একটি সাফল্য গাঁথা

মমিনের বাবা মারা গেছে জন্মের আগে। মা অন্যের বাড়িতে কাজ করে। আর বৃদ্ধা দাদীর ভিক্ষা করে দিন কাটে। মমিনের বয়স কত হবে? এই ১৫/১৬! সেও পেটের দায়ে অন্যের বাড়ীতে বছরমারী রাখাল হিসেবে কাজ করে। পড়াশুনার প্রতি ভীষণ আগ্রহ। কিন্তু স্কুলে গেলে খরচ দিবে কে? আর সব চেয়ে বড় কথা, কাজ না করলে পেটে খাওয়া জুটবে না। তাই সে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা লাভ করতে পারে না। কিন্তু তার অদম্য ইচ্ছা শক্তির কারণে শিক্ষার আলো লাভ করে। সন্ধ্যার পর কাজ শেষে সে অযথা সময় নষ্ট করত না। রাতে যখন সরকার বাড়ির ছেলে-মেয়েরা উঠানে হারিকেন জ্বালিয়ে পড়তে বসে, সেও তখন একটা চটের বস্তা বিছিয়ে বই নিয়ে তাদের সাথে বসে যায়। সরকার বাড়ীর বড় ভাই-আপাদের কাছ থেকে পড়া দেখিয়ে নেয়। অন্যান্য বিষয়ের থেকে তার হিসাব-নিকাশে মনযোগ অনেক বেশি। মুখে মুখেই অনেক বড় হিসাব করে ফেলতে পারে।

বেশ কয়েক বছর সরকার বাড়ীতে কাজ করছে মমিন। সে তার বেতনের একটি টাকাও নেয় নি এতো দিন। সরকার সাহেবের কাছে তার বেশ কিছু টাকা জমার পর, সরকার সাহেব আরো কিছু টাকা ভরে তাকে একটা রিক্সা কিনে দেন। কিন্তু মমিন সে রিক্সা নিজে না চালিয়ে ভাড়া দেয় এবং সে আগের মতই সরকার বাড়ীতে রাখাল হিসেবে কাজ করতে থাকে। তার বড় হওয়ার ইচ্ছা এবং তীক্ষ্ণ বুদ্ধি তাকে এগিয়ে নিয়ে যায়। একটা ব্যাংক থেকে কিছু লোন নিয়ে অল্প দিনেই আরো দুটি রিক্সা কিনে ফেলে। আস্তে আস্তে সে নিজের বাড়ী-ঘর করে। তত দিনে মা’কে আর অন্যের বাড়ীতে কাজ করতে হয় না। দাদীকে আর বের হতে হয় না ভিক্ষার থলি হাতে নিয়ে।
প্রায় বিশ-পঁচিশ বছর পরের কথা। এখন মমিন খুব ব্যস্ত মানুষ। বাজারে ভালো ব্যবসা। রিক্সার গ্যাজের দুইটা। একটা ধানের গুদাম আছে। বিয়ে-শাদী করেছে যথা সময়ে। তার মেয়েটা এবার এস.এস.সি তে A+ পেয়ে পাশ করেছে। আর ছোট ছেলেটা ক্লাশ সিক্সে পড়ে। গত বছর ক্লাশ ফাইভে বৃত্তি পেয়েছে। মমিনের শৈশবের দুঃখের দিন আর এখন নেই। কিন্তু সে আগের মতই সৎ আর কৃতজ্ঞ। এখনও বাজারে সরকার বাড়ীর কারো সাথে দেখা হলে গর্ব করে বলে- “ভাই, আমার এসব কিছুই আপনেদের বাড়ীতে কামলা খাটার টাকায় হয়েছে।” তার চোখে টলমল করে আনন্দ-অশ্রু।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৬ thoughts on “একটি সাফল্য গাঁথা

  1. মমিনের ভাগ্য ভালো যে, সরকার
    মমিনের ভাগ্য ভালো যে, সরকার সাবের মত একটা ভালা মনিব পাইছিলো। ঘাড়ত্যাড়া-রগট্যারা টাইপের কেউ হইলে তো দেখা যাইতো, মমিনকে এখনো তার বাড়িতে কামলা দিতে হইতেছে।

    যাক একজন সৎ ও সরল মনের মানুষের কাছে যে আরেকজন সৎ ও সরল মনের মানুষের মূল্যায়ন হয়, সেটা এই গল্পে খুঁজে পেয়ে তৃপ্ত হলাম।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

89 − 88 =