পানামা পেপারসকে ব্যাখ্যা করা, বা কুকুর কেন নিজেই নিজের গা চাটে | স্লাভোয় জিজেক

পানামা পেপারস লিকের ব্যাপারে সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয়টি হচ্ছে, এতে আসলে বিস্ময়কর কিছু নেইঃ আমরা কি এসব থেকে ঠিক তাই জানি নি যা আমরা জানতে চেয়েছিলাম? তবু, অফশোর ব্যাংক একাউন্টের ব্যাপারে সাধারণভাবে জানা এক কথা, আর কংক্রিট প্রমাণ দেখতে পাওয়াটা ভিন্ন কথা। এটা অনেকটা এরকম যে, আপনি জানেন আপনার প্রেমিক/প্রেমিকা আপনার সাথে চিট করছে- আপনি এই বিমূর্ত জ্ঞানটা গ্রহণ করতে পারেন, কিন্তু বিষ উঠবে যখন আপনি অস্বস্তিকর বর্ণণাগুলো জানবেন। এবং যখন আপনি সেই ছবিগুলো দেখতে পাবেন যে তারা আসলে করছিলোটা কি… তো এখন, পানামা পেপারসের ব্যাপারে, বিশ্বের বড়লোকদের ফিন্যান্সিয়াল পর্নোগ্রাফির কিছু নোংরা ছবি দেখে এলোমেলো হয়ে যাচ্ছি আমরা, এবং এখন আর আমাদের পক্ষে এই আত্মপ্রতারণা করা সম্ভব নয় যে আমরা আসলে কিছুই জানি না।

১৮৪৩এ, তরুণ কার্ল মার্কস ক্লেইম করেছিলেন, জার্মানির এনসিয়েন রেজিম “শুধু কল্পনা করে যে এটা নিজের ওপর বিশ্বাস রাখে এবং দাবি করে দুনিয়ারও একই কল্পনা করা উচিত।” এরকম একটা পরিস্থিতিতে, যারা ক্ষমতায় আছে তাদেরকে লজ্জা দেওয়া, নিজেই একটা হাতিয়ার হয়ে ওঠে। অথবা, মার্কস বলতে থাকেন, “আসল চাপকে আরো অসহনীয় করে তুলতে হবে এর সাথে চাপ দেয়ার সচেতনতা যুক্ত করে, লজ্জাটাকে আরো লজ্জাস্কর করে তুলতে হবে এটাকে পাবলিক করার মাধ্যমে।”

এটাই আমাদের আজকের পরিস্থিতিঃ আমরা বিরাজমান বৈশ্বিক ব্যবস্থার নির্লজ্জ সিনিসজমের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছি, যার এজেন্টরা শুধু কল্পনা করে যে তারা তাদের গণতন্ত্র, মানবাধিকারের ধারণাগুলোতে বিশ্বাস করে, এবং উইকিলিকস বা পানামা পেপারসের মতো উন্মোচনকারী উদ্যোগের মাধ্যমে, লজ্জাটা-আমাদের লজ্জা নিজেদের ওপর এরকম ক্ষমতা সহ্য করবার- পাবলিসাইজ করার মাধ্যমে আরো লজ্জাজনক হয়ে ওঠে।

পানামা পেপারসে দ্রুত একবার চোখ বুলালে এর একটা স্বতন্ত্র ইতিবাচক এবং একটা স্বতন্ত্র নেতিবাচক বৈশিষ্ট্য পাওয়া যাবে। ইতিবাচক বৈশিষ্ট্যটা হচ্ছে, অংশগ্রহণকারীদের সবাইকে-জড়িয়ে-ধরা সংহতিঃ বৈশ্বিক পুঁজির ছায়াময় দুনিয়ায়, আমরা সবাই ভাই ভাই। পশ্চিমা উন্নত বিশ্ব সেখানে আছে, দুর্নীতিমুক্ত স্ক্যান্ডিনেভিয়ানরাও, এবং তারা হাত মেলাচ্ছে ভ্লাদিমির পুতিনের সাথে। এবং চীনা প্রেসিডেন্ট জি, ইরান আর উত্তর কোরিয়াও আছে সেখানে। মুসলমান আর ইহুদিরা বন্ধুত্বপূর্ণভাবে বিনিময় করছে- এটা একটা প্রকৃত সাম্রাজ্য বহুসাংস্কৃতিকতার যেখানে সবাই সমান ও ভিন্ন। নেতিবাচক বৈশিষ্ট্যঃ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চোখে-পড়ার-মতো অনুপস্থিতি, যা রুশ ও চীনা অভিযোগকে কিছুটা কল্কে দেয় যে অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে বিশেষ রাজনৈতিক স্বার্থ কাজ করেছে।

তো এতো সব তথ্য দিয়ে আমরা করবোটা কি? প্রথম (এবং আধিপত্যশীল) প্রতিক্রিয়াটা হচ্ছে, নৈতিকতাবাদী রাগের বহিঃপ্রকাশ, নিঃসন্দেহে। কিন্তু আমাদের যা করা উচিত তা হচ্ছে দ্রুত প্রসঙ্গ বদল করা, নৈতিকতা থেকে আমাদের আর্থনীতিক ব্যবস্থায়ঃ রাজনীতিবিদ, ব্যাংকার এবং ম্যানেজাররা সবসময়ই লোভী ছিল, তো আমাদের আইনি ও আর্থনীতিক ব্যবস্থায় এমন কি আছে যা তাদেরকে তাদের এই লোভ এতো বড়ো আকারে চরিতার্থ করতে সক্ষম করে তুললো?


People demonstrate against Iceland’s Prime Minister Sigmundur Gunnlaugsson in Reykjavik, Iceland on April 4, 2016 after a leak of documents by so-called Panama Papers stoked anger over his wife owning a tax haven-based company with large claims on the country’s collapsed banks.

২০০৮এর ফিন্যান্সিয়াল মেল্টডাউনের সময় থেকে, পোপ থেকে নিচ পর্যন্ত সকল পাবলিক ফিগার আমাদের ওপর অত্যধিক লোভ আর ভোগের সংস্কৃতির সাথে লড়াই করার বিধানের বোমাবর্ষণ করে আসছেন। পোপের কাছের এক ধর্মতাত্ত্বিক যেমনটা বলেছেনঃ “বর্তমান সংকটটা পুঁজিবাদের সংকট নয়, বরং নৈতিকতার সংকট।” এমনকি বামপন্থীদের একাংশও এই পথ অনুসরণ করে। আজকে পুঁজিবাদ-বিরোধিতার কোনো অভাব নেইঃ কয়েক বছর আগেই অকুপাই প্রতিবাদ বিস্ফোরিত হয়েছিল, এবং আমরা প্রত্যক্ষও করছি পুঁজিবাদের আতঙ্কসমূহের ব্যাপারে পর্যালোচনার পাহাড়ঃ বই, পত্রিকার ইন-ডেপথ অনুসন্ধান, এবং টেলিভিশন প্রতিবেদন পরিপূর্ণ সেইসব কোম্পানির ব্যাপারে যারা নির্মমভাবে আমাদের পরিবেশ দূষণ করে চলেছে, সেইসব দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যাংকারের ব্যাপারে যারা মোটা আকারের বোনাস পেয়ে থাকে, যখন তাদের ব্যাংকগুলোকে বাঁচাতে হয় পাবলিক মানির মাধ্যমে, সেইসব সোয়েট শপের ব্যাপারে যেখানে অতিরিক্ত কর্মঘন্টা কাজ করে শিশুরা।

যাই হোক, এইসব উপচে পড়া পর্যালোচনায় একটা কিন্তু আছেঃ যা, এজ এ রুল, প্রশ্নবিদ্ধ হয় না তা হচ্ছে এইসব বাড়াবাড়ির বিরুদ্ধে লড়াই করার গণতান্ত্রিক-লিবারাল ফ্রেমওয়ার্কটা। প্রকাশ্য বা গোপন উদ্দেশ্যটা হচ্ছে পুঁজিবাদকে গণতান্ত্রিক করা, অর্থনীতির ওপর গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ প্রসারিত করা, পাবলিক মিডিয়া, সরকারি অনুসন্ধান, কঠিনতর আইন, এবং সৎ পুলিশি তদন্তের চাপের মাধ্যমে। কিন্তু গোটা ব্যবস্থাটাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয় না, এবং আইনের ব্যাপারে এর গণতান্ত্রিক প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোটা অস্পৃশ্যই রয়ে যায় যাকে এমনকি অকুপাই আন্দোলনের মতো এই “এথনিক এন্টি-ক্যাপিটালিজমের” সবচেয়ে র‍্যাডিকাল রূপও ছোঁয় না।

যে ভুলটা এখানে এড়াতে হবে সেটা এই গল্পটায়- এপোক্রাইফাল, সম্ভবত-সবচেয়ে সুন্দরভাবে উদাহরণকৃত হয়ে আছে যা বাম-কেইনিসিয়ান আর্থনীতিক জন গ্যালব্রেইথের ব্যাপারেঃ পঞ্চাশের দশকের শেষদিকে সোভিয়েত ইউনিয়নে ঘুরতে যাওয়ার আগে, তিনি তাঁর এন্টি-কমিউনিস্ট ফ্রেণ্ড সিডনি হুককে লেখা একটা চিঠিতে বলেনঃ “দুশ্চিন্তা কোরো না, আমি সোভিয়েতদের স্বারা সিডিউসড হবো না, এবং ফিরে এসে এই দাবি করবো না যে সেখানে সমাজতন্ত্র আছে!” হুম বিমর্ষভাবে জবাব দিলেন, “কিন্তু সেইটাই তো আমার দুশ্চিন্তার কারণ- যে তুমি ফিরে এসে দাবি করবে ইউএসএসআর সমাজতান্ত্রিক না!” হুককে যেটা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত করেছে সেটা হচ্ছে ধারণাটার শুদ্ধতার নেইভ ডিফেন্সঃ সমাজতান্ত্রিক সমাজ নির্মাণ করতে গিয়ে যদি কোনো ভুলচুক হয়, এটা তো আসলে আইডিয়াটার বাতিল হয়ে যাওয়ার প্রমাণ নয়, এর অর্থ হচ্ছে আমরা যথাযথভাবে এটা কার্যকর করতে পারি নাই। আমরা কি আজকের বাজার মৌলবাদীদের মধ্যে একই প্রবণতা দেখছি না?

যখন, কয়েক বছর আগে ফ্রান্সে একটা টেলিভিশন বিতর্কে, ফরাশি বুদ্ধিজীবী গাই সরমোন দাবি করলেন গণতন্ত্র আর পুঁজিবাদকে অবশ্যই একসাথে চলতে হবে, আমি তাঁকে সেই অনিবার্য প্রশ্নটা না করে থাকতে পারি নিঃ “কিন্তু আজকের চীনের কাহিনী কি?” সরমোন পাল্টা জবাব দিলেন, “চীনে কোনো পুঁজিবাদ নাই!” সরমোনের মতো ফ্যানাটিক পুঁজিবাদপন্থীর জন্য, একটা দেশ যদি অগণতান্ত্রিক হয়, এর সরল অর্থ হচ্ছে এটা প্রকৃতভাবে পুঁজিবাদী নয়, বরং চর্চা করছে এর একটা বিকৃত রূপ, ঠিক সেইভাবে যেভাবে একজন গণতান্ত্রিক কমিউনিস্টের জন্য স্তালিনিজম কমিউনিজমের প্রকৃত রূপ ছিলো না।

ভিত্তির ভুলটা শনাক্ত করা কঠিন না একেবারেই- এটা সেই সুপরিচিত রসিকতাটার মতোঃ “আমার ফিয়ান্সে কখনোই দ্যাখা করার ক্ষেত্রে দেরী করে না, কেননা যেই মুহূর্তে সে দেরী করবে, সেই মুহূর্ত থেকে সে আর আমার ফিয়ান্সে না!” এভাবেই আজকে বাজারের এপোলজিস্টরা, অভূতপূর্ব মতাদর্শিক ছিনতাইয়ের মাধ্যমে, ২০০৮এর সংকটকে ব্যাখ্যা করেঃ এটার জন্য সেই মুক্ত বাজার দায়ী না যার কারণে এটা হয়েছিলো, কিন্তু মাত্রাতিরিক্ত রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ, অর্থাৎ, সেই ফ্যাক্ট যে আমাদের বাজার অর্থনীতি প্রকৃত বাজার অর্থনীতি না, যে এটা এখনো কল্যানমূলক রাষ্ট্রের মুষ্টিতে আবদ্ধ আছে। পানামা পেপারসের শিক্ষাটা হচ্ছে, প্রাঞ্জলভাবে, এইটা আসল ঘটনা নাঃ দুর্নীতি বৈশ্বিক পুঁজিবাদী ব্যবস্থা থেকে কোনো অনিচ্ছাকৃত বিচ্যুতি না, এটা এর মৌলিক কার্যকারিতার একটি অংশ।

পানামা পেপারস লিক থেকে যে বাস্তবতা বেরিয়ে আসে তা হচ্ছে শ্রেণী বিভাজন, এবং এটা এতোটাই সহজ। পেপারগুলো দেখিয়েছে কিভাবে বড়লোকরা একটা আলাদা দুনিয়ায় থাকে যেখানকার নিয়মকানুন সব অন্যরকম, যেখানে আইনি ব্যবস্থা আর পুলিশ কর্তৃত্ব ব্যাপকভাবে মিলিত আর যা শুধু ধনীদের রক্ষাই করে না, বরং ব্যবস্থাগতভাবেই আইনের শাসনটাকে তাদের উপযোগী করে নেয়ার জন্য সদাপ্রস্তুতও বটে।

ইতোমধ্যেই অনেক ডানপন্থী লিবারাল প্রতিক্রিয়া দ্যাখা যাচ্ছে পানামা পেপারসের প্রতি যা সমস্ত দায় আমাদের কল্যানমূলক রাষ্ট্রের, অথবা অবশিষ্ট আছে এর যতোটুকু, বাড়াবাড়ির ঘাড়ে চাপায়। যেহেতু সম্পত্তির ওপর ব্যাপকভাবে কর বসানো হয়, তাই মালিকরা চেষ্টা করে, সেইসব জায়গায় সম্পত্তি সরিয়ে নিতে যেখানে করের হার অনেক নিচু, যার কিছুই শেষ পর্যন্ত অবৈধ নয়। এই অজুহাত আপাতশ্রুতিতে যতো অদ্ভূতই মনে হোক, এই আর্গুমেন্টে একটা কার্নেল অফ ট্রুথ আছে, এবং এতে নোট নেয়ার মতো দুটো পয়েন্ট আছে। প্রথমত, যেই রেখাটা বৈধ আর অবৈধ ট্রানজেকশনকে আলাদা করে তা ক্রমেই ব্লারড হচ্ছে, এবং প্রায়শই এটা নির্ভর করছে স্রেফ ব্যাখ্যাবিশ্লেষণের ওপর। দ্বিতীয়ত, সম্পত্তি মালিকরা যারা এটাকে অফশোর একাউন্ট আর ট্যাক্স হ্যাভেনে সরাচ্ছে এরা কেউ লোভী দানব না, কিন্তু কতিপয় ব্যক্তি যারা স্রেফ যৌক্তিক মানুষের মতোই চেষ্টা করছে নিজেদের সম্পত্তি রক্ষা করতে। পুঁজিবাদে, আপনি ফিন্যান্সিয়াল স্পেকুশলেশনের ময়লা পানিটা ছুঁড়ে ফেলতে পারেন না এবং বাঁচিয়ে রাখতে পারেন না রিয়াল ইকোনমির সুস্থ শিশুটিকে। কেননা ময়লা পানিটাই কার্যকরভাবে সুস্থ শিশুটির রক্তপ্রবাহ।

এখানে কারো ভয় পাওয়া উচিত নয় শেষ পর্যন্ত যেতে। বৈশ্বিক পুঁজিবাদী আইনি ব্যবস্থা নিজেই, এর সবচেয়ে মৌলিক বৈশিষ্ট্যে, বৈধকৃত দুর্নীতি। কোথায় ক্রাইম শুরু হয় (কোন ফিন্যান্সিয়াল ডিলিংসগুলো অবৈধ) সেটা কোনো আইনি প্রশ্ন নয় বরং যথার্থভাবেই একটা রাজনৈতিক প্রশ্ন, ক্ষমতার লড়াইয়ের।

তো কেনো হাজারো ব্যাবসায়ী আর রাজনীতিবিদ তাই করে যা পানামা পেপারসে প্রামাণিকভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে? জবাবটা সেই পুরনো অশ্লীল হেয়ালি-ঠাট্টার মতোইঃ কুকুর কেনো নিজেই নিজের গা চাটে? তারা পারে তাই।

মূল প্রবন্ধঃ স্লাভোয় জিজেক, ৭ এপ্রিল ২০১৬
রূপান্তরঃ ইরফানুর রহমান রাফিন, ৮ এপ্রিল ২০১৬

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

99 − 90 =