পানামা পেপার্সে যে ২৬ বাংলাদেশি অভিযুক্ত!

?w=450″ width=”500″ />

পানামা পেপার্স এখন বিশ্ব অঙ্গনে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়। সম্প্রতি পানামাভিত্তিক আইন প্রতিষ্ঠান মোসাক ফোনসেকোর অভ্যন্তরীণ পৌনে তিন টেরাবাইট নথি ফাঁস হয়ে যায়। জার্মানির একটি স্থানীয় পত্রিকায় অপরিচিত সূত্র থেকে এই বিপুল পরিমাণ নথি আসে। এরপর থেকেই ফাঁস হয়ে যাওয়া তথ্য প্রকাশিত হতে শুরু করে। এই ফাঁস হওয়া তথ্যকেই বলা হচ্ছে ‘পানামা পেপার্স’।

পানামা পেপার্সে বিশ্বের স্বনামখ্যাত বিভিন্ন ব্যক্তির অর্থগৃধ্নুতার প্রমাণ মিলেছে। ফাঁস হওয়া এই কাগজপত্রগুলো বলছে, নিজ দেশে টাকা জমাতে কর দিতে হয় বলে বিশ্বের ক্ষমতাধররা অনেকেই বাইরে অফশোর প্রতিষ্ঠান গড়ছেন, গোপনে দেশের বাইরে অর্থ পাচার করছেন। জানা যায়, ক্যারিবীয় দীপপুঞ্জসহ কিছু স্থানে এমন আইন আছে যে সেখানে বিনিয়োগ করলে কর দিতে হয় না, সহজে সেই অর্থ স্থানান্তর করা যায়, এমনকি সেসব কোম্পানির মালিকদের তথ্য গোপনও রাখা হয়। এগুলোকেই অফশোর কোম্পানি বলা হয়।

এ ধরণের বেনামি কোম্পানি গড়া ও কর ফাঁকি দিয়ে বিনিয়োগ করার তালিকায় আছেন বিভিন্ন দেশের প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি থেকে শুরু করে অভিনেতা ও ক্রীড়াবিদ পর্যন্ত এমন সব নাম, যারা অনেকেই আবার নীতিনিষ্ঠ হিসেবে বিশ্ব দরবারে সমাদৃত। পাশের দেশের সিনেমা তারকা অমিতাভ বচ্চন, ঐশ্বরিয়াই নয়, তালিকায় আছেন বিশ্বনন্দিত ক্রীড়া তারকা লিওনেল মেসিও। এমনকি এতে বাংলাদেশের রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও বিশিষ্টজনদের নামও এসেছে। অবশ্য একই অভিযোগ আগেও উঠেছিল কয়েকজনের নামে, কিন্তু সরকার এ অবধি কারো বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নিয়েছে বলে শোনা যায়নি।

পানামা পেপার্সে অভিযুক্ত বাংলাদেশিরা হচ্ছেন :
১) ম্যাগনিফিশেন্ট ম্যাগনিচুড ইনকরপোরেশনের পরিচালক ও শেয়ারহোল্ডার এএসএম মহিউদ্দিন মোনেম। এই কোম্পানির আরেক পরিচালক আসমা মোমেন।
২) রাইটস্টার প্রাইভেট লিমিটেডের পরিচালক ও শেয়ারহোল্ডার আজমত মঈন।
৩) টাইটান অ্যালায়েন্স লিমিটেডের পরিচালক এবং প্রমিনেন্ট কনটেইনার লাইনস প্রাইভেট লিমিটেডের পরিচালক ও শেয়ারহোল্ডরি এএফএম রহমাতুল বারি।
৪) বিবিটিএল এবং স্ট্রস ইউনিভার্সাল লিমিটেডের প্রধান ক্লায়েন্ট (মাস্টার ক্লায়েন্ট)।
৫) বাংলা ট্রাক ওভারসিজ লিমিটেডের পরিচালক ও শেয়ারহোল্ডার।
৬) সভেরিন ক্যাপিটাল প্রাইভেট লিমিটেডের পরিচালক ও শেয়ারহোল্ডার ক্যাপ্টেন এমএ জাউল।
৭) স্প্রিং শোর ইনকরপোরেটেড এর পরিচালক এফএম জুবাইদুল হক। একই কোম্পানির শেয়ারহোল্ডার এফএম জুবাইদুল হক এবং সালমা হক।
৮) রাইটস্টার প্রাইভেট লিমিটেডের পরিচালক ও শেয়ারহোল্ডার দিলিপ কুমার মোদি।
৯) বেকিংসডেল লিমিটেড, গ্রাটানভাইল লিমিটেড এবং বর্নিও পাওয়ার্স লিমিটেডের মালিক জাফের উমিদ খান।
১০) এল্ডার স্টার লিমিটেডের পরিচালক ও শেয়ারহোল্ডার কাজী রায়হান জাফর।
১১) তালাভেরা ওয়ার্ল্ডওয়াইড ইনকরপোরেশনের পরিচালক মাহতাব উদ্দিন চৌধুরী।
১২) রাইটস্টার প্রাইভেট লিমিটেড এবং স্ট্রস ইউনিভার্সাল লিমিটেডের পরিচালক ও শেয়ারহোল্ডার খাজা শাহাদাত উল্লাহ।
১৩) দ্য কন্ট্রাক্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেডের পরিচালক মির্জা এম ইয়াহিয়া।
১৪) পিরামিড রক লিমিটেডের পরিচালক ও শেয়ারহোল্ডার মোহাম্মদ আমিনুল হক।
১৫) রাইটস্টার প্রাইভেট লিমিটেড এবং স্ট্রস ইউনিভার্সাল লিমিটেডের পরিচালক ও শেয়ারহোল্ডার মোহাম্মদ শাহেদ মাসুদ।
১৬) লাকি ড্রাগন ম্যানেজমেন্ট ইনকরপোরেশনের পরিচালক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম।
১৭) গ্রাটানভাইল লিমিটেডের মালিক মোহাম্মদ ফয়সাল করিম খান। এন্ডারলাইট লিমিটেডের পরিচালক ও শেয়ারহোল্ডার নজরুল ইসলাম।
১৮) পিরামিড রক লিমিটেডের পরিচালক ও শেয়ারহোল্ডার নাজিম আসাদুল হক।
১৯) স্প্রিংশোর ইনকরপোরেটেডের পরিচালক সালমা হক।
২০) এল্ডার স্টার লিমিটেডের পরিচালক নিলুফার জাফরুল্লাহ।
২১) সভেরিন ক্যাপিটাল প্রাইভেট লিমিটেডের পরিচালক ও শেয়ারহোল্ডার সৈয়দ সিরাজুল হক।
২২) দ্য কন্ট্রাক্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেডের পরিচালক সাইয়েদা সামিনা মির্জা।
২৩) পিরামিড রক লিমিটেডের পরিচালক ও শেয়ারহোল্ডার তারিক ইকরামুল হক।
২৪) হ্যান্সঅ্যাটিক লিমিটেড এবং পাথফাইন্ডার ফিন্যান্স লিমিটেডের পরিচালক জাফরুল্লাহ কাজী। একই কোম্পানির পরিচালক ও শেয়ারহোল্ডার জাফরুল্লাহ নিলুফার।
২৫) তালাভেরা ওয়ার্ল্ডওয়াইড ইনকরপোরেশনের পরিচালক উম্মে রুবানা।
২৬) কম্পাস ডি বাংলা লিমিটেডের পরিচালক ও শেয়ারহোল্ডার জুলফিকার হায়দার।

অনুসন্ধানে জানা যায়, জার্মানির সেই পত্রিকাটি, যারা পানামা পেপার্স ফাঁস করছে, তারা আগে থেকেই ইন্টারন্যাশনাল কনসোর্টিয়াম অব ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্টসের (আইসিআইজে) সঙ্গে যুক্ত। যে সংস্থাটি এর আগেও এমন অনেক অফশোর কোম্পানির মালিকের নাম ফাঁস করেছিল। ইতোপূর্বে ২০১৩ সালে তাদের ফাঁস করা তথ্যের ভিত্তিতে ১৪ জুলাই ইংরেজি দৈনিক ‘নিউ এজ’ একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ফাঁস করা নথিপত্রের ভিত্তিতে ওই খবরে বলা হয়, ছয়টি অফশোর কোম্পানিতে তৎকালীন বিমানমন্ত্রী ফারুক খানের পারিবারিক প্রতিষ্ঠান সামিট গ্রুপের পাঁচ পরিচালকের মালিকানা রয়েছে।

পত্রিকাটি আরও জানায়, ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য কাজী জাফরউল্লাহ ও তার সাংসদ স্ত্রী নিলুফার জাফর বিদেশে দুটি ‘অফশোর কোম্পানি’র পরিচালক এবং শেয়ারহোল্ডার। ‘ইউএসবি এজি’ সুইস ব্যাংকের সিঙ্গাপুর শাখায় এই দম্পতির যৌথ অ্যাকাউন্ট রয়েছে বলে পত্রিকাটি জানায়। তারা সিঙ্গাপুর, ব্রিটিশ ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জসহ কর ছাড়ের সুবিধা পাওয়া যায় এমন কিছু দেশ বা দ্বীপরাজ্যে টাকা গচ্ছিত রেখেছেন বলেও খবরে প্রকাশ পায়।

বিদেশে অর্থ পাচারের এসব তথ্য দুই মাস ধরে পর্যবেক্ষণ করার পর ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে দুদক অভিযোগ তদন্তের সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু সেই তদন্তের আর কোনো অগ্রগতির কথা জানা যায়নি। খান পরিবার বা কাজী পরিবারের বিরুদ্ধে সরজকার ব্যবস্থা গ্রহণের কোনো প্রয়োজন মনে করেনি। উল্টো তারা আছেন বহাল তবিয়তে। এখন পানামা পেপার্সে অভিযুক্তদের তালিকায় এদের নাম আবারো এসেছে, নতুন অনেকের নামও যুক্ত হয়েছে। এবারেও কি ২০১৩ সালের পুনরাবৃত্তি হবে? দুদক একদিকে অর্থ পাচারের বিরুদ্ধে দেশের টাকা খরচ করে ক্যাম্পেইন করছে! এবারও কি তারা মুখে গোল দিবে আর অর্থ পাচারকারিদের সরকারি পরিচয় পেয়ে চুপ করে থাকবে?

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৮ thoughts on “পানামা পেপার্সে যে ২৬ বাংলাদেশি অভিযুক্ত!

  1. এই সরকারের আমলে এভাবে আরো কত
    এই সরকারের আমলে এভাবে আরো কত শতকোটি টাকা পাচার করা হয়েছে সেই হিসাব কি আছে কারো কাছে? লুটপাট চলছে দেশে সমানে।

  2. গুরুত্বপূর্ণ লেখা। মূল
    গুরুত্বপূর্ণ লেখা। মূল সমস্যাকে স্পর্শ করেছেন। রাষ্ট্র আদৌ এদের কারো বিচার করবে বলে মনে হয় না। বিরোধী মতের কাউকে পেলে অবশ্য বিরাট চেঁচামেচি শুরু করবে নিজেদেরটা ভুলে গিয়ে।

  3. টাকা পাচার হচ্ছে এ আর নতুন
    টাকা পাচার হচ্ছে এ আর নতুন কিছু না। তবে আমাদের দেশে তথ্য পাচার আর গপ্তচর বৃত্তির আশংকা বাড়ছে । দেশীয় সম্পদ লুটের আশঙ্কা বাড়ছে। এই দেশি বিদেশি গুপ্তচররাই দেশের জন্য হুমকি। এরা ধোইয়াশা তৈরির মাধ্যমে আমাদের দেশে যে কোন সময়ে যে কোন রকমের অস্থিতিশীল ও অরাজক পরিবেশ তৈরি করার ক্ষমতা রাখে।

  4. It was written by Shaugat Ali
    It was written by Shaugat Ali Sagor. So it is becoming more interesting now. It can be true or can be false as well.

    ফেসবুকে একটা খবর শেয়ার হচ্ছে। ‘পানামা পেপারস’ এর তালিকায় বাংলাদেশের ২৫ জন নাকি আছে- এটাই হচ্ছে খবরের বিষয়। খবরগুলোতে নামের তালিকাও আছে। এগুলো অবশ্য ক্রেডিবল কোনো নিউজপেপার এর খবরের লিংক নয়। যেইসব মিডিয়ার লিংক প্রচার করা হচ্ছে – তাদের পানামা পেপারস বিশ্লেষন করার মতো সক্ষমতা আছে কী না, সেটিও অবশ্য বড় প্রশ্ন।
    সাংবাদিক শওকত হোসেন মাসুম তার ফেসবুক পোষ্টে জানিয়েছেন’ ২০১৩ সালে আইসিআইজির ফাঁস করা আরেকটি তালিকার অংশ’কেই তারা পানামা পেপারস এর তালিকা হিসেবে চালিয়ে দিচ্ছেন।
    পানামা পেপারস এর দলিলগুলো গত এক বছর ধরে বিশ্লেষন করেছেন বিশ্বের চারশত সাংবাদিক। চারশত সাংবাদিকের কাছে এমন বোমা ফাটানো তথ্য আছে- অথচ এক বছরেও তা কোথাও ফাঁস হয়নি। সিন্ডিকেটেড ওয়েতে একযোগে এখন এই তথ্যগুলো প্রকাশিত হচ্ছে।
    একটা বিষয় বোঝা দরকার, এখন পর্যন্ত সিন্ডিকেট যতোটুকু তথ্য প্রকাশ করছে,সেইটুকুই বিশ্বের বিভিন্ন মিডিয়ায় যাচ্ছে। ফলে বাংলাদেশের কোনো ‘করিৎকর্মা’ সাংবাদিক যে ‘গোপনীয় নথিপত্র’ থেকে বাংলাদেশের অংশ বের করে নিয়ে এসেছেন- তা ভাববার কারন নাই। সত্যি বলতে কি, বাংলাদেশের সাংবাদিকদের সেই সক্ষমতাও প্রশ্নাতীত নয়।আর যাদের লিংক প্রচারিত হচ্ছে- তাদের সক্ষমতা নিয়ে কোনো কথা না বলাই ভালো।
    পানামা পেপারস নিয়ে বাংলাদেশের সাংবাদিকদের কাজ করার সুযোগ আছে। আমি বরং বলি, সেই সুযোগ কিভাবে কাজে লাগানো যায়- সেদিকে নিজেদের সক্ষমতাটুকু ব্যবহার করুন। খামোখা, বিভ্রান্তি তৈরির সাংবাদিকতা করে নিজেদের হাস্যকর করার কোনো মানে হয় না।
    পানামা পেপারস নিয়ে সাংবাদিকতা করতে না পারলে ‘অপসাংবাদিকতা’ করা উচিৎ না। এটা বন্ধ হওয়া দরকার।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

1 + 9 =