ধুর্ত রাজা চেক!

আমি আমার কোর্ট পার হয়ে অনেক আগেই তোমার বাউন্ডারিতে চলে এসেছি। আমি আমার সকল শক্তি হারিয়েছি। তুমি নৃশংস ভাবে শেষ করে দিয়েছ আমার প্রিয় মন্ত্রিকে, আমার হাতি দুটিকে, আমার নৌকোগুলিকে। বেচারা সৈন্য গুলোকে রেহাই দেওনি। একটি সৈন্য কোনভাবে বেচে আছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। তারপরও আমি কত বোকা। আমি তোমাকে প্রতিপক্ষ ভাবিনি। কি আশ্চর্য, তুমি কেন আমার শত্রু হবে? তুমি কেন আমাকে তিলে তিলে শেষ করতে চাইবে? সেই হিসেব মেলাবার আগেই পিঠে দেয়ালের স্পর্শ বিচলিত করলো আমাকে। এখন বাঁচতে হলে তোমাকে যে ঘায়েল করতেই হবে। কিন্তু আমি যে অসহায়। আমি যে সব হারিয়েছি।

কিন্তু কেউকি ভাবতে পেরেছি, আমার সেই একটি সৈন্যই যে হাজার হাজার সৈন্যের থেকে শক্তিশালী হয়ে উঠবে?
ওই দেখো দেখো, আমার সৈন্যটি কেমন দাপিয়ে চলে গেছে তোমার বাউন্ডারির ভেতর। সাথে রয়েছে সেই দুটি ঘোড়া।
আহা কি করছো? তুমি মন্ত্রি দিয়ে চাল দিতে পারবে না। মন্ত্রি সরালে আমার সামান্য(!) হাতি দিয়ে চেক পরে যাবে তোমার রাজা। আমি এগিয়ে দিলাম আমার প্রিয় ঘোড়াকে। সামনের বা দিকে আটকে গেলো তোমার রাজা আর পিছনে তোমার মন্ত্রি। আমি রক্তে হাত লাল করলাম তোমার বিশ্বাসঘাতক মন্ত্রিকে মেরে। আমি এক পৈশাচিক আনন্দে আত্মহারা। তুমি কি অবাক হয়ে তাকিয়ে আছো। আমার হাতে রক্ত। নিশ্চয়ই তুমি কখনো ভাবতে পারোনি। আমিও ভাবতে পারিনি। আমার একদিন তোমার বিরুদ্ধেই লড়তে হবে। হাতকে করতে হবে লাল। আমার হাতের রক্ত আজ দেখা যাচ্ছে। কিন্তু যে অদৃশ্যমান রক্তাক্তে নিজের হাতকে লাল করেছিলে, আহা তা তো কেউ দেখলো না। হ্যাঁ, সেই রক্ত শুধু আমার, আমার রাজ্যের।

তুমি তোমার ভেজা চোখ নিয়ে তাকালে আমার দিকে। আমার কাছে আসলে, খুব কাছে। আমি তোমার ভীত, অসহায় শ্বাস-প্রশ্বাসের অস্তিত্ব টের পাচ্ছি। তুমি আমাকে জড়িয়ে ধরলে, আবদার করলে তোমার সেই প্রিয় গানটি শোনানোর জন্য। । আর পিছন থেকে তোমার বিচক্ষন সাদা কোর্টের হাতি দিয়ে চাল ঠেলে দিলে। আমি এবং আমার রাজা দুজনেই ছিলাম সাদা কোর্টে দাঁড়িয়ে। আর সেই সুযোগটিকে বেছে নিয়ে একই চালে চেক দিলে আমার রাজাকে আর প্রধান টার্গেটে রাখলে আমাকে শেষ করবার জন্য।

আমার অট্ট হাসিতে তোমার রাজ্য কেঁপে উঠলো। তুমি ভেবেছিলে মৃত্যুর আগে হয়তো আমি পাগল হয়ে গেছি। কিন্তু আমি যে সেই কবে ফিনিক্স পাখি হয়ে গেছি তা তো তুমি টের পাওনি। তুমি ভেবেছিলে এখনো তুমি আমাকে ভেজা চোখ নিয়ে জরিয়ে ধরলে আমার আগুন দপ করে নিভে যাবে। তুমি কি জানোনা, তোমার এই ধুর্ত বুদ্ধির সাথে আমি দীর্ঘদিন ধরে সুপরিচিত।

যাক, এবার শুধু অভিনয় তুমি একা করোনি। আমিও অংশগ্রহন করেছিলাম তোমার সাথে, একই মঞ্চে। তোমাকে বুকে নিয়ে, কী হবে গতি, বিশ্বপতি, শান্তি কোথা আছে/ তোমারে দাও আশা পূরাও , তুমি এসো কাছে… ; এই গান গাইতে গাইতে পেছন থেকে আমি আমার আরেকটি ঘোড়াকে সদর্পনে এগিয়ে দিয়েছিলাম। এটা ঘোড়ার চাল প্রিয়তম, বুঝতে হবে তোমাকে। আমি রক্তাক্ত করলাম নিজের হাত তোমার সাদা কোর্টের হাতির রক্তে।

আহা ওভাবে তাকাচ্ছো কেন? কি ভেবেছিলে? মেয়ে মানুষ? ঘিন ঘিনে আবেগী? ওভাবে তাকিয়ে থেকো না প্লিজ। সত্যের জয় যে অনিবার্য। তুমি তোমার রাজ্য, রাজ্যের ভীত এক মিথ্যা পাহাড়ের ওপড় দাঁড়িয়ে রাজত্ব করছিলে। তা তো এমনিতেই ভেঙে পরতো। কিন্তু এভাবে সামান্য একটা “মেয়ে মানুষের” হাতে যে হবে, যার সকল ডানা গুলোকে সুকৌশলে কেটে দিয়েছিলে। ভাবোনি সামান্য একটা সৈন্য আর ঘোড়া নিয়ে আমি চুরমার করে দেবো তোমার মিথ্যার রাজ্য। তাই কি?

তুমি বিস্ময় ভরা চোখ নিয়ে ফেলফেল করে তাকিয়ে আছো। আমি তোমার চোখে বিস্ময় দেখে বিস্মিত হচ্ছি। তোমার তো বিস্মিত হবার কিছু নেই। যার যেটা পাওনা, সেটা তো পেতেই হবে।

কতগুলো দিন, মাস, বছর ধরে রক্তাক্ত করে গেছো আমার রাজ্যে। কেউ তোমাকে কিচ্ছুটি বলেনি। শুধু আমার জন্য। আর সেই সুযোগ তুমি লুটে পুটে নিয়েছো। কখনো ভাবিনি তোমার বিরুদ্ধেই নামতে হবে যুদ্ধে আমার। তোমার এই অঘোষিত যুদ্ধ আজ আমার আদর্শিক দন্দ। আমার রাজ্যে আমার বিচরন কি তুমি দেখনি? তুমি কি দেখনি আমার রাজ্য আমি গড়েছিলাম সমাজের সকল প্রগতি দিয়ে? তুমি কি দেখনি আমার সততার পরীক্ষা? তুমি কি দেখনি আমার রাজ্য কিভাবে ঝাঁপিয়ে পড়তো সমাজের সকল অনৈতিকতার বিরুদ্ধে? কেমন কড়ে প্রতিবাদে সামিল হতো? তুমি কি দেখনি আমার রাজ্যে ঠাই পায়নি কোন পুরুষতান্ত্রিকতা, বিশ্বাশঘাতকতা, লম্পট-ভন্ডামি ।

কেনো ঝাঁপিয়ে পড়েছিলে? কেন সাহায্য চেয়েছিলে আমার রাজ্যের? তোমার রাজ্যকে সারিয়ে তুলবার জন্য? আমি তো সব দিয়েছিলাম তোমার রাজ্যের জন্য। এতটুকু কার্পন্য করিনি। আমার মন্ত্রি আমার সৈন্যরা কতবার আমাকে বোঝাতে চেয়েছে। তোমাকে ভন্ড বলাতে আমার কত বিশ্বস্ত সৈন্যকে তাড়িয়ে দিয়েছিলাম আমার রাজ্য থেকে। আহা ওদের আমি এই অবেলায় আর কোথায় খুঁজি?

তাকিয়ে দেখো, আমার আহত সৈন্যটি এগিয়ে যাচ্ছে আমার নির্দেশে। মাত্র এক কোর্ট সামনে এগিয়ে দাঁড়ালো। তোমার ধূর্ত রাজা চেক!!! তুমি শেষ।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “ধুর্ত রাজা চেক!

  1. গদ্যকবিতা ধরলে লেখাটা অসাধারণ
    গদ্যকবিতা ধরলে লেখাটা অসাধারণ হয়েছে। মনে হচ্ছে তোমার ভিতরে কবিস্বত্ত্বা আগে থেকেই আছে। :তালিয়া: :তালিয়া:

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

7 + 2 =