক্রিয়ার বিরুদ্ধে, শোষণমুক্ত নতুন সমাজ গড়ার লক্ষ্যে চলমান বিপ্লবী সংগ্রামে পৃথিবীর সর্বত্র যে বীর সন্তানেরা প্রাণ দিয়েছে তাদের আমরা লাল সেলাম জানাচ্ছি।

মাও সেতুং ও গণযুদ্ধের ওপর একটা সাধারণ ঘোষণা
মাও সেতুং এর ১০৫-তম জন্মবার্ষিকীতে আমরা, গণযুদ্ধের পথে এগিয়ে চলা মার্কসবাদী-লেনিনবাদীরা, ‘মাও সেতুং ও গণযুদ্ধ’ শীর্ষক একটা আন্তর্জাতিক আলোচনা সভা আয়োজন করার উদ্যোগ নিয়েছি। এই অলোচনা সভায় অংশগ্রহণকারী পার্টিগুলো ও যারা অংশগ্রহণ করতে পারেনি তাদের কাছে এই বিবৃতিকে গ্রহণ করার প্রস্তাব রাখছি।

জাতীয় মুক্তি আন্দোলন, ব্যাপক সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আন্দোলন এবং বিশ্বপ্রলেতারীয় বিপ্লবকে এগিয়ে নিয়ে যেতে গণযুদ্ধের তাৎপর্য ও প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে তার শিক্ষাকে উপযুক্ত মর্যাদা দেওয়াই এই আলোচনা সভার উদ্দেশ্য।

এই আলোচনা সভাতে অংশগ্রহণকারী প্রতিনিধিরা সেইসব পার্টিগুলো থেকেই এসেছেন, যারা হয় গণযুদ্ধ পরিচালনা করছেন, শুরু করবার প্রস্তুতি নিচ্ছেন অথবা গণযুদ্ধের গুরুত্বকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরছেন এবং গণযুদ্ধগুলোকে সমর্থন করছেন। সমস্ত অংশগ্রহণকারীরা এই সাধারণ সিদ্ধান্ত পৌঁছেছেন যে বিশ্বের বেশিরভাগ দেশে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পূর্বে নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব চালিয়ে নিয়ে যেতে গণযুদ্ধ, বিশেষ করে দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধের রণনীতিগত লাইন একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

অংশগ্রহণকারীরা বিশ্ব পুঁজিবাধী ব্যবস্থার সংকট এবং সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে ও সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য জনগণের বিপ্লবী সংগ্রামের বর্তমান ও ভবিষ্যতের পরিপ্রেক্ষিতে গণযুদ্ধকে একটা রাজনৈতিক প্রয়োজনীয়তা হিসাবে স্বীকৃতি দিচ্ছেন ও তার প্রচারের দায়িত্ব গ্রহণ করছেন।

এই আলোচনাসভায় প্রতিনিধিত্বকারী সমস্ত পার্টি মার্কসবাদ-লেনিনবাদের বিজ্ঞানকে গ্রহণ করে নিজ নিজ দেশের মূর্ত অবস্থায় তাকে প্রয়োগ করার স্বীকৃতি দিচ্ছেন।

পার্টিগুলোর সমানাধিকার ও স্বাধীনতাকে সম্মান জানানোর সাথে সাথে এই আলোচনাসভার আরও বড়ো উদ্দেশ্য হল সাধারণ বোঝাপড়ার স্তরকে উন্নীত করা, প্রলেতারীয় আন্তর্জাতিকতাবাদের নীতির ভিত্তিতে গণযুদ্ধ ও অন্যান্য বিপ্লবী সংগ্রাম গড়ে তোলার ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতা ও সমর্থন গড়ে তোলা এবং এইভাবে বিশ্ব জুড়ে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আন্দোলনকে শক্তিশালী করা।

আমরা, বিশেষত মার্কসবাদী-লেনিনবাদী পার্টিগুলো, যারা গণযুদ্ধ চালাচ্ছি, কমরেড মাও সেতুং-এর জন্মশতবার্ষিকী স্মরণে গৃহীত মাও-চিন্তার ওপর সাধারণ ঘোষণাকে পুনরায় স্বাগত জানাচ্ছি। দর্শন, রাজনৈতিক অর্থনীতি, সমাজবিজ্ঞান, পার্টি গঠন, গণযুদ্ধের মাধ্যমে নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব, সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ও গঠন এবং প্রলেতারীয় সাংস্কৃতিক বিপ্লব এই বিষয়গুলোতে অবিস্মরণীয় আবদানের জন্য আন্তর্জাতিক প্রলেতারিয়েতের একজন মহান চিন্তাবিদ ও শিক্ষক কমরেড মাও সেতুং-কে আমরা শ্রদ্ধা জানাই।

আমরা মনে করি যে মাও সেতুং-চিন্তা বা মাওবাদ মার্কসবাদ-লেনিনবাদের বিকাশের একটা উচ্চতর স্তর যেখানে সমাজতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে, সংশোধনবাদকে উচ্ছেদ করতে ও পুঁজিবাদের পুনরুত্থান ঠেকাতে প্রলেতারীয় একনায়কত্বের অধীনে নিরবিচ্ছিন্ন বিপ্লব চালিয়ে নিয়ে যাবার তত্ত্ব ও প্রয়োগের পথনির্দেশ রয়েছে। আমরা সেই রাজনৈতিক লাইনকেই আঁকড়ে থাকতে চাই যা নয়া গণতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সমাধা করবারা পথে সাম্রাজ্যবাদ এবং সমস্ত প্রতিক্রিয়ার বিরুদ্ধে শ্রমিকশ্রেণীর নেতৃত্বে সমস্ত জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করবে।

যেখানে এবং যখনই শ্রমিকশ্রেণীর অগ্রণী অংশের নেতৃত্বে নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন করবার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেবে, তখনই সেখানে মার্কসবাদ-লেনিনবাদের বিপ্লবী মর্মবস্তুকে অনুসরণ করে গণযুদ্ধ চালাতে হবে। এরকম অবস্থাতে গণযুদ্ধের প্রয়োজনীয়তাকে অস্বীকার করার চিন্তাই হচ্ছে সংশোধনবাদ। এটা আসলে গণযুদ্ধকে অনির্দিষ্টকাল ধরে মুলতুবি রাখার সংশোধনবাদী পথ।

সংশোধনবাধী ও সংস্কারবাদীদের মতের বিপরীতে আমাদের মনে রাখা দরকার যে সমাজতন্ত্র গড়ে তোলবার জন্য কোনো শান্তিপূর্ণ পথের অস্তিত্ব নেই। সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থায় অসম বিকাশের ওপর লেলিনের শিক্ষা অনুযায় সাম্রাজ্যবাদের শৃঙ্খলের দৃর্বলতম গ্রন্থিতে সশস্ত্র বিপ্লব শুরু করে সত্বর বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক ও তারপর সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন করা প্রয়োজন ও সুবিধাজনক। আধা ঔপনিবেশিক-আধা অসামন্ততান্ত্রিক দেশে গণযুদ্ধের বিকাশ সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোতে শ্রেণীসংগ্রাম ও পরে প্রলেতারিয়েত কর্তৃক একচেটিয়া বুর্জোয়াদের উচ্ছেদের ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোতে অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত বিকাশের স্তর সমাজতন্ত্র গড়ে তোলবার পক্ষে উপযুক্ত, কিন্তু শ্রমিকশ্রেণীর সশস্ত্র বিপ্লবকে দমন করতে এইসব দেশের একচেটিয়া বুর্জোয়াদের হাতে আছে সবচেয়ে আধুনিক উপায়। সেইজন্য আধা ঔপনিবেশিক এবং আধা সামন্ততান্ত্রিক দেশের শ্রমিকশ্রেণী ও জনগণ যে পরিমাণে গণযুদ্ধের বিকাশ ঘটাবে সেই পরিমাণে সাম্রাজ্যবাদী দেশে একচেটিয়া বুর্জোয়াদের উচ্ছেদে প্রলেতারিয়েতের উত্থানের দিন এগিয়ে আসবে।

মাও সেতুং প্রথম দেখান যে চীনের মতো দেশে দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধ শুরু করা সম্ভব কারণ সেখানকার আসম বিকাশ, রাজনৈতিক অস্থিরতা, পশ্চাৎপদ অর্থনীতি এবং কেন্দ্রীভূত যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাব গণযুদ্ধের বিকাশকে সহায়তা করে। তিনি দেখান যে পূর্বোক্ত ব্যবস্থা কোনো উন্নত পুঁজিবাদী দেশে বিরাজ করে না, ফলে সেখানে সশস্ত্র বিপ্লবের আগে দীর্ঘ আইনি সংগ্রামে মধ্যে দিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন হয়।

বর্তমান অবস্থায় রাষ্ট্র ও বিপ্লবের ওপর মার্কসবাদী-লেনিনবাদী তত্ত্বকে উর্ধ্বে তুলে ধরতে এবং সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে বিশ্ব প্রলেতারীয় বিপ্লবকে এগিয়ে নিয়ে যেতে মার্কসবাদী লেনিনবাদী মাওবাদী পাটিগুলোর দ্বারা সংগঠিত গণযুদ্ধ অত্যান্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আধা ঔপনিবেশিক ও আধা সামন্ততান্ত্রিক দেশে গণযুদ্ধের অস্তিত্ব না থাকলে, সাম্রাজ্যবাদী দেশের শ্রমিকশ্রেণী রাজনৈতিকভাবে দেশে গণযুদ্ধের অস্তিত্ব না থাকলে, সাম্রাজ্যবাদী দেশের শ্রমিকশ্রেণী রাজনৈতিকভাবে আরও দুর্বল হয়ে পড়তে পারে, তাদের সংস্কারবাদ ও সংশোধনবাদের পথে চালিত হয়ে পড়বার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।

গণযুদ্ধের তাৎপর্য ও প্রয়োজনীয়তা
সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ ও আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে চীনের নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবে গণযুদ্ধের তত্ত্ব ও প্রয়োগের মহান প্রবক্তা হিসেবে মাও সেতুং-কে আমরা শ্রদ্ধা করি। অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের পরিপ্রেক্ষিতে গণযুদ্ধের ওপর মাও সেতুং-এর শিক্ষাকে আমাদের জানাবোঝাটা গণযুদ্ধ চালানোর জন্য অত্যন্ত প্রয়োজন। শ্রমিক শ্রেণীর বিপ্লবী পার্টির নেতৃত্বে যদি তা সঠিক পথে চালিত হয়, তবে নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবে গণযুদ্ধ হচ্ছে এক অজেয় অস্ত্র।

গণযুদ্ধের তত্ত্ব ও প্রয়োগ সম্পর্কে মাও-এর শিক্ষা মার্কসের শিক্ষার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ অর্থাৎ শ্রেণী-সংগ্রামের অনিবার্য গতি সর্বহারা একনায়কত্বের দিকে যাবে। লেনিনের দুই স্তরের বিপ্লবের তত্ত্ব ও প্রয়োগের অরাও উচ্চতর রূপ হল মাও-এর গণযুদ্ধের তত্ত্ব ও প্রয়োগ যেখানে একটা নতুন ধরনের বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের পরে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সাধিত হয়।

গণযুদ্ধের তত্ত্বের প্রধান রূপকার হিসাবে আমরা মাও সেতুং-কে মানি। গণযুদ্ধের নীতি ও কৌশলের ওপর তার তত্ত্বের তাৎপর্য আজকের দিনেও প্রাসঙ্গিক। গণযুদ্ধের ওপর তার শিক্ষা আসলে বিপ্লবী যুদ্ধের দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ ও বিপ্লবী শ্রেণীসংগ্রামের লাইনের প্রয়োগের সাথেই সম্পর্কিত। গণযুদ্ধের ওপর মাও-এর তত্ত্ব ও প্রয়োগ মার্কসবাদ-লেীননবাদের প্রধান সূত্রগুলোর বিকাশের ধারাবাহিকতা। মাওবাদের বিকাশ এটা গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ এবং পরবর্তীতে মাহন প্রলেতারীয় সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় পর্যন্ত মাও- এর সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ও গঠনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে তা ভিত্তি হিসাবে কাজ করেছে।

গৃহযুদ্ধ বা সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে পরিচালিত জাতীয় মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন স্তর ও পর্যায়ের ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতি ও বিকাশের স্তরে যুদ্ধের বিভিন্ন রূপ (গেরিলা য্দ্ধু, নিয়মিত চলমান যুদ্ধ, সম্মুখ যুদ্ধ ও অভ্যূত্থান)-এর সামাজিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণ সম্পর্কে জ্ঞানার্জনের ক্সেত্রে গণযুদ্ধের ওপর মাও-এর শিক্ষা একটা অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী উৎস হিসাবে কাজ করে।

গ্রাম দিয়ে শহর ঘিরে ফেলা সম্পর্কিত দীর্ঘস্থায়ি গণযুদ্ধের রণনীতিগত লাইন আসলে শ্রমিকশ্রেণী ও কৃষকের মধ্যে মৌলিক গণতান্ত্রিক জোট গড়ে ওঠবার বৈপ্লবিক নীতির বহিঃপ্রকাশ। এই রণনীতি বিশ্বের বেশিরভাগ দেশেই প্রযোজ্য, যেখানে কৃষক জনগণ মূল উৎপাদকের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং গণতান্ত্রিক বিপ্লবের প্রধান অংশ হিসাবে যারা কৃষিবিপ্লবী লড়াই চালাচ্ছেন।

যতদিন পর্যন্ত না শহরগুলোতে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল সম্ভব হয়ে উঠছে ততদিন দীর্ঘস্থায়ি গণযুদ্ধের রণনীতিগত লাইন গণফৌজ গড়ে তুলতে ও গ্রামাঞ্চলে শক্তিকে বাড়িয়ে তুলতে বিপ্লবী শক্তির প্রধান হাতিয়ার হিসাবে কাজ করে। বিপ্লবী শক্তি ক্ষুদ্র থেকে বৃহৎ এবং দুর্বল থেকে শক্তিশালী হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে গ্রামাঞ্চর পশ্চাৎভূমি হিসাবে কাজ করে। অফুরন্ত শক্তির উৎস জনগণের ওপর নির্ভর করে ও সফলভাবে কৌশলগত প্রতি আক্রমণ চালিয়ে গণফৌজ রণনীতিগতভাবে আত্মরক্ষার অবস্থান থেকে রণনীতিগতভাবে স্থিতাবস্তায় চলে যেতে পারে এবং তারপর সাড়া দেশ জুড়ে শহরগুলোতে ক্ষমতা দখলের জন্য রণনীতিগতভাবে আক্রমণের পর্যায়ে চলে যেতে পারে।

কোনো কোনো দেশে, যেখানে কিছু পরিমাণে শিল্প পুঁজির বিকাশ হয়েছে কিন্তু আবার গরিব কৃষক ও কৃষি খামারে শ্রমিকদের সংখ্যাও যথেষ্ট, সেইসব দেশে শ্রমিকশ্রেণীর সাথে সাথে এরাও যাতে বিপ্লবী ভূমিকা পালন করতে পারেন সেদিকে নজর দেওয়া বিশেষ প্রয়োজন। এমনকী রাশিয়ার শহরগুলোতে অভ্যুত্থানের মধ্যে দিয়ে ক্ষমতা দখলের পর গৃহযুদ্ধ এবং সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সময় গ্রামাঞ্চলে বলশেভিকদের সশস্ত্র বিপ্লবী যুদ্ধ চালানোর পরীক্ষা দিতে হয়েছিল।

বিশ্বের বেশিরভাগ দেশ আজও সামন্তবাদ ও আধা সামন্তবাদের পশ্চাৎপদতায় নিমজ্জিত। এইসব দেশগুলোতে সাম্রাজ্যবাদ ও আঞ্চলিক শোষকশ্রেণী শ্রমিক ও কৃষকের ওপর সবচেয়ে নির্মম পদ্ধতিতে শোষণ ও অত্যাচার চালিয়ে যাচ্ছে। তাই বিশ্বের এইসব দেশগুলোতে বিপ্লবী সংগ্রামের প্রধান রূপ হিসাবে সশস্ত্র সংগ্রাম এগিয়ে নিয়ে যেতে শ্রমিকশ্রেণীর বিপ্লবী পার্টিগুলোর উচিত ব্যাপক জনগণকে নেতৃত্ব দেওয়া ও দীর্ঘস্থায়ি গণযুদ্ধের রণনৈতিক লাইনকে অনুসরণ করা।

সশস্ত্র বিপ্লবী সংগ্রাম হচ্ছে সংগ্রামের প্রধান রূপ। কারণ এটা রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল তথা বিপ্লবের কেন্দ্রীয় প্রশ্নের সাথে সম্পর্কিত। রাষ্ট্র ও বিপ্লব সম্পর্কে মার্কসবাদী-লেনিনবাদী তত্ত্বের সাথে সম্পূর্ণ সঙ্গতিপূর্ণভাবে চেয়ারম্যান মাও আমাদের শিখিয়েছেন যে বন্দুকের নলই রাজনৈতিক ক্ষমতার উৎস। তিনি এই শিক্ষাও দিয়েছেন যে গণফৌজ ছাড়া জনগণের কিছুই থাকে না। একমাত্র যখন গণফৌজ থাকে তখনই জনগণ সমাজ বিপ্লবের আশা ও তার ভিত্তি স্থাপন করতে পারে।

দীর্ঘস্থায়ি গণযুদ্ধের রণনীতিগত লাইন শিল্পোন্নাত পুজিবাদী দেশে প্রযোজ্য নয়। কিন্তু গণযুদ্ধের সাধারণ লাইনের সার্বজনীন তাৎপর্য অনস্বীকার্য। একইভাবে এর বিশ্বব্যাপী তাৎপর্য এই যে, সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোতে শ্রেণীসংগ্রাম ও আধা ঔপনিবেশিক- আধা সামন্ততান্ত্রিক দেশগুলোতে দীর্ঘস্থায়ি গণযুদ্ধ পরস্পরের সাথে দ্বান্দ্বিকভাবে যুক্ত। কৃষিপ্রধান দেশগুলোতে দীর্ঘস্থায়ি গণযুদ্ধের মাধ্যমে শত্রুকে উৎখাত করতে ও উন্নত পুঁজিবাদী দেশগুলোতে শ্রমিক অভ্যুত্থান ঘটাতে শ্রমিশ্রেণীর বিপ্লবী পার্টির পক্ষে জনগণের ওপর নির্ভর করা, তাদের ওপর বিশ্বাস রাখা, তাদের জাগিয়ে তোলা ও তাদের সংগঠিত ও সমাবেশিত করা একান্ত প্রয়োজন। ব্যাপক জনগণের মধ্যে শক্ত ভিত হিসাবে গণ সংগঠন ও রাজনৈতিক ক্ষমতার আধার গড়ে তুলতে হবে। লক্ষ লক্ষ জনগণকে জাগাতে, সংগঠিত ও সমাবেশিত করতে যুক্ত ফ্রন্টের কৌশল কাজে লাগাতে হবে। বিপ্লবী সংগ্রামের সমস্ত রূপকে সশস্ত্র উপায়ে ক্ষমতা দখলের লক্ষ্যে কাজে লাগানো উচিত।

বর্তমানে কয়েকটা কমিউনিস্ট পার্টি রয়েছে যারা কমরেড মাও- এর শিক্ষাকে অনুসরণ করে অত্যন্ত সাফল্যের সাথে দীর্ঘস্থায়ি গণযুদ্ধের রণনীতি প্রয়োগ করছে। তারা জনগণের অফুরস্ত অংশগ্রহণ ও সমর্থন পাচ্ছেন। তারা রাজনৈতিক ক্ষমতার গণতান্ত্রিক কাটামো গড়ে তুলেছেন। তারা দুর্দান্ত বিপ্লবী সংগ্রামের পথে জনগণের সংগঠিত ক্ষমমতাকে বিস্তৃত করতে সক্ষম হয়েছেন।

শ্রমিকশ্রেণী বিপ্লবী পার্টির নেতৃত্বে এগিয়ে চলা গণযুদ্ধ সাম্রাজ্যবাদ ও আঞ্চলিক শোষকদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের পথ বিপ্লবী শক্তিকে রক্ষা করতে ও তার বিস্তার ঘটাতে সক্ষম হয়েছে। সশস্ত্র বিপ্লবের লাল পতাকাকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরতে, বিপ্লবের মর্মবস্তুকে আঁকড়ে ধরতে ও বিপ্লবের কেন্দ্রীয় প্রশ্ন সমাধান করতে এগুলো অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

গণযুদ্ধ পরিচালনকারী মার্কসবাদী-লেনিনবাদী পার্টিগুলো শত্রুর বিরুদ্ধে তীব্র বিপ্লবী সংগ্রামের মাধ্যমে শিক্ষিত, পরীক্ষিত ও দৃঢ় হয়ে উঠছে। তারা তাদের অভিজ্ঞতার বিশ্লেষণ করছে, ইতিবাচক ও নেতিবাচক দুটো দিক থেকেই শিক্ষা করছে, নিজেদের শক্তি ও কাজকর্মের হিসাব করছে, ভুল ও দুর্বলতাগুলো সংশোধন করছে, বিপ্লবী সংগ্রামকে উচ্চতর নতুন স্তরে তুলতে কার্যক্রম গ্রহণ করছে এবং এইভাবে একের পর এক জয় অর্জন করে এগিয়ে চলছে। তারা গণ লাইনের ওপর ভিত্তি করে জনয্দ্ধু চালাচ্ছে, জনগণকে জাগিয়ে তুলছে ও সমাবেশিত করছে। তারা জনগণের ওপর আস্থা রাখছে।

শত্রু কর্তৃক ‘কমপ্রাবল্যের যুদ্ধ’- এর রণনীতির ব্যবহার, সোভিয়েতসহ বিভিন্ন দেশে সংশোধনবাদীদের পতন দেকিয়ে কমিউনিস্ট বিরোধী মতাদর্শগত রাজনৈতিক আক্রমণ, সশস্ত্র বিপ্লবী সংগ্রামকে সন্ত্রাসবাদ হিসাবে চিত্রায়ন, কিছু ক্ষেত্রে শান্তির প্রস্তাব এবং ‘শান্তি ও উন্নয়ন’ – এর মিথ্যা আহ্বানসহ শত্রুর সমস্ত ধরনের আক্রমণকে তারা প্রতিহত করেছেন। প্রথমদিকে তাদের সশস্ত্র আন্দোলনগুলোর প্রতি সংশোধনবাদী দেশগুলোর ও বুর্জোয়া গণ মাধ্যমের প্রতারণামূলক সমর্থন ছিল। সে ফাঁদে পা না- দিয়ে বিপ্লবী অবস্থান বজায় রেখে তারা আন্দোলনগুলোর আরও বেশি স্থায়িত্বের দিকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। পরে এই আন্দোলনগুলোর সাথে সুবিধাবাদী নেতৃত্ব বিশ্বাসঘাতকতা করেছে এবং এগুলোকে সুবিধাবাদ ও নয়া ঔপনিবেশিক সমঝোতার পথে নিয়ে গেছে।

বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় থেকে সমাজতন্ত্র ও জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের মহান বিজয়ের ফলে গড়ে ওঠা শ্রমিকশ্রেণীর ও জনগণের বিপ্লবী সংগ্রামে সংশোধনবাদের বিশ্বাসঘাতকতা এবং সাময়িক বিপর্যয়ের পর্যায় থেকে একবিংশ শতাব্দীর বিশ্ব প্রলিতারিয়েতের সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের নতুন পর্যায়ে উত্তরণের ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ি গণযুদ্ধ পরিচালনকারী মার্কসবাদী-লেনিনবাদী পার্টিগুলো একটা চূড়ান্ত ভূমিকা পালন করেছে।

তারা সশস্ত্র বিপ্লবের মশালকে প্রজ্বলিত রেখেছে। সাম্রাজ্যবাদী ও নিপীড়িত উভয় ধরনের দেশগুলোতে সাম্রাজ্যবাদ ও সমস্ত প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির বিরুদ্ধে আরও দৃঢ় মরণপণ বিপ্লবী সংগ্রাম চালিয়ে তারা বিপ্লবের পথকে আলোকিত করেছেন ও বিশ্বের শ্রমিকশ্রেণীও জনগণকে প্রেরণা যুগিয়েছেন। গণযুদ্ধের সাম্প্রতিক বিজয়গুলো আসলে বিশ্ব জনগণ ও বশ্বি প্রলেতারিয়েতেরই জয়।

তাই যেসব পার্টি ও জনগণ যারা বর্তমানে গণযুদ্ধ চালাচ্ছেন বা ভবিষ্যত চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তাদেরকে সমস্ত রকমের সমর্থন দেওয়া কমিউনিষ্ট পার্টিগুলোর, বিপ্লবী শক্তিগুলোর ও জনগণের আন্তর্জাতিকে দায়িত্ব। গণযুদ্ধের বিজয় বিশ্বের সমস্ত ধরনের বিপ্লবী সংগ্রামকে সমর্থন যোগায় ও শক্তিশালী করে তোলে।

গণযুদ্ধের সুমহান তাৎপর্য ও প্রয়োজনীয়তা
জনয্দ্ধু চালাবার বস্তুগত পরিস্তিতি আজ আগেকার চেয়ে আরও চমৎকার। মহামন্দার পর থেকে ধরলে আজ বিশ্ব পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সঙ্কটের গভীরতা পুর্ববর্তী সময়ের সমস্ত নজির ছাড়িয়ে গেছে। নতুন বিশ্ব বিশৃঙ্খলা দিনে দিনে অধিকতর খারাপের দিকে যাচ্ছে। বর্তমান সঙ্কট আরও একবার একচেটিয়া পুঁজিবাদের পরগাছা, বিনাশী ও মুমুর্ষূ চরিত্র প্রকাশ করে দিচ্ছে। আমরা সাম্রাজ্যবাদ ও সর্বহারা বিপ্লবের যুগেই রয়েছি।

সাম্রাজ্যবাদ ও সর্বহারা বিপ্লবের এই যুগে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো রাষ্ট্রের কাঠামো ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে জনগণের ওপর দমন ও শোষণ চালায়, জাতীয়-আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে তার স্বার্থকে চূড়ান্ত প্রতিপন্ন করে, জনগণের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক জোট গঠন করে, আবার নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতাও চালায়। একইভাবে এই সর্বহারা বিপ্লবের যুগে শ্রমিকশ্রেণী ও তার বিপ্লবী পার্টিগুলো নির্দিষ্ট দেশগুলোতে আন্তর্জাতিকভাবে সাম্রাজ্যবাদরে বিরুদ্ধে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে ব্যাপক জনগণকে নেতৃত্ব দেয়।

উন্নতমানের প্রযুক্তি ব্যবহারের মধ্যে দিয়ে দ্রুত গড়ে ওঠা উৎপাদনের সামাজিক চরিত্রের সঙ্গে পুঁজি ঘনীভবনের একচেটিয়া চরিত্রে রয়েছে তীব্র দ্বন্দ্ব। এর ফলে সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোর একচেটিয়া পুঁজিপতিদের হাতে দ্রুত পুঁজির ঘনীভবন ও কেন্দ্রীকরণ ঘটছে।

‘মুক্ত বাজার’-এর বিশ্বায়নের সাম্রাজ্যবাদী নীতির ফলে দ্রুতগতিতে পুঁজির যে ঘনীভবন ঘটে তা কেবলমাত্র উৎপাদনশীল পুঁজির ঘনীভবন ঘটায় না, বরং যেটা আরও গুরুত্বপূর্ণ তা হচ্ছে এর ফলে লগ্নি পুঁজির অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধিও ঘটে। সম্পদের প্রকৃত মূল্য অপেক্ষা অধিক মূল্য নির্ধারণ, ফাটকাবাজির একত্রীকরণ এবং নিপীড়িত জনগণকে নিংড়ে নিতে বিশ্ব জুড়ে সুদখোরদের ভয়ঙ্কর দাপাদাপি ইত্যাদি এসব কিছু লগ্নি পুঁজির অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধির ফসল।

শ্রমিকশ্রেণী ও জনগণের রক্তঘামের বিনিময়ে অর্জিত পুঁজির এই সাংঘাতিক ঘনীভবন ও একচেটিয়া পুঁজির লাগাম ছাড়া মুনাফা বৃদ্ধির ফরে সাম্রাজ্যবাদীর ও নিপীড়িত উভয় ধরনের দেশগুলোতেই তীব্র গণ বেকারী মজুরি হ্রাস দেখা যায়, জীবনযাত্রার মান নেমে যায়। গণতান্ত্রিক অধিকার ও শ্রমিকশ্রেণীর অর্জিত সামাজিক অধিকারের ওপর তীব্র আক্রমণ নেমে আসে। এই ঘটনাবলী বিশ্ববাজারকে আরও সংকুচিত করে যার ফলে সম্সত ধরনের পণ্য ক্রমবর্ধমান অতি উৎপাদনের সংকটে পড়ে।

বিশ্ব পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সংকটের বোঝা এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার নিপীড়িত জনগণের ওপরই সবচেয়ে বেশি চেপে বসে। সাম্রাজ্যবাদ এবং তার পদলেহী স্থানীয় দালালদের হাতে জনগণকে সবচেয়ে মারাত্মাক নিপীড়ন ও শোষণের ফল ভোগ করতে হয়। কয়েকটা নিপীড়িত দেশেল জনগণ গণযুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন এবং এই সংখ্যা আরও বাড়তে বাধ্য। তাই বিশ্ব বর্তমানে পিছিয়ে থাকা দেশগুলোই ঝড়ের কেন্দ্র হিসাবে রয়েছে। রাশিয়া, পূর্ব ইউরোপ ও পূর্বতন সেভিয়েতের অর্ন্তভূক্ত দেশগুলোর সংকট আরও তীব্রতর হচ্ছে, যার ফলে এখানকার জনগণের ব্যাপক অংশ লোলুপ একচেটিয়া পুঁজির পায়ের তলে পিষ্ট হচ্ছেন। যেখানে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের জন্য বস্তুগত ও বিষয়ীগত পরিস্থিতি অত্যন্ত পরিপক্ক হযে উঠবে সেখানেই সাম্রাজ্যবাদের গ্রন্থির দুর্বলতম অঞ্চল ভেঙে পরবে।

সাম্রাজ্যবাদ প্রভুত্ব চালাচ্ছে এরকম বেশিরভাগ দেশই ১৯৭০ সাল থেকে কাঁচামালের অতি উৎপাদনের সঙ্কটে জর্জরিত হয়ে পড়েছে। আই.এম.এফ, বিশ্বব্যাঙ্ক ও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা এইসব দেশগুলোতে বাণিজ্যের অসম নিয়ম, সাংঘাতিক ঋণের বোঝা, একগুচ্ছ কাঠামোগত পুনর্বিন্যাস ও কঠোর ব্যয় সংকোচের ব্যবস্থা চাপিয়ে দিয়েছে।

বিশ্ব পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সঙ্কটের বর্তমান বিপর্যয়কর অবস্থায়, তথাকথিত উদীয়মান (দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার) বাজারগুলো সেই দেশগুলো যেখানে সাম্রাজ্যবাদ নির্দেশিত রপ্তানিমূলক বিশেষ ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল) বিশ্ব বাজারে তাদের পণ্যের লাগাম ছাড়া জোগান দেওয়ার ও বিপুল বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করবার অক্ষমতার দরুন অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে মুখ থুবড়ে পড়েছে। রাশিয়া ও পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে শাসকশ্রেণীর প্রবঞ্চনা, কযেকটা রপ্তানিযোগ্য পণ্যের পড়তি মূল্য এবং পাহাড় প্রমাণ বৈদেশিক ঋণের চাপে অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিপর্যয় ক্রমাগত ভয়াবহ হযে উঠেছে।

যে সব দেশে জাতীয় শিল্পের বিকাশ যেটুকু হচ্ছিল তার অগ্রগতিকে রোধ করা হচ্ছে বা ধ্বংস করা হচ্ছে এবং যে দেশে নিপীড়িত জনগণ তীব্র শোষণ ভোগ করছেন, সেই ধরনের দেশের সংখ্যা ক্রমশ বেড়েইে চলেছে। তীব্র গণ বেকারি বৃদ্ধি পেয়ে আজ ৩০ থেকে ৬০ শতাংশের কাছাকাছি। দারিদ্র জনগণের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশকে ছেয়ে ফেলেছে।

সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোতে একচেটিয়া পুঁজি ও শ্রমিকশ্রেণীর মধ্যে দ্বন্দ্ব আরও তীব্র হচ্ছে। শ্রমিকশ্রেণী ও ব্যাপক জনগণ তাদের দাবি নিয়ে প্রতিবাদ জানাতে আইনি পথে সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন। এই অবস্থায় শ্রমিকশ্রেণীর বিপ্লবি পার্টি গড়ে তোলা যেতে পারে এবং এই পার্টি সমাজতন্ত্র গড়ার বিপ্লবী কর্মকান্ডকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে।

সর্বহারা আন্তর্জাতিকতাবাদের মহান লাল পতাকা তলে, আধা ঔপনিবেশিক আধা সামন্ততান্ত্রিক দেশগুলোর সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রাম ও শ্রেণীসংগ্রামের সাথে তাল মিলিয়ে সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোতেও শ্রমিকশ্রেণীর শ্রেণীসংগ্রাম আরও এগিয়ে যেতে পারে। সাম্রাজ্যবাদের সংকটের বোঝা নিপীড়িত জনগণের কাঁধে চাপিয়ে দেবার চেষ্টা ও নীতির বিরুদ্ধে জনগণের প্রতিরোধ সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোতে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য শ্রেণীসংগ্রামে সহায়তা করে ও সমর্থন যোগায়।

সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো বিশ্ব জনগণকে দমন ও শোষন করতে নিজেদের মধ্যে সমঝোতা করে। কিন্তু বিশ্ব পুঁজিবাদী ব্যবস্থার ক্রমশ বেড়ে চলা সংকট তাদের নিজেদের মধ্যে সুতীব্র প্রতিযোগিতা, আরও সংকট, ফ্যাসিবাদী প্রবণতা এবং ব্যাপকভাবে যুদ্ধের জন্ম দেয়।

এই মুহূর্তে সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলো, বিশেষত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার আঞ্চলিক দালালরা জনগণের বিরুদ্ধে প্রতিবিপ্লবী হিংস্র আক্রমণ চালাচ্ছে। তারা এখন তাদের সামরিক জোট তৈরি ও বিস্তৃত করতে এবং বিভিন্ন অঞ্চলে আঞ্চলিক যুদ্ধ বাধিয়ে রাখতে ব্যস্ত।

যাই হোক, যত বেশি করে মার্কসবাদী-লেনিনবাদী পার্টিগুলো গণযুদ্ধের বিকাশ ঘটাবে, ততই বিশ্ব জনগণের বিশ্বযুদ্ধকে ঠেকিয়ে রাখার সম্ভাবনা বেড়ে যাবে অথবা সাম্রাজ্যবাদীদের চক্রান্তে যদি বিশ্বযুদ্ধ বেঁধেও যায়, তাহলেও সেই যুদ্ধ সাম্রাজ্যবাদ ও তার প্রতিক্রিয়াশীল দালালদের বিরুদ্ধে বিপ্লবী যুদ্ধে পরিণত হবে। সারা বিশ্ব জুড়ে ক্রমবর্ধমান বিশৃঙ্খলা বিশ্বব্যাপী সামাজিক বিপ্লবেরই পূর্বাভাস।

গণযুদ্ধের পটভূমি, বাস্তব অবস্থা ও সম্ভাবনা
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘কম প্রাবল্যের যুদ্ধ’- এর নীতির বিরুদ্ধে এবং ১৯৭০ দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে সংশোধনবাদী ও পেটিবুর্ঝোয়ারা যেভাবে মার্কসবাদের শিক্ষাগুলোকে অস্পষ্ট করে তুলছে তার বিরুদ্ধে গণযুদ্ধের ওপর মাও-এর শিক্ষা ও প্রয়োগকে দৃঢ়ভাবে সাথে ঊর্ধ্বে তুলে ধরা ভীষণ প্রয়োজন।

গণযুদ্ধের মাধ্যমে চীন ও ইন্দোচীনের দেশগুলোর মহান বিজয় এই শিক্ষাগুলোকে পুনধ্বনিত করেছিল। কিন্তু ১৯৭০ দশকের শেষের দিক থেকে চীনের সংশোধনবাদী নেতৃত্ব ‘আঞ্চলিক স্থিতাবস্থা, শান্তি ও বিকাশ’ এই শ্লোগানের ভিত্তিতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর গণযুদ্ধকে ধ্বংস করতে প্রবৃত্ত হল। তারা সোভিয়েত ও ভিয়েতনাম বিরোধী অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে দাঁড়াল এবং শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রসঙ্ঘের তত্ত্বাবধানে ‘শান্তি প্রতিষ্ঠা’-র প্রস্তাব মেনে নিতে খেমাররুজকে বাধ্য করল।

সামরিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে মোকাবিলা করতে পারে এই অহংকারে দাপিয়ে বেড়াতে লাগল সোভিয়েত সংশোদনবাদীরা। জাতীয় মুক্তি আন্দোলনগুলো একমাত্র সোভিয়েতের সাহায্যেই জিততে পারে এই ধারণাকে ছড়িয়ে দিল। এইভাবে বিদেশী সাহায্যের ওপর নির্ভর করে দ্রুত সামরিক বিজয়ের সংশোধনবাদী ও পাতি বুর্জোয়া সুলভ ধারণা এই আন্দোলনগুলোতে শক্তিশালী হল।

কার্টার ও রেগন উভয়েই ‘গেরিলা যুদ্ধবিরোধী যুদ্ধ’ সম্পর্কিত কেনেডির পরিকল্পনা গ্রহণ করল ও কম প্রাবল্যের প্রতিআক্রমণ নীতি প্রয়োগ করল। এইভাবে তারা অ্যাঙ্গোলা, মোজাম্বিক ও নিকারাগুয়াতে জনগণের দেশপ্রেমিক ও গণতান্ত্রিক আকাক্সক্ষাকে গুঁড়িয়ে দিতে ও তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালাতে প্রতিবিপ্লবীদের সশস্ত্র করল।

কিন্তু সংশোধনবাদীদের নেতৃত্বে ও প্রভাবে থাকা রাজত্ব ও আন্দোলনগুলোর ভেঙে পড়ার ও আরও বিপথে যাওয়ার মাঝেই গণযুদ্ধ পরিচালনকারী বিভিন্ন মার্কবাদী-লেনিনবাদী পার্টিগুলো তাদের শক্তিকে সংরক্ষিত করে চলেছে ও তার শক্তি বাড়িয়েছে। তারা তাদের শক্তিকে রক্ষা করেছে ও বাড়িয়েছে সমস্ত ধরনের ‘দমনপীড়ন’ অভিযানের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে। এর মধ্যে আছে সবচেয়ে নির্মম সামরিক সামরিক হানা, জন্ম নিয়ন্ত্রণের তত্ত্ব এবং ‘কম প্রাবল্যের আক্রমণ’ বা ‘সামান্য গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রবর্তন’।

সামরিক এবং যান্ত্রিক কলাকৌশলে ভীষণভাবে উন্নত শত্রুর বিরুদ্ধে গণযুদ্ধের জয়ের কথা মনে রেখে মরুযুদ্ধে সাম্রাজ্যবাদের উচ্চ প্রযুক্তিসম্পন্ন যুদ্দাস্ত্রের প্রদর্শনের প্রতি তারা নীতিগতভাবে ঘৃণা ও ধিক্কার তৈরি করতে পেরেছেন। তারা সবসময় স্মরণ করেন কীভাবে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ভিয়েতনাম ও ইন্দোচীনে উন্নত প্রযুক্তির অস্ত্র নিয়ে আগ্রাসন চালিয়েও জনগণের কাছে সম্পূর্ণ পরাজিত হয়। তারা এই দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করে থাকেন যে অস্ত্র নয়, জনগণের শক্তিই ভবিষ্যত র্নিধারণ করবে।

মার্কসবাদী-লেনিনবাদী পার্টিগুলো গণযুদ্ধকে চালিয়ে নিয়ে যেতে পারে এবং সাম্রাজ্যবাদ ও প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি কোনোরকম প্রতিআক্রমণ করে তাকে পরাজিত করতে পারে না। কারণ তার কৃষক জনগণের মধ্যে অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে গণ কর্মসূচি নিয়ে থাকেন, তাদেরকে কৃষিবিপ্লবের পক্ষে সমাবেশিত করেন এবং সমাজতন্ত্রের লক্ষ্য নিয়ে গনতান্ত্রিক বিপ্লবের সাধারণ লাইনে শ্রমিক-কৃষক জোট শক্তিশালী করেন।

বর্তমান বিশ্ব পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সাংঘাতিক সঙ্কটের মধ্যে বেড়ে চলা দমন ও শোষণের মুখে দাঁড়িয়ে শ্রমিকশ্রেণীর বিপ্লবী পার্টির পক্ষে সমস্ত ধরনের বিপ্লবী সংগ্রাম চালানো অবশ্য কর্তব্য। বর্তমান অবস্থায় চলমান গণযুদ্ধগুলোকে আরও তীব্র করা যায় এবং আরও অনেক দেশে গণযুদ্ধ শুরু করা সম্ভব।

তথাকথিত উদীয়মান বাজার ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার পর পূর্ব এশিয়া বিশেষত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতে গণযুদ্ধের উর্বর জমি তৈরি হয়েছে। গত ৩০ বছর ধরে ফিলিপাইন কমিউনিস্ট পার্টি প্রমাণ করেছে যে সেখানে বহুদিন ধরে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ গেড়ে বসে থাকা সত্ত্বেও গণযুদ্ধ চালিয়ে বিপ্লবী শক্তিকে রক্ষা করা ও তার শক্তি বাড়ানো সম্ভব।

ইন্দোনেশিয়ায় বর্তমানে নজিরবিহীন সামাজিক ও রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলায় বিদীর্ণ এবং গণযুদ্ধের পরিস্থিতি সেখানে অত্যন্ত প্রবল। ১০ লক্ষেরও বেশি শহিদের রক্ত সেখানে ন্যায়বিচার ও বিপ্লবের দাবি করছে। ইন্দোনেশিয়া কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে সেখানে সফলভাবে গণযুদ্ধ চালাতে না পারলে সুহার্তো ও তার উত্তরসুরীদের উচ্ছেদ করা যাবে না।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য দেশগুলো যথা কম্বোডিয়া, থাইল্যান্ড, বর্মা এবং মালয়েশিয়ার বস্তুগত পরিস্তিতি গণযুদ্ধ শুরু করবার অনুকূলে রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার ভারতে পূর্বতন সি.পি.এম (এম-এল)(পি.ডব্লু) ও পূর্বতন সি.পি.এম(এম-এল)(পি.ইউ) ই্ দেুটো পার্টি নিয়ে পুর্নগঠিত নতুন কমিউনিস্ট পার্টি সি.পি.আই(এম-এল)(পি,ডব্লু), মাওবাদী কমিউনিস্ট কেন্দ্র (এম.সি.সি)নেপালের কমিউনিস্ট পার্টি (মাওবাদী) এবং অন্যান্য মার্কসবাদী-লেনিনবাদী পার্টিগুলো গণযুদ্ধ চালাচ্ছে। জাতিসত্তার আত্মনিয়ন্ত্রণের জন্য অন্যান্য কিছু সশস্ত্র আন্দোলনও যুদ্ধের রূপ নিয়েছে। ভারতবর্ষের বিপ্লবীরা নকশালবাড়ির রাস্তা ধরেই বিপ্লবকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। ভারতবর্ষে হল গণযুদ্ধ নামক বিখ্যাত নাটকের বিরাট মঞ্চ বিশেষ, যার সাথে চীনের তুলনা করা যেতে পারে।

তুরস্কের মার্কসবাদী-লেনিনবাদী কমিউনিস্ট পার্টি এমন একটা জায়গায় গণযুদ্ধের নেতৃত্ব দিচ্ছে যা বিশ্বের কয়েকটা গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলের সম্মিলন কেদ্র। এখানকার গণযুদ্ধ বলকান, মধ্য এশিয়া ও আরব দুনিয়ার ক্ষেত্রে একটা বিশেষ ভূমিকা পালন করছে। এই অঞ্চলে সশস্ত্র বিপ্লবী সংগ্রাম পরিচালিত হচ্ছে জাতীয় আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবিতে (বিশেষত কুর্দিস্থান ওয়ার্কস পার্টি পরিচালিত সংগ্রাম) এবং তা পরিচালিত হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদ ও আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়াশীলদের শোষন ও তাদের ভ্রাতৃঘাতী দাঙ্গা বাধানোর চক্রান্তের বিরুদ্ধে। তুরষ্কের গণযুদ্ধ সমাজতান্ত্রিক পরিপ্রেক্ষিত নিয়ে নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের লাইন অনুসরণ করে চলেছে।

দক্ষিণ আমেরিকাতে পেরুর কমিউনিস্ট পার্টি সেখানকার ফোকো তত্ত্ব, শহরে অভ্যূত্থানের পাতিবুর্জোয়া চিন্তা ও কৃষক জনগণের বৈপ্লবিক ভূমিকা ও তার অস্তিত্বকে খাটো করে দেখানোর প্রভাবে মধ্যেই গণযুদ্ধ চালিয়ে যাবার উল্লেখযোগ্য উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। সেখানে আরও অনেক পার্টি আছে যারা গণযুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে, যেমন ব্রাজিল।

এছাড়াও, সেখানে আরও কিছু সশস্ত্র সংগ্রামের অস্তিত্ব রয়েছে, যেমন কলম্বিয়া, মেকসিকো। সেখানে তারা গ্রামাঞ্চলকে কেন্দ্র করেই তাদের কাজকর্ম চালাচ্ছেন, কিন্তু তারা নিজেদের মাওবাদী হিসাবে বিবেচনা করেন না, যদিও তাদের কিছু কর্মী মাও-এর লেখাপত্র অধ্যয়ন করছেন। কিছু কিছু দেশে কয়েকটা পাটি শ্রমিকশ্রেণীসহ জনগণের বাকি অংশের জঙ্গি আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছে এবং শ্রমিক অভ্যুত্থানের সাথে কৃষক অভ্যুত্থানকে মেলানোর চেষ্টা করছে।

আফ্রিকাতে সাম্রাজ্যবাদ ও আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়াশীলদের চক্রান্তে বাধানো ভ্রাতৃঘাতী লড়াই অহরহ ঘটছে। এই ঘটনা উত্তর আফ্রিকা যেমন আলজিরিয়া, মধ্য ও দক্ষিণ আফ্রিকার ক্ষেত্রেও সত্য। নয়া গণতান্ত্রিক বা সমাজতান্ত্রিক বলে নিজেদের যে রাজত্বগুলো ঘোষণা করেছিল সেগুলোরও অধঃপতন ঘটেছে। কঙ্গোতে দীর্ঘস্থায়ি মোবুতু রাজত্বের বিরুদ্ধে বর্তমানে স্বেচ্ছাচারবিরোধী সশস্ত্র আন্দোলন চলছে। কিন্তু সমগ্র আফ্রিকা জুড়ে গণযুদ্ধের মধ্য দিয়ে নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ভীষণ প্রয়োজন রয়েছে।

রাশিয়া ও পূর্বতন সোভিয়েতের অর্ন্তভুক্ত দেশগুলোতে শিল্প প্রতিষ্টানগুলো ধ্বংস হয়ে যাবার ফলে দ্রুত অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধঃপতন ঘটেছে। সেখানে শ্রমিকশ্রেণীর অভ্যুত্থানের সাথে আরও একবার গণযুদ্ধ ফেটে পড়বার জমি দ্রুত তৈরি হচ্ছে। বাস্তবিক একানকার পশ্চাৎ প্রদেশগুলো যথা ককেশাশ অঞ্চল ও মধ্য এশিয়া অঞ্চলে বিরাটাকারে সশস্ত্র অভ্যুত্থান ঘটছে। কিন্তু সেগুলো এখনও প্রতিক্রিয়াশীলদের মধ্যেকার দ্বন্দ্বের মধ্যেই আবদ্ধ রয়েছে যেমন, বৃহৎ রুশ জাতি দাম্ভিকতা ও আঞ্চলিক জাতীয়তাবাদের দ্বন্দ্ব।

মার্কসাবদী-লেনিনবাদী পার্টিগুলোকে জেগে উঠতে হবে এবং সেইসব অঞ্চলে নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব ও তারপরে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সফল করতে গণযুদ্ধ চালাতে হবে, যেখানে বড়ো মুৎসুদ্দি বুর্জোয়া ও জমিদারশ্রেণী আর পুরোনো কায়দায় শাসন করতে পারছে না এবং জনগণ সশস্ত্র বিপ্লব দাবি করছেন এবং যেখানে স্বেচ্ছাচারী শাসন ও জাতীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধের প্রয়োজন রয়েছে।

গণযুদ্ধের আহ্বান ও আন্তর্জাতিক সমর্থন
আমরা যারা এখন গণযুদ্ধের পথে এগিয়ে চলেছি সেই মার্কসবাদী-লেনিনবাদী-মাওবাদী পার্টিগুলো নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের কর্তব্য সমাধা করতে ও সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের দিকে এগিয়ে যেতে, বিপ্লবী সংগ্রামকে রক্ষা করে তাকে আরও উন্নত স্তরে নিয়ে যেতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

যেসব দেশে গণযুদ্ধ শুরু করা সম্ভব ও প্রয়োজন, সেইসব দেশের সমস্ত বিপ্লবী পার্টি ও নিপীড়িত জনগণকে আমরা গণযুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে ও সত্ত্বর তা শুরু করতে আহ্বান জানাচ্ছি।

আমরা সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতা ও গণতান্ত্রিক ঐক্যের সাধারণ ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে জনগণের অন্যান্য সমস্ত সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনগুলোকে বিপ্লবী সংগ্রামের উচ্চতর স্তরে নিয়ে যেতে ও গণযুদ্ধে নেতৃত্বদায়ী সমস্ত মার্কসবাদী-লেনিনবাদী পার্টিগুলোর সাথে ঐক্যবদ্ধ হবার আহ্বান রাখছি।

আমরা সমস্ত দেশের বিপ্লবী পার্টি, গণ সংগঠন ও জনগণের অন্যান্য সংগঠনকে বিপ্লবী সংগ্রামের সমস্ত সম্ভাব্য ও প্রয়োজনীয় রূপ গ্রহণ করে এগিয়ে যেতে এবং জাতীয় মুক্তি, জনগণতন্ত্র এবং সমাজতন্ত্রের জন্য সশস্ত্র বিপ্লবী সংগ্রামগুলোকে সমর্থন করতে আহ্বান জানাচ্ছি।

সাধ্য অনুযায়ী যেখানেই জাতীয় মুক্তি, জনগণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের জন্য গণযুদ্ধ চলছে তাকে সমর্থণ করা বা গড়ে তোলার ব্যাপারে পোষণ করা ও সাথে সাথে এই কাজে নিজেদের প্রতিশ্রুতি পালন করার চিহ্ন স্বরূপ আমরা সমস্ত পাটিকে এই ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর দেবার আহ্বান রাখছি।

স্বাক্ষরকারী সংগঠন
যে পার্টিগুলো গণযুদ্ধ চালাচ্ছে
কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া (মার্কসিস্ট-লেনিনস্ট)(পিপলস ওয়ার)
মাওয়িস্ট কমিউনিস্ট সেন্টার
কমিউনিস্ট পার্টি অব ফিলিপাইনস
কমিউনিস্ট পার্টি অব তুর্কী/মার্কসিস্ট-লেনিনস্ট

গণযুদ্ধ সমর্থনকারী পার্টি
মার্কসিস্ট লেনিনিস্ট অর্গানাইজেশন অব আফগানিস্থান
কমিউনিস্ট পার্টি অব ব্রাজিল (মার্কসিস্ট-লেনিনিস্ট)
কমিউনিস্ট পার্টি অব ক্যাটালেনিয় (মার্কসিস্ট-লেনিনিস্ট)
কমিউনিস্ট পার্টি অব গ্রীস (মার্কসিস্ট-লেনিনিস্ট)
ওয়ার্কর্স কমিউনিস্ট পার্টি অব নরওয়ে
এল দিয়োরো ইন্টারন্যাশনাল
ওয়ার্কার্স এন্ড পেসান্টস রাশিয়ান পার্টি
ওয়ার্কার্স পার্টি অব নিউজিল্যান্ড

উদ্ধার
শামসুর রাহমান

কখনো বারান্দা থেকে চমৎকার ডাগর গোলাপ
দেখে, কখনো-বা
ছায়ার প্রলেপ দেখে চৈত্রের দুপুরে
কিংবা দারুমূর্তি দেখে সিদ্ধার্থের শেলফ-এর ওপর
মনে করতাম,
যুদ্ধের বিপক্ষে আমি, আজীবন বড়ো শান্তিপ্রিয়।

যখন আমার ছোট্ট মেয়ে
এক কোণে বসে
পুতুলকে সাজায় যতনে, হেসে ওঠে
ভালুকের নাচ দেখে, চালায় মোটর, রেলগাড়ি
ঘরময়, ভাবি,
যুদ্ধের বিপক্ষে আমি, আজীবন বড়ো শান্তিপ্রিয়।

যখন গৃহিনী সংসারের কাজ সেরে
অন্য সাজে রাত্রিবেলা পাশে এসে এলিয়ে পড়েন,
অতীতেকে উস্কে দেন কেমন মাধুর্যে
অরব বচনাতীত, ভাবি-
যুদ্ধের বিপক্ষে আমি, আজীবন বড়ো শান্তিপ্রিয়।

আজন্ম যুদ্ধকে করি ঘৃণা।
অস্ত্রের ঝনঝনা
ধমনীর রক্তের ধারায়
ধরায়নি নেশা কোনোদিন।
যদিও ছিলেন পিতা সুদক্ষ শিকারী
নদীর কিনারে আর হাঁসময় বিলে,
মারিনি কখনো পাখি একটিও বাগিয়ে বন্দুক
নৌকোর গলুই থেকে অথবা দাঁড়িয়ে

একগলা জলে। বাস্তবিক
কস্মিনকালেও আমি ছুইনি কার্তুজ।
গান্ধীবাদী নই, তবু হিংসাকে ডরাই
চিরদিন; বাধলে লড়াই কোনোখানে
বিষাদে নিমগ্ন হই। আজন্ম যুদ্ধকে করি ঘৃণা।
মারী আর মন্বন্তর লোকশ্রুত ঘোড়সওয়ারের
মতোই যু্দ্ধের অনুগামী। আবালবৃদ্ধবনিতা
মৃত্যুর কন্দরে পড়ে গড়িয়ে গড়িয়ে
অবিরাম। মূল্যবোধ নামক বৃক্ষের
প্রাচীন শিকড় যার ছিঁড়ে, ধ্বংস
চর্তুদিকে বাজায় দুন্দুভি।
আজন্ম যুদ্ধকে করি ঘৃণা।

বিষয়ম দখলীকৃত এ ছিন্ন শহরে
পুত্রহীন বৃদ্ধ ভদ্রলোকটিকে জিজ্ঞেস করুন,
সৈনিক ধর্ষিতা তরুণীকে
জিজ্ঞেস করুন,
যন্ত্রণাজর্জর ঐ বাণীহীন বিমর্ষ কবিকে
জিজ্ঞেস করুন,
বাঙালী শবের স্তুপ দেখে দেখে যিনি
বিড়বিড় করছেন সারাক্ষণ, কখনো হাসিতে
কখনো কান্নায় পড়ছেণ ভেঙে- তাকে
জিজ্ঞেস করুন,
দগ্ধ, স্তব্ধ পাড়ার নিঃসঙ্গ যে ছেলেটা
বুলেটের ঝড়ে
জননীকে হারিয়ে সম্প্রতি খাপছাড়া
ঘোরে ইতস্তত, তাকে জিজ্ঞেস করুন,
হায়; শান্তিপ্রিয় ভদ্রজন,
এখন বলবে তারা সমস্বরে; যুদ্ধই উদ্ধার।

(সমাপ্ত)
আগের দুই পর্ব
১. মাও ও গণযুদ্ধ | আন্তর্জাতিক দলিল | পর্ব এক
২. মাও ও গণযুদ্ধ | আন্তর্জাতিক দলিল | পর্ব দুই

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “মাও ও গণযুদ্ধ | আন্তর্জাতিক দলিল | শেষ পর্ব

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

2 + 6 =