পাহাড়ে সেটেলার পুনর্বাসন

আমি আজন্ম খেলাধুলা বা ক্রীড়াপ্রিয় মানুষ। শুধু যে ক্রীড়াপ্রিয় তা না খেলেছিও অনেক।
কিন্তু এখন কোন খেলা যেমন বিশ্বকাপ ক্রিকেট, বিশ্বকাপ ফুটবল এজাতীয় খেলা চলাকালীন সময়টায় আমি খুব উৎকণ্ঠায় থাকি। দেশের ক্রীড়ামোদী অতি উৎসাহী বৃহৎগোষ্ঠীর জনগণ তাদের অতি উৎসাহী ক্রীড়া উন্মাদনায় দেশের ক্ষুদ্রগোষ্ঠীর জনগণের ভিটেবাড়ি পুড়ে দেয় কিনা। এই দেশে এর নজির অনেক।

পক্ষীয় দলের বিজয়ে বিজয়োল্লাস করতে এলাকার মেয়েদের অনুষঙ্গ বানাতে তারা পিছপা হয়না। আমাদের পাহাড়ের সেটেলার সমাজের পুরুষদের এই প্রবনতাটা খুব বেশি পরিলক্ষিত হয়।

আজ বৃহৎগোষ্ঠী সুশীল সমাজের একজনের সাথে এই বিষয়ে আলাপকালে আমার সেটেলার বিদ্বেষের কারণ ব্যাখ্যা করছিলাম। দেশের বিভিন্ন সরকার বাহাদুর দ্বারা সেটেলারদের পার্বত্য এলাকায় পুনর্বাসন থেকে শুরু করে তাদের ভরণপোষণ এবং তাদের পার্বত্য এলাকায় নিয়ে আসার কারণ, সবকিছুতেই তিনি আমার সাথে সহমত পোষণ করলেন।

তিনি এই বলে সহমত পোষণ করলেন যে, সরকার যাদের পার্বত্য এলাকায় পুনর্বাসন দিচ্ছে, তারা খুব অসহায়, খেটে খাওয়া, একেবারে দেশের নিম্নশ্রেণীর মানুষ। এদের মধ্যে বেশিরভাগই দেশের বিভিন্ন উপকূলীয় এলাকা থেকে নদীভাঙন কবলিত মানুষ। যারা নিজেরাও ভিটেমাটি হারিয়ে সরকারের সহায়তায় পার্বত্য চট্টগ্রামে এসে একটু মাথা গোঁজবার ঠাঁই খুঁজে পেয়েছে। এদের ঢালাওভাবে দোষ দেয়া একেবারে অন্যায়।

১। পার্বত্য চট্টগ্রামের যেসব এলাকায় সেটেলারদের বসিয়ে দেয়া হয়, সেই সব এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করে আসা পাহাড়ি আদিবাসীরা প্রথমত খুব সরল এবং নিরীহ প্রকৃতির মানুষ। দ্বিতীয়ত তারা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে খেটে খাওয়া জুমচাষী। কথার ছলচাতুরী দিয়ে যাদের কাছ থেকে এক কেজির দাম দিয়ে কোন জিনিস কিনলে দেড় কেজি পাওয়া যায়। এমনই সহজ-সরল পাহাড়ের সেসব মানুষ।

সমতল থেকে সেই খেটেখাওয়া, ভিটেবাড়ি হারা সেটেলাররা সরকারের বা সেনাবাহিনীর ভাগবাটোয়ারা করে দেয়া সেই জমি ছাড়াও তারা একসময় পাশের এলাকার কয়েক পুরুষ ধরে বসবাস করা সহজ-সরল, নিরীহ-নিপাত, জুমচাষী আদিবাসীদের জমিতে রাতের অন্ধকারে গিয়ে ঘর তুলে আসে বা কোন ক্ষেত নষ্ট করে দিয়ে আসে! এমন মানুষের সাথে কীভাবে এক এলাকায় সহবাস করা যায়?

পাহাড়ের মহিলা, কিশোরীরা যে কুয়োতে প্রতিদিন সকাল সন্ধ্যা গোসল-স্নান করতে যায়, দিনে দু-তিন বেলা পানি আনতে যায়। সেই রাস্তা এবং কুয়োর আশেপাশে যারা ওঁত পেতে থাকে, তাদের সাথে পাহাড়ের দিলখোলা মানুষ কীভাবে সামাজিক সম্পর্ক বজায় রাখবে?

২। বেশিরভাগ সেটেলারই সমতলের বিভিন্ন নদীভাঙন কবলিত এলাকা থেকে আসা। নদীভাঙনসহ বিভিন্ন দুর্যোগ কবলিত মানুষদের সাহায্য-সহায়তা করা সরকারের রাষ্ট্রীয় কর্তব্য। দেশের উপকূলীয় অনেক এলাকা প্রতিবছরই ভাঙনের ফলে নদীর গর্ভে বিলীন হয়ে যায়। দেশের সরকারের নদীভাঙন রোধ করার পদক্ষেপ নেই বা থাকলেও ফলপ্রসূ কোন বাস্তবায়ন নেই, কিন্তু সেই নদীভাঙন কবলিত বাস্তুহারা মানুষদের প্রতিবছর পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের ক্ষেতখামার, জুম,ভিটেমাটি দখল করে পুনর্বাসন দেয়ার প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করে।

রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র বাস্তবায়ন করার ফলে যদি সুন্দরবন এলাকার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, এলাকা যদি মানুষের বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়ে, সেইসব ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদেরও কি পাহড়ে এনে পুনর্বাসন দেবে সরকার? এমন আশঙ্কা কি আপনি উড়িয়ে দিতে পারবেন?

মানুষে মানুষে সম্পর্ক, সহবাস গড়ে ওঠে। মনে মন মিললে, প্রাণে প্রাণ মিললে সম্পর্ক, সহবাস, প্রতিবেশ, সমাজ গড়ে ওঠে। লেলিয়ে দেয়া অমানুষের সাথে এসবের কোনটাই সম্ভব নয়।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

58 − = 49