ক্রিকেট-ফুটবল স্মৃতি ও আমি এবং আমার সমাজ

আমারও ছোটবেলায় খেলাধুলা বেশ পছন্দের ছিল। কিন্তু ওই ঘরের কোনায় বসে রান্নাবান্না কিংবা পুতুল খেলা আমার কখনই ভালো লাগে নি। তার মানে এটা না যে সেই ছোটবেলায়ই বুঝে ফেলেছিলাম, ঘরের মধ্যে আবদ্ধ রাখতেই মেয়েদের জন্য এইসব ঘরোয়া খেলার সুব্যবস্থ করেছে সমাজ। আসলে, আমার লাফ ঝাপ পছন্দ, আমার বিশাল মাঠ পছন্দ, আমার বিশাল মাঠে ছোটাছুটি পছন্দ। তাই ওইসব ঘরকুনো খেলা আমার পছন্দের তালিকায় থাকেনি। আকর্ষণ করতো ক্রিকেট, ফুটবল ছোঁয়াছুঁয়ি ইত্যাদি।

ছোটবেলায় ছেলে বন্ধুদের ক্রিকেট খেলার আয়োজনে আমি খেলার জন্য মরিয়া হয়ে থাকতাম। খুব জোড়াজুরি করলে ওরা আমাকে খেলায় নিত, আমাকে আম্পায়ার বানাতো। আমি ব্যাটিং করতে চাইতাম, বলিং করতে চাইতাম, ফিল্ডিং এ থেকে চার-ছক্কা ঠেকাবার প্রতিশ্রুতি দিতাম। কিন্তু কে শোনে কার কথা? ওরা আমাকে বোঝাতো, আম্পায়ার হচ্ছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, ব্যাট দিয়ে বলে বারি দিলেই চার হয় না। আম্পায়ারের সিদ্ধান্তে চার-ছয় হয়। সুতরাং আমি এই খেলার খুবই গুরুত্বপূর্ণ জায়গাটাতে আছি। আমি কনভেন্স হতাম ওদের কথায়। আমার সিদ্ধান্তে এই খেলা চলবে, বাপরে বাপ, আমি ব্যাপক সিরিয়াস হয়ে থাকতাম। যদি ব্যাট-বল দেখে, ব্যাট করার ইচ্ছে উকি দিত, সেই ইচ্ছেকে বুঝিয়ে শুনিয়ে বাড়ি পাঠাতাম।
কিন্তু হায়! চার হয়, ছয় হয়, রান হয়, আউট হয়। কিন্তু কেউ আমার দিকে ভুলেও তাকায় না। তারা তারাই সিদ্ধান্ত নেয়। এই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাক্তিটির দিকে কেউ ফিরে তাকায় না। এভাবে কতদিন যে ব্যর্থ আম্পায়ার হয়ে নামে মাত্র ক্রিকেট খেলে মন খারাপ করে ঘরে ফিরেছি তার হিসেব নেই। তবে খুব বেশিদিন কিন্তু আমার বুঝতে সময় লাগেনি যে, কেন ওরা আমাকে ‘আম্পেয়ার’ নামক সান্ত্বনা পুরষ্কার দিয়ে রাখতো।

একটা বল নিয়ে কী চমৎকার এই পা থেকে ওই পায়ের মধ্যে গড়াগড়ি খেয়ে গোল হয়ে যায়। বিশেষ করে বৃষ্টির দিনে কাঁদার মধ্যে ফুটবলকে আরও আকর্ষনীয় ঠেকতো। আমি ঝাঁপিয়ে পরতাম ওদের সাথে, ফুটবল খেলবো। ছিলাম আবার নাছোড়বান্দা।

আমাকে গোল কিপার বানাতো। এবারো খুব গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আমি। ব্যাপক ভাব আমার। অর্ধেক নুয়ে, হাত দুটো সামনে রেখে খুব উত্তেজনার সাথে বল ঠেকাবার অপেক্ষা করতাম। ওই যে বল আসছে, খুব কাছাকাছি এখন। আমি পূর্ণ মনোযোগে প্রস্তুত। ওমা হঠাৎ করে কোথা থেকে একজন এসে গোল কিপার হয়ে বল ধরে ফেললো। এটা কী নিয়ম রে ভাই?
যাক ওটা বুঝতেও বেশিদিন লাগেনি যে, ওটা কোন নিয়ম না। আমাকে ওরা ওদের টিমের সদস্যই করেনি। ‘দুদভাত’ আমি।
ক্রিকেট, ফুটবল বিজয়ের পর ‘ঘুড়ি প্রজেক্ট’ হাতে নিলাম। সুবিশাল আকাশে একটা ছোট্ট কাগজ উড়বে, যেটা কিনা এত দূর থেকে আমিই নিয়ন্ত্রণ করব। আহ ভাবতেই আনন্দে গায়ে কাটা দিত। নিচের তলার ছেলেটির সাথে চুক্তি হলো, দুজনে মিলে নাটাই, সুতো, ঘুড়ি এগুলো কিনবো। এক টাকা দুইটাকা আম্মুর ব্যাগ থেকে চুরি করে, আমরা সুতো, ঘুড়ি কিনলাম আর টিনের কৌটো দিয়ে নাটাই বানালো। এখন এই সুতো কে মাঞ্জা(সুতোকে শক্ত করার জন্য, আঠা, কাঁচের গুরো,রং এর মিশ্রণ, এতে আকাশে যখন ওরে তা কেটে যাবার আশংকা কম থাকে) দিতে হবে। তিনটা দিন, সারাদিন রোঁদের মধ্যে ছাদে মাঞ্জা দেয়ার কাজ করেছি। একজনে হাতের মধ্যে ওই মাঞ্জার মিশ্রণ ধরে রাখতো, তার হাতের মধ্য দিয়ে সুতোটা যেত। আর আমি ওই সুতো ছাদের সিমেন্টের পানির ট্যাংকির চারিদিকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে রোঁদে শুকাতাম। আর চোখের সামনে ভাসতো, আমি ওই সুবিশাল আকাশে এক রঙিন কাগজের টুকরোকে নিয়ন্ত্রণ করছি। কি আনন্দ।
সেই কাঙ্ক্ষিত দিনটি আসলো। সেই ছেলে বন্ধুটি আমাকে ঘুড়ি দিয়ে বললো, তুই ওই মাথায় ঘুড়ি নিয়ে দাঁড়াবি। বাতাস আসলেই উপড়ের দিকে লাফ দিয়ে ছাড়বি। একবার, দুইবার কিংবা তিনবারের সময় ঘুড়ি আকাশে উড়তে সক্ষম হতো। কিন্তু আমি শুধু ওই ঘুড়িটাই ধরতে পেরেছিলাম, নাটাই নিয়ন্ত্রনের অধিকার আমার কখনো হয়নি। এইদিন দিবে ওই দিন দিবে দিবে করে আমাকে আর নাটাই সহ ঘুড়ি ওড়াতে দেয়নি। বিশ্বাস করবেন? খুব হাস্যকার শোনাবে? শোনাক, ওই ঘুড়ি না ওড়াতে পারার কষ্ট আমার এখনো আছে।
যাক, সেই ছোটবেলা থেকেই প্রেক্টিকাল শিক্ষার মাধ্যমেই বুঝে গেলাম যে, খেলা দুই প্রকারঃ ক) ছেলেদের খেলা খ) মেয়েদের খেলা। ‘ক’ এর সদস্য রা ‘খ’ তে খেলতে পারবে চাইলেই। কিন্তু ‘খ’ এর সদস্য দের ‘ক’ তে কোন গ্রহণযোগ্যতা নেই।

বড় হতে লাগলাম। ধীরে ধীরে দেখলাম, আমাদের দেশের ক্রিকেট বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। তারা সত্যিই যেন ‘টাইগার’ হয়ে উঠছে। বাংলাদেশ যখন জিতত। চারিদিক থেকে ছেলেরা রাস্তায় নেমে পরতো, নাচানাচি, হইহুল্লোড়, বিজয় মিছিল করতো। আমার বুকের মধ্যে আনন্দের জোয়ার তখন, ছুটে যেতে চাইতাম ওদের সাথে বিজয় উৎযাপনে অংশগ্রহন করতে। কিন্তু ততদিনে আমি কিশোরী হয়ে উঠেছি। আমার শরীর কাঠামোগত পরিবর্তনের দিকে যাচ্ছে। এই বিশাল অপরাধের কারনে, জানালা কিংবা রাস্তার একপাশে দাঁড়িয়ে শুধু ওদের আনন্দ দেখার সৌভাগ্যটুকু জুটত।

ছোটবেলায় সমলিঙ্গের ছিলাম না, তাই ওরা আমাকে খেলতে নেয়নি। কিশোরী বয়সে শুধু ওদের সাথে আনন্দ ভাগাভাগি করতে চেয়েছি, সমাজ আমাকে সেই আনন্দটুকুও দিল না।
তরুনী বয়সে কি তাহলে কালো কাপড় দিয়ে আমার চোখ,কান ঢেকে দেবে? যাতে ক্রিকেট খেলা দেখতে ও যেন না পারি? এবং বাংলাদেশের বিজয়ে যেন কোন আনন্দে আত্মহারাও না হতে পারি?

সেই কাঙ্ক্ষিত তরুনীতেও এসে পৌছালাম। ওই অপেক্ষমাণ কালো কাপড়কে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলেছিলাম। একটা মাঝারি সাইজের পতাকা গলার সাথে বেঁধে পিঠের ওপর রাখতাম।অতি আদরের, প্রিয় স্কুটিতে এক স্টার্ট দিয়ে ‘বা ং লা দে শ’ বলে চিৎকার দিয়ে ভোওও শব্দে বেড়িয়ে পরতাম। আমার পিঠে পৃথিবীর সবথেকে সুন্দর পতাকাটি বাতাসের সাথে বাড়ি খেয়ে খেয়ে স্বশব্দে উড়ে তার উপস্থিতির জানান দিত।
সোজা টিএসিসি। রং মাখতাম, রং মাখাতাম। বেশিরভাগই অপরিচিত। ওখানেই পেয়ে যেতাম প্রায় ৫০ টি বাইকের একটি রেলি। ওদের সাথে সারা ঢাকা শহর ঘুড়ে বাংলাদেশ, বাংলাদেশ বলে চেঁচাতাম। স্কুটি চালানো নিয়ে ছেলেদের সাথে অনেক খারাপ অভিজ্ঞতা থাকলেও, ওই রেলিগুলোতে আমার কখনোই কোন সমস্যার সম্মুখিন হতে হয়নি। অপরিচিত ৫০ টি ছেলের সাথে গভীর রাতেও নির্দিধায় বাইক র‍্যালি করেছি। বিজয় উৎযাপন করেছি। সেই ছোটবেলায় ক্রিকেট না খেলতে পারার, না উৎযাপণ করতে পারার কষ্ট যেন কিছুটা হলে ঘুচেছিল।

ছেলেদের খেলা, মেয়েদের খেলার এই প্রকারভেদ গুলো ঘুচে যাক। কিছু মানুষের খেলা কী তৈরি করা যেতে পারে? যে খেলা খেলতে বিশেষ কোন লিঙ্গের অধিকারী হতে হবে না? যে খেলায় কেউ নিষিদ্ধ থাকবে না। যে খেলা খেলার জন্য একমাত্র যোগ্যতা থাকবে যে সে ‘মানুষ’ কিনা?

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

16 − = 9