সুন্দরবনকে ভুলে যাবেন না

গত ২০ এপ্রিল বিদ্যুৎ ভবনে বসে সরকার চূড়ান্ত করে ফেলল সুন্দরবন ধ্বংসের রূপরেখা। সাধারণ জনগণের বিরোধিতা, পরিবেশবিদদের আপত্তি এবং আর্থিকভাবে দেশের ক্ষতির আশঙ্কাকে এড়িয়ে এইদিন সরকার তিনটি চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে সুন্দরবন ধ্বংসের সব আয়োজন শেষ করল। আমরা এর বিরোধিতা করে মুখ খুলতে না খুলতে জাতীয় জীবনে নেমে এলো ভয়ঙ্কর অশনি। সাভার ট্র্যাজেডিতে নিহত হাজারো শ্রমিককে উদ্ধারে ছুটে গেলাম আমরা। এক রকম চাপা পড়ে গেল সুন্দরবন রক্ষার আন্দোলন।

এরপর এলো হেফাজত। ঢাকাজুড়ে তারা স্মরণকালের সবচেয়ে বড় ধ্বংসযজ্ঞ চালালো। এখনও আমরা সেই হিসাব নিকাশে ব্যস্ত। সুন্দরবন ধীরে ধীরে উবে যাচ্ছে আমাদের ভাবনা থেকে। কিন্তু সুন্দরবনকে ভুলে গেলে চলবে না। আমাদের একটাই সুন্দরবন। সরকার এই বনের ভেতরেই করতে যাচ্ছে লাল ক্যাটাগরির সবচেয়ে দূষণপ্রবণ একটি প্রকল্প- কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র।

সবাই বলছে, এর মাধ্যমে সুন্দরবনের প্রভূত ক্ষতি সাধিত হবে। পরিবেশবিদরা সুন্দরবন রক্ষার্থে এই প্রকল্প অন্য কোথাও সরিয়ে নেয়ার আবেদন জানিয়েছে। অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, এই প্রকল্পে বিদ্যুৎ ক্রয়ে যে চুক্তি করা হয়েছে, তাতে বাংলাদেশ ঠকছে। দেশের প্রচলিত আইন ভেঙে এই প্রকল্পে ভারতের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল থার্মাল পাওয়ার কোম্পানিকে (এনটিপিসি) বিশেষ সুবিধা দেয়া হচ্ছে। স্থানীয় জনতা সুন্দরবন ধ্বংসের এই পাঁয়তারার বিরোধিতা করে আন্দোলন চালিয়ে আসছে। কিন্তু এত অভিযোগ, আপত্তি সত্ত্বেও পিছু হটছে না সরকার।

সরকারপক্ষের দাবি, এই প্রকল্পের ফলে সুন্দরবনের কিছু হবে না। আর দুই দেশের মধ্যে চুক্তি করতে গেলে কিছু ছাড় দিতে হয়। বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে ও তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে বেরিয়ে আসার জন্য এখন এ ধরনের বিদ্যুৎ কেন্দ্র খুবই দরকারি। তাই যে কোনো মূল্যে সরকার এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের পক্ষে। সুশীল সমাজ, অর্থনীতিবিদ, পরিবেশকর্মী, আইনজীবী ও আমরা জাতীয় স্বার্থ রক্ষা আন্দোলনের কর্মীরা ভাবতে বাধ্য হচ্ছি, সরকারের সামনে বিশেষ কোনো উদ্দেশ্য আছে। তা না হলে এতগুলো পক্ষের আপত্তি সত্ত্বেও গোঁয়ার্তুমি করে কেন সুন্দরবনের ক্ষতি মেনে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পথে হাঁটছে তারা?

সুন্দরবনের যেসব ক্ষতি হবে
রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র হবে শুনেই এ নিয়ে কাজ শুরু করেন অনেকে। বিভিন্ন পক্ষ অনুসন্ধান চালায়। সকলেই স্বীকার করে এর ফলে সুন্দরবন ব্যাপক ক্ষয়, ক্ষতির শিকার হবে। শুধু সরকারের পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা (ইআইএ) বাদে। সরকারের দেয়া ইআইএ রিপোর্টটি যদিও বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড আয়োজিত পর্যালোচনা সভায় উপস্থিত পরিবেশবিদরা একযোগে প্রত্যাখ্যান করেছে।

কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র মারাত্মক পরিবেশ দূষণ ঘটায় বলে সাধারণত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সংরক্ষিত বনভূমি ও বসতির ১৫ থেকে ২০ কিলোমিটারের মধ্যে কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের অনুমোদন দেয়া হয় না। ইআইএ রিপোর্ট অনুসারে প্রস্তাবিত ১৩২০ মেগাওয়াট রামপাল কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পটি সুন্দরবন থেকে মাত্র ১৪ কিমি দূরে যা সরকার নির্ধারিত সুন্দরবনের চারপাশের ১০ কিমি এনভায়রনমেন্টালি ক্রিটিক্যাল এরিয়া (ইসিএ) থেকে ৪ কিমি বাইরে বলে নিরাপদ হিসেবে দাবি করা হয়েছে।

অথচ যে ভারতীয় এনটিপিসি বাংলাদেশে সুন্দরবনের পাশে এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি নির্মাণ করতে যাচ্ছে সেই ভারতেরই ওয়াইল্ড লাইফ প্রটেকশন অ্যাক্ট ১৯৭২ অনুযায়ী, বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ১৫ কিমি ব্যাসার্ধের মধ্যে কোনো বাঘ/হাতি সংরক্ষণ অঞ্চল, জীববৈচিত্র্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বনাঞ্চল, জাতীয় উদ্যান, বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য কিংবা অন্য কোনো সংরক্ষিত বনাঞ্চল থাকা চলবে না। অর্থাৎ ভারতীয় কোম্পানি এনটিপিসিকে বাংলাদেশে সুন্দরবনের যত কাছে পরিবেশ ধ্বংসকারী কয়লাবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করতে দেয়া হচ্ছে, তার নিজ দেশ ভারতে হলে সেটা করতে পারত না! আবার সুন্দরবন থেকে দূরত্ব আসলেই ১৪ কিমি কিনা তা নিয়েও বিতর্ক আছে। অনেকেই বলছেন সুন্দরবন থেকে আসলে দূরত্ব ৯ কিমি। খোদ ইআইএ রিপোর্টের এক জায়গায় বলা হয়েছে প্রকল্পের স্থানটি একসময় একেবারে সুন্দরবনেরই অংশ ছিল, সেটলার বা বসতি স্থাপনকারীরা বন কেটে আবাসভূমি তৈরি করেছে (ইআইএ, পৃষ্ঠা ২০৮)।

আইন অনুযায়ী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র একটি লাল ক্যাটাগরির (সবচেয়ে বেশি দূষণপ্রবণ) শিল্প। যা কেবলমাত্র শিল্প এলাকা বা শিল্পসমৃদ্ধ এলাকা ছাড়া তৈরি করার কোনো সুযোগ নেই। অথচ কয়লাভিত্তিক এ বিদ্যুৎ কেন্দ্র করা হচ্ছে, সুন্দরবনের পাশেই কৃষি ও মৎস্য চাষের স্বর্গভূমিতে।

পরিবেশবিদদের মতে, সুন্দরবনের পাশে এমন মারাত্মক দূষণকারী একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়ে উঠলে তা সুন্দরবনের পরিবেশ ও রয়েল বেঙ্গল টাইগারসহ ওই এলাকার জীববৈচিত্র্যকে হুমকির মুখে ঠেলে দেবে। পাশাপাশি সুন্দরবনের মাটির গুণগতমান নষ্ট, প্রাণীদের হরমোনজাতীয় সমস্যা, প্রজনন ক্ষমতা হ্রাস, নদী দূষণ, মাটির উর্বরতা হ্রাস এবং উদ্ভিদের বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করবে।

এ বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন নিয়ে তাই বন বিভাগ আপত্তিও করেছিল। কিন্তু বন বিভাগের আপত্তিকে বিবেচনায় নেয়া হয়নি। যদিও নিয়মানুযায়ী সুন্দরবনের মালিক বন অধিদপ্তর এবং এ বিষয়ে তাদের মতামতই সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য পাওয়ার কথা। বন অধিদপ্তর তাদের লিখিত আপত্তিতে সরকারকে জানায়, ‘কয়লাভিত্তিক পাওয়ার প্লান্ট স্থাপন করা হলে সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগার তথা সমগ্র জীববৈচিত্র্য হুমকির সম্মুখীন হবে।’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াটের এ বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালাতে প্রতিদিন কয়লা পোড়াতে হবে ১৩ হাজার মেট্রিক টন। এতে ছাই হবে প্রতিদিন প্রায় এক হাজার ৬০০ মেট্রিক টন। যা থেকে বিপুল রাসায়নিক দ্রব্য নিঃসরিত হবে। এছাড়া সুন্দরবনের ভেতরে পশুর নদীর গভীরতা সর্বত্র বড় জাহাজের জন্য উপযুক্ত না হওয়ার কারণে প্রথমে বড় জাহাজে করে কয়লা সুন্দরবনের আকরাম পয়েন্ট পর্যন্ত আসবে। তারপর আকরাম পয়েন্ট থেকে একাধিক ছোট লাইটারেজ জাহাজে করে কয়লা মংলাবন্দরে নিয়ে যেতে হবে। ১৩২০ মেগাওয়াটের জন্য প্রতিদিন প্রায় ১৩ হাজার টন কয়লা লাগবে। এর জন্য সুন্দরবনের ভেতরে হিরণ পয়েন্ট থেকে আকরাম পয়েন্ট পর্যন্ত ৩০ নদীপথে বড় জাহাজ বছরে ৫৯ দিন এবং আকরাম পয়েন্ট থেকে মংলা বন্দর পর্যন্ত প্রায় ৬৭ কিলোমিটার পথ ছোট লাইটারেজ জাহাজে করে বছরে ২৩৬ দিন হাজার হাজার টন কয়লা পরিবহন করতে হবে!

এভাবে সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে কয়লা পরিবহনকারী জাহাজ চলাচল করার ফলে কয়লা পরিবহনকারী জাহাজ থেকে কয়লার গুঁড়া, ভাঙা বা টুকরো কয়লা, তেল, ময়লা-আবর্জনা, জাহাজের দূষিত পানিসহ বিপুল পরিমাণ বর্জ্য নিঃসৃত হয়ে নদী-খাল-মাটিসহ গোটা সুন্দরবন দূষিত করে ফেলবে। চলাচলকারী জাহাজের ঢেউয়ে দুপাশের তীরের ভূমিক্ষয় হবে। কয়লা পরিবহনকারী জাহাজ ও কয়লা লোড-আনলোড করার যন্ত্রপাতি থেকে দিনরাত ব্যাপক শব্দদূষণ হবে। রাতে জাহাজ চলাচলের সময় জাহাজের সার্চ লাইটের আলো নিশাচর প্রাণীসহ সংরক্ষিত বনাঞ্চল সুন্দরবনের পশুপাখির জীবনচক্রের ওপর মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলবে।

এসব ক্ষতির বাইরে রয়েছে পানির হিসাব। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে প্রচুর মিষ্টি পানির প্রয়োজন হয়। রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির পানি আসবে সংলগ্ন পশুর নদী থেকে। এজন্য বিদ্যুৎ কেন্দ্র পরিচালনাকারীদের লবণাক্তমুক্তকরণ প্লান্ট বসানোর প্রয়োজন পড়বে।
পশুর নদী এমনিতেই শুকিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে পশুর নদী থেকে এই হারে পানি প্লান্টে টেনে নিলে সেক্ষেত্রে নদীর ওপর নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর সেচকার্য বিঘিœত হবে। এই নদীটি সুন্দরবনের অনেকখানি অংশের জীবনপ্রবাহকে টিকিয়ে রেখেছে। নদীটি শুকিয়ে যেতে থাকলে মারা পড়বে সুন্দরবনের অসংখ্য প্রাণী।

রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্পে প্রতি ঘণ্টায় ১৪৪ কিউসেক পানি লাগবে। এজন্য ৭২টি গভীর নলকূপ বসাতে হবে। এতে অল্প সময়ের মধ্যে বিস্তীর্ণ এলাকার ভূ-উপরিভাগ মরুভূমিতে পরিণত হবে। এতে করে সরাসরি আক্রান্ত হবে সুন্দরবন। উজাড় হবে সুন্দরবনের গাছপালা। এছাড়া প্লান্টে ব্যবহৃত গরম পানি কনডেনসারের মাধ্যমে কিছুটা ঠাণ্ডা করে ছেড়ে দেয়া হবে নদীতে। এ ধরনের উষ্ণ পানি পুরো পশুর নদীর মাছ ও অন্যান্য জলজীবকে ধ্বংস করবে।

এর বাইরেও আছে অর্থনৈতিক ক্ষয়-ক্ষতির হিসাব। জানা গেছে, এই প্রকল্প থেকে প্রাপ্ত প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম হবে আট টাকা ৮৫ পয়সা। যদিও গত ডিসেম্বর মাসে দেশি প্রতিষ্ঠান ওরিয়ন গ্রুপের সঙ্গে মোট এক হাজার ৮৬ মেগাওয়াট ক্ষমতার তিনটি কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র স্থাপনের যে চুক্তি অনুস্বাক্ষরিত হয়েছে, তাতে বিদ্যুতের দাম পড়ছে অনেক কম। এর মধ্যে ৫২২ মেগাওয়াটের মাওয়া কেন্দ্রের প্রতি ইউনিটের দাম পড়ছে চার টাকা সাড়ে নয় পয়সা, খুলনা কেন্দ্রের তিন টাকা ৮৮ পয়সা এবং চট্টগ্রাম কেন্দ্রের তিন টাকা ৭৯ পয়সা। বর্তমানে দেশের একমাত্র কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বড়পুকুরিয়ায় উৎপাদিত বিদ্যুতের দাম পড়ছে সাড়ে পাঁচ টাকার মতো।

দেখা যাচ্ছে, ভারতীয় কোম্পানির সঙ্গে যৌথ উদ্যোগের চেয়ে দেশীয় একক উদ্যোগ অনেক বেশি সাশ্রয়ী। প্রকল্পে বাংলাদেশ ও ভারত ১৫ ভাগ করে মোট ৩০ ভাগ অর্থের যোগান দেবে। বাকি ৭০ ভাগ আসবে উন্মুক্ত বাজার থেকে। যা ভারতের কাছ থেকে পাওয়া ঋণ থেকে দেয়া হবে বলে জানা গেছে। যেখানে আবার সুদের হার ১৪ শতাংশের কাছাকাছি। শর্ত হিসেবে অবকাঠামো নির্মাণ ও বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের কাজ পাবে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান। যা আসলে পাবে ভারতীয় প্রতিষ্ঠান। অর্থাৎ এই প্রকল্পের কাজ বাড়তি মুনাফার সুযোগ পাচ্ছে ভারত। এতে করে ব্যয় বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও থাকছে।

তাছাড়া এ প্রকল্প থেকে এনটিপিসির লভ্যাংশের ওপর ১০ বছরের জন্য এ কর অবকাশ সুবিধা দিয়েছে সরকার। এর আগেই তাদের করপোরেট কর ট্যাক্স মওকুফ করা হয়েছিল। দেড় বিলিয়ন ডলারের এ প্রকল্পের লভ্যাংশের ওপর কর মওকুফ করায় সরকার মোটা অঙ্কের রাজস্ববঞ্চিত হবে। লভ্যাংশের ওপর কোনো বিদ্যুৎ কোম্পানির কর মওকুফের নজির দেশে ইতিপূর্বে দেখা যায়নি।

এর বাইরে ১৮৩০ একর ধানী জমি অধিগ্রহণের ফলে ৮ হাজার পরিবার উচ্ছেদ হবে। রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রে কর্মসংস্থান হতে পারে সর্বোচ্চ ৬০০ জনের, ফলে উদ্বাস্তু এবং কর্মহীন হয়ে যাবে প্রায় ৭ হাজার ৫০০ পরিবার। শুধু তাই নয়, আমরা প্রতি বছর হারাব কয়েক কোটি টাকার কৃষিজ উৎপাদন।

সুন্দরবনের ভেতরে এরকম একটি মারাত্মক দূষণপ্রবণ বিদ্যুৎ কেন্দ্র হলে জনমানুষের বিরাট ক্ষতি হবে। সুন্দরবন আমাদের প্রকৃতিক বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করে। বন ক্ষতিগ্রস্ত হলে দেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলাফল ভয়াবহ হবে। অর্থনৈতিক ক্ষতি সাধারণ মানুষের ওপরই চেপে বসবে। কৃষিজমি হারানোর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে মানুষ। অনেকে উদ্বাস্তু হয়েছেন এরই মধ্যে। এসব ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার কোনো বিকল্প নেই।

এ বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে বাংলাদেশ সরকারকে জলাশয় ভরাট, কার্বন নির্গমন, বন ক্ষতিগ্রস্তকরণ, বিশ্ব ঐতিহ্যের ধারক বনাঞ্চল ক্ষতিগ্রস্তকরণসহ দেশি-বিদেশি মোট পাঁচটি আইন বা কনভেনশন লঙ্ঘন করতে হচ্ছে। পাশাপাশি মুনাফায় কর মওকুফের মধ্য দিয়েও প্রচলিত আইন ভাঙছে সরকার। এর ফলে আগামীতে বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তিতে বাংলাদেশকে অনেক ছাড় দিতে হবে। আন্তর্জাতিক দাতাগোষ্ঠী প্রত্যাহার করে নিতে পারে নানা ধরনের সহযোগিতা।

সব হিসাব বাদ দিয়ে আমরা বলছি, সুন্দরবন থেকে সরে দাঁড়ান। আর কিছু চাই না। সরকার চাইলেই এ প্রকল্পটিম পূর্ব নির্ধারিত খুলনার লবণচরা এলাকায় করতে পারত। লবণচরায় করলে সুন্দরবন রক্ষা পেত। ইআইএতে নানাভাবে বোঝানো হয়েছে ক্ষতি কমানো সম্ভব। কিন্তু ক্ষতি যে হবে, এটা তারা এড়িয়ে যেতে পারেনি। অথচ সমীক্ষায় আসা উচিত ছিল যে, রামপালে করা যাবে না কারণ এখানে সুন্দরবন আছে। লবণচরায় করা যাবে, কারণ এখানে সুন্দরবন নেই। তা না করে তারা কয়লা পরিবহনের সুবিধার জন্য রামপালকেই অগ্রাধিকার দিল। এটা খুবই হতাশার যে, সরকার সুন্দরবনের মূল্য বুঝতে পারছে না। সরকারের উচিত অবিলম্বে এই প্রকল্পের স্থান পরিবর্তন করে তা সুন্দরবন থেকে অন্তত ১০০ কিলোমিটার দূরে নিয়ে যাওয়া।

সরকার রাজনৈতিক বিবেচনায়, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষার খাতিরে এর আগে তিতাস নদীতে বাঁধ দিয়ে ভারতে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের জন্য মালামাল পাঠিয়েছিল। এখন সুন্দরবন ধ্বংস করে ভারতকে সুন্দরবনের একক মালিক এবং তাদের মুনাফা করার ব্যবস্থা করে দিচ্ছে সরকার। ২০ এপ্রিল এ নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারত যে চুক্তি স্বাক্ষর করেছে তা বাংলাদেশের জন্য একটি ভয়াবহ বিপদের ক্ষেত্র তৈরি করেছে।

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এই প্রকল্পে এমন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে যাতে পরিবেশের কোনো ক্ষতি হবে না। বাস্তবে এটা খুবই বায়বীয় কথা। প্রযুক্তি তো মঙ্গলগ্রহ থেকে আসবে না। পৃথিবীতে এ যাবৎ কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের যত প্রযুক্তি এসেছে, তার সবই পরিবেশের কমবেশি ক্ষতি করে। ভারতের কাছে এমন কোনো প্রযুক্তি নেই, যা ব্যবহারে পরিবেশের কোনো ক্ষতি হবে না। গত কোপেনহেগেন সম্মেলনে তো এই কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্যই বিশ্ব নেতৃত্ব তাদের সতর্ক করেছিল। তুলনামূলক বিচারে ভারতের প্রযুক্তি জার্মানি বা উন্নত বিশ্বের তুলনায় অনেক বেশি ক্ষতিকর। এটা প্রমাণের জন্যে বিশেষজ্ঞ হবার প্রয়োজন নেই। এটা সর্বজনস্বীকৃত।

ভারত তার নিজের প্রযুক্তি ব্যবহার করেই বিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরি করবে। পরিবেশের ক্ষতি হবে না, এমনভাবে করা হবে যাতে কোনো ক্ষতি না হয়- এসব অর্থহীন, অর্বাচীন কথা মানুষকে শুনতে হচ্ছে মন্ত্রী, আমলা এবং বিদেশি কোম্পানির কনসালটেশন চিহ্নিত কিছু বিশেষজ্ঞের কাছ থেকে। যার সঙ্গে সত্য এবং বাস্তবতার কোনো সম্পর্ক নেই। পরিবেশের কোনো ক্ষতি হবে না এমন কোনো প্রযুক্তি পৃথিবীর কোথাও নেই। আর পরিবেশের ক্ষতি হয় বলেই ভারতে এই প্রকল্পটি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ভারতে করলে পরিবেশের ক্ষতি করে বাংলাদেশে করলে ক্ষতি হবে না- বিষয়টি কি এমন!

সবচেয়ে বড় কথা, সরকার চুক্তি সম্পাদনের পর, জমি অধিগ্রহণের পর পরিবেশগত প্রভাব নিরূপণের প্রতিবেদন দাখিল করেছে। যা হাস্যকর। আমরা জোর করে সুন্দরবনে এই প্রকল্প করার সরকারি চেষ্টায় হতাশ। এসবের মধ্য থেকে বেরিয়ে দ্রুত সুন্দরবন রক্ষা করে অন্য কোথাও প্রকল্প স্থানান্তর করতে হবে। এই ধ্বংসাত্মক পরিকল্পনার বিরুদ্ধে আমাদের সোচ্চার হওয়া দরকার। আবারও বলছি, আমাদের একটাই সুন্দরবন। এটাকে রক্ষা করতে হবে। সবাইকে পথে নামতে হবে। সরকার যদি জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করতে না চায় তাহলে তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলাটাই আমাদের কর্তব্য

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২০ thoughts on “সুন্দরবনকে ভুলে যাবেন না

  1. সব বাদ দিলেও এই হিসাবটা
    সব বাদ দিলেও এই হিসাবটা মানতেই হচ্ছে,

    ভারতীয় কোম্পানির সঙ্গে যৌথ উদ্যোগের চেয়ে দেশীয় একক উদ্যোগ অনেক বেশি সাশ্রয়ী।

    বৈদ্যুতিক, সুবিধা পাবার জন্য; নিজেদের পায়ের তলার মাটিতো আর সরিয়ে দেয়া যায় না!!!

  2. হায়রে আমার সোনার দেশের কি হবে
    হায়রে আমার সোনার দেশের কি হবে ? সবই শকুনের দল। হায় হায় হায় !!!!!!!!! :কানতেছি: :কানতেছি: :কানতেছি: :কানতেছি: :কানতেছি:

  3. ভাই ফেসবুকে একটা ইভেন্ট
    ভাই ফেসবুকে একটা ইভেন্ট খুলেন, আমরা প্রেস ক্লাবের সামনে একটা মানব বন্ধন করি। মানব বন্ধনে ১০ জন আসুক তাতে সমস্যা নেই। আসলে সকলের দৃষ্টি এখন অন্যদিকে। এইদিকে দৃষ্টি ফেরানো কঠিন হবে, কিন্তু আমাদের করতে হবে। প্রেস ক্লাবের মানব বন্ধন দিয়ে আমাদের আন্দোলনকে শুরু করে তারপর এটাকে এগিয়ে নিতে হবে।

  4. সুন্দরবন চাই, কয়লাবন নয়!!
    সুন্দরবন চাই, কয়লাবন নয়!! :চিন্তায়আছি: :চিন্তায়আছি:
    প্রতিরোধ এর সময় এসেছে আবারো…

  5. সুন্দরবন ধ্বংস করে কয়লা
    সুন্দরবন ধ্বংস করে কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র করা হচ্ছে কার স্বার্থে? আসুন এই চক্রান্ত রুখে দাঁড়াই।

  6. জয়, ভারত মাতা কি জয়…
    আমাদের

    জয়, ভারত মাতা কি জয়…
    আমাদের প্রতিবাদ অব্যহত রাখতেই হবে। আত্মঘাতী এই সিদ্ধান্ত থেকে সরকারকে ফেরাতেই হবে। সারা পৃথিবী যেখানে সকল প্রকল্প এখন পরিবেশ বান্ধব কিনা সেটার উপর জোর দিচ্ছে, আমাদের সরকার হাঁটছে উল্টো রথে। :মাথাঠুকি:

  7. ভাই এখানে মন্তব্য করলে কি হবে
    ভাই এখানে মন্তব্য করলে কি হবে বলেন? তারচেয়ে ভাল হবে প্রেসক্লাবের সামনে একটা মানব বন্ধন করলে। আপনারা যারা ফেসবুক সেলেব্রিটি আছেন তাঁরা এক সপ্তাহ প্রচারনা চালাইলে ২০০-৩০০ মানুষ জড় করা আমার মনে হয় কঠিন কিছু হবে না। ক্ষুদ্র থেকেই আন্দোলন বড় করা সম্ভব, কিন্তু শুরু না করলে কিছুই হবেনা।

  8. রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ
    রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের ব্যক্তিগত স্বার্থের কারণে আমরা একে একে সব হারাব। সুন্দরবনকে কোনভাবেই ধ্বংস হতে দেওয়া যাবে না। আসুন আমরা সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন গড়ে তুলি। এই আন্দোলন সরকার পতনের জন্য নয়। এই আন্দোলন শুধুমাত্র সুন্দরবনকে রক্ষা করার আন্দোলন।

    1. সহমত
      এই আন্দোলন সরকার পতনের

      সহমত

      এই আন্দোলন সরকার পতনের জন্য নয়। এই আন্দোলন শুধুমাত্র সুন্দরবনকে রক্ষা করার আন্দোলন।

      :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:

  9. যে সুন্দরবনকে আমরা ভোট দিলাম
    যে সুন্দরবনকে আমরা ভোট দিলাম সপ্তম আশ্চর্যের একটি হওয়ার জন্য, সেই সুন্দরবনকে এখন ধ্বংস করার জন্য সরকার মরিয়া হয়ে উঠেছে। যে সুন্দরবন আমাদের গর্বের সম্পদ তাকে আরো সমৃদ্ধ করা তো দূরে থাক চিরতরে শেষ করে দিচ্ছে।
    ব্লগ ফেসবুকে এ সম্পর্কে লিখে আমরা মানুষকে সচেতন করতে পারি, কিন্তু সরকার বধির। তার কানে বোমা ফাটালেই সে শুনবে। প্রতিবাদ করতে হবে রাজপথে, যেভাবে আড়িয়াল বিল রক্ষা করা হয়েছে ঠিক সেভাবেই সুন্দরবন রক্ষা করতে হবে। তবেই সরকারের টনক নড়বে। সুন্দরবন আমাদের জাতীয় সম্পদ। সরকারের একছত্র অধিকার নেই।
    একটি ঘটনা অন্য ঘটনাকে চাপা দিয়ে কবর রচনা করছে। কিন্তু চাপের ভারে যদি আমরাই তলিয়ে যাই তবে আর এ নিয়ে লিখে কি হবে। দেশের এখন এমন অবস্থা যে আজ একটি ঘটনা ঘটবে তো কাল অন্যটি। একটি নিয়ে প্রতিবাদ করতে গিয়ে যাতে অন্যটি ভুলে না যাই।
    আসুন আমরা সংঘটিত হই, রাস্তায় নামি……

  10. এই ব্যাপারে অনেকেই বিস্তারিত
    এই ব্যাপারে অনেকেই বিস্তারিত জানে না, তাই মানুষের মধ্যে তেমন প্রতিক্রিয়া দেখা যায় না….এর বিরুদ্ধে দাড়াতে হলে আগে সবাইকে এই বিষয়ে জানাতে বোঝাতে হবে….

  11. দ্রুত প্রতিরোধ গড়তে হবে। আর
    দ্রুত প্রতিরোধ গড়তে হবে। আর দৃষ্টি অন্য দিকে নেওয়া যাবে না। হেফাজত এক অর্থে আমাদের দৃষ্টি এইদিক থেকে সরিয়ে নিচ্ছে

    1. সরকারও চায় আমাদের দৃষ্টি
      সরকারও চায় আমাদের দৃষ্টি অন্যদিকে ফেরানো থাকুক। আর এইরকম দেশের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিরোধী দল হরতাল ডাকবে না। ডাকবে খালেদার বাড়ি হারানোর দুঃখে। এই হচ্ছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলের জনসেবার চিত্র। :ক্ষেপছি:

  12. সমযোপযোগি সুন্দর পোষ্ট।
    সমযোপযোগি সুন্দর পোষ্ট। সুন্দরবনকে রক্ষা করতে যা যা করা দরকার আমাদের করা উচিৎ। এটা হেলাফেলা করবার বিষয় নয়। গোলামি চুক্তির পর আবার নতুন করে চুক্তি করে দেশের বারোটা বাজানোর কোনো যুক্ত নেই।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

66 − = 59