এ আমার নির্লজ্জ লোভ

প্রতিদিন পাবলিক-বাসে করে অফিস যাওয়া, বাসায় ফেরা। প্রায় প্রতিদিনই দুঃসহ ভিড়ের ভেতর চ্যাপ্টা হয়ে, নিজে ঘেমে, নানান শরীরের ঘামগন্ধ শুকে, এবং কোনো কোনো দিন ঝুঁকি নিয়ে গেটের হাতল ধরে ঝুলতে ঝুলতে পাক্কা একঘন্টার ভ্রমণ শেষে অফিসের সামনে গিয়ে নামতেই দেখি গেট পেরিয়ে ঢুকছেন বড়ো বস্। তাঁকে বহন করে নিয়ে আসছে যে চকচকে প্রাইভেট কারটা, সেটা বাজারের সবচে’ দামি ব্রান্ডের একটা। তার ভেতরে ছড়ানো ফ্রেশনারের মিষ্টি গন্ধে ভুরভুর করছে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাতাস।
—কোনোদিন লোভ করি নি— ইশ! আমার যদি এমন একটা গাড়ি থাকতো!

হাঁটতে পছন্দ করি। নতুন নতুন কিছু দেখার সুযোগ মেলে, মস্তিষ্ক ব্যস্ত হবার জন্যে কাজ পায়। টাকাও বাঁচে। মাঝে মাঝেই একেকটা বহুতল বাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ি—কী সুন্দর নির্মাণ! কী সুদৃশ্য কারুকার্য! কী বিশাল ভবন! ভেতরে তার কতো বিলাসিতা! কতো সুখ!
—কখনো লোভ করি নি— আহ্! আমার যদি এমন একটা বাড়ি থাকতো!

মার্কেটিঙের চাকরি, মার্কেটেই ঘোরাঘুরি। সারাদিন, প্রতিদিন। প্রায়দিন, অন্তত একবার, কোনো কোনো দিন কয়েকবার, বড়ো বড়ো শপিংপ্লেসে গিয়ে সময়ের কিছুটা কাটাই কাজের বাইরে। দেখি, কী ঝলমলে আলোকোজ্জ্বল অভ্যন্তর! কী দামি দামি পণ্যের কেমন পরিপাটি সাজগোজ! কতো ভিড়! কতো ক্রেতা-সমাগম!
—একবারও লোভ করি নি— হায়! আমার যদি এমন একটা ব্যবসা থাকতো!

লোভ করেছি একটাই মাত্র জিনিসের— ভালোবাসা। মানুষের ভালোবাসা পাবার বড়ো নির্লজ্জ লোভ আমার।

কিন্তু পরিচিতি কই? আগে আপনার কাছে আমি তেমনভাবে পরিচিত হবো, তারপরেই না আপনি আমাকে ভালোবাসবেন! দেশের শীর্ষ দৈনিকসহ কয়েকটা সাহিত্য-পত্রিকায় হাতে গোণা কতক লেখা এসেছে— তাতে কি পরিচিতি আসে? —পরিচিতি নেই। বিভিন্ন ব্লগসাইটে লিখেছি কিছুদিন— তাতেও কি পরিচিতি আসে? —পরিচিতি নেই। ফেসবুকে লিখি মাঝে মাঝে— তা আর ক’জন পড়ে? —পরিচিতি নেই। পরিচিতি নেই, পরিচিতি নেই। আমার লেখা পড়বে কে, আমার বই ধরবে কে? অতএব, লজ্জা পাওয়া উচিত ছিলো আমার— বই প্রকাশে। কিন্তু অন্তরে বসত করে লোভের দানব। তার ইচ্ছের অবাধ্য হবার সাহসই বা কোথায় আমার? আমাকে দিয়ে সে প্রকাশ করিয়েই ছাড়লো, আমার প্রথম বই, গল্পবই— “জোছনাবন্দী”। এবং তারপর?

তারপরের যে সত্য, সেটা দুঃখের। বিশ্বাস করুন, ‘জোছনাবন্দী’র শ্রদ্ধেয় প্রকাশক আমাকে একটা ফুঁটো পয়সাও দেন নি, এমনকি অফার করেন নি একটা কাপ চায়েরও! এবং মশিউদ্দৌলা জুয়েল নামের মহৎ হৃদয়ের যে মানুষটা ‘জোছনাবন্দী’ প্রকাশের জন্যে বিশেষভাবে সহায়তার হাত বাড়িয়েছিলেন, সেই মানুষটার কাছে আজ আমি একটু একটু করে লজ্জিত ভীষণ। তবু দুঃখ করি নি। কারণ, তারচেয়েও বড়ো এবং আশ্চর্যকর সত্য হলো— ‘জোছনাবন্দী’ আমাকে ভালোবাসা এনে দিয়েছে। মানুষের ভালোবাসা। ভাবনা থেকে যতোটা পাবো বলে কথা ছিলো, তার অধিক, ইতোমধ্যে। প্রকাশক এপর্যন্ত সঠিক কোনো হিসেব দেন নি— কতো কপি বিক্রি হলো, তার। কিন্তু বন্ধুরা মেলার স্টলের সামনে দাঁড়িয়ে বলেছে— ‘জোছনাবন্দী’ একেবারে চুপচাপ পড়ে নেই— পাঠকরা হাতে নিয়ে উল্টেপাল্টে দেখছে, খোঁচখাবলা পড়ছে, টুকটাক বিক্রিও হচ্ছে। আমার সহোদর তুহিনও স্টলে গিয়ে দেখেছে একই অবস্থা। আমার নিজের কাছ থেকে আগ্রহ করে অনেকে কিনেছে বছরের নানা সময়ে। আর এবারের মেলায় নিজে স্টলে গিয়ে শুনেছি, বিক্রেতারা বলেছে— ‘জোছনাবন্দী’ মন্দ যাচ্ছে না। অনেকে এসে খুঁজছেও না। একবারে বলছে— ‘জোছনাবন্দী’ চাই। এবং প্রকাশের পর থেকে এপর্যন্ত, ফেসবুকে ঢুকে দেখতে পেয়েছি— কিছু গ্রুপে পাঠকদের কাছ থেকে এসেছে চমৎকার চমৎকার বেশ কিছু পর্যালোচনা! ইনবক্সে পেয়েছি অনেক অনেক প্রেরণাদায়ী মন্তব্য! এবং সবচে’ বড়ো কথা— ‘জোছনাবন্দী’তে মুগ্ধ হয়ে একজন প্রকাশক এ বছরের একুশের বইমেলায় প্রকাশ করেছেন আমার লোভের দ্বিতীয় প্রকাশ, আমার দ্বিতীয় গল্পবই— “অন্তর্ডুব”। ‘জোছনাবন্দী’র প্রকাশক আমাকে যেমন একটা ফুঁটো পয়সাও দেন নি, ‘অন্তর্ডুব’-এর প্রকাশক তেমন আমার কাছ থেকে একটা ফুঁটো পয়সাও নেন নি।

আমার ‘অন্তর্ডুব’ও ইতোমধ্যে অনেক পাঠকের হাতে পৌঁছে গেছে। কয়েকটা সুন্দর পর্যালোচনাও পেয়েছি। এবং বিশ্বাস, পাবোও আরো আরো। তবে মুদ্রণ শেষ হয় নি। শেষ হবে বলে আশাও করি নি। কারণ, সেই পর্যায়ের পরিচিতি আমার নেই, প্রিয়তাও নেই। মুদ্রণ শেষ হতে লাগে ব্যাপক পরিচিতি, তারওচে’ বেশি প্রিয়তা।

মোদ্দাকথা, মরে যাবার আগ পর্যন্ত লিখে যেতে চাই। মানুষের ভালোলাগা-মন্দলাগার গা ঘেঁষে থাকতে চাই। বিনিময়ে তাদের কাছ থেকে কিচ্ছু চাই না— স্রেফ ভালোবাসা। কিন্তু তার জন্যে চাই পরিচিতি। এবং তার জন্যে প্রয়োজন মানুষের কাছে পৌঁছোনো। এখন তাই লোভ মানুষের কাছে পৌঁছোনোর। আপাতত “জোছনাবন্দী” এবং “অন্তর্ডুব” নিয়ে মানুষের কাছে পৌঁছোতে চাই। অনেক অনেক অনেক মানুষের কাছে— ভেতরে। লোভটা প্রবল, প্রচণ্ড। ইতোমধ্যে লেখক সার্জিল খানসহ গুটি কয়েকের ঠাট্টা-তামাশাও পেয়েছি। মন খারাপ হয়েছে। কিন্তু সব ভুলে আবার এসেছি বই দুটোর কথা বলতে, হয়তো তাই লোভটা নির্লজ্জ।

বিশেষ কথা, ইতোমধ্যে যারা নতুন লেখক দেখে অবহেলায় দূরে ঠেলে দেন নি, বরং আগ্রহভরে এসে দাঁড়িয়েছেন পাশে, যুগিয়েছেন উত্সাহ, সাহস— তাদের প্রতি এই অধমের অপরিশোধ্য ঋণ, অশেষ কৃতজ্ঞতা। এবং নিরন্তর প্রার্থনা, এইভাবে পাশে পেতে চাই সবাইকে। সারাজীবন। সবসময়।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

60 + = 66