গেস্টরুমের নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ যা করছে!

সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র হাফিজুর মোল্লার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে আবার আলোচনায় ছাত্রলীগ। সংগঠনের নেতাদের দ্বারা পরিচালিত গেস্টরুমের নামে প্রতি রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম বর্ষে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের পোহাতে হচ্ছে দুর্ভোগ। অনেক শিক্ষার্থী গোপনে চোখের পানি আড়াল করছেন বটে! তবে হাফিজুর মোল্লা জীবন দিয়ে সবার নীরবতা ভেঙে গেলেন।

হাফিজুর মোল্লা ছাত্রলীগের হয়ে হলে ওঠায় দলীয় কর্মসূচিতে যাওয়ার বাধ্যবাধকতা ছিল। রাতে হল ছাত্রলীগের নেতাদের দ্বারা পরিচালিত ‘গেস্টরুম ডিউটি’ তাই অসুস্থ শরীরেও এড়াতে পারেননি তিনি। ফলাফল, নিউমোনিয়া এবং এক পর্যায়ে মৃত্যু! হাফিজুরের এই মির্মম মৃত্যু গেস্টরুম ও ছাত্রলীগকে আলোচনায় এনেছে। যার প্রেক্ষিতে শুরু হয় অনুসন্ধান। সম্প্রতি ‘সাপ্তাহিক’ ম্যাগাজিনে প্রকাশিত এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ছাত্রলীগের এই গেস্টরুম কালচার ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের চুপচাপ থাকাসহ ছাত্রদের দুর্ভোগের আদ্যোপান্ত উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে ছাত্র, শিক্ষক, ছাত্রনেতাসহ অনেকের বক্তব্যে ধ্বনিত হয়েছে গেস্টরুমে আসলে কী ঘটছে! আসুন, জেনে নেই, গেস্টরুম কালচার সম্পর্কে!

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গেস্টরুম কালচার শুরু হয় ২০০১ সালের রাজনৈতিক পট-পরবর্তনের পর থেকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি হলেই এখন গেস্টরুম বসে। আগে এই বিষয়টা অনিয়মিত থাকলেও ক্রমে এটা নিয়মিত হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের দাবি অনুযায়ী, প্রতিটি হল কমিটির ছাত্রলীগ নেতারা সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হতে ইচ্ছুক বা যুক্ত এমন কর্মীদের নিয়ে রাতে গেস্টরুমে বসে আলাপ-আলোচনা করেন। সংগঠনের আদর্শ, কার্যক্রম এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে সংগঠনের সদস্যদের আচার-আচরণ কেমন হবে, এরকম সব বিষয়ে বড়রা পরামর্শ দেন। এটাই গেস্টরুম ডিউটি নামে পরিচিত। এভাবে সংগঠনের কার্যক্রম গতিশীল করা গেছে বলে ছাত্রলীগের দাবি।

তবে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ভিন্ন চিত্র। গেস্টরুম বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের যত শিক্ষার্থীর সঙ্গে আমাদের কথা হয়েছে প্রত্যেকেই এর নিন্দা করেছেন। ভয়ঙ্কর সব তথ্য দিয়েছেন ছাত্ররা। কলা বিভাগের একটি বিষয়ে অধ্যয়নরত জহুরুল হক হলের একজন সিনিয়র শিক্ষার্থী জানান, ‘গেস্টরুম হচ্ছে ছাত্রলীগের আইনকানুন শেখার জায়গা। প্রথম বর্ষে ভর্তি হওয়া ছাত্রদের এতে বাধ্যতামূলক উপস্থিত থাকতে হয়। দ্বিতীয় বর্ষ থেকে শুরু করে অন্য বর্ষের শিক্ষার্থীরাও যোগ দেন, তবে দেরিতে এবং সংখ্যায়ও কম। দেড় থেকে দুই ঘণ্টা ধরে, কখনো বা তারও বেশি সময় ধরে চলে গেস্টরুম। আগে এটা গেস্টরুমে হলেও এখন অধিকাংশ হলেই মাঠের মধ্যে ছাত্রদের সারি বেঁধে দাঁড় করিয়ে এসব চলে।’

তিনি জানান, ‘প্রথম বর্ষের ছাত্রদের যেহেতু হলে সিট পাওয়ার কোনো সুযোগই নেই, তাই ছাত্রলীগের মাধ্যমেই হলে উঠতে হয়। সে সময় শর্ত থাকে যে, সংগঠনের সকল কর্মসূচিতে যেতে হবে। সাধারণত রাত ৯টার পর হল শাখার ছাত্রলীগ নেতারা গেস্টরুমে এনে প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের আচার-আচরণ শেখায়। প্রথমেই নির্দেশ জারি হয় যে, নিজ বর্ষের বন্ধুরা বাদে বাকি সবাই তোমাদের সিনিয়র। তাদের দেখলেই সালাম দিতে হবে ও হাত মেলাতে হবে।’

জানা গেছে, গেস্টরুমের এই নির্দেশনাটিকে বলা হয় ‘সহবত’ শিক্ষা। এই সহবত শিক্ষাটা প্রথম বর্ষের ছাত্রদের জন্য ভয়ঙ্কর হয়। সাংবাদিকতা বিভাগে অধ্যয়নরত এবং ক্যাম্পাস প্রতিনিধি হিসেবে একটি অনলাইন পোর্টালে কর্মরত একজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা হয় আমাদের। তিনি বলেন, ‘আমার নাম প্রকাশ করা যাবে না। এখন ক্যাম্পাসে কেউই ওদের বিরোধিতা করে নিরাপদ না। একমাত্র সাংবাদিকতা ছাড়া সব বিষয়ের ছাত্রদেরই এর মধ্য দিয়ে যেতে হয়। আমাদের বিভাগের প্রথম বর্ষে যারা আসে, তারা কিছুটা ছাড় পায়। তবে অনেককেই যেতে হয় গেস্টরুমে। ছাত্রলীগ সেখানে সহবত শেখায়। এরপর দেখা যায়, গোসল করতে গেলাম, রুমে আসতে আসতে হাত ব্যথা হয়ে গেল। কারণ প্রথম বর্ষের ছাত্ররা সবাই দেখামাত্রই সালাম দিচ্ছে এবং হাত মেলাচ্ছে। এটা তারা করে বাধ্য হয়েই। আমাকেও প্রথম বর্ষে থাকতে করতে হয়েছে। যারা মানে না, তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়।’

তিনি জানান, ‘যদি কেউ সিনিয়রদের নির্দেশ অমান্য করে তাহলে তাকে পরদিনের গেস্টরুমে সবার সামনে গালমন্দ করা হয়, হল থেকে বের করে দেয়ার হুমকিও দেয়া হয়। চোখ ফুটে গেছে? বড় নেতা হয়ে গেছ? নাকি বাপ কোনো জমিদার? এসব বলে বকাঝকা করা হয়। তার পরও যদি কেউ না শোধরায়, তাহলে তার ওপর যে কোনো আঘাতই নেমে আসতে পারে। তবে এটা নিশ্চিত যে, এরকম করলে সিট পেতে অনেক দেরি হয়। এমনও হয়েছে যে, দ্বিতীয় বর্ষে উঠে সিট পাওয়ার পরেও জোর করে তাকে গণরুমে পাঠানো হয়েছে, কারণ সে সহবত শেখেনি। সহবতের ভেতর আবার এটাও থাকে যে, দুই হাতে হাত মেলানো যাবে না, কারণ ওটা শিবিরের কাজ। শিবিরের মতো করে টাকনুর ওপর প্যান্ট ভাঁজ করে রাখা যাবে না। একমাত্র গোসল ছাড়া কেউ লুঙ্গি পরতে পারবে না। দিনে হলের বাইরে শর্টস পরে যাওয়া যাবে না। সংগঠনের কোনো কর্মসূচি ছাড়া মধুর ক্যান্টিনে যাওয়া যাবে না। বড় ভাইদের সঙ্গে ছাড়া টিএসসি, হাকিম চত্বরে আড্ডা মারা যাবে না।’

অনুসন্ধানে জানা যায়, সাংবাদিকতা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র আলী আহসান গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে গেস্টরুমের বিরোধিতা করে মারধরের শিকার হন। দ্বিতীয় বর্ষের কয়েকটি ছেলেকে তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন যে, প্রথম বর্ষে ভর্তি হওয়া তার ঘনিষ্ঠ জুনিয়রদের গেস্টরুমে নিয়ে বকাঝকা করা হলো কেন? পরদিন রাতে তাকে গেস্টরুমে ডেকে নিয়ে ২০/২৫ জন মিলে একত্রে মারধর করে। এই ঘটনাটি বিজয় একাত্তর হলের সব ছাত্রেরই জানা।

সাধারণত সদ্য দ্বিতীয় বর্ষে ওঠা ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরাই গেস্টরুম পরিচালনা করেন। তবে সংগঠনে পদপ্রত্যাশী অন্য সিনিয়ররাও সঙ্গে থাকে। গেস্টরুম শুরু হওয়ার ঘণ্টাখানেক পর তাতে এসে যোগ দেন হল শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি কিংবা সাধারণ সম্পাদক। অধিকাংশ হলেই সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ভিন্ন গ্রুপের হওয়ায় দুই গ্রুপের আয়োজনে আলাদাভবে গেস্টরুম হয়। একদিন সভাপতির গ্রুপ, তো অন্যদিন সাধারণ সম্পাদকের গ্রুপ। সপ্তাহে তিন/চার দিন এরকম গেস্টরুম হয়। সহবত শিক্ষা ছাড়াও গেস্টরুমে আরও কিছু বিষয়ের চর্চা চলে। এর মধ্যে আছে ট্রেনিং এবং ব্রেন ওয়াশ।

শিক্ষার্থীরা জানান, গেস্টরুমের প্রথম দিকে সহবত শিক্ষার পাশাপাশি দেশপ্রেমের শিক্ষাও দেয় ছাত্রলীগ। তবে এই দেশপ্রেমটা দলপ্রেম ছাড়া আয়ত্ত করা যায় না। বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি লিটন নন্দী বলেন, ‘তাদের শিক্ষা অনুযায়ী তারাই একমাত্র দেশপ্রেমিক সংগঠন। এছাড়া অন্য কোনো সংগঠনের সঙ্গে মেশার অর্থ হলো, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরোধিতা করা। সরাসরি গণরুমে ওঠা ছাত্রদের মানা করে দেয়া হয় অন্য কোনো সংগঠনের মিছিল বা কোনো কর্মসূচিতে যেন না দেখা যায়।’

পহেলা বৈশাখে নারী নিপীড়নের ঘটনায় তাৎক্ষণিকভাবে একমাত্র প্রতিরোধ সৃষ্টিকারী আলোচিত এই ছাত্রনেতা বলেন, ‘এর দায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষেরই। প্রথম বর্ষে ছাত্ররা সিট পায় না। ফলে তারা ছাত্রলীগ নিয়ন্ত্রিত গণরুমে ওঠে। একেকটি গণরুমে ২০ থেকে ২৫ জন করে বাস করে। যদিও বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাবে একটি রুমে চারটি সিট, প্রতি সিটে দু’জন করে একরুমে বরাদ্দ পান আটজন। কিন্তু গণরুমে মেঝেতে টানা বিছানা করা হয়। যারা রুমে ধরে না, তারা থাকে বারান্দায়। ঢাকায় এসে আবাসন নিয়ে সংকটে থাকা এসব শিক্ষার্থীর যাওয়ারও কোনো জায়গা নেই। ফলে তারা ছাত্রলীগের কথা শুনতে বাধ্য হয়। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে ছাত্ররা কোনো নালিশ নিয়ে যায় না। কারণ হল প্রভোস্ট ছাত্রলীগের নেতাদের ডেকে বলে দিতে পারেন। এরকম অবস্থা হলে মার তো নিশ্চিত, পরে শিবির হিসেবে চিহ্নিত হয়ে জেলে যাওয়ারও ভয় থাকে। এসব কারণে প্রতিবাদও হয় না। ছাত্ররা জিম্মি হয়ে পড়ছে। আমরা নবীনবরণের অনুষ্ঠান সফল করার জন্য ছাত্রদের মধ্যে জোর প্রচারণা চালাচ্ছি। কিন্তু ছাত্ররা অসহায়ত্ব নিয়েই আমাদের বলছে যে, ভাই যেতে তো চাই কিন্তু হলের বড় ভাইরা পরে ঝামেলা করবে।’

লিটন নন্দী বলেন, ‘এভাবে ছাত্রদের মানসিক নিপীড়ন চালানো হয় এবং কাউকে বুঝিয়ে, কাউকে বা জোর করে অন্য সংগঠন করা থেকে বিরত রাখা হয়। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্ষমতার রাজনীতির চোটপাট বাড়ছে, আর বিপরীতে ছাত্রদের অধিকার আদায়ের আন্দোলন স্তিমিত হয়ে পড়ছে। শিক্ষার্থীদের তারা উগ্রতা শিক্ষা দেয়, নেতা হওয়ার জন্য নাকি এগুলো দরকার আছে। ক্যাডার প্র্যাকটিসও চলে। এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীরা উগ্র, মেরুদণ্ডহীন, আজ্ঞাবহ, দাসে পরিণত হয়।’

জগন্নাথ হলে থাকেন সুদীপ্ত। বিভাগ, বর্ষের নাম গোপন করে তিনি বলেন, ‘জগন্নাথ অনেক বড় হল। এখানে কিছু ছাত্র নিজ ব্যবস্থাপনায় দলীয় ব্যবস্থা ছাড়া উঠতে পারে। কিন্তু দল তবু সবারই করা লাগে। রাত ১০টার দিকে বা তার কিছু পরে নেতারা মাঠে আসে। ছেলেরা নামলে সবাই সারি বেঁধে দাঁড়ায়। এরপর আর্মির মতো করে, যাকে চার্জ করা হবে, তাকে এক পা এগিয়ে সামনে আসতে বলা হয়। এরপর সে যদি কাউকে আদাব না দিয়ে থাকে বা অন্য কোনো ভুল করে সেজন্য গালাগালি করা হয়। আমরাও প্রথম বর্ষে এ অবস্থায় পড়েছি। এমনকি পরীক্ষার আগের রাতেও হলের বড় ভাইদের ব্যক্তিগত কাজ করে সময় ব্যয় করতে বাধ্য হয়েছি।’

বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক তাহসিন মাহমুদ বলেন, ‘গেস্টরুমে অন্য সংগঠন করতে নিষেধ করা হয়। বিজয় একাত্তর হলে গত ডিসেম্বরে বর্ধিত ফি প্রত্যাহারের দাবিতে ছাত্রদের সংগঠিত করছিলাম আমরা। সেই আন্দোলনকে গেস্টরুমে বলি দেয়া হয়। আন্দোলনটা ছিল প্রথম বর্ষের ছাত্রদের। ছাত্রলীগ নেতারা তাদের ডেকে সরাসরি বলে দেন, কোনো সংগঠনের সঙ্গে গিয়ে আন্দোলন করা যাবে না। শিক্ষকদের সঙ্গে আলাপ করে তারা ৩০০ টাকা ফি কমিয়েছেন, এটা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে বলা হয় সবাইকে। যদিও বর্ধিত ফি’র পরিমাণ ছিল ৩৬০০ টাকা। এটা চাওয়া হয়েছিল আইডি কার্ড বানানোর জন্য। অন্য হলগুলোতে যেখানে আইডি কার্ডের জন্য ৩০০ থেকে সর্বোচ্চ ৫০০ টাকার মধ্যেই রাখা হয়। এভাবেই বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্তৃত্ব করছে ছাত্রলীগ।’

তাহসীন আরও বলেন, ‘গণরুম নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা ছাত্রলীগকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনই দিয়েছে। সূর্য সেন হলে ছাত্রলীগ নেতারা নিজেরাই সম্প্রতি আরেকটি গণরুম বানিয়েছে। যেহেতু তারা থাকতে দিচ্ছে, তাই তাদের নির্দেশ মানতে হবে, ছাত্ররা বিষয়টা এভাবেই দেখছে। অথচ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। আমি যখন দ্বিতীয় বর্ষে পড়ি, ২০১৪ সালে, একদিন দেখলাম মল চত্বরের সামনে পুলিশ। সূর্য সেন হলের সামনে জটলা দেখে এগিয়ে গেলাম। ভেতরে গিয়ে দেখলাম সারা হল কাঁপিয়ে একটি ছেলেকে বেদম মার মারা হচ্ছে। পুরো গেস্টরুম রক্তাক্ত। ছেলেটার হাত-পা ততক্ষণে ভেঙে গেছে। এরপর পুলিশ এল, শিক্ষকরাও এলেন। হল কমিটির সেক্রেটারি আরেফিন সিদ্দিক সুজন পুরো বিষয়টা তদারক করছিলেন। শিক্ষকরা এসেই প্রথম তার সঙ্গে হাত মেলায়, হেসে সম্ভাষণ করে। এভাবেই ক্যাম্পাসে তাদের আধিপত্য কায়েম হয়েছে।’

জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় সকল গেস্টরুমই রক্তাক্ত হয়েছে শিক্ষার্থীদের রক্তে। আলোচিত ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগেকার সময়ে গেস্টরুমে ডেকে ছাত্রদের মারধর করা এবং শিবির সাব্যস্ত করে পুলিশের কাছে তুলে দেয়ার ঘটনা ব্যাপক আকার ধারণ করে। গেস্টরুমে এমনভাবে ছাত্রদের নিয়ন্ত্রণ করা হয় যে, হল ছাত্রলীগের সভাপতি তাদের কাছে সবচেয়ে মাননীয় হয়ে ওঠে।

আরবি বিভাগের তৃতীয় বর্ষের একজন ছাত্র বলেন, ‘এমনভাবে তারা বলে যেন বঙ্গবন্ধুর পর হল কমিটির সভাপতিই বড় নেতা। তার জন্য জীবন উৎসর্গ করাটা ভাগ্যের। ভাই যা বলবেন, তা তো মানতেই হবে, তিনি যেন কোনো কারণে বিরক্ত না হন, তাও খেয়াল রাখতে হবে। আগে গেস্টরুমে আরও বেশি টর্চার হতো। গত বছরও আমি গেস্টরুমে হাজিরা খাতা দেখেছি। এখন ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি নেই বিধায় হাজিরা খাতা বন্ধ আছে। হাজিরা খাতা ধরে নাম ডেকে দেখা হতো যে, সবাই এসেছে কিনা। পরদিন পরীক্ষা আছে বললেও অনেকে মাফ পায় না। তবে এই চাপের প্রায় পুরোটাই যায় প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের ওপর দিয়ে। আর নিপীড়নে এগিয়ে থাকে দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীরা।’

জানা গেছে, গেস্টরুমে ট্রেনিং সেশনও চলে নির্বাচিতদের নিয়ে। রিকশাঅলা বাড়াবাড়ি করলে তাকে কষে থাপ্পড় দিতে হবে। আলোচনায় আসতে হলে সাহস দেখাতে হবে। নেতা হতে গেলে অর্থাৎ নেতাদের মতো সুবিধা পেতে গেলে সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদকের আস্থা অর্জন করতে হবে। তারপর বাছাইকৃতদের নিয়ে হকি ধরা, রড ধরা, কিভাবে কোথায় মারলে মারা যাবে না, জখম কম হবে, এসব শিক্ষা দেয়া হয়। কোনো কোনো সময় সবাইকে ওই রাতেই মিছিল করতে বলা হয়। গভীর রাতে শব্দ শুনে আতঙ্কে গুম ভাঙে ছাত্রদের।

কখনো কখনো নেতার সঙ্গে দলবেঁধে সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে যান প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীরা। সেখানে অনৈতিক কর্ম এবং মাদকের প্রশিক্ষণ হয় বলেও অভিযোগ আছে। মাঝে মাঝে দ্বিতীয় বর্ষের ভাইদের সঙ্গে মিলে ‘বাস ধরা’র কাজেও যান শিক্ষার্থীরা। নীলক্ষেত সড়ক দিয়ে যাওয়া কোনো বাসের কন্ডাক্টর বিশ্ববিদ্যালয়ের কারও সঙ্গে খারাপ আচরণ করেছে, এমন অভিযোগের প্রেক্ষিতে সেই বাস ধরে হলে নিয়ে আসতে নির্দেশ দেয়া হয়। পরবর্তীতে সেই বাস মালিকের কাছ থেকে বড় অঙ্কের চাঁদা আদায় করে ভাগ-বাটোয়ারা হয় বলেও অভিযোগ আছে।


ছাত্রলীগের অত্যাচারেই হাফিজুরের মৃত্যু ঘটে : বাবা ইসহাক মোল্লার দাবি!

তবে আলাপ করা হলে এভাবে ট্রেনিং সেশন চালানো এবং ছাত্রদের বাধ্য করার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ছাত্রলীগ নেতারা। তারা কেবল গেস্টরুমে বসে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ প্রচারের কথা বলছেন। প্রক্টর এ প্রশ্নে জানিয়েছেন যে, গেস্টরুমে ভাল, খারাপ দুটোই হয়। এটা যেহেতু অনেক দিন থেকে চলে আসছে, তাই পাল্টাতে সময় লাগবে। অবশ্য এ প্রশ্নে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ইমেরিটাস সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বাস্তবসম্মত বক্তব্য রেখেছেন।

তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণমূলক ভূমিকা এখন একেবারেই সংকুচিত। আমরা যখন ছাত্র ছিলাম, প্রভোস্ট তো বটেই, হাউস টিউটরেরও পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ছিল। সন্ধ্যার পর রোল কল করা হতো। কে আছে, কে বাইরে গেছে খোঁজ রাখা হতো। পরে ব্যবস্থা নেয়া হতো। মোনেম খাঁর আমলেই প্রথম ক্যাম্পাসে হল দখল হতে দেখা যায়। এরপর ১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে তাদের উৎখাত ঘটানো হয়। এটাকে আমরা বিরাট বিজয় বিবেচনা করেছিলাম। কিন্তু সেই অর্জন ধরে রাখা যায়নি। এখন হলগুলো ব্যতিক্রমহীনভাবে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের নিয়ন্ত্রণে থাকে। প্রভোস্টের কোনো কর্তৃত্ব থাকে না। আবার দেখা যায় প্রভোস্ট থেকে শুরু করে আরও বড় পদ পর্যন্ত যারা আছেন, তারাও সরকারি দলের আনুকূল্য ভোগ করেন। ফলে অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ কমে যায়। আর এভাবে নিয়ন্ত্রণও কমতে থাকে। …দলীয় আনুগত্য না থাকলে হলে থাকা তো প্রথম বর্ষের ছাত্রদের জন্য অসম্ভব। তাদের কর্মসূচিতে না গেলে নির্যাতিত হতে হয়। শিক্ষকদের কাছে গিয়ে ফল হয় না, কারণ তারা তো আগে থেকেই দলীয় অনুগত। অবশ্য সবাই এমন নন।’

তার বক্তব্য থেকে প্রতীয়মান হয় যে, ছাত্রলীগের আজকের ক্যাম্পাস নিয়ন্ত্রণ ও গেস্টরুমের মতো অত্যাচারী কর্মকান্ড চালানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে প্রশাসনের ব্যর্থতার কারণেই। আর প্রশাসন ব্যর্থ হচ্ছে, কারণ তারাও একই দলের দ্বারা নিয়োগপ্রাপ্ত এবং দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে তাদের কোনো গণতান্ত্রিক বা মুক্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা নেই!

আরও জানতে পড়ুন : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় : শিক্ষার্থীদের মৃত্যু-কান্না, প্রশাসন কিছু দেখে না

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on “গেস্টরুমের নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ যা করছে!

  1. বাহ ছাত্রলীগ! ছোটভাই প্রথম
    বাহ ছাত্রলীগ! ছোটভাই প্রথম বর্ষে একটা হলে থাকছে,ভাবছি হল ছেড়ে দিতে বলব এবার।ছাত্রলীগের কাছে জিম্মি হয়ে হলে না থাকাই মনেহয় ভাল হবে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

31 − = 23