গ্যাস সংকট সমাধানেও টোটকা দাওয়াই! (বিশ্লেষণ)

শীত এলেই গ্যাস সংকট সাধারণ মানুষ খোলা চোখে দেখতে পান। কিন্তু এখন যে গ্যাস সংকটের আলাপ করছি, তা রান্নার গ্যাসের অভাব নয়। বরং প্রশ্ন উঠছে গ্যাসের মোট মজুদ নিয়ে। স্বনির্ভর খাতটি যে অচিরেই দুর্দশায় পড়তে যাচ্ছে সেই চিত্র পরিষ্কার। অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, বিদ্যুৎ খাতের সংকট মোকাবিলায় যেমন রেন্টাল নামক ‘টোটকা’ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিল, গ্যাস খাতও সেই দশায় পড়তে যাচ্ছে- এসে গেছে এলপিজির টোটকা দাওয়াই! গ্যাস খাতে আগামীতে কী ঘটতে যাচ্ছে এবং সামগ্রিক জ্বালানি নিরাপত্তার হাল-হকিকতের দিকে নজর দেয়া যাক।

মজুদ ও বিতরণের অবস্থা
দেশে এ পর্যন্ত আবিষ্কৃত গ্যাসক্ষেত্রের সংখ্যা ২৬টি। এতে গ্যাস মজুদ ছিল ২৭ দশমিক ১২ ট্রিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে ১৩ দশমিক ৬৩ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসই ব্যবহার হয়ে গেছে। অবশিষ্ট আছে ১৩ দশমিক ৪৯ ট্রিলিয়ন ঘনফুট। এখন পর্যন্ত যে গ্যাসক্ষেত্রগুলো আবিষ্কৃত হয়েছে, তার মধ্যে ২৪টিই স্থলভাগে। বাকি দুটি সমুদ্রে হলেও গভীরে নয়, তীরবর্তী। বর্তমানে উৎপাদনে আছে ২০টি গ্যাসক্ষেত্র, যার সবই স্থলভাগে।

প্রতিবছর নতুন করে ১০ শতাংশ হারে গ্যাসের চাহিদা বাড়ে। এমন হিসাব দেখিয়ে পেট্রোবাংলা বলছে, মজুদ গ্যাসে চলবে আর মাত্র ১০ বছর। তাও যদি ঠিকঠাক উত্তোলন করা যায়। বিশেষজ্ঞরা এর মধ্যেই অতি উত্তোলনের কারণে কিছু গ্যাসক্ষেত্রের ক্ষতির আশঙ্কাও প্রকাশ করেছেন। যাই হোক, সব মিলিয়ে জ্বালানি নিরাপত্তার মেয়াদ আর মোটে ১০ বছর।

পেট্রোবাংলার তথ্যমতে, দেশে এখন গ্যাসের চাহিদা দৈনিক ২ হাজার ৯৫০ মিলিয়ন ঘনফুট। এর বিপরীতে ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট ঘাটতি রেখে উৎপাদন হচ্ছে দৈনিক প্রায় ২ হাজার ৩৫০ মিলিয়ন ঘনফুট। এই যে বিপুল পরিমাণ গ্যাস খরচ হচ্ছে, তা যাচ্ছে কোথায়?

মোট উৎপাদিত গ্যাসের ৪২ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদনে; ১৭ শতাংশ শিল্পে; ১৬ শতাংশ ক্যাপটিভ পাওয়ারে; ১২ শতাংশ গৃহস্থালিতে; ৭ শতাংশ সার-কারখানায়; ৫ শতাংশ সিএনজিতে; ১ শতাংশ বাণিজ্যিক এবং দশমিক ১ শতাংশ চা-বাগানে ব্যবহৃত হচ্ছে। অর্থাৎ সার ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে যাচ্ছে প্রায় ৫০ ভাগ গ্যাস, আর শিল্পে যাচ্ছে প্রায় ৩৫ ভাগ। এদিকে গাড়ির সিএনজিতে ৫ ভাগ আর বাসাবাড়িতে প্রায় ১০ ভাগ গ্যাস যাচ্ছে। যদিও বাসাবাড়িতে সরকার আরও বেশি গ্যাস খরচের হিসাব দিয়ে থাকে, কিন্তু তা গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ গৃহস্থালি গ্যাসের নামে অনেক গ্যাস শিল্প ও বাণিজ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে। যদি বাসাবাড়ির গ্যাসকে কর্পোরেট, ব্যবসা, বাসা ও ক্ষুদ্রশিল্প এই চার ভাগে ভাগ করা হয় তাহলে দেখা যাবে চুলার গ্যাস নিয়ে যে হৈচৈ, তা আসলে যাচ্ছে অন্যের পেটে।

এর পাশাপাশি নতুন গ্যাসক্ষেত্র উন্নয়নের সম্ভাবনা কতটা তা দেখে নেয়া দরকার। গত কয়েক বছরে দেশে নতুন গ্যাসক্ষেত্রের সন্ধান মেলেনি। যদিও মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা-সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির পর সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল। তবে এখন পর্যন্ত তা কাজে লাগানো যায়নি। স্থলভাগের গ্যাস অনুসন্ধান আদালতের নির্দেশে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর সম্প্রতি সেই নির্দেশ তামাদি হয়েছে। অর্থাৎ স্থল ও সমুদ্র, উভয় ক্ষেত্রেই গ্যাস অনুসন্ধানের সুযোগ খোলা আছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো আশার আলো সামনে দেখা যাচ্ছে না।১

সংকটের নেপথ্যে
এক সময় বলা হয়েছিল, বাংলাদেশ গ্যাসের সাগরে ভাসছে। দু’ দশক না পেরুতেই এখন বলা হচ্ছে গ্যাস শেষ হয়ে আসছে। এসব প্রচারে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত এবং শেষ পর্যন্ত জাতীয়তাবাদী মানসিকতা থেকে তারা মনে করেন, আমাদের গ্যাস শেষ হবে না। তবে বাস্তবতা এক্ষেত্রে বিরূপ। দু’দশক আগের সেই প্রচারটা ছিল একেবারেই মিথ্যাচার। আর আজকের গ্যাস সংকটের ভিত্তিও এক অর্থে সেটাই।

সে সময় দেশ গ্যাসের সাগরে ভাসছে এমন কথা বিশেষজ্ঞদের মারফতেই প্রচার করা হয়েছিল। এই অপপ্রচারের সঙ্গে যুক্ত ছিল সরকার ও সংশ্লিষ্ট নানা প্রতিষ্ঠান। কারণ তখন বাংলাদেশের যে গ্যাস উৎপাদনের সক্ষমতা, চাহিদা ছিল তার তুলনায় অনেক কম। প্রস্তাব এসেছিল পাইপলাইনের মাধ্যমে ভারতে গ্যাস রপ্তানি করার। সঙ্গে সঙ্গে কিছু মানুষ রপ্তানির বিরোধিতা করে। রপ্তানিবিরোধী মনোভাবকে দমাতেই দেশ গ্যাসের সাগরে ভাসছে বলে প্রচার করা হয়। সে যাত্রায় ভারতে গ্যাস রপ্তানি ঠেকানো গেলেও ওই যে বিপুল গ্যাসের প্রচারণা তা তখনো আধিপত্য করতে থাকে। সে সময় এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা বাদে চাইলেই কিছু জানা যেত না। ইন্টারনেটের ব্যবহার ছিল না। পেট্রোবাংলা ছিল ঠিকই, কিন্তু গণমাধ্যমে জ্বালানি খাত এখন যেমন গুরুত্ব পায়, তখন এরকম পেত না। ফলে গ্যাস খাতের বাস্তব অবস্থা সম্পর্কে সর্বসাধারণ দূরে থাক, আগ্রহীদের জন্যও জানাটা ছিল মুশকিল।

বিপুল গ্যাসের সাগরে ভাসছে দেশ- এই প্রচারণা দেখা গেল একের পর এক ক্ষমতায় আসা সরকারগুলো বিশ্বাস করছে। গ্যাস খাতে গৃহীত সে সময়ের নানা পদক্ষেপ বিশ্লেষণ করলে তারই প্রমাণ মিলবে। দেখা যাবে, সব সরকারের আমলেই বিরাট আগ্রহের সঙ্গে জ্বালানি পরিবর্তন করা হয়েছে। যেসব ক্ষেত্রে তেলের ব্যবহার চালু ছিল, সেগুলোকে পর্যায়ক্রমে গ্যাসভিত্তিক করা হয়েছে। ক্যাপটিভভিত্তিক দ্রুত শিল্পায়নের বিকাশ ঘটানো হয় গ্যাসের সহায়তায়। গাড়ি-সিএনজিতে ও আবাসিকের রান্নায় গ্যাস পৌঁছানো হয়। আবাসন খাতের বিকাশে এটা ভূমিকা রাখে। এসব উদ্যোগ বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে সরকার শুধু গ্যাস খরচের খাত খুঁজে খুঁজে বের করেছে। কারণ গ্যাসের ব্যবহার ছিল তখন খুবই কম। ২০০০ সালে গড়ে ১ হাজার ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন হতো। তখন বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হলেও চাহিদা নেই বলে উৎপাদনে যায়নি সরকার।২

একইসঙ্গে দেখা যাবে এই সময়পর্বে গ্যাসের দাম রাখা হচ্ছে নামমাত্র! যা কিনা মূল্যবান এই সম্পদের অপব্যবহার ও অপচয়ের পথ খুলে দেয়। ফলে ২০০০ সালে যেখানে চাহিদা নেই বলে উৎপাদন বন্ধ রাখা হচ্ছিল, ২০০৭ সালে সেখানে উৎপাদন বাড়ানোর পরেও ঘাটতি থেকে যায়। সে বছর মার্চে বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদন শুরু হয়। উৎপাদনের শুরুতেই তারা ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করতে সক্ষম হয়। তার পরও দেখা গেল, প্রায় ২৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের সরবরাহ ঘাটতি রয়েছে। ২০০৮ সালে দেশে গ্যাস সরবরাহ ছিল ১ হাজার ৭৫০ মিলিয়ন ঘনফুট। তখনও গ্যাসের সরবরাহজনিত ঘাটতি ছিল, এখনও তা বজায় আছে।

অনেকে মনে করেন, গ্যাস খাতের সব সমস্যা হচ্ছে সিএনজি ও রান্নায় গ্যাস। রান্না ও গাড়িতে গ্যাস না দিলে সব সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে। এটা সঠিক না। আমরা ওপরের হিসাবে দেখেছি, রান্না ও গাড়িতে গ্যাস যায় ১৫ ভাগ। কিন্তু বিদ্যুৎ ও সার উৎপাদনে যায় ৫০ ভাগের মতো। বর্তমানে এবং অতীতেও বাংলাদেশে যে গ্যাস সংকট ছিল ও আছে, তার নেপথ্য কারণ হচ্ছে, উৎপাদনের প্রাথমিক জ্বালানি হিসেবে গ্যাসের ব্যবহার। যেখানে কথা ছিল তেল বা কয়লার মতো জ্বালানির ব্যবহার, সেখানে আমরা পোড়াচ্ছি মোট গ্যাসের বেশিরভাগ। আর রান্না ও গাড়িতে গ্যাসের সংযোগ ছিল সরকারগুলোর জনপ্রিয়তা লাভের আশা ও অদূরদর্শিতার ফল। তবে এর কারণে সংকট হয় না। যদিও সরকার সবসময় গ্যাস সংকটের কথা উঠলেই রান্নার গ্যাসের দিকে আঙ্গুল তোলে। এবারও তাই হয়েছে।৩

যদিও গাড়িতে গ্যাস দিতে সরকার আপত্তি করে না, তবে এর দ্বারা ভিন্নরূপের সংকট সৃষ্টি হচ্ছে। এত অল্প দামের গ্যাসে কম খরচে গাড়ি চালানোর সুবিধা মিলছে। ফলে বাড়ছে গাড়ি, তার সঙ্গে বাড়ছে যানজট। যার প্রেক্ষিতে বাড়াতে হচ্ছে রাস্তা ও ফ্লাইওভারের মতো নানা প্রকল্প। গাড়ি, রাস্তা, ফ্লাইওভার ও যানজট যদি শিল্পায়নের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে বাড়ত তাহলে অর্থনীতির মোট যোগফলের চেহারাটা আরেকটু গোছানো হতো। কিন্তু এখন শিল্পের বিকাশ পিছিয়ে থাকলেও কম দামের গ্যাসের কল্যাণে গাড়ি ও যানজটের রমরমা। মোট অর্থনীতিকে এই মাথাভারী বোঝাটা বইতে হচ্ছে বিধায় তার অগ্রগতি শ্লথ।

তা সত্ত্বেও পরিষ্কার থাকা দরকার যে, গ্যাস সংকটের নেপথ্যে আছে প্রাথমিক জ্বালানি হিসেবে গ্যাসের ব্যবহার। সংকটের কারণ কিছুতেই রান্নার গ্যাস নয়। গাড়িতে গ্যাস অর্থনীতিতে অন্য সংকটের জন্ম দিলেও তা গ্যাস সংকট সৃষ্টি করছে না। তবে পরিকল্পনাহীনভাবে এসব খাতে গ্যাস সংযোগ ও কম মূল্যে গ্যাস দেয়ায় গ্যাসের বাড়তি একটা চাহিদা তৈরি হয়েছে।

সরকারি পরিকল্পনার অসঙ্গতি
গ্যাস সংকট যে সামনে অবধারিত, এটা ২০০৯ সাল থেকেই স্পষ্ট। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিদ্যুৎ উৎপাদনে জোর দেয় এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতা ৪ হাজার মেগাওয়াট থেকে ১০ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করে। বিদ্যুতের উৎপাদন বৃদ্ধি করতে গিয়ে গ্যাসের সরবরাহ সরকারকে বাড়াতে হয়, কারণ বিদ্যুৎ উৎপাদনে মূল জ্বালানি এটাই। গ্যাস দিয়ে এই পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাবে না জেনে সরকার বিদ্যুৎ সংকট সমাধানে টোটকা দাওয়াই হিসেবে নিয়ে আসে তেলভিত্তিক রেন্টাল বিদ্যুৎ প্রকল্প। পাশাপাশি পরিকল্পনা ছিল দ্রুতই বড় মাপের কিছু কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র করার। কিন্তু এখন পর্যন্ত ওই টোটকা দিয়েই চলছে।

বিদ্যুৎ সমস্যা সমাধানে স্থায়ী ও দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামোতে যাওয়া যায়নি। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের ব্যবহার কমানো যায়নি। বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে গ্যাসের চাহিদা রয়েছে গড়ে সাড়ে ১৫শ’ মিলিয়ন ঘনফুটের মতো। পাচ্ছে গড়ে সাড়ে ৭শ’ মিলিয়ন ঘনফুট। সার উৎপাদনেও একইভাবে ব্যবহার হচ্ছে গ্যাসের। সার কারখানাগুলোতে গ্যাসের চাহিদা রয়েছে গড়ে ২৩৭ মিলিয়ন ঘনফুট। কিন্তু পাচ্ছে গড়ে ৬৬ থেকে ৭০ মিলিয়ন ঘনফুট। চাহিদার অর্ধেকেরও কম সরবরাহ করে এ দুই খাতেই যাচ্ছে ৫০ ভাগ গ্যাস। চাহিদা অনুযায়ী দিলে সব গ্যাসই এখানে চলে যেত।

সরকারের প্রথম পরিকল্পনা হওয়ার কথা ছিল, প্রাথমিক জ্বালানি হিসেবে গ্যাসের ব্যবহার বন্ধ করা। কিন্তু তা করা যায়নি। তবে এর মধ্যেই বিভিন্ন সরকারের আমলে গ্যাস রপ্তানির বিধান রেখে বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে গ্যাস উত্তোলনের চুক্তি ও টাটার মতো বিদেশি কোম্পানির শিল্পে গ্যাস সরবরাহ করার চেষ্টা হয়েছিল। আন্দোলনের মুখে তা বন্ধ হয়েছে বটে! তবে বন্ধ করা না গেলে গ্যাস সংকট যে আরও এগিয়ে আসত তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এটাই নির্দেশ করে যে সরকারগুলো সমস্যা সমাধানের পরিকল্পনা না করে যার যার সুবিধামতো পদক্ষেপ নিচ্ছিল।

বর্তমানে সরকার গ্যাস সংকট সমাধানে নানা উদ্যোগের কথা বলছে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে বিদ্যুৎ ও সারে গ্যাসের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনা এর মধ্যে সেভাবে নেই। সরকারের হাতে দু’ ধরনের সমাধান আছে। আশু সমাধান হলো গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানো এবং কিছু ক্ষেত্রে গ্যাসের সরবরাহ বন্ধ করা। যেমন, ইটভাটায় গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করা হয়েছে। বাসাবাড়িতে নতুন করে গ্যাসের সংযোগ দেওয়া বন্ধ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে লিকুইফায়েড পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে সরকার।৪

দীর্ঘমেয়াদে সরকারের সামনে রয়েছে একটাই সমাধান, বিকল্প জ্বালানির জোগান নিশ্চিত করা। সরকার তা দু’ভাবে মোকাবিলার কথা ভাবছে। প্রথমত গ্যাস আমদানি। এজন্য লিকুইফায়েড ন্যাচারাল গ্যাস (এলএনজি) আমদানির পরিকল্পনা হয়েছে। কক্সবাজারের মহেশখালীতে এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের কাজ চলছে। পরিকল্পনা মোতাবেক এ থেকে প্রতিদিন ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস আসবে। ২০১৭ সাল থেকে এ গ্যাস ব্যবহার করা যাবে বলা হচ্ছে। পাশাপাশি পারমাণবিক বিদ্যুৎ ও কয়লার ব্যবহার দ্বারা গ্যাসের ব্যবহার প্রতিস্থাপন।


এলপিজির আলাপ দিয়ে গ্যাস সঙ্কট আড়াল করাটা সরকারের গাফিলতিকেই তুলে ধরছে!

সরকারের এই পরিকল্পনায় কোনো অতীত মূল্যায়ন নেই, রয়েছে অসঙ্গতিও। প্রথমেই আক্রমণ করা হয়েছে রান্নার গ্যাসে। যা কিনা বড় কোনো সমস্যা নয়। কিন্তু সরকার সব আলোচনা ঠেলে এলপিজিতে নিয়ে গেছে। বর্তমানে দেশে প্রায় ৪ লাখ টন চাহিদার বিপরীতে এলপি গ্যাসের সরবরাহ ১ লাখ ৮০ হাজার টনের মতো। এর মধ্যে ১ লাখ ৬০ হাজার টন হয় আমদানি, আর বাকি প্রায় ২০ হাজার টন তৈরি হয় সরকারি কারখানায়। সরকার এখন এলপিজি নির্ভরতার পথ দেখালেও ২০১২ সালে তারা পরিকল্পনা করেছিল বেসরকারি খাতের পাশাপাশি সরকারি খাতে বাগেরহাটের মংলায় ও চট্টগ্রামের কুমিরায় ১০০ মেট্রিক টন করে দুটি এলপি গ্যাস সিলিন্ডারজাত করার কারখানা প্রতিষ্ঠা করা হবে। কিন্তু সরকারি সেই পরিকল্পনা এখনও কল্পনাতেই বন্দী। এখনই এলপিজির ঘাটতি আছে। এর মধ্যেই সরকার এলপিজির বাজার তৈরি করতে ভূমিকা রাখছে।

অনেকেই এমনটা মনে করেন যে, সরকার গ্যাস সংকটের সমাধান হিসেবে এলপিজি সামনে আনছে না। বরং কিছু এলপিজি ব্যবসায়ীর মুনাফার জন্যই এলপিজির এত বিজ্ঞাপন। এই আশঙ্কাকে বাতিল করে দেয়া যায় না, কারণ সরকার নিজে এলপিজি সরবরাহের কোনো উদ্যোগ নেয়নি। ফলে বাজারের ঘাটতিকে ব্যবহার করে অসাধু ব্যবসায়ীরা এখনই ৭০০-৮০০ টাকার সিলিন্ডার ১৫০০ টাকায় বিক্রি করছে। কালোবাজারির মাধ্যমে বাড়া এলপিজির এই দামকে ভিত্তি ধরেই সরকার আবাসিক গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব করেছিল। অথচ পরিকল্পনা অনুযায়ী সরকারের উচিত ছিল এলপিজির দামকে স্বাভাবিক রাখা ও আবাসিকের পাইপলাইনকে এই নিয়ন্ত্রিত মূল্যের এলপিজি দিয়ে প্রতিস্থাপন করা, সেটা সহজও হতো। কিন্তু সেই উদ্যোগ না নিয়ে এলপিজির দিকে যাওয়ার আগ্রহটা ওই আশঙ্কাকেই শক্তিশালী করে।

বিদ্যুৎ সংকট কালের অভিজ্ঞতাকেও এক্ষেত্রে আমলে নেয়া যায়। সে সময় সরকার নিজে বড় বিদ্যুৎ কেন্দ্র গঠনের কাজে না এগিয়ে ব্যক্তিমালিকানায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে জোর দিল। তাদের কাছ থেকে বাজার দরের বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনে নিল। এভাবে এগুতে এগুতে এখন দেশে ৪৫ ভাগ বিদ্যুতের উৎপাদন ক্ষমতা বেসরকারি খাতে। তবে আগামী দু’ বছরে ৭৬টি ছোট-বড় বিদ্যুৎ কেন্দ্র উৎপাদনে আসবে। ১৬টি বিদ্যুৎ কেন্দ্র উদ্বোধনের অপেক্ষায় আছে। এর মধ্যে ১৪টিই বেসরকারি। এগুলো চালু হলে বেসরকারি খাতের আধিপত্য আরও বাড়বে। এমনকি বেসরকারি পর্যায়ে রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পগুলোও চালু আছে। সরকারের পথ নকশা থেকে দেখা যায়, ২০১৬ সালের মধ্যে ১৩ হাজার ১৫৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে যার মধ্যে ৫ হাজার ৯১৯ মেগাওয়াট মাত্র সরকারি খাতে আর বেসরকারি খাতে যুক্ত হবে ৭ হাজার ২৩৫ মেগাওয়াট। এসবের ফলে বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে।

পরিসংখ্যান বলে, সরকারি খাতের গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের প্রতি ইউনিটে খরচ পড়ে ২ টাকা ৯০ পয়সা। অন্যদিকে বেসরকারি খাতে এ খরচ গড়ে ৪ টাকা ৮০ পয়সা। যেমন রুরাল পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেডের (আরপিসিএল) মালিকানাধীন ময়মনসিংহ গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটিতে উৎপাদন ব্যয় পড়ে সাড়ে পাঁচ টাকারও বেশি। পিডিবির তথ্য অনুযায়ী, বিদ্যুৎ খাতে প্রতিবছর ভর্তুকির প্রায় শতভাগই যাচ্ছে রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রে। ২০১২-১৩ অর্থবছরে রেন্টালে ব্যয় হয়েছে ভর্তুকির ৯৯ দশমিক ৮২ শতাংশ অর্থ। সে বছর মোট ৫ হাজার ১৭২ কোটি টাকা ভর্তুকি দেয়া হয়। এসব হিসাব দেখিয়ে দেয় যে, বিদ্যুৎ সংকট সমাধানের চেয়ে বিদ্যুৎ সংকটকে ব্যবহার করে মুনাফা করার ব্যবস্থাপনা উন্নতি করে বেশি। গ্যাসের ক্ষেত্রেও সেই ধারাবাহিকতাই পরিলক্ষিত হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপগুলো কার্যকর করা হচ্ছে না, কিন্তু সংযোগ বন্ধ করে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের ব্যবসায় নামিয়ে দেয়া হচ্ছে।৫

তাছাড়া ১০ ভাগ আবাসিক গ্যাস কোনো সংকটেরই কারণ নয়। প্রাথমিক জ্বালানি হিসেবে বিদ্যুৎ ও সারে ভিন্নতর জ্বালানির সংস্থান না করতে পারলে এলপিজি দিয়ে গ্যাস সংকট সমাধান করা যাবে না। বড় উৎপাদন ক্ষমতার কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো এগোয়নি। বিদ্যুতে সরকারের আশা এখন যে প্রধান দুটি প্রকল্প, তাও বিরোধিতার সম্মুখীন। রামপালে ১৩৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন কয়লাভিত্তিক ও রূপপুরে ১৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র দুটি পরিবেশ ও জাতীয় নিরাপত্তার নিরিখে সমস্যার কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। এর বিরুদ্ধে আন্দোলনও চলছে। সরকার এক্ষেত্রে কোনো বিকল্পের সন্ধান দিতে পারেনি।

রেন্টাল যখন টোটকা দাওয়াই হিসেবে এসেছিল, তখন বিশেষজ্ঞরা বলেছিলেন এতে ব্যয় বাড়বে, সংকটের সমাধান হবে না। এখন একইভাবে এলপিজির সমাধান আসছে! এটাও কোনো সমস্যার সমাধান করতে পারবে না, কেবল জ্বালানি খাতে নাগরিকের ব্যয়বৃদ্ধি ঘটানো ছাড়া।

করণীয়
১৯৯৬ সালে জাতীয় জ্বালানি নীতি প্রণয়ন করা হয়। সেই জ্বালানি নীতিতে গ্যাসভিত্তিক জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে সম্ভাব্য জ্বালানি নিরাপত্তা ঝুঁকির ব্যাপারে পরিষ্কারভাবে সতর্কবাণী উচ্চারণ করা হয়েছিল। বলা হয়েছিল, মনোফুয়েল-নির্ভরতা বাংলাদেশের জন্য আগামীতে জ্বালানি নিরাপত্তা ঝুঁকির সৃষ্টি করতে পারে। তখন সুনির্দিষ্টভাবে পরামর্শ দেয়া হয়, দেশের উত্তর-পশ্চিমে যে কয়লা আছে তা ব্যবহারের উদ্যোগ নেয়ার। পেট্রোবাংলার হিসেবে, ২০১৯ সালের মধ্যে গ্যাসের চাহিদা দাঁড়াবে প্রায় ৩ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট। প্রাথমিক জ্বালানি হিসেবে গ্যাসের ব্যবহার প্রতিস্থাপন করা গেলে এই চাহিদা হতো অর্ধেক এবং তা নিজস্ব গ্যাস থেকে ভালোভাবেই সামাল দেয়া যেত।৬

দেখা যাচ্ছে, সরকার পরিকল্পনা সময়মতো করলেও তার বাস্তবায়ন হয় সরকারে থাকা নানাপক্ষের প্রয়োজনের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে। যেমন এখনও প্রাথমিক জ্বালানি প্রতিস্থাপনের উদ্যোগ আসেনি অথচ এলপিজি ব্যবহারের রাস্তা তৈরি করা হচ্ছে। অথচ দরকার ছিল, ধীরে ধীরে বাজারে এলপিজির সরবরাহ বৃদ্ধি করে এর দাম নিয়ন্ত্রণে এনে আবাসিক গ্যাসকে পর্যায়ক্রমে এলপিজির দিকে নিয়ে যাওয়া। তারও আগের পদক্ষেপ হচ্ছে, সার ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার নিশ্চিত করা। কিন্তু সেসব পদক্ষেপ না নিয়ে কেবল এলপিজি নিয়ে সরকারের ঊর্ধ্বতনদের মাতামাতি দেখিয়ে দিচ্ছে যে, গ্যাস সংকটের সমস্যাও রেন্টালের মতোই টোটকা দাওয়াই দিয়ে গভীরতর করা হচ্ছে।

শেষ কথা
শিল্পে গ্যাস সংকট কোনো নতুন কথা নয়। ২০০৯ সাল থেকে শিল্পে গ্যাস সংযোগ বন্ধ আছে। সম্প্রতি সরকারের একটি বিশেষ কমিটি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ৮০০ শিল্পে গ্যাস সংযোগ দেয়ার প্রস্তাব করেছে। বর্তমানে বিদ্যুৎ খাতের অবস্থা অপেক্ষাকৃত ভালো বলে মনে হলেও বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের সরবরাহ অনিশ্চিত হলে কেবল গ্যাস খাত নয়, একইসঙ্গে বিদ্যুৎ খাতও ডুববে। সরকারের জানা থাকার কথা যে, শিল্পে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের চাহিদাও এ সময়ে বাড়বে।

প্রমাণিত মজুদ বলছে, হাতে সময় আছে মাত্র ১০ বছর। এর মধ্যে নতুন গ্যাস আবিষ্কার না হলে অচিরেই বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে গ্যাস প্রত্যাহার করতে হবে। নতুন গ্যাস মিললেও অচিরেই এই পথে হাঁটতে হবে। সুতরাং সেই আলাপকেই সামনে আনা দরকার। গ্যাস সংকটের বাস্তব কারণ ও বাস্তব সমাধান জনগণের কাছে তুলে ধরা দরকার।

গাড়ি ও বাসা বাড়ির গ্যাস বন্ধ করতে হলে এভাবে খুদে গ্রাহকদের ওপর এলপিজি ব্যবসায়ীদের চাপিয়ে দিয়ে এর কোনো সমাধান হবে না। এ নিয়ে জাতীয় পরিসরে প্রচারণা ও প্রস্তুতি দরকার। কিন্তু সরকার আগের ধারাবাহিকতায় চলছে, নেই সুষ্ঠু পরিকল্পনা! আছে কেবল ভাগ-বাটোয়ারার জন্য যা দরকার সেসব পদক্ষেপ আর যেকোনো অভিযোগের বিপরীতে আছে রাশি রাশি প্রতিশ্রুতি!

তথ্যসূত্র
১। পেট্রোবাংলা, দৈনিক গ্যাস উৎপাদনের রিপোর্ট, গ্যাস বন্টনের চিত্র, এমআইএস রিপোর্ট, অক্টোবর-২০১৫ ও ফেব্রুয়ারি-২০১৫ এর তুলনা
২। জ্বালানি নিরাপত্তা: একটি বহুস্তর ভাবনা, ম তামিম| বণিক বার্তা
৩। জ্বালানি নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়তে যাচ্ছে, অধ্যাপক এম শামসুল আলম। সাপ্তাহিক
৪। ২৬ জানুয়ারি, ২০১৬ সংসদে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ
৫। ২০১৩-১৪ অর্থবছরের ভাষণে অর্থমন্ত্রীর দেয়া তথ্য
৬। জাতীয় জ্বালানি নীতি, ১৯৯৬ এবং বিদ্যুৎ খাত মহাপরিকল্পনা (মাস্টারপ্ল্যান), ২০০৫ ও ২০১০। ২০০৫-এর নীতিতে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুতের পরিকল্পনাই নেয়া হয় কিন্তু ২০১০ এর পরিকল্পনায় প্রাথমিক জ্বালানি থেকে গ্যাসকে বাতিল করা হয়।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৩ thoughts on “গ্যাস সংকট সমাধানেও টোটকা দাওয়াই! (বিশ্লেষণ)

  1. লুটপাট এখন রাষ্ট্রের
    লুটপাট এখন রাষ্ট্রের প্রকাশ্যে ঘোষিত কর্মসূচী। যেভাবে দায়মুক্তি আইন করে জ্বালানি খাতে যা খুশি তাই করছে, তাতে এ খাতের কোনো সমস্যাই সমাধান হওয়া সম্ভব না।

  2. পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্য ব্লগে
    পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্য ব্লগে আইডি তৈরি করার লিংক………
    W/B blog
    http://­www.nalokpublication.­com/
    এই লিংকে যাও

    তারপর দেখ sing In /Register লেখার ওখানে ক্লিক কর এরপরে নীচের দিকে লেখা আছে Continue With Faceboob লেখাটিতে ক্লিক কর, তারপর ok লেখা বেরবে ok তে ক্লিক করলেই ব্লগের আইডি হয়ে গেল

    http://www.nalokpublication.com

  3. পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্য ব্লগে
    পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্য ব্লগে আইডি তৈরি করার লিংক………
    W/B blog
    http://­www.nalokpublication.­com/
    এই লিংকে যাও

    তারপর দেখ sing In /Register লেখার ওখানে ক্লিক কর এরপরে নীচের দিকে লেখা আছে Continue With Faceboob লেখাটিতে ক্লিক কর, তারপর ok লেখা বেরবে ok তে ক্লিক করলেই ব্লগের আইডি হয়ে গেল

    http://www.nalokpublication.com

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

5 + 1 =