জ্বালানি মন্ত্রণালয় কেন বিরোধীদের ডাকছে!

রামপালে নির্মিতব্য কয়লাভিত্তিক ১৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার মৈত্রী সুপার থারমাল পাওয়ার প্রজেক্টকে ঘিরে পরিবেশবিদ ও বিশেষজ্ঞদের ভয়াবহ সব আপত্তি আছে। এর মধ্যেই সরকার বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করছে। মূল প্রকল্পের কাজে হাত দেয়ার আগে সম্প্রতি তারা প্রকল্প এলাকা পরিদর্শনের আয়োজন করে। এতে বিরোধিতাকারীদেরও অংশ নেয়ার আহ্বান জানানো হয়। কেউ কেউ তাতে সাড়া দেন, কেউ বা মতামত দিয়ে এখনও জবাবের অপেক্ষায় আছেন। রামপাল পরিদর্শন শেষে সংশ্লিষ্টরা ফিরে আসার পর সরকারের এই উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা এখন তুঙ্গে!

প্রশ্ন উঠছে, তবে কি সরকার বিরোধী মতকে আসলেই বিবেচনা করার মানসিকতা গ্রহণ করেছে? তবে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে, জাতীয় কমিটির কাছে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের পাঠানো আমন্ত্রণ পত্র নিয়ে। সারা বছর যাদের গালি দেয়া হয়, এমনকি সংসদেও যাদের নিয়ে কূটালাপ চলে, পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে যাদের নামে কালিমা লেপন করা হয়, হঠাৎ কেন সরকার তাদের নিয়ে পথ চলতে আগ্রহী হলো? নাকি এ সবই লোক দেখানো কৌশল? সুন্দরবনের কাছে এ প্রকল্প করা থেকে শেষ পর্যন্ত সরকার সরে আসবে কিনা এ ভাবনাও গতি পেয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সুন্দরবনে কয়লাভিত্তিক ১৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের কাজ সরকার অব্যাহত রেখেছে। সরকারি সূত্রে জানা গেছে, মূল প্রকল্পের কাজ এখনও শুরু না হলেও এর প্রস্তুতি হিসেবে যে কাজ সম্পন্ন হয়েছে, তা মূল প্রকল্পের হিসাবে ৩ শতাংশ। একদিকে কাজ চলছে, অন্যদিকে এ প্রকল্পের বিরোধীদের ডেকে সরকার বলছে ‘সুচিন্তিত মতামত’ দেয়ার জন্য। এর আগ পর্যন্ত সরকার বিরোধী মতকে পুরোপুরি উপেক্ষাই করে গেছে। এর নমুনা দেখা গেছে গত ২ নভেম্বর এ প্রকল্প সম্পর্কে পত্রিকায় দেয়া বিদ্যুৎ বিভাগের বিজ্ঞাপনে।

ওই বিজ্ঞাপনে বিদ্যুৎ বিভাগ দাবি করে, রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র একটি পরিবেশবান্ধব প্রকল্প। সুন্দরবন থেকে প্রকল্পটি নিরাপদ দূরত্বে অবস্থিত দাবি করে এতে আরও বলা হয়, ‘এ প্রকল্প নিয়ে একটি মহল ও কতিপয় ব্যক্তি বা সংগঠন বিভ্রান্তিমূলক তথ্য প্রচার ও কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে। যা অমূলক, ভিত্তিহীন ও দেশের স্বার্থবিরোধী।’ অর্থাৎ সরকার খুব স্পষ্টভাবেই বিরোধিতাকারীদের সকল মতামততে নাকচ করে দিয়েছে। এ ধরনের বক্তব্য প্রকাশের ঠিক পরপরই প্রকল্পের বিরোধিতাকারীরা সরকারি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে রামপাল এলাকা পরিদর্শনে সরকারের আমন্ত্রণ পান।

সরকারের এ আমন্ত্রণকে সব পক্ষ থেকে স্বাগত জানানো হয়। পাশাপাশি প্রশ্ন ওঠে, এতদিন পরে কেন হঠাৎ করে সরকার এমন সমন্বয়ের পথে এগুচ্ছে। সরকার কি আসলেই বিরোধিতাকারীদের মতামত চায়? যদি তাই হবে, তাহলে কেন আমন্ত্রণ পাঠানোর পাশাপাশি আবার পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে বিষোদগার ছড়ানো হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে মতামত জানতে চাই রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র বিরোধী আন্দোলনের মূলমঞ্চ তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্য সচিব অধ্যাপক আনু মুহাম্মদের কাছে।

তিনি বলেন, ‘সরকারের এ আমন্ত্রণকে আমরা ইতিবাচকভাবেই নিয়েছি। আমন্ত্রণের জবাবে আমাদের মতামতও দিয়েছি। যদিও এখনও তার কোনো জবাব পাইনি। এ প্রশ্নটি আমরাও আমলে নিয়েছি যে, আসলে তাদের উদ্দেশ্য কি? কারণ সরকারের কথায় ও কাজে কোনো সঙ্গতি দেখা যাচ্ছে না। একদিকে তারা বলছে আমাদের সুচিন্তিত মতামত চায়। অন্যদিকে আবার আমাদের লক্ষ্য করে বিজ্ঞাপন দিয়ে কিছু ব্যক্তি, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, দেশের স্বার্থবিরোধীও বলা হচ্ছে। এ দুটো তো একসঙ্গে সঠিক হতে পারে না। পাশাপাশি আমরা এও বলেছি, বন ধ্বংসের কর্মযজ্ঞ চলমান রেখে সুচিন্তিত মতামত চাওয়াটা কাজের কিছু নয়। এর প্রেক্ষিতে আমরা দাবি জানিয়েছে, সরকার যদি আন্তরিকভাবেই আমাদের মতামত চায়, তাহলে তাদের প্রথম কর্তব্য হচ্ছে, রামপালে যে কোনো বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কাজ স্থগিত করা এবং আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে কুৎসা রটনা ও দমন-পীড়ন বন্ধ করা। সরকার যদি প্রকল্পের কাজ ও আমাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচার ও দমন চালিয়ে যায় তাহলে তো আলোচনা অর্থহীন। এ প্রস্তাবের এখনও কোনো জবাব আমরা পাইনি।’

সরকারের এই হঠাৎ সমন্বয় উদ্যোগের নেপথ্যে কী আছে জানতে চাইলে আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘বর্তমানে দেশে ও বিদেশে সুন্দরবনে নির্মিতব্য এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। ইউনেস্কোসহ বিভিন্ন বিদেশি ও আন্তর্জাতিক পরিবেশবাদী সংস্থা এই প্রকল্পের বিরোধিতা করছে। দেশেও আমাদের আন্দোলনের প্রতি জনসমর্থন বেড়েছে। আগের চেয়ে অনেক বেশি মানুষ এখন সুন্দরবন বিষয়ে ওয়াকিবহাল। এসব ঘটনা সরকারের ওপর চাপ তৈরি করেছে। তাছাড়া প্রধানমন্ত্রী কিছুদিন আগে ‘চ্যাম্পিয়ন অব দ্য আর্থ’ পদকে ভূষিত হলেন। এ অবস্থায় সরকারের জন্য এটা প্রমাণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে যে, সুন্দরবন রক্ষায় তারা সত্যিকারার্থেই আন্তরিক। আন্তর্জাতিক জলবায়ু সম্মেলনে এবার কয়লাপ্রকল্পগুলো চাপে থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। রামপাল প্রকল্পও সমালোচনার সম্মুখীন হবে, এটা বলাই যায়। এজন্যই জলবায়ু সম্মেলনের কিছুদিন আগে এ ধরনের উদ্যোগ নিয়ে সব পক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করেই কাজ হচ্ছে, এমনটা প্রমাণের চেষ্টা করছে সরকার।’

সুন্দরবন পরিদর্শনের সরকারি আমন্ত্রণে জাতীয় কমিটি যুক্ত না হলেও দেশের বিশিষ্ট জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা যারা কিনা সুন্দরবন রক্ষা আন্দোলনের সমর্থক, তারা কেউ কেউ পরিদর্শনে অংশ নিয়েছিলেন। ঘুরে এসে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলেন, ‘কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিরোধিতা আমরা করছি না। আমরা কেবল বলছি যে, সুন্দরবনের এত কাছে এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র করা হলে বনের কোনো ক্ষতি হবে না, এটা আগে নিশ্চিত করতে হবে। আমরা দেখছি যে, ইআইএতে বলা হচ্ছে প্রকল্প এলাকা গ্রামীণ বসতি। অর্থাৎ সুন্দরবনকে আমলে নেয়া হয়নি। আমরা আরও দেখছি যে, সুন্দরবন ও এর আশপাশ এলাকা নিয়ে আমাদের কাছে কোনো ইকোলজিক্যাল ইনফরমেশন ডাটাবেজ নেই। সুন্দরবনের পরিবেশগত ক্ষতি নিরূপণে মনিটরিং স্টেশন নেই। এ নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো কাজও হয়নি। ইআইএতে কারিগরি বিষয়ের ওপর যেসব তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে, তা অনুমাননির্ভর। এরকম পর্যবেক্ষণের ওপর দাঁড়িয়ে এ বিদ্যুৎ কেন্দ্র করা হলে, সুন্দরবনের ক্ষতি হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা আছে। আর ক্ষতি একবার হলে তা মেটানোর কোনো রাস্তা নেই। সরকারকে অবশ্যই সর্বাগ্রে সুন্দরবন রক্ষার ও এর কোনো ক্ষতি না হওয়ার বিষয়ে অকাট্য তথ্যপ্রমাণ দিতে হবে। নইলে এ প্রকল্প বন্ধ করতে হবে। সুন্দরবনকে কিছুতেই আমরা ঝুঁকিতে ফেলতে পারি না।’

সরকার এখনও রামপালে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র করার চিন্তা না ছাড়লেও আন্দোলনকারীরা আশাবাদী যে, এ প্রকল্প অচিরেই বন্ধ হবে। সরকারের সাম্প্রতিক সমন্বয় প্রক্রিয়া, বিদেশি ব্যাংকগুলোর ঋণদানে অপারগতা, দেশজুড়ে সুন্দরবনকে কেন্দ্র করে সচেতনতা বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর অব্যাহত উদ্বেগ এবং প্রধানমন্ত্রীর পরিবেশ বিষয়ক পদক প্রাপ্তি, এ সবই আশার দরজা খুলে দিয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সরকার এখনও সুন্দরবনের গুরুত্ব বুঝতে পারছে না। তবে চারদিকে যেভাবে আলোড়ন তৈরি হচ্ছে, তাতে করে সরকারকে অবশ্যই অবস্থান পরিবর্তন করতে হবে। এই যে জাতীয় কমিটির কাছে পাঠানো সরকারের আমন্ত্রণপত্র, এটাকেও গণমতের চাপ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on “জ্বালানি মন্ত্রণালয় কেন বিরোধীদের ডাকছে!

  1. রামপালের কার্যক্রম এগুচ্ছে
    রামপালের কার্যক্রম এগুচ্ছে ধীরেসুস্থে। এই সরকার খুব সম্ভবত এই প্রজেক্ট থেকে ফিরে আসবেনা। পকেটে টাকার ঝনঝন শুনতে কার না ভাল লাগে?

    কোন অবস্থাতেই সুন্দরবন নষ্ট হতে দিবনা…

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

6 + 1 =