বিবর্তনবাদ : আমাদের অস্তিত্বের ভিত্তিমূল

কিছুদিন আগে সুপ্রিয় বিজ্ঞান লেখক ড.রুশো তাহেরের বিজ্ঞানের সাংস্কৃতিক বিনির্মাণে বইটি পড়ার সুযোগ হয়। লেখক দেখিয়েছেন যে বিজ্ঞান কেবল কাঠখোট্টা তত্ত্বের ভিতর সীমাবদ্ধ নয় ।বরং বিজ্ঞানের রয়েছে একটি সহজ স্বাভাবিক সৌন্দর্য । বিজ্ঞানর সাহায্য নিয়েই আমরা আমাদের অস্তিত্বের ভিত্তিমূলে প্রবেশ করতে পারি । ইতিমধ্যেই বিজ্ঞানের অসাধারণ অগ্রগতির ফলে আমরা জেনেছি অনেক অজানা কথা , খুলে ফেলেছি দর্শনের অনেক রুদ্ধদ্বার । চেতনা , আমার আমিত্ব ইত্যাদি ব্যাখ্যার জন্য এখন আমাদের কাল্পনিক আত্মা নামক অনুষঙ্গের প্রয়োজন হয় না । বিজ্ঞানের দ্বারাই আমরা এখন অতি সহজ এবং স্বাভাবিকভাবে এসব ব্যাখ্যা করতে পারি । এখন কথা হচ্ছে বিবর্তনবাদ নিয়ে । বিবর্তনের বিরুদ্ধে যেখানে উন্নত দেশগুলোতেই সরকারি অর্থায়নে প্রচারনা চালানো হয় সেখানে আমাদেরদেশে বিবর্তনবাদকে সহজভাবে গ্রহন করা হবে না এটাই স্বাভাবিক।

ছোটবেলা থেকেই আমাদের শেখানো হয় মানুষ কোন পর্যায়ক্রমিক বিবর্তনের মাধ্যমে নয় বরং স্বকৃত পাপের দরুন স্বর্গ হতে ধরায় পতিত হয়েছে । আমাদের মগজে ঢুকিয়ে দেওয়া হয় এসব অযৌক্তিক তথা অবৈজ্ঞানিক ভ্রান্ত ধারনা। যে কারনে পরবর্তীতে বিজ্ঞান বিষয়ে উচ্চশিক্ষা লাভ করার পরেও আমাদের মন আচ্ছন্ন হয়ে থাকে এসব ভুল ধারনায়। বস্তুত বিজ্ঞান বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ আর বিজ্ঞানমনষ্কতা সম্পূর্ণই আলাদা। বাংলার কৃষক দার্শনিক আরজ আলী মাতুব্বরের কথা সবাই কমবেশি জানি। যিনি বিজ্ঞানশিক্ষা লাভ করেননি কিন্তু নিজের মনকে বিজ্ঞানমনষ্ক করেছিলেন। আবার বিজ্ঞান বিষয়ে বড় বড় ডিগ্রী লাভ করার পরেও প্রাচীন ধর্মগ্রন্থে আধুনিক
বিজ্ঞান খুঁজে বেড়ান এমন লোকও আছেন।

যাই হোক বিবর্তনবাদ বিজ্ঞানের জগতে আজ একটি প্রমাণিত তত্ত্ব। নিউটনের মহাকর্ষ সূত্র যেমন নিরেট সত্য
তেমনি এ পর্যন্ত পাওয়া তথ্য উপাত্তের ভিত্তিতে বিবর্তনবাদ একটি প্রমানিত অনুষঙ্গ। কিন্ত নিউটনের সূত্র
আমারা অনায়াসে মেনে নিতে পারি। কারণ, ধর্মগ্রন্থে এর সমর্থনে কোন বাণী না থাকলেও অন্তত বিরোধ নেই। অপরদিকে বিবর্তনবাদ যেহেতু মানব প্রজাতি এবং আমাদের চারপাশের প্রানের জগত সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারনা দেয় যা ধর্মগ্রন্থে বর্ণিত গল্পের পুরোপুরি বিপরীত, তাই আমরা এ তত্ত্বকে সহজভাবে নিতে পারি না। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে বিবর্তনবাদ সম্পর্কে পড়ানো হলেও অনেক স্যার ম্যাডামরা আগেই বলে রাখেন এটি আসলে একটি ভ্রান্ত ধারনা। এ থেকেই বোঝা যায় প্রকৃত বিজ্ঞানশিক্ষা এখনো অধরাই রয়ে গেছে। অথচ বিবর্তনকে অস্বীকার করার কোন উপায়ই নেই। জিনতত্ত্ব, বংশগতিবিদ্যা, অণুজীববিজ্ঞান ছাড়াও আধুনিক বিজ্ঞানেরঅনেক মৌলিক শাখা বিবর্তনবাদের উপর প্রতিষ্ঠিত। বিবর্তন জড়িয়ে আছে আমাদের অস্তিত্ত্বের সাথে। মানব সভ্যতা , ধরায় প্রানের
ক্রমবিকাশ সম্পর্কে স্বচ্ছ, সুন্দর এবং গ্রহণযোগ্য ধারনা পেতে হলে আমাদের দ্বারস্থ হতে হবে বিবর্তনবাদের কাছে। আমাদের মনে রাখতে হবে যে, ধর্ম এবং বিজ্ঞান সম্পূর্ণই আলাদা জিনিস। ধর্মের মাধ্যমে মানুষ নিরঙ্কুশ বিশ্বাস ও আনুগত্যের দ্বারা আধ্যাত্নিকতার চর্চা করে। অপরদিকে বিজ্ঞানের দ্বারা পর্যবেক্ষণ এবং পরীক্ষা নিরীক্ষার
দ্বারা মানুষ যৌক্তিক সিদ্ধান্তের দিকে ধাবিত হয়। এর একটির সাথে অপরটি মেশালে উভয়ই অপব্যাখ্যার
শিকার হয়। বিবর্তনবাদকে যতদিন আমরা সহজ এবং স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে না পারব ততদিন আমাদের বৌদ্ধিক বিকাশ এক স্থানেই মুখ থুবড়ে পড়ে থাকবে ।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৭ thoughts on “বিবর্তনবাদ : আমাদের অস্তিত্বের ভিত্তিমূল

    1. হ্যাঁ। আসলে বিবর্তনের
      হ্যাঁ। আসলে বিবর্তনের প্রক্রিয়া, জটিল পর্যায়ক্রমিক ধারা নিয়ে গুরুগম্ভীর লেখা আমার মত অধমের দ্বারা সম্ভব নয়। সাধারণ মানুষকে বিবর্তন সম্পর্কে যে ভ্রান্ত ধারণা দেওয়া হয় তার নিরীখেই লেখা।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 2 = 2