ধর্ম (চাপাতি) বনাম বিজ্ঞান , যুক্তি ও মুক্তচিন্তা ; এভাবে-ই হেরে যাবে শিমুলরা ?

শিমুল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘দর্শন’ বিভাগের ছাত্র । গ্রামে ছেলে হওয়া স্বত্ত্বেও কোন প্রকারেই ধর্মান্ধতা , প্রচলিত কুসংস্কার ছুঁতে পারে নি শিমুলকে । সর্বদা ধর্মের কুসংস্কারের বিরুদ্ধে থেকেছে যুক্তিবাদ আর বিজ্ঞানকে হাতিয়ার করে । পড়াশুনার পাশাপাশি শিমুল লেখালেখিও করে । বিভিন্ন অনলাইন যোগাযোগ মাধ্যম ছাড়াও ব্লগে বেশ লেখালেখি করে শিমুল । তাছাড়াও বেশ কয়েকটি বইও লিখে ফেলেছে সে । উল্লেখযোগ্য বই আমার সমাজ আজ অন্ধকারে , ওরা চাপাতি মারে , ধর্মান্ধতা ও কাঁঠমোল্লা ইত্যাদি । মৌলবাদী ধর্মান্ধদের কাছ থেকে প্রতি নিয়ত প্রাণনাশের হুমকি পেয়ে আসছিল শিমুল । তারপরেও ঘাঁবড়ে যায় নি সে । মুক্তচিন্তার সমাজ গড়ার লক্ষ্যে কলমকে চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছে সর্বদা ।

শিমুলের বন্ধুরা মিলিতভাবে একটি পাঠচক্র করে নিয়মিত । অবসরকালে বন্ধুরা মিলিত হয়ে আলোচনা করে বিভিন্ন বিজ্ঞানভিত্তিক , যুক্তিবাদ , মুক্তচিন্তা নিয়ে । তুমুল তর্ক-বিতর্ক চলে সব সময় । শিমুলদের পাঠচক্রের একটি সুন্দর নাম আছে । নামটি হল , “এসো মুক্তচিন্তা করি” । শিমুলের একটা স্বপ্ন আছে । স্বপ্নটা হল এই ধর্মান্ধতার আঁধারে ঢেকে যাওয়া সমাজটাকে আলোকিত করা । বিকশিত করা মানুষের মস্তিস্ক , যা ধর্মান্ধতার অন্ধকারে সংকুচিত হয়ে পরে আছে যুগ যুগ ধরে ।

সেদিন খুব সকালে শিমুল ঘুম থেকে উঠল । ভার্সিটির হলেই থাকে শিমুল । খুব তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়েই হল থেকে বেড়িয়ে পরল শিমুল । আজ মুক্তচিন্তার উপর একটি আলোচনা আছে পাঠচক্রে । এছাড়াও আলোচনা হবে মুক্তচিন্তার উপর ভিত্তি করে ম্যাগাজিন প্রকাশ নিয়ে । শিমুলদের পাঠচক্রে যারা নিয়মিত আসে তারা প্রত্যেকেই এথিস্ট । বিজ্ঞান ও যুক্তির আলো দিয়ে ধর্মান্ধতার অন্ধকার দূরীকরনের ব্রত নিয়েছে প্রত্যেকেই । সকাল তখন সাড়ে আটটা । পাঠচক্রের নিয়মিত পাঠকরা সবাই উপস্থিত । শিমুল ওদের পাঠচক্র আয়োজিত রুমে প্রবেশ করল । এখানে বলতে হচ্ছে , শিমুলরা পাঠচক্রের কাজ পরিচালনার জন্য একটি ছোট্ট রুম ভাড়া নিয়েছে । শিমুল পাঠচক্রের প্রধান । তাই সবাই শিমুলের আসার অপেক্ষা করছে । শিমুল রুমে ঢুকেই মেঝেতে বসে পরল । উপস্থিত সবাই মেঝেতে গোল হয়ে বসা । শিমুল আলোচনা শুরু করল ,
শিমুল: দেখো আমরা অর্থাত্‍ আমাদের সমাজটা ধর্মান্ধতার অন্ধকারে আচ্ছন্ন । আমরা যতদিন না ধর্মান্ধতাকে দূর করতে পারব ততদিন মানুষ মানুষ নয় গর্দভ হয়ে বেঁচে থাকবে । আর গর্দভ হয়ে বেঁচে থাকার মাঝে কোন আনন্দ নেই , নেই কোন তৃপ্তি । আমরা মানুষকে বোঝাব । তাদের কাছে তুলে ধরব ধর্মান্ধতার অন্ধকার । ধর্ম তাদের সর্বদা ব্যবহার করছে তাদের মস্তিস্ক । বিজ্ঞান ও যুক্তির আলো থেকে দূরে রেখে ধর্ম মানুষকে করে তুলছে অসভ্য জানোয়ারে । আর আমরা এই সব মানুষের কাছে তুলে ধরব ম্যাগাজিন প্রকাশের মাধ্যমে । শিমুলের কথা শেষ হতেই পাঠচক্রের এক সদস্য সজিব প্রশ্ন করল শিমুলকে ,
সজিব: ম্যাগাজিন প্রকাশ করে আমরা কিভাবে ধর্মান্ধতার অন্ধকার দূর করব ?
শিমুল: ম্যাগাজিনে কোন বড় বড় লেখকের লেখা ছাপা হবে না । আমরা গ্রামাঞ্চলে যাব । সেখানকার বিদ্যালয় , কলেজের শিক্ষার্থীদের নিয়ে পাঠচক্র করব । এরপর ওদের বিজ্ঞান , যুক্তিবাদ , দর্শন ও মুক্তচিন্তা বিষয়ের উপর ধারাবাহিক বক্তব্য শোনাব । আর সেই সব বক্তব্য দিবেন দেশের বরেণ্য বুদ্ধিজীবিরা । যারা ধর্মান্ধতা দূরীকরনের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছেন । এরপর তাদের লেখা জন্য প্রশিক্ষন দেয়া হবে । এভাবেই আমরা আমাদের ম্যাগাজিনের জন্য দক্ষ ক্ষুদে লেখক তৈরি করব , যারা তখনই থাকবে এক একজন বিজ্ঞান , যুক্তিবাদ , দর্শন ও মুক্তচিন্তার উপর পারদর্শী । শিমুলের কথা শেষ হতেই উপস্থিত সকলেই করতালি দিয়ে উঠল । অর্থাত্‍ শিমুলের পরিকল্পনা আলোচনায় গৃহিত হয়েছে । এরপর আরও বেশ কয়েকটি বিষয়ের উপর আলোচনা হবার পর সকলেই পাঠচক্রের রুম থেকে বের হয় । শিমুল রুমের সব কিছু গুছিয়ে রুম বন্ধ করে ক্যাম্পাসের উদ্দেশ্যে রওনা হয় । তখধ ঘড়িতে সময় দুপুর বারটা ।

শিমুলের পরিবারে একমাত্র বাবা ছাড়া আর কেউ নেই । সেই ছোট্ট থাকতেই মা মারা যায় । বাবা অতি কষ্টে শিমুলকে লেখা পড়া শেখাচ্ছে । শিমুলের বাবাও একজন ধর্মান্ধতার অন্ধকার থেকে মুক্ত মানুষ । শিমুলের পথ চলার প্রেরণা তার বাবাই জোগায় বলতে গেলে । সর্বক্ষেত্রে শিমুলের বাবাই তাকে সাহস জোগায় । শিমুলে বাবা শিমুলকে একটাই কথা বলেন ,
শিমুলের বাবা শোন শিমুল , ধর্ম মানুষের মস্তিস্কে লোভ আর ভয় ঢুকিয়ে দেয় । যখন লোভ আর ভয়ের সংমিশ্রনের মানুষের মস্তিস্ক চলতে থাকে ঠিক তখনই মানুষ অসভ্য হয়ে যায় । সব সময় লোভ আর ভয় থেকে দূরে থাকবি আর মানুষকে দূরে রাখতে চেষ্টা করবি । তাই তো আজ শিমুল লোভ আর ভয় থেকে অনেক দূরে এবং সমাজকেও লোভ আর ভয় থেকে দূরে রাখার প্রাণপণ চেষ্টা করে যাচ্ছে ।

ম্যাগাজিত প্রকাশের প্রাথমিক ধাপ হিসেবে শিমুলরা প্রত্যন্ত গ্রামের বিদ্যালয় ও কলেজগুলোতে পৌছেছে । সেখানে বিজ্ঞান , যুক্তি , দর্শন ও মুক্তচিন্তা নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আলোচনা চলছে । ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে চলছে ম্যাগাজিনের কাজ ।

কয়েক সপ্তাহ পর ….

শিমুলদের ম্যাগাজিনের প্রথম সংখ্যা প্রকাশ করা হবে কয়েক দিনের মধ্যেই । শিমুলদের এই মুক্তধারার কাজকর্মের উপর জঙ্গী সংগঠনগুলো যারা ধর্মান্ধতার অন্ধকারে আচ্ছন্ন করে রেখেছে সমাজকে , রাষ্ট্র তারা নজর রাখছে । তাছাড়াও নিয়মিত হুমকি দিয়েই চলছে শিমুলকে । যদি এই সমস্ত মুনাফেকি কর্ম পরিত্যাগ না করা হয় তবে ফল ভাল হবে না উল্লেখ করে বেনামী চিঠিও এসেছে অনেক । কিন্তু শিমুল ভয় পায় না ।

সেদিন হোস্টেলের ঠিকানায় শিমুলের একটি চিঠি আসে । চিঠি পাঠিয়েছে শিমুলের বাবা । শিমুল চিঠি খুলে পড়তে লাগল ,
“শিমুল আমি গ্রামে খুব বিপদে আছি । গ্রামের লোকজন আমার ও তোর উপর ক্ষেপে আছে । মসজিদের মোল্লারা বিচার বসাবে । কারণ , তুই দেশ থেকে ধর্ম ধ্বংসের ষড়যন্ত্র করছিস । তুই ধর্মদ্রোহী , রাষ্ট্রদ্রোহী । শিমুল , ভয় করিস না বাবা । আমার এখানে যা হয়ে যাক তুই গ্রামে আসিস না । গ্রামে আসলেই তোকে খুন করা ঘোষনা করেছে গ্রামের চেয়ারম্যান । তুই সাবধানে থাক বাবা । ভাল থাক । আর কর্ম থেকে এক চুলও নড়বি না ।
-ইতি
তোর বাবা” । শিমুল বাবার চিঠি পড়ে ভরকে গেল । হতভম্ব হয়ে বসে রইল । বাবার জন্য খুব চিন্তা হচ্ছে শিমুলের ।

সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছে । শিমুশ প্রেসে । ম্যাগাজিন প্রকাশের কাজ নিয়ে খুব ব্যস্ত । অন্যান্যারাও খুব ব্যস্ত । দ্রুত প্রথম সংখ্যা বের করতে হবে । তাই সারাদিন ধরেই শিমুল প্রেসে । প্রেসে কাজ শেষ করে রাত নয়টা হবে তখন শিমুল রিক্সায় করে হলে ফিরছে । রিক্সা তখন প্রেস ক্লাব চত্ত্বরে । হঠাত্‍ চার পাঁচজন মুখোশ পরা লোক রিক্সার চলার গতি শ্লথ করতে রাস্তায় দাড়িয়ে আছে । কিছু বুঝে উঠার আগেই দুজন মুখোশধারী দুপাশ থেকে চাপাতি দিয়ে শিমুলের মাথায় এলোপাতারি চারটি কোপ দিল । শিমুলের মাথা থেঁতলে মগজ বের হয়ে গেল এবং শিমুল রিক্সা থেকে ছিঁটকে রাস্তার পরে গেল । লোকজন চিত্‍কার চেঁচামেচি শুরু করে দিয়েছে । মুখোশধারীদের সাথে বাইক ছিল । তারা শিমুলকে রাস্তায় ফেলে দিয়ে দৌড়ে বাইকে উঠল এবং দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করল । ঘটনাস্থলে পুলিশ এসেছে । লোকজন ধরাধরি করে শিমুলকে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায় । কোন একজন শিমুলে ছিন্নভিন্ন পরে থাকা মগজও সাথে করে নিয়ে যায় । খবর শুনে শিমুলের বন্ধুরা হাসপাতালে ছুটে আসে । ডাক্তার নিশ্চিত করল শিমুল মারা গেছে । ধর্মের চাপাতি শিমুলকে খুন করে দিয়েছে । থামিয়ে দিয়েছে ধর্মান্ধতার অন্ধকার দূর করে বিজ্ঞান , যুক্তি , দর্শন ও মুক্তচিন্তার আলোয় আলোকিত সমাজ গড়ার অগ্রযাত্রাকে । ওদিকে আজ গ্রামে গ্রামের মোল্লা ও চেয়ারম্যানের সমন্বয়ে বিচার সভা বসে । বিচারে ধর্মের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারী শিমুলের বাবা হওয়ার জন্যে শিমুলের বাবাকে পাঁচশ বেত্রাঘাত করার সিন্ধান্ত গৃহিত হয় । সিন্ধান্ত অনুযায়ী বেত্রাঘাত করা হয় শিমুলের বাবাকে । পাঁচশ বেত্রাঘাত পূর্ণ হবার পূর্বের শিমুলের বাবা মারা যায় । গ্রামের চেয়ারম্যান গ্রামের সকলকে নির্দেশ করে যায় কেউ যেন এই ধর্মদ্রোহী পিতার মৃতদেহ কবর না দেয় । যদি দেয় তবে তাদেরও এই অবস্থা করবে । তাই জীবন বাঁচাতে কেউ শিমুলের বাবার মৃতদেহ কবর দেয় নি । এদিকে মাঠে পরে থাকে এক সাহসী সন্তানের সাহসী পিতার মৃত দেহ ওদিকে লাশ ঘরে পরে থাকে এক মুক্তধারার সাহসী যোদ্ধার মৃত দেহ ।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “ধর্ম (চাপাতি) বনাম বিজ্ঞান , যুক্তি ও মুক্তচিন্তা ; এভাবে-ই হেরে যাবে শিমুলরা ?

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

73 − = 63