ক্লোজড পুলিশ, একজন চাঅলা ও অনলাইনে আমরা ক’জন

 

সম্প্রতি বিভিন্ন অপরাধ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে পুলিশের নাম উঠে আসছে নিয়ম করে। আগে থেকেই বাংলাদেশের পুলিশ বাহিনী নানা কারণে সমালোচিত। কিন্তু গত কয়েক বছর, বিশেষ করে গেল কয়েক মাসে পুলিশ একের পর এক ঘটনার জন্ম দিয়েছে, যা জাতীয় পরিসরে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। কোথাও তারা নিজেরা অপরাধী, কোথাও অপরাধীকে ছেড়ে দিচ্ছে, কোথাও বা অপরাধের সময় উপস্থিত থেকেও ভূমিকা নিচ্ছে না।

হতাশার বিষয় হচ্ছে, পুলিশের অপরাধ বিশ্লেষণ আগেও অনেক হয়েছে। এর আগেও পুলিশ অনেক কিছু ঘটিয়েছে। সেজন্য ব্যক্তি পুলিশ সদস্যরা কেউ কেউ শাস্তিও পেয়েছেন। কিন্তু সামগ্রিকভাবে এই বাহিনীর রূপান্তর ঘটানো কিংবা পুরো পুলিশি ব্যবস্থার মধ্যে পরিবর্তন আনার কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। যখনই পুলিশ সদস্যদের অপরাধ সামনে চলে আসে, তখনই সরকার সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যকে ক্লোজ (প্রত্যাহার) করেন। নিয়মিত এই ব্যবস্থা নিতে নিতে এটা একটা সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে।

এই ‘ক্লোজড’ শব্দটাও এমনভাবে ব্যবহার হয়, যেন বিরাট কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। মিডিয়াও ক্লোজের পর বড় বড় হরফে লিখে সে খবর প্রচার করে, কিন্তু এর গোমর ফাঁস করে না। আসলে এর অর্থ হচ্ছে, দায়িত্ব থেকে ওই পুলিশ সদস্যকে পুলিশ লাইনে ফেরত নেয়া, অর্থাৎ সবেতন ছুটি! এ রকম ছুটিতে ক্লোজড হওয়া অপরাধী পুলিশ সপ্তাহখানেক থাকেন। এরপর আবার তাকে নতুন কোনো জায়গায় দায়িত্ব দেয়া হয়। এরপর নিয়মমাফিক অন্য পুলিশ সদস্যরা ওই অপরাধের তদন্ত করে এবং নিয়মানুযায়ী এক পুলিশ আরেক পুলিশের কোনো অপরাধ খুঁজে পায় না। ফলে ক্লোজড হওয়া ওই পুলিশ কিছুদিনের মধ্যেই নিরপরাধী প্রমাণীত হন।

ক্লোজড হওয়াটা তাই আদতে কোনো শাস্তি নয়, বরং পুরস্কার। পুলিশেরা কিছুদিন বিশ্রাম বা অবসরে থাকার সুযোগ পায় এর কল্যাণে। সরকার এই পদ্ধতি দিয়েই পুলিশের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোকে দীর্ঘদিন ধরে মোকাবিলা করে আসছে। এ কারণে পুলিশ সংক্রান্ত সমস্যা কেবল বেড়েছেই। কতটা বেড়েছে, সে সম্পর্কে নতুন করে ধারণা দেয়ার দরকার আছে বলে মনে হয় না। কিছুদিন আগেই ম্যাজিস্ট্রেটকে আটকে রেখে টাকা আদায় করে ক্লোজড হয়েছে পুলিশ। এরপরে তরুণীকে পতিতা বানিয়ে টহল গাড়িতে করে ঘুরিয়ে টাকা আদায়কালে র্যা বের হাতে ধরা পড়েছে পুলিশ, তারাও ক্লোজড। এরপর চাঁদার টাকা না পেয়ে চাঅলার গায়ে আগুন দিয়ে তাকে হত্যা করল পুলিশ, তার ফলও ক্লোজড।

পুলিশের আয় খুব বেশি নয়। একজন কনস্টেবলের বেতন সব মিলিয়ে মাসে ৯ হাজার ৯৫ টাকা। একজন সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই), টাউন সাব-ইন্সপেক্টর (টিএসআই) ও সার্জেন্টের বেতন সব মিলিয়ে ১৬ হাজার ৫৪০ টাকা। নতুন স্কেল অনুযায়ী এ বেতন এখন দেড়গুণ বেড়েছে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, পুলিশ সদস্যরা ও কর্তারা ব্যাপক ভোগ-বিলাসের মধ্যে বাস করেন। অবস্থা এরকম যে, ঘুষ এদেশের পুলিশ বাহিনীতে জনপ্রিয় এক প্রথায় পরিণত হয়েছে। সর্বোচ্চ স্তর থেকে গ্রাম পর্যন্ত এই ব্যাধির বাস। গত বছর উচ্চপদস্থদের ম্যানেজ করতে বরিশাল পুলিশের তহবিল গঠন, টাকার বিনিময়ে ক্রসফায়ার, আসামিকে পালাতে সাহায্য করার মতো সব মহলে আলোড়ন তোলা ঘটনাগুলোও এই পরিস্থিতির কোনো হেরফের ঘটাতে পারেনি।

পুলিশ পুনর্গঠনের প্রশ্নটা আসে সাধারণত জেল থেকে বড় নেতারা বের হওয়ার পর। পুলিশ রিমান্ডের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা স্মরণ করে এমন নেতারা বক্তব্য-বিবৃতি অনেকই দিয়েছেন। কিন্তু রিমান্ডে নিয়ে অর্থ আদায়, মারপিট, অবৈধ কাজ করা পুলিশ ছাড়েনি। সাধারণত দেয়ালে পিঠ ঠেকে না গেলে ভয়, নিরাপত্তাহীনতা, হয়রানি, অভিযোগ দায়ের পদ্ধতির জটিলতা ইত্যাদি কারণে কেউ পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগই করেন না, আর মামলা তো দূরে থাক। অভিযোগ দায়ের করেও লাভ নেই। তাই রিমান্ডে কী হয়, এটা সাধারণ আসামিদের কাছ থেকে তেমন জানা যায় না। যদিও নিঃসন্দেহে বলা যায়, সাধারণ গরিব মানুষই প্রশাসন কর্তৃক বেশি নিপীড়নের শিকার হন। পুলিশি নির্যাতন আমলে নিলে এই রিমান্ড সংস্কৃতিকেও আলাদাভাবে বিচার করতে হবে। রিমান্ডে অত্যাচার চালানোর লাইসেন্স পুলিশ কিভাবে পায়?


পুলিশের এই চেহারার পেছনে ক্ষমতায় আসা সব সরকারেরই দায় আছে!

দেশের বিত্তশালীরা পুলিশের এই চেহারা কমই দেখে থাকেন, বরং টাকার বিনিময়ে ও ক্ষমতার জোরে তারা পুলিশকে দিয়ে যা খুশি করিয়ে নিতে পারেন। তাছাড়া একজন মালিক যখন শ্রমিকদের বেতন দেন না, তাদের বঞ্চিত কএন, পুলিশ তখন সেই মালিককে অভিযুক্ত করে না। বরং শ্রমিকরা বেতনের দাবিতে রাস্তায় নামলে পুলিশ তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তাই ধনীদের কাছে পুলিশ খুবই ভালো। কারণ পুলিশ দিয়ে তাদের স্বার্থরক্ষা হয়। বিপরীতে পুলিশের হাতে নিপীড়নের শিকার হই আমরা মধ্যবিত্ত ও বিত্তহীনরা।

গত ৩ জানুয়ারি, বুধবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে রাজধানীর শাহআলী থানাধীন গুদারাঘাটে চাঁদার টাকা না পেয়ে চা দোকানি বাবুল মাতুব্বরের গায়ে আগুন লাগিয়ে দেয় পুলিশ। এমন অভিযোগ করেছেন দগ্ধ ব্যক্তি ও তার পরিবারের সদস্যরা। এমনকি প্রত্যক্ষদর্শীরাও সাক্ষ্য দিয়েছেন যে, গুদারাঘাটে কিংশুক বহুমুখী সমিতির গেটের পাশে রাস্তায় বাবুল মাতুব্বরের চা দোকান। চুলা হিসেবে কেরোসিনের স্টোভ ব্যবহার করেন। বুধবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে শাহআলী থানা পুলিশের একটি টহল টিম মাইক্রোবাসে তার দোকানে যায়। রাস্তায় দোকান বসানোর জন্য পুলিশ তার কাছে চাঁদা চায়। টাকা দিতে রাজী না হওয়ায় পুলিশের সঙ্গে তার তর্ক হয়। একপর্যায়ে পুলিশ লাঠি দিয়ে স্টোভের চুলায় আঘাত করে। স্টোভের কেরোসিন ছিটকে তার গায়ে পড়ে আগুন ধরে যায়। দোকানেও আগুন লাগে। এতে তিনি দগ্ধ হন। পুলিশ তাকে সাহায্য না করে মাইক্রোবাস নিয়ে কেটে পড়ে।

ঘটনাটি পুলিশি নির্যাতনের বাস্তব চিত্রই শুধু আমাদের সামনে হাজির করছে না, পাশাপাশি আমাদের মুখোশটাও খুলে দিচ্ছে। অনলাইনে দেখুন, দিন-রাত কত বিষয় নিয়ে আমাদের উত্তেজনা। অথচ এই চাঅলা ভাই আমাদের কারও মনোযোগ পেল না। মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে হলো তাকে। আর এর কারণ পুলিশ, অথচ আমরা সবাই নিশ্চুপ। এমনিতে ময়লা সাফ করা নিয়ে বিতর্কে আমরা পটু আছে। আবার আমের মৌসুম, শীতের মৌসুমেও আমাদের মানবতার হাতকে অনেক লম্বা দেখা যায়। কিন্তু অন্যায় হলে, রাষত্র অন্যায় করলে আমরা তখন মুখে আঙুল দিয়ে বসে থাকি।

অনলাইনে এখন অনেক সুশীলকে পাওয়া যাবে যারা চেতনার সরকারের কোনো ধরণের ডিস্টার্ব করার বিরুদ্ধে, সুতরাং তারা চুপ। আমাদের নারীবাদীরা, নারী আন্দোলনের কর্মীরা তো কবেই ঘরে ঢুকে গেছেন। বুদ্ধিজীবীরা সব আছেন নিজ নিজ পকেট ভরার কাজে ব্যস্ত। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর মতো বুদ্ধিজীবীরা যান আমিন জুয়েলার্সের মালিকের কাছ থেকে টাকা নিতে। ওদিকে একদল বইমেলার গুষ্টি উদ্ধারে ব্যস্ত, তারা কেবল অভিজিতের বইয়ের পক্ষেই লড়বে! ছাত্র আন্দোলনের নেতারা দেখেছি পুলিশ ছাত্রীদের ওপর হামলা করলেই কেবল উত্তেজিত হন, এছাড়া তারা এখনকার মতোই নীরব থাকেন সব সময়। এসব গ্রুপের লোকজনকে দেখিনি ওই চাঅলার মৃত্যুকে অন্যায় মনে করে তার বিরুদ্ধে কোথাও বক্তব্য রেখেছেন বা অন্যদের জোটবদ্ধ হতে ডাক দিয়েছেন। গরিবের মৃত্যু যে সবাইকে কাঁদায় না, এমন নজির আমরা আগেও অনেক দেখেছি।

এটুকু তো পরিষ্কার বোঝাই যায় যে, রাজনৈতিক সমস্যাগুলো পুলিশ দিয়ে মোকাবিলা করার সরকারি নীতিই পুলিশের আজকের এই লাগামহীন অপরাধের জন্য দায়ী। সব সরকারই এই নীতি প্রয়োগ করেছে। অবাধে সরকারবিরোধী পক্ষগুলোকে পেটানোর লাইসেন্স পেয়ে আসছে পুলিশ। এমনকি রাজনৈতিক স্বার্থে মিথ্যা মামলা বানানোর কাজেও তারা ব্যবহৃত হয়েছে। বাংলাদেশে এ যাবৎ ক্ষমতায় আসা সরকারগুলোর সাধারণ প্রবণতা হচ্ছে, সরকার তার রাজনৈতিক ক্ষমতার তুলনায় পুলিশের ওপর বেশি নির্ভরশীল থাকে। এর ফলে পুলিশের ক্ষমতা উত্তরোত্তর বেড়েছে। আইন পাল্টে, সুযোগ-সুবিধা বাড়িয়ে এবং অবৈধভাবে রাজনৈতিক ক্ষমতার অংশীদার করে পুলিশকে ক্রমশ ফ্যাসিস্ট প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত করা হয়েছে।

পুলিশের পুনর্গঠন জরুরি। আর সেজন্য প্রথমে দরকার আমাদের সরব হওয়া। কেবল ছাত্র আন্দোলনের ওপর পুলিশি হামলা হলে নয়, পুলিশের যেকোনো অন্যায়কেই আলাদা মাত্রায় বিচার করতে হবে এবং তার বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিতে হবে। পুলিশকে অতিরিক্ত ক্ষমতা দেয় এমন আইনগুলো সংশোধন, পুলিশি কর্মকাণ্ডে জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠার জন্য সময়োপযোগী ব্যবস্থা গ্রহণ এবং কার্যকর অর্থেই পুলিশকে জনগণের অধীনস্ত সংস্থা হিসেবে দাঁড় করাতে হবে। বর্তমানে সারা বিশ্বেই পুলিশকে দমনমূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে, আর আমাদের এখানে তো দেশের রাজা পুলিশ। এমনকি তারা নিজেরা এও বলে বেড়ায় যে, আমরা লাইসেন্সধারী মাস্তান।

অনেক আলাপই হলো। পুলিশি নিপীড়নের মাত্রা সম্পর্কে আমরা কম বেশি জানি। কিন্তু অনলাইনে তো আমরা কম নই। অনেক ইস্যুতে এখান থেকে প্রতীবাদ হয়েছে, ফলও মিলেছে। কিন্তু একজন চাঅলা যখন পুলিশের হাতে মরে, তখন আমরা নীরব থাকি। আমাদের অনলাইন সৈনিকেরা তখন ময়লা থেকে মুক্তির জন্য যুদ্ধে ব্যস্ত থাকেন। কেউ কেউ বইমেলায় কার বই আছে, কারটা নাই, তা নিয়ে ব্যস্ত থাকেন! হেফাজতের আগুন, বিএনপি-জামাতের আগুন নিয়ে লাখ লাখ পোস্ট দেয়া গেছে। কিন্তু চাঅলা আগুনে পুড়লে তার হত্যাকান্ড নিয়ে কথা বলার সময় আমাদের হয় না। এরকম একচোখা হারামি অ্যামনেস্টি টাইপের সুশীলতার অবসান ঘটাতে হবে। তা পারা গেলে তবেই কেবল পুলিশি নির্যাতনের বিরুদ্ধে আমরা কার্যকর কোনো ভূমিকা রাখার দিকে এগুতে পারব।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৫ thoughts on “ক্লোজড পুলিশ, একজন চাঅলা ও অনলাইনে আমরা ক’জন

  1. ঠিকই বলেছেন পুলিশের এই ক্লোজড
    ঠিকই বলেছেন পুলিশের এই ক্লোজড ব্যাপারটাকে মিডিয়া এমনভাবে হাজির করে যেন, বিরাট ব্যবস্থা নেয়া হইছে, আসলে পুরোটা ফাঁকি।

    চাঅলা হত্যাকারি পুলিশের ফাঁসি চাই। আপরাধী সংগঠন পুলিশের পুনর্গঠন চাই। দলীয় স্বার্থে পুলিশের ব্যবহার বন্ধ চাই। ভবিষ্যতে পুলিশবিহীন দেশ চাই।

  2. এদেশে হাজার হাজার কোটি টাকা
    এদেশে হাজার হাজার কোটি টাকা ট্যাক্স দিয়ে এই সব পুলিশ
    পোষার দরকার কি।

    [বতর্মানে পুলিশকে ৫০ টাকা নতুন
    নোট দিলেই পার পেয়ে যায়ে
    ইয়াবা-গাজা খুররা,আর ১০০টাকা
    দিলে মাফ হয়ে যায়ে যে কোন
    আপরাধ।]
    [যে দেশে পাবলিক প্লেসে
    সিগেরেট খেলে আইনে জরিমানার
    বিধাণ রয়েছে,আর সেই দেশে পুলিশ
    পাবলিক প্লেসে সিগেরেট খায়ে।]

  3. নব্য বিপ্লবীদের কাছে বিপ্লবের
    নব্য বিপ্লবীদের কাছে বিপ্লবের ক্ষেত্র এখন শুধু ফেসবুক। শুধু বড় বড় ষ্ট্যাটাস লিখেই নিজের প্রমোশন নিজে চালানো যায় মন্দ কি!

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

8 + 2 =