মাতৃভাষা ও একটি ভিনদেশি ভাষা

“আমাদের সেই উচ্চশিক্ষার প্রয়োজন, যে উচ্চশিক্ষায় বাংলা ও ইংরেজি ভাষা গঙ্গা ও যমুনার মতো মিলিত ধারায় প্রবাহিত হবে” এই কথাটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঠিক কী দেখে বলেছিলেন জানা নেই তবে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের সাথে মিশে, শিক্ষা নিয়ে নানান স্তরের বন্ধুদের অভিযোগ শুনে, বিভিন্ন প্রকারের শিক্ষাব্যবস্থায় সরাসরি ছাত্রী হিসেবে সম্পৃক্ত থেকে এবং এখন বিদেশে পড়াশোনা করতে গিয়ে বিভিন্ন দেশি মানুষের সাথে ওঠাবসা করতে গিয়ে আমার নিজের কিছু উপলব্ধি হয়েছে এবং সেই উপলব্ধির ‘একটা’র সাথে রবীঠাকুরের এই উক্তির খুব শক্ত একটা সম্পর্ক স্থাপন করা যায়। সেটা হলো আমাদের ভাষার দূর্বলতা। একটা উন্নয়নশীল দেশের মানুষ এবং উন্নত দেশের মানুষের মধ্যে একটা (একমাত্র নয়) বড় পার্থক্য হলো জাতি দুইটির জ্ঞানের সীমা। যোগাযোগ এবং বিশ্বায়নে প্রয়োজনীয় দক্ষতা গুলো থাকলে সেই জাতিটির এগিয়ে যেতে অনেক সুবিধা হয়। এই কারণে মাতৃভাষায় দক্ষতার পাশাপাশি ইংরেজিতে দক্ষতা এবং ইংরেজি বই পড়ার প্রতি আগ্রহ থাকাটা খুব জরুরি।

সাহিত্যচর্চা এবং বিভিন্ন ধরণের বই পড়া কিভাবে একজন মানুষের চিন্তার ধারা বদলে দেয় সেই বার্তা প্রচারে আবদুল্লাহ আবু সাঈদ স্যার বহুদিন ধরে কাজ করে চলেছেন। প্রতি শুক্রবার (আমার শহরে শুক্রবার অন্যজায়গায় অন্যদিন হতে পারে) শহরের আনাচে কানাচে ঘুরে কিছু বইভর্তি গাড়ি ‘আলো আমার আলো ওগো আলো ভুবন ভরা’ গানের মাধ্যমে যেই কথাটি ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে চায় তা হলো ‘আলোকিত মানুষ চাই’ এবং ভ্রাম্যমাণ এই লাইব্রেরিতে উঁকি দিলেই বোঝা যায় আলোকিত হওয়ার উপায়টা আসলে কি। উপায়টা হলো বই পড়া। ছোট বই পড়া, বড় বই পড়া, দেশি বই পড়া, বিদেশি বই পড়া, রহস্য বই পড়া, ভ্রমণ কাহিনী পড়া, গবেষণামূলক বই পড়া, ছোটগল্পের বই পড়া, উপন্যাস পড়া, কবিতা পড়া, রম্যরচনা পড়া। লেখক তার সমস্ত চিন্তা চেতনা, অভিজ্ঞতা, কল্পনা সব ঢেলে দিয়ে বাক্যের পর বাক্য গেঁথে লেখেন এক একটা বই। বিভিন্ন সময়, বিভিন্ন পরিস্থিতি, সমাজের বিভিন্ন স্তরের কথা উঠে আসে একটা বইয়ে। সমাজকে আলাদা আলাদা আঙ্গিকে দেখতে সাহায্য করে বই। বই পড়ে শেখা যায় বিভিন্নরকমের রচনাশৈলী। এজন্য বিশ্বকে জানতে হলে, নিজেকে জ্ঞান সমৃদ্ধ করতে হলে পড়া দরকার নানান দেশি বই এবং সবচেয়ে ভালো হয় যদি বইগুলোকে লেখক যে ভাষায় লিখেছেন সে ভাষায় পড়তে পারলে। যেহেতু একজনের পক্ষে অনেকগুলি ভাষা শেখা সম্ভব না বা সম্ভব হলেও সে ভাষার সাহিত্য বোঝার মত দক্ষতা অর্জন করা খুব কঠিন তাই অন্তত একটি ভাষা যে ভাষা শিখলে আরো নানাদিকে উপকৃত হওয়া সম্ভব সেই ভাষাটি ভালো ভাবে আয়ত্ত করা খুব জরুরি। নজরুলে ‘বিদ্রোহী’ কিংবা শরৎচন্দ্রের ‘মহেশ’ কে ভাষান্তরিত করলে যেমন সাহিত্যকর্মটি তার শক্তি হারাবে একই ভাবে হার্পার লী’র ‘To kill a Mocking bird’ বা শেক্সপিয়ারের ‘Midsummer night’s dream’ কে বাংলায় তরজমা করলে এই সাহিত্যকর্ম গুলোও প্রাণহীন হয়ে পড়বে। তবে ভাষাটা খুব ভালো করে না জানা থাকলে বিদেশি এই ভাষার বইগুলো পড়ার প্রতি আগ্রহটা তৈরি হবে না। একটা দুটো পড়তে পড়তে আগ্রহ জন্মালে পরে বইয়ের জগতে প্রবেশ করার ইচ্ছা জন্মাবে।

এবারে আসি একটা ভিন্ন সমস্যায়। কিছুদিন আগে ড.আবেদ চৌধুরীর সাথে এই বিষয়ে আলাপ করার সময় তিনি তাঁর ব্যক্তিগত একটা অভিজ্ঞতার কথা বললেন। একটা গবেষণামূলক লেখা লিখে তিনি লেখাটার একটা ইংরেজি সংস্করণ বের করেননি বলে ভিনদেশি গবেষকেরা তাঁর এই গবেষণার কথা জানতে পারেনি। বেশ অনেক বছর পর একজন গবেষক একই বিষয়ে একটা ফর্ম্যাল গবেষণা পত্র প্রকাশ করে ফেলেন। ইংরেজি একটা সংস্করণ প্রকাশিত থাকলে গবেষণাটা যে আগে একজন করেছেন সেটা নতুন গবেষকরা জানতেন। তবে আবেদ স্যার ইংরেজিতে প্রকাশ করেননি ভিন্ন কারণে। এটা কেবল একটা উদাহরণ ইংরেজি জানার প্রয়োজনীয়তার। ইংরেজি লেখার চর্চা এবং তাতে দক্ষতার অভাবেও এধরণের বিড়ম্বনা হতে পারে। গবেষণামূলক লেখা শুধু বিজ্ঞানেই না সমাজবিজ্ঞান, নৃবিদ্যা, প্রত্নতত্ত্ব এগুলোর উপরেও বাংলাদেশে অনেক গবেষণা করা সম্ভব। সেই গবেষণাপত্রগুলো যদি ইংরেজিতে প্রকাশ করে প্রচার করা হয় এতে করে বাংলাদেশের পাশাপাশি, বাংলাদেশি লেখক-গবেষকদের নামও বিশ্ব জানবে। বেশিসংখ্যক মানুষ ইংরেজি লেখনশৈলী রপ্ত করলে গবেষণাধর্মী লেখা ছাড়াও দেশের ভেতরে আরো নানান ধরণের লেখালেখির (যেমন, গ্লোবাল ম্যাগাজিন, ওয়েবসাইটের বিবরণ, ডকুমেন্টারি ইত্যাদি – এগুলো ক্ষেত্রে লেখার ভাষা বাংলার পাশাপাশি ইংরেজিতেও হলে আমরাও ছড়িয়ে দিতে পারবো আমাদের গল্পগুলো) সংস্কৃতি তৈরি হবে।

এখান থেকেই চলে আসে আরেকটি বিষয় সেটা হলো বিজ্ঞান ও গৎবাধা কিছু টপিকের বাইরে আমাদের দেশের শিক্ষার্থীরা পড়ছে কতটুকু। প্রত্নতত্ত্ব, এন্টোমলজি, ওয়াইল্ড লাইফ, দর্শন, মনস্তত্ব এগুলো তো আছেই তাছাড়াও রয়েছে নানার কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় গ্রিক পুরাণের কাহিনী, অঞ্চলভিত্তিক স্থাপত্যকর্মের বৈশিষ্ট, ইতিহাসের নানান অজানাদিক ইত্যাদি (বিষয়গুলো একেবারেই র‍্যানডম ভাবে লেখা)। এগুলো বিষয়ের উপর লেখা ভালো বইগুলো যথাযথ কারণে ইংরেজিতে লেখা। ইংরেজি ভাষায় দূর্বলতা থেকে আসে এভাষার বই পড়ার প্রতি অনাগ্রহ, ফলস্বরূপ একটা বিশাল জ্ঞানের জগতের সাথে সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে না কারো। তবে ভাষায় দূর্বলতা কে একা দায়ী করা যায় না,দূর্বলতা রয়েছে সুযোগসৃষ্টিতেও। এইসব বই পড়তে চাইলে প্রথমত এইসব বইয়ের অস্তিত্ব জানতে হবে। দেশে উন্নতমানের গ্রন্থাগার খুঁজতে গেলে খুব সহজে হাতে গোনা যাবে এবং খুব বেশি আঙ্গুলেরও প্রয়োজন হবে না গোনার জন্য। দ্বিতীয়ত এইসব গ্রন্থাগার পাঠকদের কতটুকু আকৃষ্ট করে সে ব্যাপারেও সন্দেহ আছে আমার। কিনতে গেলেও এসব বই অনেক কষ্ট করে খুঁজে বের করতে হবে আর যেহেতু মানুষ এগুলোর ব্যাপারে জানেই না অতএব খোঁজার প্রশ্নও আসে না সচরাচর।

বেশকিছুদিন থেকে মাথায় এটাও ঘুরপাক খাচ্ছে যে বাংলা ভাষাটা এত সমৃদ্ধ হওয়ার পরও দিন দিন বাংলাদেশের সাহিত্যকর্ম এত বিপন্ন হয়ে পড়ছে কেন। মানসম্পন্ন বাংলাদেশি সাহিত্যিকদের সংখ্যা এখন খুবই নগণ্য। উপন্যাস নিয়ে আলাপ করতে গেলে বারবার কলকাতার বাঙালি লেখকদের বইয়ের কথা উঠে আসে। জানি না এ ধারণা সত্যি কিনা তবে অনেক বই পড়ার অভ্যাস, এবং বিভিন্ন দেশের সাহিত্য চর্চার অভ্যাস তৈরি হলে হয়তো বেরিয়ে আসবে আরো বেশি লেখক সাহিত্যিক কারণ নানান দেশি সাহিত্যের ধারণা পাবে মানুষ। নিজেদের ছোট গন্ডি থেকে বেরিয়ে এসে অভিনব চিন্তার দরজা খুলে যাবে কল্পনাপ্রিয় মনগুলোতে।

বিশ্বায়ন আমাদের প্রয়োজন, জ্ঞানসমৃদ্ধিটাও প্রয়োজন, বিশ্বের সাথে যোগাযোগ স্থাপন প্রয়োজন, এগুলোর একটাও বিলাসিতা নয়। স্থান, কাল, পাত্র এবং পদ্ধতি ঠিক রেখে ব্যবহার করতে পারলে দ্বিতীয় একটা ভাষা সংস্কৃতি উন্নয়নের হাতিয়ার। ভিন্ন একটা ভাষা জানা মানে মাতৃভাষার জায়গাটা সে ভাষাকে দিয়ে দেয়া হতে পারে না। ভাষা নিয়ে আমরা কেবল আবেগ প্রকাশ করি কিন্তু এটাও মাথায় রাখা দরকার যে প্রিয় ভাষাটির সৌন্দর্য এবং সে ভাষাভাষী মানুষের সমৃদ্ধ সংস্কৃতির ঐতিহ্য স্মরণ করাই একমাত্র দায়িত্ব না তা বজায় রাখাও দায়িত্ব। আমাদের উপন্যাস, আমাদের কবিতা, আমাদের চলচ্চিত্র বিশ্বমানের হবে যদি আমরা আমাদের জ্ঞানের বিশ্বায়ন করতে পারি।

মতবিরোধিতা কে স্বাগতম জানাচ্ছি। অবশ্যই যুক্তিগুলোয় ত্রুটি থাকতে পারি। মূলবক্তব্যে আশা করি দ্বিমত পোষণ করবেন না কেউ।বি.দ্র.: যেসব দেশ একমাত্র মাতৃভাষা ব্যবহার করেই সংস্কৃতিতে অনেক খ্যাতিমান করে তুলেছে তাদের সাথে আমি তুলনা করতে চাইনি কারণ একটা দ্বিতীয় ভাষা জানা এবং সুন্দরভাবে ব্যবহার করতে পারা একটা প্রশংসনীয় দক্ষতা, তাছাড়া সেই দেশগুলোর সাথে আমাদের দেশের ভাষার ব্যবহার ছাড়াও আরো অনেক পার্থক্য আছে। এটা কখনোই ভুলে যাওয়া ঠিক না যে একাধিক বিষয়ের উপর নির্ভর করে উন্নয়ন। চায়না ইংরেজি না জেনেও অনেকদূর এগিয়ে গিয়েছে তাই আমরাও ইংরেজি না জেনে অনেক দূরে এগিয়ে যেতে পারবো – এধরণের ভুলযুক্তিকে Cherry Picking বলে বিতর্ক বিশ্লেষকদের ভাষায়।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “মাতৃভাষা ও একটি ভিনদেশি ভাষা

  1. ভালো লিখেছেন। বই পড়ার মধ্য
    ভালো লিখেছেন। বই পড়ার মধ্য দিয়ে আসলে অনেক ধরনের জ্ঞান আহরন করা যায়। কিন্তু আমাদের দেশের সমস্যাটা হলো আমরা বই পড়ার বিষয়টায় জ্ঞান আহরনটা শুধুমাত্র এক ভাবে দেখি। এটাকে সামগ্রীক ভাবে দেখলে ভালো হতো আমার মতে। :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

56 + = 57