যে কারণে আমি মুরতাদ, কাফের

ধরেন প্রসঙ্গটা- নারী।
আপনি হাদীস দেখাইলেন- ইসলামে নারী নেতৃত্ব হারাম। আমি কইলাম, ব্যাখ্যায় ভুল আছে, নারী নেতৃত্ব হারাম না।
আপনি কইলেন- নারীর মাথার চুলের অগ্রভাগ থাইকা পায়ের পাতা পর্যন্ত কিচ্ছু দেখানো যাবে না, নারী জোরে কথা বলতে পারবে না, নারী দ্রুত হাঁটতে পারবে না, নারী হাসতে পারবে না, এমনকি নারী পরিবার-সমাজ-দেশ-বিশ্ব নিয়া ভাবতেও পারবে না। তার কাজ ঘর-দোর পরিষ্কার করা, আসবাব গোছ-গাছ করা, রান্নাবান্না করা, কাঁথা সেলাই করা আর সন্তান জন্মদান ও লালনপালন করা। আমি কইলাম- না, নারী তার স্বাভাবিক প্রকাশমান অঙ্গ খোলা রাইখা যে কোনো কাজ করতে পারবে, যে কারও সামনে যাইতে পারবে। সে হাসতে পারবে, সে দৌড়াইতে পারবে, সে চিন্তা করতে পারবে ও মতামত প্রদান করতে পারবে।
আমি ইসলামের ইতিহাস থাইকা তার জ্বলন্ত দৃষ্টান্তও দেখাইলাম। কোর’আন-হাদীস থাইকা রেফারেন্স ও অকাট্য যুক্তিও দিলাম।

আপনি এইবার কোর’আন ছাইড়া শরীয়তের বইয়ে আঙ্গুল রাইখা কইলেন- এই দেখেন, লেখা রইছে নারী ঘরের বাইরে যাইতে পারবে না। আমি রসুলের জীবনী থাইকা দেখাইলাম- নারী ঘরের বাইরে যাইতে পারবে। পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও সকল সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে পারবে।

আপনি এইবার হাদীসের বই থাইকা ব্যাপক খোঁজাখুজি কইরা একখান হাদীস বার করলেন। এই যে দেখেন- নারী হইল শয়তান, নারীর সারা শরীর জুইড়া খালি শয়তান আর শয়তান। নারী তেতুলের মত, তেতুলের মত, তেতুলের মত। কাজেই নারী থাইকা সাবধান। আমি কইলাম- যুগে যুগে যত নবী-রসুল আসছেন সবাই নারীর গর্ভ থাইকাই জন্মলাভ করছেন। পুষ্প ছাড়া বৃক্ষ যেমন, নারী ছাড়া পৃথিবী তেমন। মায়ের পায়ের নীচে সন্তানের বেহেশত- এইটা রসুলের কথা। রসুল নারীকে অবজ্ঞা করেন নাই। নারীকে ভালোবাসছেন। সৃষ্টিগতভাবে নারী হইল শান্তির প্রতীক। আল্লাহর রসুল নারীকে পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ নেয়ামত বইলা ঘোষণা করছেন।

ইত্যাকার নানান তর্ক-বিতর্ক শেষ হইল। যেহেতু আপনার মতামত আমি গ্রহণ করলাম না, যেহেতু আপনার দৃষ্টিভঙ্গি আমার দৃষ্টিভঙ্গির সাথে মিলল না, যেহেতু আমার ব্যাখ্যা আপনার পছন্দ হইল না, যেহেতু আপনি যেইটারে ইসলাম বলতেছেন সেইটারে আমি ইসলাম বলতেছি না, সুতরাং এইবার আপনি এক সুন্দর পরিকল্পনা করলেন। মসজিদের মিম্বারে দাঁড়ায়া, ওয়াজ মাহফিলের মাইক্রোফোন কাঁপায়া ফতোয়া দিয়া দিলেন- আমি মুরতাদ হয়ে গেছি, আমি কাফের হয়ে গেছি, আমি খ্রিস্টান হয়ে গেছি, আমি হইলাম ইসলামের দুশমন, আমি ইহুদির দালাল, আমি ইসলামবিরোধী কথা বইলা মানুষের ঈমান-আকীদা নষ্ট কইরা ফালাইতাছি, আমারে থামানো দরকার, তাওহীদী জনতার প্রতিরোধ দরকার, বাংলার মুসলমানের মাটি থাইকা আমারে উচ্ছেদ করণ দরকার, আমারে আগুন দিয়া জ্বালাই দেওযা দরকার, আমারে জবাই করা দরকার।

অতঃপর আমারে মাইরা, জ্বালাইয়া-পুড়াইয়া ভস্ম কইরা, আমার ছাইয়ের উপর আপনারা ‘ইসলামের’ কালো পতাকা উড়াইলেন। সাংবাদিকরা কইল- আহা! তরতাজা একখান মানুষ মাইরা ফালাইলো গো! কিন্তু ওই ব্যাডাও তো কম আছিল না, ইসলাম লইয়া বিভ্রান্তি ছড়াইত, হুজুর বলছে সে নাকি ইসলামবিরোধী কথাবার্তা কইতো। ওর ইসলামবিরোধী কথা শুইনা ধর্মভীরু মানুষ সহ্য করবার পারে নাই। দোষ তো ওরই। সুশীলরা কইল- দোষঘাট যাই হোক, তাই বইলা মানুষ খুন? এ তো মানা যায় না বাপু। তুমি তারে দু-চারটা চর-থাপ্পর দিতে পারতা, শাসায়া দিতে পারতা, অনুভূতিতে আঘাত পাইয়া মামলাও করতে পারতা, তাই বইলা খুন করবা নাকি? কাজটা কিন্তু একটু খারাপই হইছে।
অতঃপর আপনার প্রতি জনতার শ্রদ্ধা আরও একগুণ বাইড়া গেল। আপনি যে সত্যি সত্যিই ইসলাম রক্ষা ও বাতিল নির্মূল কইরা জনতার ঈমান-আকীদা রক্ষা কইরা চলতেছেন তা আবারও সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হইল। আপনি আরও বেশি বেশি দান-দক্ষিণা পাইতে থাকলেন এবং নতুন কোনো কাফের-মুরতাদের সন্ধান করতে লাগলেন।

আচ্ছা, আমারে কি ভুতে কামড়াইছিল?

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

33 − = 31