কাজী আকরাম হোসেন- বৈরী সময়ের গল্প

সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপর্যয় ও কমিউনিষ্ট পার্টির বিভক্তিতে এই শিবিরের একটা বড় অংশ নিষ্ক্রীয় হয়ে পরলেন। অনেকে নিজেদের রাজনীতি, সমাজতন্ত্র ও সমাজপরিবর্তনের সংগ্রাম থেকে দুরে সরিয়ে রাখলেন। অনেকে অবস্থান গ্রহন করলেন এই আকাঙ্খা ও সংগ্রামের বিপরীত দিকে। আমরা যারা সেই সময়ে এই সংগ্রামের পক্ষে নিবেদিত, তখন দেখেছি-পেয়েছি এই সংগঠনের অনেক সুবিধাভোগী মানুষের অচেনা আচরণ ও অসহযোগিতা। একদিকে পারিবারিক ও সামাজিক পরিস্থিতির প্রতিকূলতা, অন্যদিকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের নানা অপপ্রচার, সেই সময়টিকে আরও জটিল করে তুলছিল। সেই বৈরী সময়ে হাতেগোনা যে কয়েকজন মানুষ আমাদের সাহস ও প্রেরণা ছিলেন তাদের অন্যতম একজন, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন’র সাবেক সভাপতি (১৯৭৬-৮০), বীর মুক্তিযোদ্ধা, সংগঠনের দুঃসময়ের কান্ডারী, অসাধারণ বক্তা কাজী আকরাম হোসনে।

আমি-আমরা প্রায়ই আকরাম ভায়ের ডিওএইচএস অফিসে যেতাম। সাধারণত যেতাম দুপুরের পরে। উনার অফিস সহকারীকে বলা থাকতো, আমি-আমরা গেলে সরাসরি উনার রুমে চলে যেতাম। অনেকের মত তিনি কখনো আমাকে বাইরে বসিয়ে রাখেন নি। রুমে ঢুকে বসতেই প্রথমে তিনি বলতেন, নিশ্চয়ই দুপুরে কিছু খাওয়া হয় নি? আমি হয়তো স্বলজ্জ বোধে বলতাম ‘না মধুতে রুটি-কলা খেয়েছি।’ তিনি বলতেন, আমার কাছে লুকাবার কিছু নেই। আমিওতো তোমাদের এই পথ হেঁটে এসেছি। তারপর তিনি কর্মচারীকে দিয়ে প্রথমে খাবার ব্যবস্থা করতেন। এবং অফিসের কাজের ফাঁকে ফাঁকে আমাদের সাথে কথা বলতেন। সংগঠনের নানা বিষয়ে কথা হতো। আকরাম ভাই ভাল ভাবেই জানতেন আমাদের প্রধান সমস্যা হচ্ছে সংগঠন পরিচালনার অর্থ।

৯০এর দশকে বিশ্ব রাজনীতির নয়াসমীকরণের উন্মাতাল হাওয়া এসে লাগে দেশীয় রাজনীতির পালে, সৃষ্টি হয় মস্কোপন্থী প্রগতিশীল বলয়ে নয়ামেরুকরণের পালা। সেই সময়ে সংগঠনের শুভাকাঙ্খীদের সাথে বিভিন্ন প্রয়োজনে যোগাযোগ করা সহজ ছিল না। কারন এই সময়ে অনেকের মতাদর্শগত অবস্থান ছিল হয় চ্যুত, নয় দ্বিধান্বিত। সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ে প্রশ্ন-বিতর্ক-আলোচনা ছিল বেশ অস্বস্তিকর ও বিব্রতকর। মনে হচ্ছিল অনেকের আস্থা ও বিশ্বাসের জায়গা ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। বেশ কিছু প্রাক্তন নেতার অসৌজন্যমুলক আচরণ-কথাবার্তায় হতাশ হয়েছি। তখন আকরাম ভাইকে পেয়েছি আমাদের সাহস ও আত্মবিশ্বাস হিসেবে। তিনি আমাদের তাঁর অফিসে বসিয়ে রেখে ছাত্র ইউনিয়নের প্রাক্তন বন্ধুদের ফোন করতেন সংগঠনকে সহযোগিতা করার জন্য। তিনি তাঁদের সাথে জোর গলায় কথা বলতেন, দাবী নিয়ে বলতেন, বুঝাতেন এবং তর্ক করতেন! তিনি আমাকে, সোহেলভাইকে বিভিন্ন জনের সাথে ফোনে যোগাযোগ করে সেখানে চাঁদা আনতে পাঠাতেন এবং তার ফলোআপ দেখতেন। সবসময় কাজ হতো, তা নয়। কিন্তু তিনি হাল ছাড়ার ব্যক্তি নন। আবার চেষ্টা করতেন, আমরাও যেতাম। মাঝে মাঝে খুব খারাপ লাগতো। একজন এতবড় মানুষ, তিনি আমাদের জন্য নিজেকে এভাবে ছোট করছেন। বার বার ফোন করছেন, কেউ ধরছে না, এড়িয়ে যাচ্ছেন, ঘুরাচ্ছেন, তবু তিনি চেষ্টা করছেন! এতটা ধৈর্য ও দায়িত্ববোধ নিয়ে তিনি আমাদের সাহায্য করেছেন। একদিন আমি বল্লাম ভাই, আপনি আর নিজেকে এভাবে ছোট করবেন না, বরং আমরা অন্যভাবে চেষ্টা করি। তখন তিনি একটা উপদেশ দিয়েছিলেন যা পরবর্তিতে আমি সবসময় মনে করেছি, “কারো কাছে সাহায্য চাইতে কখনোই লজ্জিত হবে না, শুধু মনে রাখবে তুমি তোমার ব্যক্তিস্বার্থে তাদের কাছে সহযোগিতা চাচ্ছো না, তুমি সাহায্য চাচ্ছো একটি সংগঠনের জন্য। যে সংগঠন বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক চেতনার-চর্চার ও সংগ্রামের প্রধান রুপকার। যার একটি গৌরবোজ্জল সংগ্রামের ইতিহাস-ঐতিহ্য আছে যার সুবিভাভোগী আমি, আমরা, এজাতীর সবাই।

এবার চাঁদা তোলা নিয়ে একটা মজার গল্প বলি। একবার আকরাম ভাই ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক নেতা ইউনিকগ্রুপের স্বতাধিকারী নূরআলী ভাইকে ফোন করলেন। ফোনে বললেন, ছাত্র ইউনিয়নের সম্মেলন, সোহেল-টরিক যাচ্ছে, ওদের একটা বড় অংকের টাকা দেবেন, না হয় ১ দিনের খাবারের দায়িত্ব নেবেন, যাতে অনুষ্ঠানের কোন সমস্যা না হয়। আমরা সরাসরি গেলে হয়তো কম টাকা দিতো সেকারনে তিনি নিজে বিষয়টির দায়িত্ব নিলেন। যাইহোক, আমরা নূরআলী ভায়ের অফিসে গেলাম, উনি আমাদের নাস্তা করালেন। এরপর নূরআলী ভাই বললেন, তোমাদের চাঁদার রশিদ কোথায় দেখি! আমি ব্যাগ থেকে বের করে উনার হাতে দিলাম। উনি রশিদ বই হাতে নিয়ে একটা পর একটা করে পাতা উল্টিয়ে দেখছেন। আমাদের বিশিষ্ট জনেরা কে কত টাকা দিয়েছে সেটা মনোযোগ দিয়ে দেখছেন। হটাৎ উনার চোখ আটকে গেল একটা পাতায়! তিনি এগিয়ে ধরে বল্লেন এটা আমাদের আসাদুজ্জামান নূর ভাই না? আমি বললাম হ্যাঁ। উনি কত দিয়েছেন? বল্লাম ১০ হাজার টাকা। তখন পর্যন্ত সেটাই ছিল আমাদের প্রাপ্ত সর্বোচ্চ চাঁদা! তখন নূরআলী ভাই বললেন, উনিতো (আসাদুজ্জামন নূর) আমার সিনিয়ার নেতা ছিলেন, উনি যদি ১০ হাজার টাকা দেন-, আর আমি যদি তার বেশী দেই তাহলে তো বেয়াদপী হয়ে যাবে! এটা করা যাবে না, এটা নূরভাই শুনলে মাইন্ড করবে! অতএব, আমাকে এর কমে থাকতে হবে, না হলে এর সমান থাকতে হবে! এইভাবে আমাদের সাথে মজা করছিলেন। এরমধ্যে আকরাম ভাই নূরআলী ভাইকে ফোন করলেন, কি কতটাকা দিলেন? একটা বড় অংক দিতে, রাজি করাতে আকরাম ভাই নূরআলী ভাইকে চাপ দিচ্ছেলেন। যাইহোক শেষ পর্যন্ত তিনি আমাদের ১৫ কি ২০ হাজার টাকা দিয়েছিলেন। এই হচ্ছে আমাদের আকরাম ভাই, দুঃসময়ের কান্ডারী, এক বৈরী সময়ের গল্প।

সংগঠন ঘিরে উনার নিজেরও কিছু আশা-নিরাশা, ক্ষোভ-অভিমান ছিল। এর পরের কোন লেখায় হয়তো সেই বিষয়ে আরও কিছু লেখা যাবে। আকরাম ভায়ের হটাৎ চলে যাওয়া ছিল সংগঠন ও প্রগতিশীল আন্দোলনের জন্য অপুরণীয় ক্ষতি। সংগঠনের বর্তমান নেতৃত্বের প্রতি অনুরোধ অকাল প্রয়াত এই সংগঠক-নেতাকে নিয়ে একটি স্মরণ সভার আয়োজন করার। তাঁর সমসাময়িকে নেতৃত্ব-বন্ধু-স্বজনদের কাছ থেকে তাঁর জীবনের বিভিন্ন দিক জানার মাধ্যমে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা ও সংগঠনকে এগিয়ে নেবার আহ্বান রাখছি।

বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন’র সাবেক সভাপতি, বীর মুক্তিযোদ্ধা, দুঃসময়ের কান্ডারী কাজী আকরাম হোসেন’র ১৫ তম মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি-

ড. মঞ্জুরে খোদা টরিক, লেখক-গবেষক, সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

26 − = 16