তনুর আরেকটা স্যান্ডেল কি খুনি-ধর্ষকের বাসায়?

?w=450″ width=”400″ />

গত মাসে কুমিল্লার ময়নামতি সেনানিবাসে সংস্কৃতিমনা কলেজ ছাত্রী তনু ধর্ষণ-হত্যাকাণ্ডের পর থেকে ধর্ষক ও তাদের সহমর্মী সেনাবাহিনী, পুলিশ, সরকার ও সরকারী দলের নেতা-কর্মীদের পক্ষ থেকে অবাস্তব, অযৌক্তিক ও অগ্রহণযোগ্য যুক্তিতে বিষয়টি ধামাচাপা দেয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। সন্দেহ এখানেই; কেননা ধামাচাপা প্রক্রিয়া এখন নগ্ন রূপ নিয়েছে। এতে করে সরকার, সেনাবাহিনী ও অন্যান্য আইন শৃঙ্খলা বাহিনী গ্রহণযোগ্যতা হারাচ্ছে, জনগণের কাছ থেকে আরো দূরে সরে যাচ্ছে।

সেনা ও পুলিশ সদস্যরাও যে ধর্ষকামী হয় এটা বোধকরি আমাদের দেশের সাধারণ মানুষ ইতিমধ্যে জানে। তারা আবার নারী স্বাধীনতায়ও বিশ্বাস করে না বরং সাঈদী আর শফি হুজুরের মতো মেয়েদের মাংসপিণ্ড, খাবার জিনিস ইত্যাদি মনে করে। এইরকম মানসিক অবস্থায় সংস্কৃতিমনা তনুকে গণধর্ষণ করে মেরে ফেলবে এটা বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে খুব স্বাভাবিক।

তনুর ধর্ষক ও খুনিরা খুব ক্ষমতাবান কেউ, মানে সেনাবাহিনীর কিছু উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও তাদের সাঙ্গপাঙ্গ, যারা পরিকল্পিতভাবে ঘটনাটি ঘটিয়েছে। তাই ধর্ষক-খুনিদের রক্ষা করার উদ্দেশ্যে শুরু হয় ধামাচাপা উৎসব!

# যেখানে তনুর লাশ পাওয়া গেছে সেখান থেকে বিভিন্ন আলামত সরিয়ে ফেলেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। কিন্তু এই বে-আইনি কাজটি ধামাচাপা দিতে পারেনি। মিডিয়াতে চলে এসেছে।

# লাশ উদ্ধার করে নিয়ে যাওয়া হয় সেনানিবাসের সামরিক হাসপাতালে। সেখানে অফিসারদের নির্দেশে লাশের শরীর থেকে ধর্ষণের আলামত ধুয়ে ফেলা হয়। শুধু তাই নয়, ধোয়ামোছার পর ডাক্তার যে সুরতহাল রিপোর্ট তৈরি করেছিলেন সেই রিপোর্টও পরে বদলে ফেলা হয়।

# সারারাত সামরিক হাসপাতালে রাখার পর লাশটি পাঠানো হয় সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে পরীক্ষার জন্য বিভিন্ন আলামত নেয়া হলেও অন্যান্য স্পর্শকাতর মামলার মতো এক্ষেত্রেও পরীক্ষা পদ্ধতি ও ফলাফলকে প্রভাবিত করা হয়। ফলাফল জনসমক্ষে ঘোষণা করা হয় ১৫দিন পর এবং বলা হয় ধর্ষণের কোন আলামত পাওয়া যায়নি এবং হত্যার কারণ বুঝা যায়নি, ঠিক যেমনটা চেয়েছিল সেনাবাহিনীর খুনি-ধর্ষকরা।

# তনুকে কালভার্টের পাশের ঝোপঝাড়ে ধর্ষণ ও খুন করা হয়েছে এমন একটি ধারণা দেবার চেষ্টা করা হয়। এমনও শোনা যাচ্ছে সেনানিবাস এলাকার বাইরে তাকে মেরে পরে লাশটি এনে ফেলা রাখা হয়। কিন্তু লাশের সাথে একটি স্যান্ডেল থাকার কারণে বুঝা যায় অন্য স্যান্ডেলটি সেই বাসায়/গ্যারেজে পাওয়া যাবে যেখানে তাকে গণধর্ষণ শেষে হত্যা করা হয়।

# বিচারপ্রার্থীদের নজর অন্যদিকে সরাতে তনুর পরিবারের সদস্যদের কয়েকবার কয়েকটি বাহিনীর লোকজন জিজ্ঞাসাবাদের নামে মানসিক নির্যাতন করলেও সেই তথ্য তারা লুকাতে পারেনি।

# সন্দেহভাজন হিসেবে তনুর ক্লাসমেট, থিয়েটার গ্রুপের সদস্যদের চিহ্নিত করলেও সুবিধা করতে পারেনি সেনাবাহিনী।

# সুষ্ঠু তদন্তের নামে তনুর লাশ কবর থেকে উঠিয়ে পরীক্ষার জন্য আলামত সংগ্রহ করা হলেও সেখানেও যে ধর্ষণের আলামত পাওয়া যাবে না তার আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

# পরিশেষে এটাকে স্রেফ একটি চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ড হিসেবে ঝুলিয়ে রাখা হবে বছরের পর বছর, কেননা খুনি-ধর্ষকরা তো আর নিজেদের দোষ স্বীকার করে ফেসবুক/টুইটারে বার্তা দিবে না!

কেন সেনা কর্মকর্তারা জড়িত?

# লাশ উদ্ধার হওয়ার পর থেকে তদন্তে রাখঢাক।

# স্থানীয় সাংবাদিকদের খবর প্রকাশ না করতে আদেশ দেওয়া।

# পরিবারের সদস্যদের মোবাইল কেড়ে নেওয়া এবং বাসায় থাকতে বাধ্য করা।

# সিএমএইচের ডাক্তারদের ধর্ষণের আলামত লুকাতে বাধ্য করা।

# নারীলোভী সেনা কর্মকর্তা/সদস্যরা বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে তনুর নাচ-গান দেখে তনুর উপর তাদের নজর যায়। তাছাড়া সে যেহেতু একজন চতুর্থ শ্রেণির বেসামরিক কর্মচারীর মেয়ে সেহেতু তাকে গনিমতের মাল হিসেবে বিবেচনা করেছিল খুনি-ধর্ষকরা।

# তনু যেহেতু তাদের দেয়া টোপ গেলেনি, তাই সেই ক্ষোভ ঝাড়তে তাকে গণধর্ষণ ও নৃশংস ভাবে হত্যা করা হয়।

# কর্মকর্তাদের ছেলেরা এই ঘটনায় জড়িত থাকলে এতদিনে ধরা পড়ে যেত।

হয়তো ওরা তদন্ত ও বিচার কাজকে পেছাতে পারবে, হয়তো ধর্ষক-খুনিদের এর মধ্যে বিদেশে পাঠিয়ে দিতে পারবে, হয়তো ন্যায়বিচারের দাবীতে সোচ্চার আন্দোলনকারীদের ভয় দেখাতে বা গুম করে দিতে পারবে। কিন্তু প্রোপাগান্ডা চালিয়ে তনুকে গণধর্ষণ ও নির্মমভাবে হত্যার বিষয়টি লুকাতে পারবে না ওরা।

সেনাবাহিনীর আদালত বা দেশের বেসামরিক আদালতে বিচার না হলেও, তনু হত্যার বিচার হবে জনগণের আদালতে। জনগণই তদন্ত করে সত্য প্রকাশ করবে এবং দোষীদের তাদের প্রাপ্য শাস্তি দিবে। সাথে খুনি-ধর্ষকদের সাহায্যকারীদের চিহ্নিত করে সমাজ থেকে বয়কট করবে।

আমার বিশ্বাস একটা সময় আসবে যখন ময়নামতি সেনানিবাসের কোন সাহসী সদস্য মিডিয়ার কাছে সত্য ঘটনা প্রকাশ করবে। সেনাবাহিনীর বেশিরভাগ সদস্যই খারাপ আর বাকীরা ভীতু, এমনটা আমার বিশ্বাস হয় না। অন্তত: যেসব বেসামরিক কর্মচারী সেখানে কাজ করে তারা তাদের স্ত্রী, কন্যাদের সেনা কর্মকর্তাদের লোভ-লালসার বলি হওয়া থেকে রক্ষা করতে নিশ্চয়ই কঠোর পদক্ষেপ নিবে।

দুই যুগ আগে পুলিশ কর্তৃক ইয়াসমিনকে ধর্ষণ ও হত্যা, সেনা অফিসারের দ্বারা কল্পনা চাকমা অপহরণ এবং সম্প্রতি টাঙ্গাইলের কালিহাতিতে ছেলের সামনে মাকে ধর্ষণের ঘটনায় বিচার চাইতে পুলিশের গুলি উপেক্ষা করে জনগণ দূর্বার আন্দোলন গড়ে তুলেছিল।

দেশে ধর্ষণের ঘটনা, ধর্ষকদের সংখ্যা এবং তাদের সমর্থকদের সংখ্যা বেড়ে গেলেও নারীদের পাশাপাশি ধর্ষণ প্রতিরোধে আগ্রহী পুরুষদের সংখ্যাও বেড়েছে। যৌন সন্ত্রাসীরা যতই আক্রমণাত্মক হোক না কেন, পুলিশ যতোই টাকার গোলামী করুক না কেন, অন্যায় করে পার পাবে না কেউ।

প্রথম প্রকাশ-Norrfika.se মতামত পাতায়।

তনু ইস্যুতে আরেকটি লেখা- সশস্ত্র বাহিনী, সেনানিবাস: অজানা আতংকের নাম

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

77 − 67 =