আমাদের মিডিয়া এবং আমাদের বুদ্ধিজীবীরা… অথবা আমরা

মানুষ বড়ই অদ্ভুদ জীব। এইটা ত সবারই জানা। তবুও বারবার একটি মানুষ থেকে আরেকটি মানুষের পার্থক্য অথবা একই মানুষের বিশেষ সময়ে আচরনগত পরিবর্তন আমাকে বিশেষ বিনোদন দেয়। শাকিব খানের মতো কখনও আমিও যদি সেলিব্রেটি হই এবং ছয় ইঞ্চি প্লাস্টার মেখে নাক-মুখ একটু ডান বামে সরিয়ে বসা উপস্থাপিকা যদি আমাকে প্রশ্ন করে যে, অবসর সময়ে আপনি কি করে কাটান? তাহলে আমার উত্তর হবে চারদিকের মানুষের কথা ভেবে(এর মাঝে আমিও আছি কিন্তু)।. উপস্থাপিকা তখন একদম ঢলঢল মুখে “ওয়াও,আপনার মতো একজন মানুষ , অবসর সময়ে মানুষের কথা ভেবে সময় কাটান! অথচ অন্যান্যরা সবাই বই পড়ে,গান শুনে এইগুলা করে ;সেখানে আপনি মানুষের কথা ভেবে সময় কাটান?” আমি তখন বলব, যেমন ধরেন আপনার চাইতে একশত গুন সম্পন্ন কেউ এই মুহুর্তে আমার সামনে বসে সাক্ষাৎকার নিতে পারত কিন্তু পারছেনা কারণ হয় আপনার বাপ কোনো মন্ত্রী এমপি অথবা আপনি এই অনুষ্ঠানের প্রযোজকের সকল চাহিদা পূরনে সমর্থ্য হয়েছেন। প্রকৃতিজগতে একমাত্র এই গুন মানুষই রাখে। যদিও ডারউইন সাহেব বলে গিয়েছেন, “সার্ভাইবেল অব দ্যা ফিটেস্ট” কিন্তু বর্তমানে এই “ফিটেস্ট শব্দটার মানে আর শারীরিক শক্তি না, প্রকৃতির বিরুদ্ধে লড়াই করে টিকে থাকাও না। এমনকি মস্তিষ্ক নামক যে বস্তুটির কল্যানে আজকে মানুষ এই পৃথিবী শাসন করছে…জংগলে বসে ফল না খেয়ে ওয়েস্টার্ন গ্রিলে গিয়ে আরেকটি প্রানীকে গ্রীলের মধ্যে ঢুকিয়ে পুড়ে আরাম করে খাচ্ছে এবং সেই জন্যে বিরাটা বিরাট সব আওয়োজনও করছে। সেই “মস্তিষ্ক”ও এখন মূল্যহীন। এখন একমাত্র শক্তি হচ্ছে “পুঁজি” বা খাঁটি বাংলাতে বলতে গেলে “টাকার বল” ,এরপর আসবে এলাকার গুন্ডা-বদমাইশ থাইকা শুরু করে চোর চ্যাচ্ছর পর্যন্ত কারো সাথে আপনার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে কি না। এই ক্ষেত্রে সরকারী গুন্ডাবাহিনী মানে সবুজ ড্রেস,কালো ড্রেস পরে যারা অটোমেটিক গান নিয়ে খোল্লাম-খোল্লা ঘুরতে পারে। বুঝছেন? তার মানে “বল” আর “বুদ্ধি” এই দুইটা শন্দকে রিপ্লে করে এখন সেখানে বসান “পুঁজিপতি” এবং “ গুন্ডামি” । দেশে কত কত প্রতিভাবান ছেলে-পেলে পরে আছে যারা হয়ত এক-দুইটা সুযোগ পেলে দেশের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির চেহারাই পালটে দিতো। আমাদের সিনেমার মান কখনই হলিউডি চাকচিক্য বা ঋত্বিক ঘটকের মতো মন্ত্রে ভরা ছিলো না। কিন্তু আমাদেরও ছিলো জহীর রায়হান, তারেক মাসুদ যাদের কদর ত আমরা করিই নি ,উল্টো তাদেরকে হতে হয়েছে এই সমাজের বলীর স্বীকার।আর সিনেমা পাল্টানোর দায় দিছি কাকে? জলিল নামের এক ভাঁড় কে যে আসলে ভাঁড়ামি করার যোগ্য কি না সেটাই আমার চিন্তাতে আসেনা। সেইদিন বুয়েটের সামনে গিয়ে দেখি পলাশির রাস্তা পুরা বন্ধ করে রাখছে।বাঁশ দিয়া রাস্তা বন্ধ। কোনো গাড়ি তোঁ দূর কি বাত,ফাল দিয়া কোনো ঘোড়াও যাইতে পারবেনা। “তামাশা” দেখাইতে বুয়েটের পোলাপান এবং স্যাররা দুনিয়াতে সবার সেরা এই কথা আমি দৃঢ় গলায় বলতে পারব। যে বুয়েটে পাশের রুমে চা-পাতি কেনো ইলেট্রিক করাত দিয়া কুপাইলেও পাশের রুম থাইকা কেউ না বের হয়ে উল্টো দড়জা বন্ধ করে দিবে সেই বুয়েটেই আবার যখন সেই কুপ খাওয়া ছেলেটি অথবা বাসের নিচে পরে মরে যাওয়া ছেলেটির লাশ আসবে ক্যাম্পাসে তখন কত ডিজাইনের রংগ যে তারা করতে পারে তার ইয়াত্তা নাই। আর সেইসকল রঙ্গগুলোকে রুপ দেয়ার জন্য ত আর্কিটেকচার ডিপার্টম্যান্ট ত আছেই। সবাই সসবার ইঞ্জিনিয়ারিং বুদ্ধির শরবত উপুর কইরা ঢাইলা দেয় তখন “আভেগ” দেখাইতে। কিন্তু যখনই সত্যি সত্যি একদল ছেলে-মেয়ে প্রতিবাদ করতে চায় “যে কারনে এই ঘটনাটি ঘটেছে সে কারনটিকে” উপরে ফেলার দাবি নিয়ে রাস্তায় মিছিলে মিছিলে প্রকম্পিত করে দেয় শেরে বাংলা,সোহরাওয়ারদি হল তখন আবার বাকিরা চুপ। তাদের ক্যারিয়ারের সাওয়াল যে। যে বেটা মরেছে তার নামে একখান ব্যানার টানিয়ে শোক দেখাইলাম ত , আর কি দরকার? এই বুয়েটেই হচ্ছে ছোট্ট বাংলাদেশ।

সেইদিন প্রথম আলোতে এক গল্প নিয়ে ঘটে গেলো বিরাট হাউকাউ। প্রথম আলো আজ দেখলাম ছোট্ট করে মাফও চাইল। এই সেই প্রথম আলো যারা পরিমল ক্লাস টেনের বাচ্চাকে রেপ করার রিপোর্ট করার সময় সেখানে “ মেয়েটি সেদিন মিনিস্কার্ট পরে এসেছিলো,হাটুর উপরে কাপড় উঠে ছিলো” অতি সুশীল লাইন লিখতে পারে। এই “প্রথম আলো” ঐ পারসোনার হিডেন ক্যামেরার রহস্য বাঁচানোর জন্য নিজের জান দিয়ে দিয়েছিলো। এরপরও আমরা কিন্তু এই প্রথম আলোই পড়ি। বাংলাদেশের সবচাইতে বেশি বিক্রিত (নাকি বিকৃত?!) পত্রিকা হচ্ছে এই “প্রথম আলো”। অনেকে অনেক কারণ বলেন। কেউ বলেন গেট-আপ। কেউ বলেন তাদের বস্তুনিষ্ঠতা (মানে লোড ব্যালেন্সিং আর কি!) আবার কেউ কেউ বলেন তাদের খেলার খবর ভালো। তবে এই কথা মানোট হবে বাংলাদেশের প্রথম সাড়ির সকল বুদ্ধিজীবিরাই এখন প্রথম আলোতে লেখেন। একটু ভুল হয়ে গিয়েছে।“ সকল বুদ্ধিজীবী” শব্দটার পড়ুন “গ্ল্যামারাস বুদ্ধিজীবী”। গ্ল্যামার খুবি দরকারী জিনিস। আগে এর প্রয়োজন পড়ত সিনেমার নায়ক-নায়িকাদের। কিন্তু কর্পোরেট জামানাতে এই গ্ল্যামার এখন সকল জায়গায় লাগে। খেলাধুলা থেকে শুরু করে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পাওয়া বিজ্ঞানীকেও এখন গ্ল্যামারাস হতে হয়। সারাজীবন যে পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে গেলেন যে চে’গুয়েভারা এখন সেই চে’ই স্থান পাচ্ছে মেয়েদের ব্রা-প্যান্টিতে ,মদের দোকানে। কারণ কি? চে’গুয়েভারার গ্ল্যামার। কর্পোরেট দুনিয়া এদের গ্ল্যামারকে বিক্রি করছে কিন্তু এদের মতবাদকে মাটির যত নিচে সম্ভব তত নিচে দাবিয়ে দিচ্ছে।এতে অবশ্য চিন্তিত হবার কিছু নেউ। ৬/৭ কোটি বছর আগের ডাইনোসরের ফসিল আমরা তুলে এনেছি। আর তোরা ত্তত্ব লুকাতে চাস মাটির নিচা? হাদারামের দল। এই চে’ একদিন চে’দের জাহাজ নিয়ে আসবে…দেখে নিস।

আচ্ছা, আবার ফিরে যাই প্রথম আলোর জনপ্রিয়তার পিছনে। আসলে সবগুলোই প্রথম আলোর জনপ্রিয়তার পেছনে কিছুনা কিছু ভুমিকা রেখেছে। মানতেই হবে প্রতম আলোর গেট-আপ ,দৈনিক সংগ্রামের চাইতে ভালো। পত্রিকার প্রথম পাতাতেই মোনালিসার এত সুন্দর মুখখানা আর সেই সাথে বাংলালিংকের মিমের সেই কলিজা পুড়িয়ে দেয়া হাসির সাথে একটুকরা খবর দেখতে দারুন লাগে মাইরি। প্রথম আলো নারীদের এসিড মারার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে… পত্রিকার নামের সাথে সাথে একটি উত্তমকাজের প্রচারনাও হচ্ছে, মন্দ কি? মাদকের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। অবশ্যই মাদক একটি সোসাইটিকে ধ্বংস করার জন্য যথেষ্ট। কিন্তু তারা যে সমাধানের পথ দেখাচ্ছে আমাদের সেটি কি আসলেই সঠিক পথ? তারা কনসার্টের আয়োজন করছে। নাটকের আয়োজন করছে। কিন্তু মাদক-সিগারেট এইসব থেকে মানুষকে দূরে রাখার সবচাইতে বড় অস্ত্র কি? কনসার্ট করে আর বুঝিয়ে কতজন মাদকগ্রহনকারীকে আপনি সঠিক পথে আনতে পারবেন? হুদাই কষ্ট করে লাভ নেই। একজনকেও পারবেন না। এসিডের বিরুদ্ধে সমাজে আপনি কি সচেতনাতা তৈরি করতে পারবেন? সচেতন কেউ কখনও এসিড মারে? আসলে এইসবই হচ্ছে “কর্পোরেট সোস্যাল ওয়েলফেয়ার”। তারা যে সমাজের জন্য বেজায় চিন্তিত সেটি প্রমান হলো আবার পিছন দিয়ে মারার জন্য এসিড বা খাওয়ার জন্য ইয়াবা,হেরোইন,মরফিন আমদানিও হলো। কি মজা। এক ঢিলে কয়েক হাজার পাখি মারা হয়ে যায়। আসল কথা হচ্ছে আপনি যদি একটি সমাজে সত্যিই মাদকবিহীন করতে চান তাহলে সচেতনা-মচেতনাতার গুষ্ঠী কিলান। আগে আপনি ঐ দেশ থেকে মাদকবিক্রি বন্ধ করুন। আপনি যদি সত্যিই চান দেশের কোনো মেয়ের মুখ এসিডে ঝলসে না যাক তাহলে আপনি অবৈধভাবে এসিড বিক্রি বন্ধ করেন। অথচ আমাদের দেশে প্রথম আলো দেশের গ্ল্যামারাস সব বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে কনসার্ট করাচ্ছেন, জাগো না ফাগো নামের একটি এনজিও দিয়ে ফুল বিক্রির তামাশা করছেন আর ঐ কনসার্টেই আমি পাচ্ছি গাজার গন্ধ, পাচ্ছি ইয়াবা বিক্রির ফোন নাম্বার… মরফিনের এ্যাম্পল। বাহরে বা…এই না হলে সচেতনতা।

জাফর ইকবাল থেকে ফারুক ওয়াসিফের মতো যারা লিখে আপনার আমার চোখ দিয়ে পানি বের করে ফেলতে পারেন তারা সবাই ঐ সকল “জাগো মার্কা” কর্মসুচি বা “মাদক/এসিড বিরোধী”কনসার্টে যান। যান অংকের অনুষ্ঠানে। এরা সবাই জামত-শিবিরের ঘোর বিরোধী। দিগন্ত টেলিভিশনে সাক্ষাৎকার দিতে অস্বীকার জানিয়ে জাফর ইকবাল ত একবার ভীষন নাম কামাইয়েছে। প্রথম আলোর সেমি-সম্পাদক ত একজন মুক্তিযোদ্ধার মা’কেই বিক্রি করে বই বানিয়ে ছেড়ে দিলেন। এরা সবাই কিন্তু খুবই গ্ল্যামারাস বুদ্ধিজীবী। এদের সবার পিছনে আছে পদার্থবিজ্ঞান,বুয়েট,জাহাংগির নগর ভার্সিটির সিল। শুধু এরাই না। মাহফুজুর রহমান(প্রথম আলোর সিস্টার কনসার্ন “দ্যা ডেইলি স্টার”) এর মেয়েও আজকাল সেলেব্রেটির পর্যায়ে পরে যাচ্ছেন। এরা বুদ্ধিজীবীদের মধে একটি এলিট শ্রেনী তৈরি করছেন যাদের নামের পিছনে আছে বিরাট বিরাট ডিগ্রি। যে ডিগ্রি বলে আজ তারা লোকপ্রিয় বুদ্ধিজীবী। “যখনই কোনো বুদ্ধিজীবী লোকপ্রিয়তা পাবে ,তখনই বুঝবে সে কোথাও সমঝোতা করেছে”…কথাটা আমার না। হুমায়ুন আজাদ স্যারের। বইমেলাতে কথা প্রসংগে একবার বলেছিলেন। যেহেতু সেখানে আমি আর আমার দুই বন্ধু উপস্থিত ছিলাম তাই প্রমান দিতে পারছিনা।

সেইদিন আমার সদ্য শত্রু হওয়া একজন বন্ধুর কাছ থেকে আনা আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের একটি বই পড়ছিলাম। বইটির নাম “অপ্রকাশিত আখতারুজ্জামান ইলিয়াস”। মানে তার লেখা যেসকল প্রবন্ধ বা বক্তৃতা বই আঁকারে বের হয়নি সেগুলোর সংকল। সেখানে একটি প্রবন্ধ ছিলো “ফরাসি বিপ্লবের প্রভাব”। আমাদের এই বংগে তখন অনেক বড় বড় বুদ্ধিজীবীরা ছিলেন। ছিলেন রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্রবিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র,মাইকেল মধুসুদন দত্ত, মশাররফ হোসেন… আরো অনেক অনেক বুদ্ধিজীবী। তারা সবাই সমাজ সংস্কারক হিসাবেই পরিচিত যতটুকু না সাহিত্যিক হিসাবে। একজন বুদ্ধিজীবীর মূল অবদান ত সমাজকে সংস্কার করাই,তাই নয় কি? কবি-সাহিত্যিকরা যদি সমাজ পরির্তনের আন্দোলনে নিজেকে জড়াতে না পারেন তাহলে সেই সমাজে পরিবর্তনের ডাক আসেনা। আবার উল্টোটাও হয়। যাই সেই প্রবন্ধের কিছু ব্যাপারে আপনাদের মনোযোগ কামনা করছি। যেমন ধরেন হন। টেকচাদ ঠাকুর,কালীপ্রসন্ন সিঙ্ঘ,দীনবন্ধু মিত্র, প্রহসন ও নাটকে মধুসূদন দত্ত ও মশাররফ হোসেন সাধারন মানুষের দৈনন্দিন ব্যবহারের মুখের ভাষা ব্যবহার করেছিলেন তাদের খিস্তি খেউর সহ। বংকিমচন্দ্র তার প্রবন্ধে খোলাখুলি বলেছেন যে সাহিত্যের ভাষা ও মুখের ভাষার মধ্যকার ব্যবধান সাহিত্য সৃষ্টির সহায়ক নয়। তার মানে তারা সবাই বিপুল মানুষের সাহিত্যে অংশগ্রহনকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। সেই সময়কার প্রেক্ষিতে সেটি অনেক বড় একটি ব্যাপার। যেখানে আমরা তখন লেখার জন্য “সাধু” আর বলার জন্য “চলিত” ভাষা ব্যবহার করতাম। সেখানেই মৌখিক ভাষার ব্যবহার আসলেই একধরনের রেভুল্যাশনই বটে। আপনারা সবাই জানেন যে রাজা রামমোহন “সতীদাহ প্রথা” রোধ করেন,ঈশ্বরচন্দ্র “বিধবা বিবাহ” দেয়ার আইন পাশ করান। এক কথায় এরা সবাই সমাজ সংস্কারক কিন্তু মজার ব্যপার কি জানেন? এরা কেউই কিন্তু বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন করেন নি। এরা কেউই বৃটিশদের বিরুদ্ধে একটি টু-শব্দও করেননি। যে রামমোহন আগুনে জ্বলে যাওয়া শরীর দেখে সহ্য করতে পারেননি সেই একই রামমোহন এমনকি ইংরেজ নীলকরদের পক্ষ হয়ে দেশবাসীর অধিকার ক্ষুন্ন করার জন্য সমস্ত আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে তিনি ইংরেজ শাসকদের কাছে আবেদনপত্র পেশ করেন। বাঙালি কৃষকের সীমাহীন দারিদ্র ও দুর্দশার বাস্তব ও নিখুঁত বর্ননা লিখেও একই প্রবন্ধে বঙ্কিম ইংরেজদের প্রবর্তিত চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের স্থায়িত্ব কামনা করেন। দেবতা হিসাবে পরমারধ্য রাজা রামচন্দ্র মধুসূদনের হাতে চিত্রিত হন পররাজ্যলোভি কাপুরুষ রাজা হিসাবে,কিন্তু নিজের দেশে ইংরেজ আগ্রাসন সম্বন্ধে তিনি বিরক্তিকরভাবে নিশ্চুপ। সমাজ সংস্কারে নিয়োজিত হয়ে সামন্ত মূল্যবোধে নুয়েপড়া সমাজপতিদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে করতে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বাংলায় ইতিহাস লেখেন,সেখানে ইংরেজ লেখককে অন্ধভাবে অনুকরন করতে তার আত্মসম্মানে বাধেনা। ইংরেজ নীলকরদের মুখোশ উন্মোচনের প্রায়শ্চিত্ত করেন দীন বন্ধু মিত্র বইয়ের উতসর্গ পত্রে ইংরেজ শাসকের দীর্ঘ প্রসস্তি গেয়ে। যে বঙ্কিম সাম্যের বানীতে উৎসাহিত হন,দেশের কৃষকের দূর্দশায় যিনি গভীর বেদনা বোধ করেন,তিনি আবার দেশের একটি সম্প্রদায়কে আরেকটি সম্প্রদায়কে খেপিয়ে তোলার জন্য উপন্যাসে যে ভাষা ব্যবহার করেন তা কোনভাবেই রুচিসম্মত বলা চলেনা। ইংরেজ শাসনকে তিনি অভিনন্দন জানান,ন্যূনতম আত্মমর্যাদাবোধ জলাঞ্জলি দিয়ে তিনি বিদেশী শাসনকে আশীবার্দা হিসাবে ঘোষনা করেন। ইংরেজ শাসনকে সমালোচনা করে মীর মশাররফ হোসেন কিছুই লেখেন না,উপরন্তু সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির লক্ষ্যে এমনই গো বধ বন্ধের আহবান জানিয়ে তিনি আবার শেষ জীবনে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ প্রচার করেন।

এরা সবাই সমাজ পরিবর্তনের ডাক দিয়েছিলেন কিন্তু কেউই সেই সমাজ ব্যবস্থার নিয়ামক “ইংরেজ শাসন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কথা বলেন নি। কেনো? এত মহৎ মহৎ মানুষের কেনো ইংরেজ শাসন ব্যবস্থার বিরোধীতা কেনো করেননি? আমাদের নুয়ে পড়া কৃষকের শরীর আর চোখের পানি কেনো তাদের স্পর্ষ করেনি? কারনের গভীরতা খোঁজার জন্য আপনাকে এত বিদ্বান হতে হবেনা। জাস্ট কমনসেন্সটা ইউজ করলেই হবে। ইংরেজরা ইন্ডিয়া দখল করার পর কোলকাতা কেন্দ্রিক একটি সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলে। কোলকাতা হয়ে উঠে সবকিছুর কেন্দ্র। এই কোলকাতাকে কেন্দ্র করেই টেকচাদ থেকে বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথ থেকে শরতচন্র সবার সাহিত্যচর্চা শুরু। এরা তাই সমাজের বৈষম্য বা আরো ভালোভাবে বলতে গেলে ধর্মীয় বৈষম্যগুলো নিয়েই লেখালেখি করেছেন। এবং এটাও সত্য যে তাদের এই সমালোচনার ফলে হিন্দু ধর্ম আজকে মাজা শক্ত করে দাঁড়িয়ে আছে। না হলে হিন্দু ধর্মও এখন সেই হারিয়ে যাওয়া জৈন ধর্মগুলোর মতো একটি হত।

কিন্তু আমার কথা হচ্ছে যে সকল বুদ্ধিজীবীদের সমাজ মূল সমস্যার দিকে ইংগিত করে কিছু লেখার সাহস নেই। যারা লেখা বিক্রি করে সংসার চালানোর জন্য লেখেন বা নিজের পিঠ বাঁচানোর জন্য লেখেন এবং তথাকথিত “প্রথম আলো” মার্কা প্রিন্ট মিডীয়া আর “চ্যানেল আই” মার্কা ডিজিটাল মিডিয়ার জোড়ে যারা আজকালকার ছেলে-মেয়েদের হিরোতে পরিণত হচ্ছেন তারা কি আসলেই সেই কথা বলার অধিকার রাখেন? দেশের তেল-গ্যাসঃ সহ অনেক আমদানি-রপ্তানি অনেক ব্যবপারে সরকারের করা বৈষম্যমূলক চুক্তি নিয়ে যারা নিশ্চুপ থাকেন,পারলে পক্ষে কথা বলেন তারা কি সমাজে ধর্মের অনাচার বা মাদ্রাসা ব্যবস্থার বৈষম্য নিয়ে কথা বলার অধিকার রাখেন? যারা ইন্ডিয়ার তাঁবেদার সরকার বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পা-চাটা বিরোধীদলের আসল গুমোড় জেনেও সেগুলো প্রকাশ না করেন, পুরু পৃথিবী জুড়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন চলছে তার বিরুদ্ধে যারা বিরক্তিকরভাবে চুপ আছেন তারা ভবিষ্যত প্রজন্মকে কিভাবে পথ চলতে হবে সেই শিক্ষা দেয়ার অধিকার কি আসলেই ধারন করেন? যারা তালেবানী প্রথার বিরুদ্ধে কথা বলেন কিন্তু তালেবানদের হোতাদের কথা বলেন না তাদের সাথে মুখোশ পড়া রাবন আর রামের কোনো পার্থক্য আমি পাইনা। আপনার পান কি?

সমাজের চাইতে নিজের শ্রেনীস্বার্থকেই যারা বেশি গুরুত্ব দেন। লেখার আগে নিজের পাছা আর পিঠ বাঁচানোর ব্যবস্থা যারা করে রাখেন আমি তাদেরকে “কলম ব্যবসায়ী” আর যারা নিজের শ্রেনী স্বার্থ রক্ষার দালালী করেন আমি তাদেরকে “বুদ্ধিবেশ্য” বলতে রাজী আছি। এর বেশিকিছু না।

ডঃ ইউনুস থেকে জাফর ইকবাল , প্রথম আলো থেকে চ্যানেল আই এরা সবাই আসলে ঐ শ্রেনীস্বার্থ রক্ষাকারীদের দেয়াল হিসাবে কাজ করে যাচ্ছে। নামগুলো শুধু শাব্দিকভাবে নিবেন না। এদের মাঝে অনেকেই পরেন। আমি অধম মানুষ ,নাম মনে রাখতে পারিনা তাই অনেক নাম ভুলে যাই কিন্তু ইতিহাস ভুলেনা। এরা ইতিহাসের আস্তাকুড়েই নিক্ষিপ্ত হবেন। যেমন হয়েছেন বংকিমচন্দ্ররা… যেমন হয়েছেন হিমুর সৃষ্টিকর্তারা…

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৩২ thoughts on “আমাদের মিডিয়া এবং আমাদের বুদ্ধিজীবীরা… অথবা আমরা

  1. সব কিছু নষ্টদের দখলে চলে
    সব কিছু নষ্টদের দখলে চলে যাচ্ছে। উমদা একটা পোস্ট লিখেছেন। তবে পোস্টে রসকস (পুঁজিবাদী উপাদান) কম হওয়াতে অনেকেই হয় পড়বেন না। তারপরও এই ধরনের লেখা বেশী বেশী প্রমোট করা উচিত ব্লগগুলোর। আমি পোস্টটি স্টিকি করার জন্য ইস্টিশন মাষ্টারের দৃষ্টি আকর্ষন করছি।

    1. উমদা পোস্ট কি জিনিস ভাই?
      উমদা পোস্ট কি জিনিস ভাই? :চিন্তায়আছি:

      লেখা প্রমোট হওক বা না হওক, সবার চিন্তা চেতনাতে পরিবর্তন আসুক এটাই কামনা।

  2. যে কোন বাজারী পণ্যই শুরুতে
    যে কোন বাজারী পণ্যই শুরুতে সেবা দিলেও পরবর্তীতে সেটা সে উশুল করে নেয়। প্রথম আলো সুশীল শ্রেণী সমাজের প্রতিনিধি হয়ে কাজ করে আর আমরা সুশীল হতে প্রথম আলো হাতে নিয়ে ঘুরি। তবে এসবও কিন্তু তাদের একটা ব্যবসায়িক পন্থা একটু নামে আসতেই তারা এসব করছে।

  3. আপনার লেখার বিরাট ভক্ত আমি।
    আপনার লেখার বিরাট ভক্ত আমি। অনেকদিন পর পর লিখছেন। আরও নিয়মিত আপনার লেখা আশা করছি। btw: লেখা ভালা পাইসি।

  4. খুবই খোরাকিযুক্ত লেখা।
    খুবই খোরাকিযুক্ত লেখা। প্রসঙ্গত যোগ করতে চাই- বৃটিশবিরোধী আন্দোলনের সশস্ত্র বিপ্লবীদের যে শ্রম আর ত্যাগের প্রভা, তার পাশে নিয়মিত চর্বিত নামগুলো অনেকখানি ম্লান। অথচ চরম গান্ধীবাদিও জানত এইসব বিপ্লবীর রক্ত না দলে তারা আলাপের দরজা পর্যন্ত যেতে পারত না; স্বাধীনতার দর কষাকষিতো তো বহুদূরের গল্প। তারপরেও সোনার অক্ষরে নাম লিখতে গেলে, সবার আগে ‘সোনামিয়া’দের নামগুলোই এগিয়ে থাকে। যেমন ইদানিং এগিয়ে থাকে একজন ডিগ্রীবাজের নাম। :ফুল:

    1. সেডাই… নাম আসলে আগে ঐ
      সেডাই… নাম আসলে আগে ঐ গান্ধিবাদীদের নামই আসে। অথচ সেই গান্ধী সাহেব ইংল্যন্ডে গেলেও নিজের খাসি নিয়া যাইতেন দুধ খাওয়ার জন্য। যে নেতা নিজেই সাম্প্রদায়িক সে অসাম্প্রদায়িক কেমনে হবে? গান্ধী ত ইন্ডিয়ারে মুক্ত করার জন্য বিপ্লব করে নাই, হাতজোড় করে মিনতি করছে যার ফল আজ এই ধর্মভিত্তিকভাবে খন্ডিত উপমহাদেশ। সাম্প্রদায়িকতার বীজ ত ব্রিটিশরা বুইনা দিয়াই গেছে। আর আমরা এখন ওটারে আরো বড় করতেছি। লালন পালন করতেছি।

  5. একেতো অনিয়মিত তার উপর এতো
    একেতো অনিয়মিত তার উপর এতো কঠিন জ্ঞানের পোস্ট, দুইবার পড়তে হয়েছে বুঝতে গিয়ে।
    স্টিকি করবার জন্য কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ।

    অধম দাদা আরো নিয়মিত পোস্ট চাই, আপনার নিয়মিত পোস্ট না পেলে হরতাল ডেকে বসবো।

    1. অনিয়মিত না দাদা, নিয়মতই দেখি
      অনিয়মিত না দাদা, নিয়মতই দেখি কিন্তু কথাবার্তা একটু কম কই আর কি :মনখারাপ:

      কঠিন কই লেখলামরে ভাই। আমি নিজেই কঠিন লেখা ভয় পাই। আর নিজে লিখুম কঠিন লেখা?

  6. কঠিন ধরনের লেখা। তবে যা বলতে
    কঠিন ধরনের লেখা। তবে যা বলতে চাইছেন সেটা বোঝা যায়। চিন্তা করার খোরাক আছে। ভালো লাগলো লেখাটা।

  7. আপনার আগুন পোস্ট অনেকদিন পর
    আপনার আগুন পোস্ট অনেকদিন পর পাইলাম। হতাশার মাঝে আছি। আমি নিজেই লেখালিখি থেকে অনেক দুরে সরে গেছি। আপনাদের লিখতে দেখলে লেখার প্রেরণাটা চাঙ্গা হয়ে উঠে। লেখার বিষয়ের সাথে শতভাগ সহমত। নিয়মিত লিখবেন, এই আশা রাখছি।

    1. শুভ্রত শুভ এর মতো একটি
      শুভ্রত শুভ এর মতো একটি শান্ত,ভদ্র ছেলেকে;পারভেজ ভাইয়ের মতো এমন একজন নিবেদিত প্রান মানুষকে যখন চোরের মতো দড়ি লাগিয়ে,হাতকড়া পড়িয়ে মিডিয়ার সামনে হাজির করা হয় তখন আর লিখতে ইচ্ছে হয় বলুন? শুভকে যেদিন এ্যারেস্ট করা হয় তার দুইদিন আগে শুভের সাথে দেখা। ক্যামেলিয়ার ল্যাপটপ নিয়ে আমার অফিসে আসার কথা।আমি একদিন পর নিজ থেকে ফোন দিয়ে শুনি তাঁকে গুম করে ফেলেছে। পরে অবশ্য মেরে ফেলে নাই। কিন্তু সত্যি আমি প্রচন্ড আতংকের মধ্যে ঐ ঘন্টাগুলো কাটিয়েছি।

      এভাবে যদি আমাদের ছোট ভাই যারা নিজেদের এই দেশের সত্যিকার সন্তান হিসেবে গড়ে তুলতে চায়, আমাদের বড় ভাই যারা বিলাসবহুল জীবনের হাতছানি সত্ত্বেও এই দেশে পুড়ে আছেন শুধু “কিছু একটা করার আশায়” তাদের যখন এভাবে দেখি তখন আর লিখতে মন চায় না? শুধু কিছু গালি বের হয়ে হয়ে আসে মুখ থেকে কিন্তু সেই গালিগুলো দেয়ার মতো যোগ্যতাও তাদের নেই।এরা সব ভ্রষ্টের দল। গালি এদেরকাছে সম্মানের বিষয়।

  8. আমরা কি পুঁজিবাদের সেই পথ ধরে
    আমরা কি পুঁজিবাদের সেই পথ ধরে হাঁটছিনা, যে পথের শেষে সাম্যের আলো থাকবে…
    মার্ক্স -এর সমাজতন্ত্রেই পুঁজিবাদ কে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির একটা ধাপ বলা আছে!
    আমি প্রচণ্ড আশাবাদী একজন মানুষ, যদিওঃ
    “চাষার সমস্ত স্বপ্ন আস্তাকুড়ে ছুঁড়ে একদিন
    সাধের সমাজতন্ত্রও নষ্টদের অধিকারে যাবে।”
    — হুমায়ুন আজাদ!!
    প্রাসঙ্গিকভাবে তার কথা খুব মনে পড়ে গেল!! কেউ ছাড় পাবা না, ভাব…

  9. অধম ভাইজানে মনে হয়, ধইন্যা
    অধম ভাইজানে মনে হয়, ধইন্যা পাতা বেশী পছন্দ করেন। পোস্টটি জটিল ! কয়েকবার পড়ে মাথা খাটানোর পর সামান্য বুঝেছি। এখনও পুরাপুরি বুঝতে পারিনি। তবে ভবিষ্যতে আরও ২/১ বার পড়ে পুরাপুরি বুঝার চেষ্ঠা করবো। পোস্টের জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

    তবে আপনাদের একটা তাজা খবর দেই, প্রথম আলো আঞ্চলিকভাবে বগুড়া থেকেও প্রকাশের অনুমোদন পেয়ে গেছেন ইতোমধ্যেই…….

    1. লন, আপনার লাইগাও
      :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা:

      লন, আপনার লাইগাও

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 61 = 68