সমাজ বিকাশের নিয়ম

সমাজ বিকাশের একটা নিয়ম আছে। সেই নিয়মটি আবিষ্কার করেছেন কার্ল মার্কস ও ফ্রেডারিক এঙ্গেলস। সমাজ বিকাশের এই সূত্রগুলি তুলে ধরে ও ব্যাখ্যা করে যে মতবাদ তাকে বলা হয় ঐতিহাসিক বস্তুবাদ।

ঐতিহাসিক বস্তুবাদের মূল কথা
১। কোন সমাজের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা, রাজনীতি, আইন-কানুন, সামাজিক রীতিনীতি ইত্যাদিকে বলা হয় উপরিকাঠামো। আর সেই সমাজের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে বলা হয় ভিত্তি। ভিত্তির সঙ্গে সামঞ্জস্য বিধান করেই গড়ে ওঠে উপরিকাঠামো। তাই সমাজকে চিহ্নিত করতে হবে তার অর্থনৈতিক ব্যবস্থা কি তাই দেখে। অর্থনৈতিক ব্যবস্থা পরিবর্তন হলেই সমাজের অন্যান্য দিক অর্থাৎ উপরিকাঠামো পরিবর্তিত হবে। অর্থাৎ সমাজটাই পাল্টে যাবে।

২। অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বলতে প্রধানতঃ উৎপাদন ব্যবস্থাকে বুঝায়। উৎপাদন ব্যবস্থা পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই সমাজ পরিবর্তিত হয়ে চলেছে। সমাজ কোন অনড় বস্তু নয়। তা ক্রম পরিবর্তনশীল। উৎপাদন ব্যবস্থায় পরিবর্তনই সমাজ বিকাশের মূল কারণ।

৩। উৎপাদন ব্যবস্থার মধ্যে দুটি দিক রয়েছে- (ক) উৎপাদিকা শক্তি ও (খ) উৎপাদন সম্পর্ক। উৎপাদন করতে দুটি জিনিস লাগে- প্রকৃতি ও মানুষের শ্রম। মানুষ প্রকৃতির উপর শ্রম প্রয়োগ করে উৎপাদন করে। একমাত্র মানুষই উৎপাদন করে, অন্য কোন প্রাণী করে না। এইজন্য একমাত্র মানুষেরই সমাজ আছে। উৎপাদন করতে গিয়ে দুই রকম সম্পর্ক সৃষ্টি হয়- প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক এবং মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের বিষয় থেকে আসছে উৎপাদিকা শক্তির বিষয়টি। আর উৎপাদন করতে গিয়ে মানুষের সঙ্গে মানুষের যে সম্পর্ক তৈরী হয়, তার থেকে আসছে উৎপাদন সম্পর্কের বিষয়টি। উৎপাদনের যন্ত্র, উৎপাদনের কলাকৌশল এবং অভিজ্ঞতা ইত্যাদিকে বলা হয় উৎপাদিকা শক্তি। লাঙ্গল দিয়ে চাষ হয়, না ট্রাক্টরের সাহায্যে চাষ হয়, কি কায়দায় চাষ হয় অথবা কাপড় উৎপাদনের জন্য প্রাচীন আমলের তাঁত ব্যবহার হয়, না আধুনিক মেশিন বা যন্ত্রপাতি ব্যবহার হয়, ইত্যাদি বিষয় উৎপাদিকা শক্তির অন্তর্ভূক্ত।

মানুষ একাকী উৎপাদন করে না। সর্বকালে সর্ব অবস্থায় উৎপাদন বলতে সামাজিক উৎপাদন বুঝায়। উৎপাদন করতে মানুষের পরস্পরের মধ্যে যে সম্পর্ক তৈরী হয় তাকে বলা হয় উৎপাদন সম্পর্ক। এর দ্বারা বোঝায় কারা প্রকৃত উৎপাদনের জন্য কতখানি শ্রম প্রয়োগ করে, কারা উৎপাদন যন্ত্রের মালিক, কারা উৎপাদিত দ্রব্যের কত অংশ ভোগ করে ইত্যাদি।

৪। সমাজ বিকাশের নিয়ম হচ্ছে এই যে, উৎপাদিকা শক্তি ক্রমাগত বেড়ে চলেছে। মানুষের প্রচেষ্টার ফলেই বিজ্ঞানের, যন্ত্রপাতির ও কলাকৌশলের উন্নতি সাধন হচ্ছে। কিন্তু মানুষ এর সুদূরপ্রসারী সামাজিক প্রভাব কি, সে সম্পর্কে কোন প্রকার সচেতন না হয়েই এই কাজ করে চলে। এর ফলে একটা অবস্থায় দেখা যায় যে, উৎপাদিকা শক্তি এমনভাবে বেড়ে গেছে যে, তাকে পুরোপুরি ও ভালভাবে কাজে লাগাতে হলে উৎপাদন সম্পর্কের পরিবর্তন দরকার। এই অবস্থায় সমাজের কোন কোন শ্রেণী উৎপাদন সম্পর্ক পরিবর্তনের জন্য তৎপর হয়ে ওঠে। তাদেরকে বলা হয় প্রগতিশীল শ্রেণী। কিন্তু ঐ অবস্থাতেও কোন কোন শ্রেণী পুরাতন উৎপাদন সম্পর্ক আঁকড়ে থাকতে চায়। সামগ্রিক উৎপাদন তিগ্রস্ত হলেও, তাদের ব্যক্তিগত লাভ বেশী থাকে যদি পুরাতন উৎপাদন সম্পর্ক বহাল থাকে। এই শ্রেণী বা শ্রেণীগুলো হচ্ছে প্রতিক্রিয়াশীল শ্রেণী। ইতিহাসের নিয়ম হচ্ছে এইরকম অবস্থায় প্রগতিশীল শ্রেণী প্রতিক্রিয়াশীলকে বিপ্লবের মাধ্যমে পরাজিত করে নতুন উৎপাদিকা শক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নতুন উৎপাদন সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করে। এইভাবে সমাজের ভিত্তি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা পরিবর্তিত হয় এবং পরে উপরিকাঠামোও পরিবর্তিত হয়। গড়ে ওঠে নতুন সমাজ ব্যবস্থা। সমাজ বিকাশের এটাই নিয়ম।

৫। একটি সমাজের মধ্যেই পরবর্তী সমাজের অংকুর সৃষ্টি হয়। পুরাতন সমাজের মধ্যেই প্রথমে পরিবর্তন হয় উৎপাদিকা শক্তির। তারপর একটা স্তরে উৎপাদিকা শক্তির সঙ্গে উৎপাদন সম্পর্কের দ্বন্দ্ব খুবই প্রকট হয়ে ওঠে। অর্থাৎ তখন উৎপাদন সম্পর্কের পরিবর্তন অপরিহার্য হয়ে ওঠে। এই অবস্থাকে বলে বস্তুগত বিপ্লবী অবস্থা অর্থাৎ বিপ্লবের মাধ্যমে নতুন উৎপাদন সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা তীব্রভাবে অনুভূত হয়। উৎপাদিকা শক্তির সঙ্গে উৎপাদন সম্পর্কের দ্বন্দ্বই সমাজ বিকাশের মূল কারন।

৬। উৎপাদন সম্পর্ক পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা যতই অনুভূত হোক না কেন, তা আপনি পরিবর্তিত হয় না। প্রগতিশীল শ্রেণীগুলি প্রতিক্রিয়াশীল শ্রেণীগুলিকে রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে বিতাড়িত করে নিজেরা রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে নতুন উৎপাদন সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত করে এবং সঙ্গে সঙ্গে নতুন আর্থ ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য বিধান করে তৈরী করে নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থা, সংস্কৃতি, সামাজিক রীতিনীতি ইত্যাদি অর্থাৎ উপরিকাঠামো। তার মানে, সমাজের আসল পরিবর্তন আসে শ্রেণী সংগ্রামের মাধ্যমে যার চূড়ান্ত রূপ হল বিপ্লব। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে উৎপাদিকা শক্তির সঙ্গে উৎপাদন সম্পর্কের দ্বন্দ্বের প্রতিফলন ঘটে রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনে শ্রেণী সংগ্রামের ভেতর দিয়ে।

সমাজ বিকাশের ইতিহাস
ঐতিহাসিক বস্তুবাদ সমাজের ইতিহাসকে নতুনভাবে এবং বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে দেখতে শিখিয়েছে। সমাজের উৎপাদন ব্যবস্থা কি রকম, সেই ভিত্তিতে মানব সমাজের ইতিহাসকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়- (১) আদিম সাম্যবাদী যুগ, (২) দাস যুগ, (৩) সামন্ত যুগ, (৪) পুঁজিবাদী যুগ, (৫) সমাজতান্ত্রিক যুগ, (৬) সাম্যবাদী যুগ (ভবিষ্যতে আসবে)।

আদিম সাম্যবাদ
আদিম সাম্যবাদী যুগে উৎপাদন ছিল অতি অনুন্নত। পশু শিকার ও বন থেকে ফলমূল সংগ্রহ। উৎপাদিকা শক্তি অতি অনুন্নত, পাথরের হাতিয়ার ইত্যাদি। উৎপাদন সম্পর্ক এইরূপ, সকল সম পুরুষ একত্রে পশু শিকার করত, মেয়েরা ঘরে কাজ করত এবং সকলে একত্রে সমানভাবে শিকার ভাগ করে খেত। এই অবস্থায় সঞ্চয় সম্ভব ছিল না। ব্যক্তিগত সম্পত্তি ছিল না। শ্রেণী ও রাষ্ট্র ছিল না। নারী ও পুরুষের সমান মর্যাদা ছিল। সেদিন উৎপাদনের ঐ স্তরে, উৎপাদিকা শক্তির বিকাশের ঐ স্তরে এই ধরণের উৎপাদন সম্পর্কই স্বাভাবিক ও সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল।

দাস সমাজ
কালক্রমে মানুষ অধিকতর উন্নত উৎপাদন করতে শিখল। কিছু কৃষি কাজ ও পশু পালন করতে শিখল। অর্থাৎ উৎপাদিকা শক্তির বিকাশ ঘটল। এই অবস্থায় এল নতুন উৎপাদিকা শক্তি সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নতুন উৎপাদন সম্পর্ক। এই উৎপাদন সম্পর্ক হচ্ছে এইরূপ, মুষ্টিমেয় দাস মালিকরা সকল উৎপাদন যন্ত্র ও উৎপাদিত দ্রব্যের মালিক। কিন্তু তারা শ্রম প্রয়োগ করে না। প্রকৃত উৎপাদন করে দাসেরা। আদিম সাম্যবাদী যুগেও গোষ্ঠীতে গোষ্ঠীতে যুদ্ধ হত, কিন্তু যুদ্ধবন্দীদের মুক্তি দেয়া হত অথবা মেরে ফেলা হত অথবা নিজেদের গোষ্ঠীর অন্তর্ভূক্ত করে নেয়া হত। তখন দাস করার কোন প্রয়োজন বা অবস্থাও ছিল না। পরবর্তী যুগে অধিকতর উৎপাদিকা শক্তির বিকাশের স্তরেই এই দাস ব্যবস্থা এসেছে।

এই দাস যুগের শুরুতে সমাজে কয়েকটি নতুন উপাদান দেখা দিল ব্যক্তিগত সম্পত্তি, শ্রেণী, শোষণ, শ্রেণী সংগ্রাম ও রাষ্ট্র। নারীও এই সময় পুরুষের পদানত হল। উন্নততর উৎপাদিকা শক্তির যুগে ও অধিকতর উৎপাদনের যুগে সঞ্চয় সম্ভব হল। তাই এল ব্যক্তিগত সম্পত্তি এবং সঙ্গে সঙ্গে উত্তরাধিকার প্রথা। একই সঙ্গে দেখা দিল শ্রেণী বিভাগ, দাস মালিক ও দাস। আদিম সাম্যবাদী যুগেও পুরুষ নারীর চেয়ে বলশালী ছিল। কিন্তু পুরুষ নারীর উপর কর্তৃত্ব করত না। বরং গৃহকার্যে বয়োজ্যেষ্ঠ মহিলার নেতৃত্ব স্বেচ্ছায় মেনে নিত। শ্রেণী বৈষম্যের যুগে উত্তরাধিকার নিশ্চিত করার প্রয়োজনে নারীর উপর নানারকম বিধি-নিষেধ ও নিয়ন্ত্রণ দেখা দিল। নারী পুরুষের পদানত হল।

দাসযুগে সম্পত্তির পরিমাণ ও সামাজিক প্রতিপত্তি নির্ধারিত হতো দাসের সংখ্যা দ্বারা। দাসরা নিশ্চয়ই স্বেচ্ছায় শোষণ মেনে নিতে রাজী হয় নি। শ্রেণী শোষণ যেখানে থাকবে, শ্রেণী সংগ্রামও সেখানে থাকবে। শোষিত শ্রেণীকে দমন করে রাখার জন্য, শোষক শ্রেণী বিভিন্ন ব্যবস্থার প্রবর্তন করে, তার মধ্যে আছে সেনাবাহিনী, প্রশাসন ব্যবস্থা, কয়েদখানা, বিচার ব্যবস্থা ইত্যাদি। এগুলি মিলেই হচ্ছে রাষ্ট্র।

সামন্ত সমাজ
পরবর্তীকালে কালক্রমে উৎপাদিকা শক্তির আরও উন্নতি ঘটল। বিশেষ করে কৃষি উৎপাদনের জন্য উন্নততর যন্ত্র ও কৌশল মানুষ আবিষ্কার ও আয়ত্ত করে। এই উন্নততর উৎপাদিকা শক্তির সঙ্গে দাস উৎপাদন সম্পর্ক সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কারণ, কিছুটা স্বাধীনতা ও অধিকার না দিলে ক্রীতদাস দিয়ে এই উন্নততর উৎপাদিকা শক্তিকে কাজে লাগানো যায় না। এই অবস্থায় দাস প্রথার বিলোপের পক্ষে এসে দাঁড়ালো একদিকে দাসরা ও অপরদিকে স্বাধীন কিছু নাগরিক। এরা প্রগতিশীল শ্রেণী। কিন্তু দাসের মালিকরা সমাজের সামগ্রিক উৎপাদন ও উন্নতির কথা না ভেবে দাস প্রথা টিকিয়ে রাখার পপাতি ছিল। এরা প্রতিক্রিয়াশীল শ্রেণী। তবে দাস ব্যবস্থা অসংখ্য দাস বিদ্রোহের দ্বারা ভেতর থেকে দুর্বল হয়ে গিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন দেশে বিপ্লবের মাধ্যমে দাস প্রথা উঠে যায় এবং আরম্ভ হয় সামন্ত ব্যবস্থার যুগ।

পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় সামন্ত ব্যবস্থা বিভিন্নরূপ নিয়েছে। আবার সামন্ত ব্যবস্থাও কালক্রমে বহু পরিবর্তিত হয়েছে। তবু মোটামুটি এখানে উৎপাদন সম্পর্কটি হচ্ছে এই রকম, উৎপাদনের প্রধান উপাদান জমি ভুস্বামী বা সামন্ত প্রভুর দখলে। প্রকৃত উৎপাদন করে কৃষক বা ভূমিদাস। কৃষক শ্রম প্রয়োগ করে ও উৎপাদনের অন্যান্য উপকরণ জোগাড় করে উৎপাদন করে। কৃষক উৎপাদিত ফসলের মালিক, কিন্তু উৎপাদিত ফসলের বিশেষ অংশ অথবা নির্দিষ্ট অংকের অর্থ খাজনা হিসাবে জমির মালিককে দিতে বাধ্য। ভূমিদাস ব্যবস্থায় ভূস্বামী ভূমিদাসের জীবন ধারণের জন্য সামান্য কিছু জমি দিয়ে দিত, কিন্তু ভূমিদাসকে বেশীর ভাগ সময় ভূস্বামীর জমিতে বেগার খাটতে হত। ভূমিদাসরা জমি ছেড়ে অন্য কোথাও যেতে পারত না। ভূমিদাসরা দাসদের চেয়ে কিছুটা উন্নত ও স্বাধীন। ভূমিদাস প্রথার মূল কথা বেগার শ্রম। আর অন্য ধরনের জমিদারী প্রথার মূল কথা খাজনা। সামন্ত সমাজে সম্পত্তির পরিমাণ ও সামাজিক প্রতিপত্তি নির্ধারিত হয় জমির পরিমাণ দ্বারা।

পুঁজিবাদী সমাজ
সামন্ত সমাজের গর্ভেই উৎপাদিকা শক্তির আরও বিকাশ ঘটে। যান্ত্রিক শিল্পের উদ্‌ভব হয়। বহু বিস্তৃত পণ্যের বাজার সৃষ্টি হয়। সৃষ্টি ব্যবসায়ী শ্রেণীর যাদের বলা হয় বুর্জোয়া। সামন্ত ব্যবস্থা থাকলে বিভিন্ন কারণে এই উন্নততর উৎপাদিকা শক্তিকে কাজে লাগানো সম্ভব হচ্ছিল না। বুর্জোয়া শ্রেণী সামন্ত উৎপাদন সম্পর্ক খতম করার জন্য উদ্যোগী হয়ে ওঠে। এ ছাড়া ভূমিদাস ও কৃষকরাও ইতিপূর্বে সামন্তদের শোষণের বিরুদ্ধে বহুবার বিদ্রোহ করে আসছিল। বুর্জোয়ারা কয়েকটি কারণে সামন্ত ব্যবস্থাকে আধুনিক যন্ত্রশিল্পভিত্তিক পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বিকাশের পথে বাধা হিসাবে দেখছিল।

কারণগুলি হচ্ছেঃ ১• সামন্ত ব্যবস্থায় বেশীর ভাগ মানুষ কৃষক ও ভূমিদাসের ক্রয় ক্ষমতা এত নিচে থাকে যে, পণ্যের বাজার বিস্তৃত হতে পারে না। আর আধুনিক যন্ত্র শিল্প যে লক্ষ লক্ষ পণ্য তৈরী করে তার ক্রেতা তো সাধারণ মানুষই হবে, মুষ্টিমেয় ভূস্বামী নয়। ২• সামন্ত শ্রেণী কর্তৃক ধার্য কর ও অন্যান্য বাধা-নিষেধ বুর্জোয়ার বিকাশের পক্ষে বাধা। ৩• ভূমিদাস প্রথা থাকলে কারখানার জন্য ‘স্বাধীন শ্রমিক’ পাওয়া যায় না। বুর্জোয়া শ্রেণীর নেতৃত্বে কৃষক, ভূমিদাস ও অন্যান্য গরীব শ্রেণীগুলি সামন্ত প্রভুদের বিরুদ্ধে বিপ্লবে এগিয়ে আসে। এটাই বুর্জোয়া বিপ্লব। অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীতে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে সামন্ত সমাজের অবসান ঘটেছে, গড়ে উঠেছে পুঁজিবাদী সমাজ।

পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় উৎপাদন সম্পর্ক এইরকম- পুঁজিপতি অর্থ হাতে নিয়ে কারখানা প্রতিষ্ঠা করে, কাঁচামাল জোগাড় করে, তারপর শ্রমিক নিয়োগ করে উৎপাদন করায়। উৎপাদিত দ্রব্য পুঁজিপতি বাজারে বিক্রি করে মুনাফা উঠিয়ে নিয়ে আসে। ‘স্বাধীন শ্রমিক’ নির্দিষ্ট বেতনে চাকুরি করে, অর্থাৎ নির্দিষ্ট সময়ের জন্য শ্রমিক তার শ্রম শক্তি বিক্রি করে। প্রকৃত উৎপাদন করে শ্রমিক, কিন্তু উৎপাদনের পরিকল্পনা বা পরিচালনা করার দায়িত্ব তার নয়, পুঁজিপতির। উৎপাদিত দ্রব্যের মালিকও পুঁজিপতি। পুঁজিপতি বাজারে উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করে মুনাফা তুলে আনে। আসলে মুনাফা সৃষ্টি হয় উৎপাদনের প্রক্রিয়ার মধ্যেই অর্থাৎ শ্রমিককে শোষণ করেই। শ্রমিক যে শ্রম প্রয়োগ করে, তার পুরো মূল্য সে পায় না। পুঁজিপতি শ্রমিকের শ্রম শক্তি ক্রয় করে, কিন্তু প্রদত্ত শ্রমের পুরো মূল্য সে শ্রমিককে দেয় না। পুঁজিপতি শ্রমিকের শ্রম শক্তি ক্রয় করে সস্তায়। এইখানেই সে ঠকায় শ্রমিককে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় শোষণের মূল কথা হল এটাই।

এখানে একজন পুঁজিপতির সঙ্গে সামন্ত প্রভুর পার্থক্য লণীয়। পুঁজিপতি ও সামন্ত প্রভু উভয়ই শোষক এবং কেউই প্রকৃত উৎপাদন করে না। তবে পুঁজিপতি উৎপাদন পরিচালনা করে এবং উৎপাদিত পণ্য বাজারে বিক্রি করে তাকে মুনাফা তুলে আনতে হয়। সামন্ত প্রভু উৎপাদনের ব্যাপারে কোন দায়িত্বই নেয় না। কৃষককেই উৎপাদনের সকল দায়িত্ব নিতে হয় (ভূমিদাসের ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন)। জমিদার কেবল উৎপাদিত ফসলের উপর তার ভাগ বসায়। পুঁজিবাদী সমাজে সম্পত্তির পরিমাণ ও সামাজিক প্রতিপত্তি নির্ধারিত হয় টাকার অংকের দ্বারা।

সমাজতান্ত্রিক সমাজ
পুঁজিবাদ তার প্রথম যুগে উৎপাদনকে ও উৎপাদিকা শক্তিকে বিপুল পরিমাণে বাড়িয়ে তোলে। কিন্তু একটা পর্যায়ে দেখা গেল পুঁজিবাদী উৎপাদন সম্পর্ক উৎপাদনকে আর বাড়াতে পারছে না, উৎপাদিকা শক্তিকেও আর কাজে লাগাতে পারছে না, উৎপাদিকা শক্তির বিকাশের সম্ভাবনাকেও রুদ্ধ করে দিচ্ছে।

পুঁজিবাদী ব্যবস্থার উন্নততর স্তরে অতি উৎপাদনের সংকট দেখা যায়। এবং কয়েক বছর পর পরই এই সংকট দেখা যায়। ‘অতি উৎপাদন’ আসলে সঠিক নয়। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় বিভিন্ন পুঁজিপতিরা মুনাফা তাগিদে নিজ নিজ হিসাব অনুযায়ী উৎপাদন করায়। সমাজের প্রকৃত প্রয়োজন অনুযায়ী পরিকল্পনা মাফিক কোন উৎপাদন হয় না। ফলে মাঝে মাঝে দেখা যায়, উৎপাদিত পণ্যের বাজার নেই। চাহিদা নিশ্চয়ই আছে, নেই ক্রেতা সাধারণের ক্রয় ক্ষমতা। এই অবস্থায় পণ্য অবিক্রিত অবস্থায় থাকে, পুঁজিপতিরা ভবিষ্যতে বাজার উঠবে এই আশায় তাদের মাল নষ্ট করে ফেলে, কল-কারখানাও বন্ধ করে দেয়। এটা সমাজের সম্পদের অপচয়। এতে এটা প্রমাণ করে যে, উৎপাদিকা শক্তিকে পুঁজিবাদী উপাদন সম্পর্ক আর কাজে লাগাতে পারছে না। কেন? কারণ, এই উৎপাদন সম্পর্কের মধ্যে রয়েছে যে বিষয়টি তা হল, উৎপাদন যন্ত্রের মালিক ব্যক্তি বিশেষ যার উদ্দেশ্য কেবলমাত্র মুনাফা, সমাজের চাহিদা পূরণ নয়। এই অবস্থায় উৎপাদন যন্ত্রের উপর ব্যক্তি মালিকানার বদলে সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হলে সামাজিক সম্পদ ও শক্তির এই অপচয় হত না, উৎপাদিকা শক্তিকেও মানুষের প্রয়োজন অনুযায়ী পুরোপুরি কাজে লাগানো যেত। তাহলে পুঁজিবাদের একটা স্তরে উৎপাদিকা শক্তির সঙ্গে উৎপাদন সম্পর্কের দ্বন্দ্ব ল্য করা যাচ্ছে। এখন পুঁজিবাদী উৎপাদন সম্পর্কের (অর্থাৎ ব্যক্তি মালিকানার) বদলে সমাজতান্ত্রিক উৎপাদন সম্পর্কের ( অর্থাৎ সমাজতান্ত্রিক মালিকানার) প্রয়োজন অনুভূত হচ্ছে। নতুন উৎপাদন সম্পর্ক অর্থাৎ উৎপাদন যন্ত্রের উপর সামাজিক মালিকানা ভিত্তিক উৎপাদন সম্পর্কই (এটাই সমাজতান্ত্রিক উৎপাদন সম্পর্ক) হচ্ছে অধিকতর উন্নত উৎপাদিকা শক্তির সঙ্গে সবচেয়ে সঙ্গতিপূর্ণ।

পুঁজিবাদী উৎপাদনের একটা স্তরে বেশীর ভাগ শিল্প, পুঁজি ও ব্যবসা মাত্র কয়েকজন পুঁজিপতির হাতে চলে আসে। এটাকে বলে একচেটিয়াত্ব। এই অবস্থা পুঁজিপতিদের জন্য নিজেদের মধ্যে আগের মতো অবাধ প্রতিযোগিতা থাকে না। ফলে অধিকতর উৎপাদন, উন্নততর উৎপাদন এবং তারই প্রয়োজনে টেকনোলজির বিকাশ ও বিজ্ঞানের প্রসারের জন্য পুঁজিপতিদের এক সময় যে আগ্রহ ছিল, এখন আর সে তাগিদ থাকছে না। কারণ তাদের ল্য কেবলমাত্র সর্বোচ্চ মুনাফা আদায়, অন্য কিছু নয়। ফলে এই অবস্থায় পুঁজিবাদ উৎপাদিকা শক্তির বিকাশের জন্য আগ্রহী তো থাকেই না, বরং অনেক ক্ষেত্রেই তা বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে ব্যক্তি মালিকানার বদলে সামাজিক মালিকানা ভিত্তিক নতুন উৎপাদন সম্পর্কই উৎপাদিকা শক্তির বিকাশের পক্ষে সহায়ক হবে।

কিন্তু পুঁজিপতিশ্রেণী নিশ্চয়ই নিজেদের স্বার্থ ত্যাগ করে নতুন উৎপাদন সম্পর্কের পক্ষে দাঁড়াবে না। এই নতুন উৎপাদন সম্পর্কের পক্ষে দাঁড়িয়ে লড়ে শ্রমিকশ্রেণী। পুঁজিবাদ তার বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে ক্রমাগত আরও বড় বড় কারখানা তৈরী করতে বাধ্য হয়। আর এই প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়েই ক্রমেই বেড়ে ওঠে, একত্রিত ও সংগঠিত হয় পুঁজিপতির বিরুদ্ধ শক্তি শ্রমিক শ্রেণী। পুঁজিবাদী সমাজে পুঁজিপতির সঙ্গে শ্রমিকশ্রেণীর সংগ্রাম চলে। চূড়ান্ত পর্যায়ে শ্রমিকশ্রেণী পুঁজিপতিশ্রেণীকে ক্ষমতাচ্যুত করে ব্যক্তি মালিকানার বদলে সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্ঠিত করে। এটাই সমাজতন্ত্র।

সমাজতন্ত্রে শ্রেণী শোষণ নেই, ব্যক্তিগত সম্পত্তিও নেই। নিজস্ব ব্যবহারের জন্য পার্সোনাল প্রপার্টি আছে, কিন্তু কারো মালিকানায় এমন কোন সম্পত্তি (প্রাইভেট প্রপার্টি) নেই যার দ্বারা অপরকে শোষণ করে মুনাফা আদায় করা যায়। অর্থাৎ উৎপাদন যন্ত্রের উপর ব্যক্তি মালিকানা নেই। এই সমাজে সকলেই সামাজিক উৎপাদনে অংশগ্রহণ করে। এবং প্রত্যেকে তার শ্রম ও যোগ্যতা অনুযায়ী নির্দিষ্ট মজুরী পায়।

শ্রমিকশ্রেণী পুঁজিপতিশ্রেণীকে ক্ষমতাচ্যুত করে পুরাতন রাষ্ট্রকে ভেঙ্গে ফেলে এবং শ্রমিকশ্রেণীর স্বার্থ অনুযায়ী নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে। সমাজতান্ত্রিক সমাজেও রাষ্ট্র থাকে, কিন্তু আগের তিন যুগের (দাস, সামন্ত ও পুঁজিবাদী) সঙ্গে পার্থক্য এই যে, এই রাষ্ট্র আর শোষক শ্রেণীর হাতিয়ার নয়। এটা শ্রমিকশ্রেণীর হাতিয়ার, তা ব্যবহৃত হয় নিজ দেশের পরাজিত পুঁজিপতিশ্রেণীর প্রতিরোধ প্রচেষ্টা ঠেকানো অথবা অন্য দেশের বুর্জোয়াদের আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য।

সাম্যবাদী সমাজ
সমাজতান্ত্রিক উৎপাদন সম্পর্ক ক্রমাগত উৎপাদিকা শক্তিকে বাড়িয়ে তুলতে সাহায্য করে। সুদূর ভবিষ্যতে এমন এক সময় আসবে যখন উৎপাদন এত বিপুল হবে যে সেই অবস্থায় এ নীতি কার্যকরী হবে, ‘প্রত্যেকে তার সামর্থ্য অনুযায়ী কাজ করবে, আর প্রত্যেকে তার প্রয়োজন অনুযায়ী ভোগ করবে’। এই সমাজই সাম্যবাদী সমাজ। এই হচ্ছে শ্রেণীহীন সমাজ। এই সমাজে রাষ্ট্র থাকবে না। সমাজতন্ত্রের অগ্রগতির সাথে সাথে রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গ অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়বে। এইভাবে ধীরে ধীরে রাষ্ট্র উবে যাবে।

ঐতিহাসিক বস্তুবাদ প্রসঙ্গে আরও কিছু কথা
১। কয়েকটি যুগের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু কোন সুনির্দিষ্ট দিনণ দিয়ে বলা যায় না, কবে থেকে অমুক যুগ শুরু হল আর কবে তার সমাপ্তি ঘটল। এমনকি পৃথিবীতে সব জায়গায় একই সঙ্গে একই ধরনের উৎপাদন ব্যবস্থা শুরু হয় নি। যেমন আজকের পৃথিবীতে কোথাও সমাজতান্ত্রিক সমাজ, কোথাও পুঁজিবাদী সমাজ আবার কোথাও বা আরও পিছনের কোন সমাজ বর্তমান রয়েছে।

২। কোন দেশে একই সঙ্গে দুই বা ততোধিক উৎপাদন ব্যবস্থা দেখতে পাওয়া যায়। তার মধ্যে যে ব্যবস্থাটি প্রধান তার দ্বারা সমাজটাকে চিহ্নিত করা হয়।
৩। কোন সমাজই স্থায়ী নয়। প্রত্যেকটি সমাজের অভ্যুদয়, বিকাশ ও পতন (বা অন্য উন্নততর সমাজে রূপান্তর) আছে।

৪। সমাজ বিকাশের মূল কারণ নিহিত আছে উৎপাদন ব্যবস্থার পরিবর্তনের মধ্যে। উৎপাদন ব্যবস্থার মধ্যে প্রথম পরিবর্তন আসে উৎপাদিকা শক্তির। তারপর নকুন উৎপাদন সম্পর্কের প্রয়োজন অনুভূত হয়। এই ঘটনাটি ঘটে মানুষের সচেতন প্রচেষ্টা ছাড়াই এবং কোন ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা শ্রেণীর ইচ্ছা নিরপেভাবে। এই অবস্থার কারণে সৃষ্টি হয় শ্রেণীসংগ্রাম। শ্রেণীসংগ্রাম প্রতিটি শ্রেণীবিভক্ত সমাজে থাকবেই। এটাই আসলে সমাজ বিকাশের মূল চালিকা শক্তি। শ্রেণীসংগ্রামের পরিণতি বিপ্লবে। বিপ্লবের মাধ্যমে সমাজের গুণগত পরিবর্তন হয়, নতুন উৎপাদন সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়।

৫। একটি সমাজের ভিত্তি তার অর্থনীতি। অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তন দ্বারাই সমাজ পরিবর্তিত হয়, পরিবর্তন হয় তার উপরিকাঠামো। এটা যেমন সত্য, তেমনই উপরিকাঠামোও যে ভিত্তিতে প্রভাবিত করে, তাও সত্য। ভিত্তি ও উপরিকাঠামোর মধ্যে সম্পর্ক দ্বান্দ্বিক। যেমন, উৎপাদিকা শক্তি ও উৎপাদন সম্পর্কের দ্বন্দ্বই আপনাআপনি উৎপাদন ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনে না। উৎপাদন ব্যবস্থার পরিবর্তন সাধিত হয় রাজনৈতিক বিপ্লবের মাধ্যমে। বিপ্লবের দ্বারা প্রথমে রাষ্ট্র ক্ষমতার পরিবর্তন হয়, পরিবর্তন হয় রাষ্ট্র ব্যবস্থায়। তারপর উৎপাদন ব্যবস্থায় পরিবর্তন (যা ইতিমধ্যেই অনিবার্য ও অপরিহার্য হয়ে উঠেছে) আনা হয়। উৎপাদন ব্যবস্থার এই পরিবর্তন সমাজের অন্যান্য দিকে সংস্কৃতি, সামাজিক রীতিনীতি ইত্যাদি ক্ষেত্রে প্রবলভাবে প্রভাব ফেলে এবং সেই সব ক্ষেত্রে দ্রুত পরিবর্তন আনতে সাহায্য করে। বিষযটি বুঝতে হলে শ্রেণী, রাষ্ট্র ও বিপ্লব সম্পর্কে ব্যাখ্যা ও আলোচনার প্রয়োজন।

শ্রেণী
নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক যুগে নির্দিষ্ট উৎপাদন ব্যবস্থায় যে জনসমষ্টি উৎপাদন যন্ত্রের (উপায়ের) সঙ্গে একই রকম সম্পর্কে থাকে তারা একটা শ্রেণী। মানব সভ্যতার ইতিহাসে তিনটি শ্রেণী বিভক্ত যুগ দেখতে পাওয়া যায়-দাস, সামন্ত ও পুঁজিবাদী যুগ। প্রত্যেক যুগে দুটি প্রধান শ্রেণী আছে। একটি শোষক, অপরটি শোষিত। দাস যুগে দাস মালিক ও দাস, সামন্ত যুগে সামন্ত প্রভু ও কৃষক বা ভূমিদাস, পুঁজিবাদী যুগে পুঁজিপতি ও শ্রমিক। প্রত্যেক যুগে প্রধান দুটি শ্রেণীর মধ্যবর্তী আরও কিছু শ্রেণী থাকে, যেমন আজ পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থায় পেটি বুর্জোয়া।

একমাত্র আদিম সাম্যবাদী সমাজ ও ভবিষ্যতের সাম্যবাদী সমাজ বাদ দিলে প্রত্যেক যুগে সমাজের কোন না কোন শ্রেণী অধিপকি শ্রেণী হয়। তারাই হয় শাসকশ্রেণী। রাষ্ট্র ব্যবস্থা, সংস্কৃতি, সামাজিক রীতিনীতি সেই শ্রেণীর স্বার্থানুযায়ী তৈরী হয়। দাস সমাজে দাস মালিক, সামন্ত সমাজে সামন্ত প্রভু, পুঁজিবাদী সমাজে পুঁজিপতিশ্রেণী এবং সমাজতান্ত্রিক সমাজে শ্রমিকশ্রেণী অধিপতি ও শাসক শ্রেণী। যে কোন সংস্কৃতি দর্শন, সামাজিক রীতিনীতি বিশেষ যুগের চিহ্ন ও বিশেষ শ্রেণীর বৈশিষ্ট্য তুলে ধরে।

শ্রেণী বিভক্ত সমাজে শ্রেণী সংগ্রাম থাকবেই। শ্রেণী সংগ্রাম পরিণতি লাভ করে বিপ্লবে। শ্রেণী সংগ্রাম কেবলমাত্র অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বা রাজনৈতিক অঙ্গনে চলে, তাই নয়। উপরিকাঠামোর বিভিন্ন জায়গায়ও শ্রেণী সংগ্রাম চলে। একটি সমাজে সংস্ড়্গৃতি বা সামাজিক রীতিনীতির প্রধান অংশ ঐ সমাজে অধিপতি শ্রেণীর স্বার্থের প্রতিফলন ঘটায়। কিন্তু সেখানেও বিরুদ্ধ শ্রেণীর সংস্ড়্গৃতি বা বিরুদ্ধ শ্রেণীর (শোষিত শ্রেণীর) চিন্তাভাবনার পরিচয় বা ছাপ পাওয়া যায়।

রাষ্ট্র
আদিম সাম্যবাদী সমাজের পর যখন প্রথম শ্রেণী বিভক্ত সমাজের উদ্ভব তখনই রাষ্ট্রের জন্ম। রাষ্ট্র এমন একটা ব্যবস্থা যার দ্বারা শোষিত শ্রেণীকে দমন করে রাখা হয়। এর প্রধান অঙ্গ পুলিশ, সেনাবাহিনী এবং প্রশাসন ব্যবস্থা। বিচার বিভাগ, আইন ইত্যাদিও এর অন্তর্ভূক্ত। দাস সমাজ, সামন্ত সমাজ ও পুঁজিবাদী সমাজ এই তিন সমাজে শোষণের পদ্ধতি ভিন্ন ভিন্ন বিধায় রাষ্ট্রের রূপও ভিন্ন ভিন্ন। যেমন সামন্ত যুগেও রাজতন্ত্র ছিল রাষ্ট্রের প্রধান চেহারা, পুঁজিবাদী যুগে রাজতন্ত্রের জায়গা দখল করেছে বুর্জোয়া গণতন্ত্র। তবে সকল যুগেই ঐ সকল সমাজ ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য একই, তা হল এই যে, রাষ্ট্র হচ্ছে দমন-পীড়নের যন্ত্র।

বিপ্লবের মাধ্যমে বিপ্লবীশ্রেণী পুরাতন রাষ্ট্র কাঠামোকে পরিবর্তন করে নিজের শ্রেণী স্বার্থ অনুযায়ী নতুনভাবে রাষ্ট্র কাঠামো তৈরী করে। যতদিন যাচ্ছে রাষ্ট্রের কাঠামো তত জটিল হচ্ছে। কিন্তু প্রত্যেকটি শ্রেণী বিভক্ত সমাজে রাষ্ট্র হচ্ছে শোষকশ্রেণীর শোষণ ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার প্রধান হাতিয়ার। একমাত্র সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র হল গুণগতভাবে ভিন্ন চরিত্রের। এখানেও রাষ্ট্র দমন করার জন্যই লাগে। কিন্তু তা শোষণের হাতিয়ার নয়। শ্রমিকশ্রেণী পুরাতন রাষ্ট্র ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙ্গে তার নিজস্ব স্বার্থানুযায়ী একেবারে নতুন ধরনের রাষ্ট্রযন্ত্র তৈরী করে ৈযার রাজনৈতিক রূপ হচ্ছে সর্বহারার একনায়কত্ব।

বিপ্লব
সামাজিক বিপ্লব বলতে বোঝায় সমাজের গুণগত পরিবর্তন অর্থাৎ এক সমাজ থেকে আরেক সমাজ ব্যবস্থায় রূপান্তর অর্থাৎ উৎপাদন ব্যবস্থার পরিবর্তন। উৎপাদন সম্পর্কের কোন পরিবর্তন হল না, কিন্তু কেবলমাত্র সরকার পরিবর্তন হল (তা যদি জনগণের সশস্ত্র অভ্যুত্থানের মধ্যে দিয়েও হয়) তবে তাকে বিপ্লব বলা যায় না। সমাজ প্রতিদিনই কিছু কিছু করে পরিবর্তিত হচ্ছে। উৎপাদিকা শক্তির কিছু না কিছু বিকাশ হচ্ছে। এর সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব পড়ছে। ক্রমাগত নতুন উৎপাদন সম্পর্কের তাগিদ জাগছে জনগণের একটা বিরাট অংশের মধ্যে। শোষিত ও নির্যাতিত শ্রেণীগুলির সঙ্গে শাসক ও শোষকশ্রেণীর দ্বন্দ্ব ক্রমাগত বাড়ছে। অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও অন্যান্য অঙ্গনে শ্রেণীসংগ্রাম বিকাশ লাভ করছে। শোষিত ও নির্যাতিত শ্রেণীগুলির মধ্যে শ্রেণী চেতনা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ গুলি হচ্ছে সমাজের পরিমাণগত পরিবর্তন। এ পরিবর্তন প্রতিদিনই হচ্ছে, কিন্তু এত সামান্য যে তা চোখে ধরা পড়ে না। শেষে একটা পর্যায়ে পরিমাণগত পরিবর্তন গুণগত পরিবর্তনে রূপান্তরিত হয়, যখন শোষিত শ্রেণীগুলি ক্ষমতাসীন শ্রেণীকে ক্ষমতাচ্যুত করে। এটাই বিপ্লব।

বিপ্লবের মাধ্যমে নতুন শ্রেণী রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করে এবং তারপরে সেই শ্রেণী প্রথমে রাষ্ট্রকে নিজের স্বার্থানুযায়ী তৈরী করে এবং একই সঙ্গে পুরাতন উৎপাদন সম্পর্কও বাতিল করে নতুন উৎপাদন সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত করে। তাহলে যে কোন ধরনের সরকার পরিবর্তন বা যে কোন ধরনের বিদ্রোহ তা যত মহৎ ও জংলী হোক না কেন (এমনকি তা যদি গণবিস্ফোরণ বা গণঅভ্যুত্থানও হয়), তাকে বিপ্লব বলা যাবে না।
বিপ্লবে দুটি জিনিস থাকতে হবে- ১) রাষ্ট্র ক্ষমতায় নতুন শ্রেণীর অবস্থান নেয়া এবং সেই শ্রেণীর স্বার্থানুযায়ী নতুন রাষ্ট্রকাঠামো তৈরী হওয়া, ২) উৎপাদন ব্যবস্থায় গুণগত পরিবর্তন অর্থাৎ উৎপাদন সম্পর্কের পরিবর্তন।

যেহেতু, বিপ্লব মানে নতুন শ্রেণীর রাষ্ট্রক্ষমতা দখল (সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবে এই শ্রেণী হল শ্রমিকশ্রেণী), অতএব বিপ্লব হবে সশস্ত্র। কারণ, রাষ্ট্রের প্রধান অঙ্গই হচ্ছে সশস্ত্রবাহিনী। হয় এই বাহিনীকে পরাজিত করতে হবে, অথবা সশস্ত্র বাহিনীর অধিকাংশ সদস্যকে দলত্যাগ করে বিপ্লবের পক্ষে যোগদান করতে হবে, অন্যথায় বিপ্লব জয়যুক্ত হতে পারে না।

বিপ্লব মানে ক্ষমতাসীন শোষকশ্রেণীকে পরাজিক করে ক্ষমতা বহির্ভূত শোষিত ও নির্যাতিত শ্রেণীর বা শ্রেণীসমূহের রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল। অতএব, বিপ্লব মানে গণবিপ্লব। এতে অবশ্যই ব্যাপক জনগণের অংশগ্রহণ থাকতে হবে। নির্বাচন বা সাধারণ ক্যু’র মাধ্যমে কখনও বিপ্লবের কাজ সম্পন্ন হতে পারে না।

[নোট : লেখাটি অবিকৃতভাবে প্রকাশ করা হয়েছে। এর মূল লেখক সৈয়দ আমিরুজ্জামান। প্রথম আলো ব্লগ থেকে সংগৃহীত]

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “সমাজ বিকাশের নিয়ম

  1. ধন্যবাদ গুরুত্বপূর্ণ এই
    ধন্যবাদ গুরুত্বপূর্ণ এই পোস্টটি শেয়ার করার জন্য। শিরোনামে এটাও যোগ করে দিতে পারতেন যে মার্কসবাদ কি, তা এখানে সোজা কথায় আলাপ করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

15 − = 10