যেখানে বিত্তের কাছে পরাজিত জাতীয়তা

চৌধুরী এর ‘চৌ’ এর অর্থ চার আর ‘ধারী’ মানে ধরে রাখা/বহন করা। মূলত চৌধুরী তারাই যারা হিন্দু ধর্মের চার বর্ণেই (বাক্ষ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র) একসাথে ধারণ করে। মুঘল আমলে মুসলিম শাসকরা নিজেদের সবধরণের জনগণের প্রতিনিধি প্রমাণে এই টাইটেল গ্রহণ করে। তালুকদার তাদের বলা হতো যারা মুঘল আর বৃটিশ আমলে জমির মালিক ছিলো। মজুমদার তারা যারা রাজস্বের হিসেব রাখতো। ভূঁইয়ারা ছিলো সুলতানি আমলে এই অঞ্চলের জমির মালিক কাম শাসক। শেখ টাইটেল যাদের ছিলো মূলত তাদের পূর্বসূরীরা এই অঞ্চলে ইসলামের প্রচারের জন্য আরব থেকে এসেছিলো।

বৃটিশরা যখন সিরাজোদ্দৌলাকে মীর জাফরদের বেঈমানীর কারণে সহজে পরাজিত করে এই অঞ্চলে ক্ষমতা দখল করে শোষণ শুরু করে তখন থেকেই এই অঞ্চলে ‘মীর জাফর’ নামটাকে ঘৃণার চোখে দেখা হয়, পারতপক্ষে কেউ জেনে শুনে নিজের সন্তানের নাম মীর জাফর রাখার সাহস করে না। আমাদের বেঈমানদের গালাগালির সুবিদার্ধে দুটো শব্দ খুব বেশি ব্যবহার করি। একটা এই ‘মীরজাফর’ আর আরেকটা ‘রাজাকার’। মীরজাফরের তুলনায় রাজাকার গালিটায় তীব্র ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশই ঘটায়। এক অর্থে চিন্তা করলে মীরজাফর একটা রাজাকার ছিলো। তবে রাজাকারকূলের শিরোমনি গোলাম আজমের জনপ্রিয়তা খুব যে খারাপ ছিলো বা আছে তার জন্য তার নামে আরো শ’ কিংবা হাজার খানেক বাংলাদেশী থাকাটা বিস্ময়ের কিছু নয়। সত্তরের নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তান বা এই বাংলায় জামাতের একটা আসন বাদে কোন তীব্র পাকিস্তানপন্থী কোন দল একটা আসনও না জিতলেও বিহারী আর কিছু সাচ্চা পাক-পাকিস্তানিদের সহায়তায় পাকিস্তানপন্থীদের ভোটের হার একদমই কম ছিলো না। সে হিসেবে হাজারখানেক গোলাম আজম এদেশে থাকাটাই স্বাভাবিক।

মূল কথায় আসি, এই যে চৌধুরী, তালুকদার, ভূঁইয়া, শেখ কিংবা কাজী বংশ নিয়ে এই একবিংশ শতাব্দীতে এসেও এতো মাতামাতি হয় কিন্তু ঘাঁটাঘাঁটি করলে দেখা যায় এই টাইটেলের লোকগুলোই তৎকালীন বৃটিশ শাসকদের প্রধান চামচা ছিলো। এরা নিজেদের প্রভাব-প্রতিপত্তি টিকিয়ে রাখার জন্য বৃটিশ শোষকদের চরণ ধুঁয়ে নিজ দেশের জনগণের উপর প্রচন্ড রকমের অত্যাচার করতো। খাজনা নেওয়া নিয়ে কঠোরতার চূড়ান্তরূপ দেখাতেও তাদের গা কাঁপতো না। ওইসময়কার ইতিহাস আর গল্প-উপন্যাসে দেশী শাসকদের সহায়তা বৃটিশদের শোষণের চিত্র খুব স্পষ্টভাবেই পাওয়া যায়। এজন্য বলা যায় এরাও আসলে একপ্রকারের রাজকার ছিলো। কিন্তু ভাগ্য এই সুপ্রসন্ন যে বৃটিশরা চলে যাওয়ার পর এমন শোষকদের কেউ বিচারের দাবি তুলেনি। স্বাধীন দুই রাষ্ট্রে ‘জয় হিন্দ’ আর ‘পাকসার জমিন সাদবাদ’ করে এরাই কিংবা এদের উত্তরসূরীরাই বিভিন্ন অঞ্চলের শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ ছিলো।

একটা মজার ব্যাপার হলো দেশভাগের নামে যে দুটো আলাদা রাষ্ট্র হলো, সেই রাষ্ট্রগুলোর পূর্ববর্তী কোন একক রাষ্ট্র ছিলো? ছিলো না। বৃটিশ সাম্রাজ্যের আগে বিভিন্ন অঞ্চলে আলাদা শাসন ছিলো। আর ভারত ছিলো মহাভারতে উল্লেখিত ‘আসমুদ্র হীমাচল’ মানে হীমাচল থেকে সমুদ্র পর্যন্ত বিস্তৃত একটা সাম্রাজ্য যার আসলেই ঐতিহাসিক কোন শক্ত কোন ভীত্তি নেই। যাই হোক, ভারত রাষ্ট্র হয়ে তাদের সংবিধান লিখতে দিলো অচ্ছুত বর্ণের বা শ্রেণীহীন দলিত হিন্দুদের প্রতিনিধি বি আর আম্বেদকারকে (পরবর্তীদে বুদ্ধ ধর্মে দীক্ষা নেয়), আর প্রমাণ করলো এই ভারত সকল শ্রেণীর আর মানুষের জন্য। পাক জমির পাকিস্তান তো ততদিনে একটা সংবিধান বানাতেও হিমশিম খেতে খেতে শেষ। মুখে দুই রাষ্ট্রের এক কথা, সব শ্রেণীর মানুষের সমান অধিকার। কাজে কর্মে জনগণই সেটা বিশ্বাস করতো না, বরং যে যেভাবে পেরেছে নিজেদের নামের পাশে চৌধুরী, তালুকদার, কাজী, ভূঁইয়া প্রভৃতি টাইটেল লাগিয়ে শ্রেণীসম্পন্ন মানুষে পরিণত করেছে।

দেশভাগের পর এপারের অনেক মানুষ ওপারে গেলো, ওপারের অনেকেই এপারে এলো। বিহার থেকে বিহারী এলো। তারপরও মনেপ্রাণে সবাই একই জাতিসত্তা গ্রহণ করতে পারলো না। পাক সার জমিন বাদ হয়ে একপ্রান্তে লাল সবুজের বাংলাদেশের জন্ম হলো, আরেকপ্রান্ত তার সেই প্রতিপত্তি হারালেও পাকিস্তান নাম নিয়েই বেঁচে আছে। তবে এখনো মানুষগুলো বদলায়নি। এখনো মানুষজন তাদের জাতিসত্তাগুলো সত্যিকার অর্থে ধারণ করতে পারেনি। এখনো একটা তামিল পরিবার একটা বাঙ্গালি কিংবা একটা মারাঠী পরিবারের সাথে নতুন সম্পর্কে যেতে দু’চারবার ভাবে। ভারতীয় সত্তা ধারণ করতে না পারায় তাদের ‘কমন’ কালচার বলতে বলিউডই আছে। কিন্তু সবাই নিজ নিজ সংস্কৃতি আর চিন্তা চেতনায় পড়ে আছে। তাইতো ‘টু স্টেটস্’ এর মতো মুভী কিংবা বই লিখে মনেপ্রাণে ভারতীয় হয়ে ওঠার জন্য লেখককে উৎসাহ দিতে হয়।

বাঙ্গালী বাংলাদেশী একক জাতিসত্তার এই বাংলায় তো অবস্থা আরো করুণ। এক পরিবারের সাথে আরেক পরিবারের সম্পর্ক করার আগে যা যা দেখতে হয়ঃ

১. ধর্ম এক কি না।
২. এলাকা এক কি না। (নোয়াখাইল্লা-বরিশাইল্লা বাছবিচার)
৩. সংস্কৃতিমনা উদার নাকি রক্ষণশীল মুসলিম/ধার্মিক কি না (হালের লোক দেখানো ট্রেন্ডী হাজী মুসলিম পরিবার চায় আরেকটা ধার্মিক পরিবার আর উদারমনা দাবিদাররা চায় তাদের মতো)
৪. পরিবারের টাইটেল উঁচু কি না (বংশ মর্যাদার লেভেল টাইটেলে বিদ্যমান অনেকাংশেই)
৫. পূর্বপুরুষরা এই বাংলার নাকি ওই বাংলা বা ভারত থেকে আগত ছিলো কি না (মানে অনেকের মতে দাদা-বাবারা এই বাংলায় জন্মসূত্রে বসবাসকারী না হলে সহীহ বাংলাদেশী বলা যাবে না! :3 )
৬. শিক্ষা (সার্টিফিকেট দেখানোর মতো হলেই হবে)
৭. ৮. ৯. …. ৯৯. (অর্থ সংশ্লিষ্টবিষয়াদীসহ বিস্তারিত গবেষণা।)

মূলত এই যে আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের নিয়ে গর্ব করে অ্যাডভান্টেজটা নেই, তাদের কর্মকান্ড কি আসলেই গর্ব করার মতো কিছু ছিলো কি না তা অনেক বেশি প্রশ্নসাপেক্ষ, তবে মনমানসিকতায় আমরা এখনো শ্রেণীবৈষম্য পুষে বেড়াই। একটা রাষ্ট্র যেখানে সবার অধিকার সমান হওয়ার কথা, সবার সুযোগ সুবিধা সমান হওয়ার কথা.. সেখানে রাষ্ট্রের জন্ম থেকেই দখল দখল করে নিজেই খব সাবাড় করে শ্রেণীযুক্ত হয়ে লুটপাট করে যে যেভাবে পেরেছে উঁচুশ্রেণীর মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগীতায় নেমেছে। যেখানে সবাই সবার সহযোগীতার মাধ্যমে সমান হওয়ার কথা সেখানে সেই আমরা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাকে ব্যর্থ করে দিয়ে প্রশাসনকে গালি দেই। মাঝে মাঝে মনে হয় এই বৃটিশ তাড়ানো থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত যারা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য জীবন দিয়েছে তারা অযথাই জীবনগুলো সেক্রিফাইস করেছে। যাদের সেক্রিফাইসের ফলে লুটেরা-রা আরও বেশি লুট করার সুযোগ পেয়ে সমাজে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে, তাদের জন্য এসব সেক্রিফাইসের কোন দরকার ছিলো না। একশ-দুইশ বছর আগে যারা ভাবতো বৃটিশরা চলে গেলে আমরা সবাই শান্তিতে থাকবো তারা আসলেই বোকা ছিলো, যারা পঞ্চাশ বছর আগে ভাবতো পাকিরা চলে গেলে আমরা শান্তিতে থাকবো তারাও বোকা ছিলো। আসলে আমরা মনের কলুষতা দূর না করে সবাই এক একজন চৌধুরী, তালুকদার, ভূইয়া প্রভৃতি হয়ে বাঁচতে চাই। এখানেই মূল সমস্যা। আমরা কেউ বাংলাদেশী হতে চাই না। মনে প্রাণে একদমই হতে চাই না।

রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা যদি ব্যর্থ হয় তবে ব্যর্থতার জন্য আমাদের মানসিকতাই দায়ী।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

73 − = 72