বাপজানের বায়স্কোপঃ প্রজন্মের গল্প

মাসুম রেজার কাহিনী অবলম্বনে রিয়াজুল রিজু পরিচালিত কারুকাজ ফিল্মস-এর চলচ্চিত্র “বাপজানের বায়স্কোপ”। ছবিটি মুক্তি পেয়েছিল গতবছর(২০১৫) ১৮ ডিসেম্বর। কিন্তু মুক্তির তিন দিনের মাথায় দেশের ৪৮টি হল থেকে নামিয়ে দেওয়া হয় ছবিটি। হল মালিকদের বক্তব্য- “এই ছবিতে হলে দর্শক হয় না। দর্শক স্বল্পতাই ছবিটি নামিয়ে দেয়ার একমাত্র কারণ।” অথচ বেশ কয়েকটা হলেই দেখা গেছে এই ছবিটি নামিয়ে দিয়ে যে ছবিগুলো ছাড়া হয়েছে, তাতে দর্শকের পরিমাণ “বাপজানের বায়স্কোপ”-এর চার ভাগের এক ভাগও না! তাহলে “বাপজানের বায়স্কোপ” নামিয়ে দিয়ে কী লাভ হল? এর একটাই অর্থ দাড়াচ্ছে, দর্শক স্বল্পতাই “বাপজানের বায়স্কোপ”-এর প্রদর্শনী বন্ধের একমাত্র কারণ নয়। জানা গেছে যে “বাপজানের বায়স্কোপ” মুক্তির আগে এর প্রচারণার জন্য যে পোস্টারগুলো লাগানো হয়েছিল দেশের বিভিন্ন জায়গায়, দু’দিন না যেতেই সেগুলোর ওপর দিয়ে অন্য ছবির পোস্টার লাগিয়ে দেওয়া হয়েছিল। অর্থাৎ একটা শ্রেণী খুব কৌশলে এই ছবিটিকে চাপা দিতে চাইছে, তারা চায় না এদেশের মানুষ এই ছবিটি দেখুক!

“বাপজানের বায়স্কোপ” চলচ্চিত্রটি মূলত একটি মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক চলচ্চিত্র। শুনলে হয়ত অবাক-ই লাগবে, কোন প্রকার রক্তপাতের দৃশ্য ছাড়াই এখানে চমৎকার ভাবে তুলে ধরা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ এবং বিপক্ষের মধ্যকার দ্বন্দ্ব-সংঘাত। স্বাধীনতা পরবর্তী ৪৪ বছরে মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের শক্তি বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কীভাবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে, তারা কীভাবে সাধারণ মানুষের অসহায়ত্ব এবং ইতিহাস বিমুখতার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ক্ষমতার সিংহাসনে চেপে বসেছে, ধর্মকে তারা কীভাবে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করছে- তারই সার্বিক চিত্র আমরা দেখতে পাই এই চলচ্চিত্রে। একই সাথে এই চলচ্চিত্রে আমরা দেখতে পাই আমাদের সংস্কৃতির এক বিলুপ্তপ্রায় উপাদান, বায়স্কোপের খেলা- যাকে গ্রামের লোকজন একটা সময় “ফুচকির খেলা” বলত।

এই চলচ্চিত্রে তুলে ধরা হয়েছে বাংলাদেশের এক প্রত্যন্ত অঞ্চল চরভাগিনার কাহিনী। চরভাগিনার মানুষজন খুবই সহজ সরল, সহজ সরল তাদের জীবন যাপন। তাদের বেশিরভাগেরই পেশা কৃষিকাজ। জীবিকা নির্বাহের জন্য সকাল-সন্ধ্যা তারা ক্ষেতে খামারে কাজ করে, এর বাইরে অন্য কিছু নিয়ে ভাবার সময় বা সুযোগ কোনোটাই তাদের নেই। ব্যতীক্রম কেবল হাসেন মোল্লা। তার পেশা কৃষিকাজ হলেও তার মন সবসময় পড়ে থাকে ঘরের এক কোণে পড়ে থাকা তার বাবার বায়স্কোপের দিকে। তার বাবা বেঁচে থাকতে গ্রামে গ্রামে গিয়ে বায়স্কোপের খেলা দেখাতেন, সেও তখন থাকত তার বাবার সঙ্গে সঙ্গে। এখন এই খেলার প্রচলন নেই বললেই চলে। কিন্তু যার রক্তে বায়স্কোপের খেলা, সে কি আর কৃষিকাজ নিয়ে পড়ে থাকতে পারে? তার বাবা প্রায়ই তার কল্পনায় দেখা দেন, তাকে বলেন, “ফুচকির খেলা চালু রাখবি না বাজান?” বাবার অনুরোধেই সে মনঃস্থির করে, এখন থেকে সপ্তাহে একদিন সে গ্রামে গ্রামে গিয়ে বায়স্কোপের খেলা দেখাবে। বায়স্কোপের জন্য সে পুথি লিখতে শুরু করে, সেই পুথিতে সে তুলে ধরে বাবার মুখে শোনা মুক্তিযুদ্ধের সময়কার এক অজানা কাহিনী। সেই কাহিনীতে ছিল শহিদ মুক্তিযোদ্ধা ইউসুফের কথা, যে কিনা সম্পর্কে হাসেন মোল্লার ছোট চাচা। আরো ছিল রাজাকার সেকান্দারের কথা, যে এমপি পদপ্রার্থী, এবং চরভাগিনার মোড়ল জীবন সরকারের মামা। হাসেন মোল্লার অনুরোধে মাদ্রাসার ছাত্র ইনসান তার পুথি অনুসারে মুক্তিযুদ্ধের কিছু ধারাবাহিক ছবি এঁকে দেয়, যা দিয়ে হাসেন মোল্লা তৈরি করে বায়স্কোপের ফিল্ম। এর জন্যে ইনসানকেও অনেক ভোগান্তি পোহাতে হয়। এরপর একদিন হাসেন ইনসানকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে পড়ে তার বায়স্কোপের খেলা দেখাতে। মুক্তিযুদ্ধের কাহিনী বায়স্কোপের খেলায় নিয়ে আসে এক নতুন স্বাদ। গ্রামের লোকজন জানতে পারে ত্রিশ লক্ষ শহিদের রক্ত আর দু’লক্ষ বীরাঙ্গনার সম্ভ্রমের বিনিময়ে পাওয়া আমাদের প্রিয় জন্মভূমির স্বাধীনতার পেছনের ইতিহাস। বায়স্কোপের খেলা আর হাসেন মোল্লার পুথি গ্রামের সাধারণ মানুষের মনে জাগিয়ে তোলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে। কিন্তু এতে করে হাসেন মোল্লা পড়ে যায় জীবন সরকারের রোষানলে। জীবন সরকার হাসেনকে আদেশ করে বায়স্কোপের খেলা বন্ধ করতে। তাতে কাজ না হওয়ায় সে চরভাগিনার সাধারণ লোকজনের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে শুরু করে। তখন ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসে জীবন সরকারের পৈশাচিক রূপ! একদিকে জীবন সরকারের হুংকার- “এই বায়স্কোপের খেলা বন্ধ!” আরেক দিকে বাবার অনুরোধ- “ফুচকির খেলা চালু রাখবি না বাজান?” আর অন্যদিকে চরভাগিনার বাসিন্দাদের হাহাকার, আর্তনাদ! কোনদিকে যাবে হাসেন মোল্লা? সে কি ছেড়ে দেবে তার বায়স্কোপের খেলা দেখানো? গ্রাম বাংলার মানুষজন কি আর কখনোই শুনতে পাবে না তার মুখে মুক্তিযুদ্ধের পুথি? চরভাগিনার বাসিন্দারাই বা কোন দিক বেছে নেবে? তারা কি অসহায় হয়ে আপোষের রাস্তা বেছে নেবে, নাকি বায়স্কোপের জন্য তারাও লড়বে জীবন সরকারের বিরুদ্ধে??

মাসুম রেজার কাহিনীকে চলচ্চিত্রে রূপ দেয়ার ক্ষেত্রে সব দিক থেকেই মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন তরুণ নির্মাতা রিয়াজুল রিজু। নিজের সবটুকু ঢেলে দিয়ে তিনি এই চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করেছেন, তা চলচ্চিত্রটি দেখলেই বোঝা যায়। আজ তার এই চলচ্চিত্র হাসেন মোল্লার বায়স্কোপের মতই পড়েছে আমাদের সমাজের জীবন সরকারদের রোষানলে। তবুও দমে যান নি এই তরুণ চলচ্চিত্র নির্মাতা, বরং নতুন উদ্যমে তিনি মাঠে নেমেছেন “বাপজানের বায়স্কোপ” নিয়ে। “বাপজানের বায়স্কোপ” এবার সারাদেশ ঘুরবে, দেশের বিভিন্ন জায়গায় জায়গায় চলবে এর প্রদর্শনী। গত মাসে কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনদিনব্যাপী প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়েছে এই চলচ্চিত্রের। কিছুদিন আগে শাহবাগের পাবলিক লাইব্রেরীতেও অনুষ্ঠিত হয়ে গেল “বাপজানের বায়স্কোপ”-এর একটি প্রদর্শনী। আর প্রতিবারেই ছিল দর্শকদের উপচে পড়া ভীড়! কারণ প্রজন্ম বলছে- “বায়স্কোপ চলব, চলব মানে চলবই!”

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৪ thoughts on “বাপজানের বায়স্কোপঃ প্রজন্মের গল্প

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 1 = 5