দিল্লির জেএনইউতে ‘অ্যান্টি-ন্যাশনালিস্ট’রা কী করছে!

 

ধীরে ধীরে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে দাঁড়াচ্ছে রাজনীতির মল্লভূমি। একদিকে বিজেপিসহ কট্টর জাতীয়তাবাদীরা বলছেন ক্যাম্পাসে সভা করে যারা দেশবিরোধী স্লোগান দিয়েছে তাদের ক্ষমা নেই। অন্যদিকে কংগ্রেস, বাম, জেডিইউ, আপের মতো দলগুলো বলছে, কেন্দ্রীয় সরকার ও বিজেপি টার্গেট করেছে জেএনইউকে, কারণ এই প্রতিষ্ঠান জ্বি হুজুর মনোভাব নিয়ে চলে না।

দু’পক্ষই আক্রমণাত্মক। রাহুল গান্ধী কাল গিয়েছিলেন সেখানে। তাকে কালো পতাকা দেখিয়েছে ছাত্রদের একাংশ। আর বিরোধী রাজনীতিকদের সমর্থনপুষ্ট ছাত্রছাত্রীরা এখন ছাত্রনেতাদের ধরপাকড়ের বিরুদ্ধে নেমে পড়েছে জোরদার আন্দোলনে। ইতিমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনা ক্রমশই বিভক্ত করেছে বৃহত্তর সমাজকে। অতীতে অসহিষ্ণুতার প্রতিবাদে পুরস্কার সম্মান ফেরত দিচ্ছিলেন সরকারবিরোধীরা। এবার জেএনইউ–এর প্রাক্তন সেনা অফিসারেরা পাল্টা হুমকি দিয়েছেন। তারা ফেরত দেবেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি।

ছাত্রনেতা গ্রেপ্তার নিয়ে দিল্লি জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন উত্তেজনা চরমে সেই সময় কাল কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের সঙ্গে দেখা করে বাম ও জেডিইউ নেতাদের এক প্রতিনিধিদল। প্রতিনিধিদলে ছিলেন সিপিএম সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি, সিপিআইয়ের জাতীয় সম্পাদক ডি রাজা এবং জেডিইউর মুখপাত্র কে সি ত্যাগী। রাজনাথ সিং তাদের বলেন, কোনও নিরপরাধ ছাত্রকে হয়রান করা হবে না। কিন্তু দোষীরা ছাড়া পাবে না।

নেতারা বিশ্ববিদ্যালয়ে পুলিসি হস্তক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং জানতে চান কানহাইয়া কুমারকে কেন গ্রেপ্তার করা‍ হল। উল্লেখ্য, গতকাল দেশদ্রোহের মামলায় গ্রেপ্তার করা হয় কানহাইয়াকে। জেএনইউ ক্যাম্পাসে উগ্রপন্থী আফজল গুরুর ফাঁসির বিরুদ্ধে একটি সভার আয়োজন করা হয়েছিল। কানহাইয়া কুমার হলেন সিপিআইয়ের ছাত্র শাখা এআইএসএফের সদস্য।

গতকালই রাজনাথ সিং বলেছিলেন, কানহাইয়া ক্যাম্পাসে একটি অনুষ্ঠানে যে ভারতবিরোধী স্লোগান দিয়েছিল, তা বরদাস্ত করা হবে না। এই ধরনের আচরণের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দেশের ঐক্য ও সংহতি নিয়ে যদি কেউ প্রশ্ন তোলে, কোনও মতেই তাদের ছেড়ে দেওয়া হবে না। তার এই বক্তব্যকে অনেকেই ফ্যাসিস্ট হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। কারণ কারো রাজনৈতিক মতবাদে এটা থাকতেই পারে যে, তারা এই দেশটাকে খোল-নলচেসমেত বদলে দিতে চান। সেক্ষেত্রে তারা দেশের ওপর বিদ্যমান রাষ্ট্রকাঠামোর বিরোধিতা করতেই পারেন। রাজনাথ ‘রাষ্ট্রবিরোধিতা’কে ‘দেশবিরোধিতা’ হিসেবে গণ্য করছেন এবং এটা ভুল।

ছাত্রনেতা কানহাইয়ার গ্রেপ্তারের প্রতিক্রিয়ায় রাহুল গান্ধী বলেন, মোদি সরকার ও এবিভিপি জেএনইউ–এর মতো একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ তুলছে, কারণ জেএনইউ তাদের লাইন মেনে চলে না। এটা অত্যন্ত নিন্দনীয়। তিনি বলেন, ভারতবিরোধী মনোভাব কখনই গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু মনে রাখতে হবে, বিক্ষোভ ও বিতর্ক গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। বিপরীতে কংগ্রেসের কাছে বিজেপির আবেদন, রাজনৈতিক কারণে আমাদের শহিদদের অপমান করবেন না। সৈন্যরা সীমান্তে জীবন উৎসর্গ করছেন আর উগ্রপন্থীদের শহীদ বানানো হচ্ছে জেএনইউ’র মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে।


গ্রেপ্তার ছাত্রনেতা কানহাইয়া কুমার

কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অনন্ত কুমার জেএনইউ’র ঘটনাকে জাতীয়তাবিরোধী আখ্যা দিয়ে বলেন, দোষীদের কড়া শাস্তি দিতে হবে। দেশদ্রোহীদের নিশ্চয়ই শাস্তি দেবে সরকার। আফজল গুরু ও অন্য সন্ত্রাসবাদীদের পক্ষে যারা স্লোগান দেয় তাদের শাস্তি থেকে নিস্তার নেই।

পুলিস ২০ জনের নামের তালিকা প্রকাশ করেছে, যাদের বিরুদ্ধে দেশদ্রোহের মামলা দেওয়া হয়েছে কোনও তদন্ত ছাড়াই। অন্যদিকে, উপাচার্য জগদীশ কুমারকে লেখা এক চিঠিতে প্রাক্তন সেনারা বলেছেন, আমরা ৫৪তম ন্যাশনাল ডিফেন্স অ্যাকাডেমি কোর্সের সদস্যরা এই ঘটনায় ব্যথিত হয়ে আমাদের পুরস্কার ও ডিগ্রি ফিরিয়ে দিতে চাই।

জেএনইউ-এর এই ঘটনাবলী ভারতীয় কাগজগুলোতে যেভাবে এসেছে তা জাতীয়তাবাদী প্রচারণার অংশ হয়েই এসেছে, এর বাইরে দাঁড়াতে পারেনি। এই অভিযোগ তো পুরনো যে, ভারতের শাসক দলগুলো বরাবরই সেদেশের জাতীয়তাবাদ চাঙা রাখার জন্য পাকিস্তানবিরোধী প্রচার প্রচারণাকে হাতিয়ার করেছে। অনেক তরুণরা এই বিরোধ-বাণিজ্য (কনফ্লিক্ট বিজনেস) থেকে বেরিয়ে আসতে চান। তারা ভারতের সেবানাহিনী ও পাকিস্তানের সেবানাহিনীর ব্যবসা বাণিজ্য ও রাজনীতিতে হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করে বক্তব্য রাখছেন।

গণঅধিকার প্রতিষ্ঠার নিমিত্তে সেনাবাহিনীর ‘যুদ্ধ-যুদ্ধ-ভাব’ বন্ধ ও তাদের ক্ষমতা খর্ব করার পক্ষে ছাত্ররা রায় দিয়েছেন। ছাত্রদের এসব দাবি আর সরকার এখন মুখোমুখি এসে গেছে। যার প্রেক্ষিতে কানহাইয়া কুমারকে গ্রেপ্তারসহ ২০জনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা দেয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকার সেনাবাহিনীকে তুষ্ট করছে! সেনা কর্মকর্তাদের ক্ষোভ ও পুরষ্কার ফেরতের আকাঙ্ক্ষাটা চোখে পড়ার মতো। এর আগে ৬৮ বছরে ভারতে কম অন্যায় হয়নি। কিন্তু কোনোদিনই সেনা কর্মকর্তারা পদক-ডিগ্রি ফেরত দেয়ার কথা ভাবেনি। এদিকে পুরো ঘটনাবলীকে ভারতপন্থী আর ভারতবিরোধী এমন রূপ দেয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে গণমাধ্যমগুলো!

যাই হোক, জেএনইউ’র শিক্ষার্থীরা যে শাসকদের কাছ থেকে ‘অ্যান্টি-ন্যাশনালিস্ট’ উপাধি পেয়েছে এটাই তাদের অর্জন। ন্যাশনালিস্ট না হয়ে আন্তর্জাতিকতা ও বিশ্ব মানবতার পতাকা বহনই তো প্রগতিশীলতা! তাছাড়া অখন্ড ভারত বিষয়ে অনেক ভারতীয়রই দ্বিমত আছে। তারা মনে করেন ভারত আদি থেকেই অনেক রাষ্ট্রের যগফল। বর্তমান এসভ দেশ ও জাতিকে জোর করে ভারতের পতাকায় আটকে রাখা হয়েছে। ভারতের বড় ধনী ও শাসকদের বিরোধিতা করে যখন তারা কথা বলছেন, শাসকরা তখন সেটাকে ‘অ্যান্টি-ন্যাশনালিস্ট’ তকমা লাগিয়ে দিচ্ছে! এর বিরুদ্ধেই সংগঠিত হয়েছে জেএনইউ’র ছাত্ররা। সাবাশ তরুণ প্রাণ!

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “দিল্লির জেএনইউতে ‘অ্যান্টি-ন্যাশনালিস্ট’রা কী করছে!

  1. ভারতে এন্টি-ন্যাশনালিস্ট অনেক
    ভারতে এন্টি-ন্যাশনালিস্ট অনেক আছে শুধু ধর্মীয় বিতর্ক ছড়িয়ে সেগুলোকে চাপা দিয়ে রাখার চেষ্টা চলছে । কিন্তু এই এন্টি-ন্যাশনালিস্টরা আর বেশি দিন চাপা থাকবে না । এই তো বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে ।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

8 + 2 =