গল্পঃ এন্ড দেন আই ডিসাইডেড টু কিক মাইসেলফ আউট অফ হেভেন – পর্ব – ৪

পর্ব-৩

আহ! আমার সামনে এক হুর উপস্থিত!!

এক অদ্ভুত উপলব্ধি হইলো। বেহেস্তের অনন্ত জীবনেও কোন বিশেষ মুহুর্ত থাকতে পারে এইটা জানতে পারলাম। একবার মাত্র দেখলাম, এরপর চক্ষু সংযত কইরা চিফের দিকে মাথা ফিরাইলাম। দুনিয়ার জীবনে এরচেয়ে কোটিগুন কম সুন্দরী মাইয়া দেইখাও সরাসরি চাইয়া থাকতে আনইজি লাগলো। ভাবতাম, তাকাইয়া আছি টের পাইয়া লুইচ্চা ভাবতেছে নাতো? আর এ তো হা কইরা তাকাইয়া থাকার মতও না, গোগ্রাসে গিলতে থাকার মতো কেউ। কী এ কষ্ট হইলো নজর নীচু রাখতে। এ এক মহাশুন্য ভর্তি কষ্ট!!

চীফ কইলো,

– “স্যার, ভাবী হাজির। বাদাম খাইতে পারেন। বাদামও মওজুদ। পারফেক্ট অনুপাতে বীটলবন দেয়া। আপনার আর ভাবীরটা আলাদা আলাদা করা নাই। উনারে এমনভাবে বানানো, যাতে আপনার যা পছন্দ উনারও তাই পছন্দ হবে। “

আমি অবাক হইয়া সলজ্জ বিস্ময়ে কইলাম,

– “ কস কি মমিন? আমি আবার এরে বিবাহ করলাম কবে? আর বানানো হইছে মানে কি? আমারতো সবসময় বিপরীত চরিত্র পছন্দ ছিলো? এক হইলে তো একঘেয়ে হইয়া যাবে। তর্ক বিতর্ক না হইলে কি কথা কইয়া মজা আছে?“

চীফ জবাব দিলো,

– “স্যার, আপনেতো দুনিয়ার জীবনে অবিবাহিত মরছিলেন। তাই কোন জেনুইন ভাবী নাই। তাইলে এরা জেনুইন ভাবীর বান্ধবীর মর্যাদা পাইতো। যেহেতু তা হয়নাই, তাই এদের আপনার স্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেয়া হইছে। সম্পূর্ন আপনার আজ্ঞাবহ। “

আমি কইলাম,

– “বিয়া না কইরাই স্ত্রী? আবার আমার আজ্ঞাবহ মানে কি? আমি কি বান্দী চাইছি? আমি কইছি হুর আনতে। দুনিয়ার জীবনে হুরের কত কথা শুনছি। ভাবলাম একটু হুর দেখমু, একটা শখ পুরন হইবো। পাশে বসাইয়া বাদাম খাইতে খাইতে একটূ গল্প করা যাইবো। তুমি তো হাজির করলা পুতুল। তাও আবার বাদামও ছিল্লা নিয়া আসছো। ছিইল্লা দেয়া বাদাম খাইতে কি আর ওই মজা পামু? ভাবছিলাম আস্তে আস্তে নিজেই বাদাম ছুইলা ধীরে সুস্থে কথা কমু। ফ্রেন্ডশিপও হইয়া যাইতে পারে। সুন্দরী একটা বান্ধবী থাকা তো খারাপ কিছুনা। সবকিছুতে ভজঘট লাগাইয়া দিলা সদরঘাটের মতো। “

চীফ অফ এঞ্জেলস ষ্টাফরে কাচুমাচু মুখে দেখলাম মনে হুইলো। যদিও এদের ভাবভঙ্গীর তেমন কোন পরিবর্তন কোনদিন দেখিনাই, দেখার কথাও না। মনে মনে হয়তো ভাইবা নিলাম। সে জবাব দিলো,

– “ স্যার, এইটা তো আর দুনিয়ার জীবন না যে বিয়ার ফর্মালিটি করা লাগবে শরীয়া মোতাবেক। এইখানে স্বাধীন জীবন, আর উনাদের মধ্যে বেশ অনেক সংখ্যক নারীকেই আপনার সস্ত্রীর মর্যাদা দেয়া হইছে। এখন আপনি উনাদের সাথে বাদাম খাবেন নাকি লীলাখেলা করবেন আপনার মর্জি। আমরা আপনার ইচ্ছাপুরনের অনুষঙ্গ মাত্র। “

আমি কইলাম,

– “স্ত্রী বানাইছো ঠিক আছে। সম্মতি নিছিলাতো? নাইলে আদর সোহাগ করতে গেলে শ্লীলতাহানীর মতো হইয়া যাবেনা ব্যাপারটা?”

চীফ কইলো,

– “স্যার, উনাদের কেবল আপনার জন্য সৃষ্টি করা হইছে। উনাদের আপনার বাইরে অন্য কাউকে পছন্দ করার ক্ষমতা নাই। কেউ উনাদের স্পর্শ করেনাই, করতে সক্ষমও হবেনা। “

আমি বিমর্ষ হইলাম, কি কই না কই ভাবতে ভাবতে কইলাম,

– “ ভাইরে, আমিতো এই পুতুল হুর চাইনাই। আমি চাইছিলাম বান্ধবী। বড় একা একা লাগে। পোলা দোস্ত হইলেও হইতো, একলগে বাংলা ফাইভ টান দেওন যাইতো ভাগ কইরা। ভাগাভাগির টানে ক্যান জানি বেশি মজা লাগে। মনে হয় আরেকটু বেশি টানে আরো মজা পাইতাম, অতৃপ্তি থাইকা যায়। আর ওই অতৃপ্তির লাইগার বেশি মজা লাগতো। তুমি বুঝবানা গেলমান। কিন্তু বাদাম খাওনের লাইগা বান্ধবীর জুরি নাই। সুন্দরী হইলে আরো কথা নাই। অন্যরকম একটা উত্তেজনা কাম করে, মনে হয় এইবার বুঝি চান্স আছে। এইবার কিছু একটা হবে, কিছু একটা হইতেও পারে। “

চীফ কইলো,

– “স্যার, হওয়া না হওয়া নিয়া চিন্তা কইরেননা। হবেই ধইরা নেন। বললাম না ওইভাবেই সৃষ্টি। স্পেশালি ফর ইউ। ডাইনে বামে যাওয়ার চান্স নাই। “

আমি আরো বিমর্ষ হইলাম, কইলাম,

– “ শালার তোমরা মানুষরে জীবনেও বুঝবানা। দিলাতো খেলাটাই নস্ট কইরা। এই পোগ্রামেবল হুর দিয়া আমি কি করমু? এরে লীলাখেলার ইশারা করলেও তো নিঃসংকোচে রাজী হইয়া যাইবো! আমি তো সেক্স ডল চাইনাই, বান্ধবী চাইছিলাম। একটু সুখ দুক্ষের কথা কইতাম। শেয়ারিং হইতো, শেয়ারিং থাইকা হাল্কা হাল্কা কেয়ারিং, এরপর অন্য রকম ফিলিং, এরপর আরো অন্যকিছু… পুরাই মাটি কইরা দিলা সব। এরচেয়ে একটা ভালো ফোন দ্যাও। গেমস খেলি। “

চীফ কইলো,

– “জো হুকুম স্যার। “

এরপর আমি দেখলাম আমার হাতে একটা নোকিয়া ১১০০!! তাও আবার গোল্ডেন কালারের, ইয়া হেভি!! আমি আরো তব্দা খাইয়া জিগাইলাম,

– “ এ কি দিলিরে গেলমান? ইটার মত ভারী ক্যান? আর অন্য কালার দিলে হইতোনা? আর দিবি তো দিবি একটা আইফোন প্লাসই দিতি। নোকিয়া ১১০০ই দিলি?”

চীফ কনফিডেন্টলি জবাব দিলো,

– “স্যার, স্ট্যাট নিয়া দেখলাম, আপনার ওই সময়ে সবচেয়ে জনপ্রিয় আর বহুল বিক্রিত সেট এইটাই ছিলো। আর সোনা দিয়া বানানো তো, একটূ ভারীই লাগার কথা। বেহেস্তি সেটের একটা আলাদা ব্যাপার স্যাপার থাকা উচিত না? নরমাল প্লাস্টিক দিয়া বানানো হইলে হবে? আর গেমসের মধ্যে স্নেক লোড করা আছে। বহুল জনপ্রিয় ছিলো ওই আমলে। আপনে খেলতেন নাকি জানা নাই। ভিডিও রিওয়াইন্ড কইরা দেখতে হবে। “

আমি আর কি বলতে পারতাম? কি করমু না বুইঝা বললাম, খাতা কলম দ্যাও, সাহিত্য চর্চা করি। এই জীবন আর ভাল্লাগতেছেনা। বাচার খায়েশ মিইটা গ্যাছে।

চীফ তাই আইনা দিলো। আমি আমারপ্রিয় আছিলাম। সবচেয়ে প্রিয় বিনোদন ছিলো ঘুম। বিড়ালের মতো ঘুম। আমার মনে হইলো বিড়াল হইলেও ভালো ছিলো এই বেহেশ্তি জীবনের চেয়ে। আমি লিখতে লাগলাম,

“স্বর্গের আরাম কেদারার তিতকুটে ব্লাক কফি প্রায় আজন্ম উপভোগ শেষ হবে হবে করবার মুহূর্তে দুইপাশে হাতপাখা নিয়ে বাতাসরত দুই হুরকে ইশারায় বধির করে দিয়ে উপরওয়ালা আবারো ইশারায় বুঝিয়ে বললেন, “যাও তোমার ইচ্ছাপূরণ করা হলো। এই মুহূর্ত থেকেই তুমি হলে বিড়াল!”

কেন যে ভুল করে চেয়েছিলাম আরাম আরাম বিড়াল জীবন!? অথচ বয়স না নির্ধারণ হেতু এখন বয়সবিহীন শুধু এক অনন্ত ম্যাও জেগে উঠবে অবিরত বিষাদ ও হর্ষের ফুলে, ঘরোয়া ছায়ায় আর তারওপরে আলপথে, বেমরশুম দিগন্তের দিকে!!

হয়তো কেউ আমাকে আদর করবে, আলতো আঙুলের ঘ্রাণে দেখে নেব আশ্রয়স্রোত। হয়তো বিড়ালজীবন এক ভিন্ন আবেগের ফ্রেমে বেঁধে দেবে আজীবন জমানো যত সন্তাপ, শোক, ক্ষয় …
ম্যাওওও – ভেবে দেখি এই ডাক তবে এতদিন ছিল বুকের বিহনে, পাঁজরের আনাচেকানাচে, তবে পুরোনো মরিচার মতো …

আমার বিড়ালচোখে আজ জেগে ওঠে লগ্নভ্রষ্ট তমালতরুবন, অক্ষয়পথ ধরে উমরছাড়া এই নরম রোমশতা।

হায় হে উপরওয়ালা, বিড়ালজীবন দাও শুধু অনন্ত আয়ু দিওনা!!”

লেখা শেষ করবার পর পর আমার মনে হইলো কুমুর কথা। কুমু ছিলো আমার দস্ত ডিউর বিড়াল, মাইয়া বিড়াল। আমার ইচ্ছা হইলো কুমুরে দেখতে। চীফ বললো,

– “স্যার, কুমু ম্যাডাম হাজির!! “


এরপর দেখলাম কুমুরে, আমাদের অতি আদরে সর্বদা গদগদ কুমুরে!! লেজ উপরের দিকে তুইলা সে অনন্তকাল আগের সেই অদ্ভুত ভঙ্গীতেই নাড়াচাড়া করতেছে। বুঝতে পারলাম, এইটা অর্ডার দিয়া বানানো কুমু না, আমাদের সেই অকৃত্তিম কুমু। এই প্রথম বেহেস্তে একটা আবদার টোটো রক্ষা করা হইলো, কোন কারচুপি নাই।

আমি জোরে ডাক দিলাম,- “ওরে কুমুরে। আয় আয়, এইদিকে আয়!!“

কুমু আমার আওয়াজ এই লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি বছর পরেও চিনতে পারলো মনে হয়। এক লাফে আমার কোলে আইসা বসলো। আমি ভাবতে লাগলাম, এই বেহেস্ত জীবনে আমার এই পর্যন্ত সবচেয়ে বড় পাওয়ার মধ্যে একটা হইতেছে কুমুরে আবার দেখতে পাওয়া। যদিও কুমুর লাশ আমি নিজের চোখের সামনে এখনো ভাইসা উঠতে দেখতেছি। আমি আর আমার দোস্ত ডিউ ওরে কানতে কানতে কবর দিছিলাম। কবরের পাশে দুইটা হোমিওপ্যাথির শিশিতে আমাদের চোখের পানি ভইরা উপরে কাগজে লিখে দিছিলাম,

“কুমুর জন্য আমাদের চোখের অশ্রু!”

এরপর বোতল দুইটা একটা পিলিথিনে পেচাইয়া বাক্সে ভইরা ওর কবরের পাশে পুইতা রাখছিলাম। ভাবছিলাম কবরের পাশে আমাদের ভালোবাসাটাও থাকুক। কুমু নিশ্চয়ই মরার পরে সেই দৃশ্য দেখছিলো। ওই চোখের পানি সেই কবেই হারাইয়া গেছে কে জানে, মায়াটা এখনো সেইরকমই আছে। এখন ভাবতেছি, কত হাজার হাজার মানুষ দেখছি দুনিয়ার জীবনে, কত মায়া জন্মাইছিলো এর তার জন্য। এই মায়াও তারচেয়ে কোন অংশে কম না। খোদার প্রতি কৃতজ্ঞতা জাগলো এইবার, মনে মনে থ্যাঙ্কু দিলাম উনারে, বললাম,- “হে ঈশ্বর, জীবনের অন্তত একটা ভালোলাগা তো তুমি আবার ফিরাইয়া দিলা, তোমারে ধন্যবাদ।“

খুব আশ্চর্য্যের ব্যাপার হইলো আমি কুমুর মনের কথা পড়তে পারতেছি। কুমু স্বর্গীয় পশু নিবাসে আরামেই ছিলো। একটা অনুভুতিহীন ইন্দুররে সুতায় বাইন্ধা তার সাথে টমের মতো বান্দ্রামী করতেছিলো, নিস্পাপ আনন্দ। তারে যখন জানানো হইলো তোমার দুনিয়ার এক দোস্ত তোমারে দেখতে চায়, তখন সে চীতকারে “মিয়াও মিয়াও মিয়াও” বইলা সানন্দে সম্মতি জানাইছিলো। দুনিয়ার সব মায়া মনে হয় পশু পাখিও ছাড়তে পারেনা। ইন্দুরটারে নিয়া খেলা তার কাছে তুচ্ছ মনে হইছিলো সেইসময়। সে আমারে মনে মনেই বুঝাইলো, – “চল বস, বেহেস্তে একসাথে একটু হাটা দিয়া আসি, সেই পুরান দিনের মতো! অনন্তকাল একসাথে ঘুরিনা!!”

আমি সানন্দে রাজী হইলাম। শুরু হইলো এই প্রথমবারের মতো আসল বেহেস্ত ভ্রমন। জেনুইন সঙ্গী পাইছি এইবার। হোকনা সে একটা বিড়াল, তবু অতি পছন্দের কেউ এই ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নাই।

লাফাইতে লাফাইতে আমরা আগাইতে থাকলাম, এক পর্যায়ে উড়াল দিলাম। উপরে উইঠা নীচের বেহেস্ত দেখার খায়েশ জাগলো। সবকিছুই এতো বড় যে উপ্রে উইঠাও কিছু বোঝা গেলনা। সবই এক জিনিস। কোন বৈচিত্র নাই। একটা তাবুর উপর দিয়াই গেলাম মাসখানেক ধইরা, শেষই হয়না। উপর থাইকা নীচে তাকাইলে কেবল তাবুর ছাদ দেখা যায়, বেহেস্ত আর কি দেখমু। ভাবলাম মাটিতে নাইমা হাটাই ভালো। ধরলাম আবার হাটা। মনে মনে বললাম, আমাদের তাবুর ভিতরে ঢুকাইয়া দাও। ঢুইকাও গেলাম ভিতরে। সে বিশাল অবস্থা। আসলে বলা উচিত বিশাল ফাকা অবস্থা। যেইদিকে তাকাই ফাকা ময়দান, আবছা আলোয় কেবল উপরের ছাদটা দেখা যায়। এতো বড় তাবু দিয়া করবো কি??? ভাবলাম ফাকা জায়গায় যাই। কোন গাছের তলায় বইসা আবার বাংলা ফাইভ খাই। কুমুরে ঘাড়ের উপর তুইলা বললাম,

– “চল, যাওয়া যাক কোন সুবিশাল বৃক্ষতলে, এই ধুধু ময়দানের মতো তাম্বুতে দেখার কিছু নাই।“

হাজির হইলাম বৃক্ষতলে। এইখানেও সেই একই কাহিনী, মাথার উপর চাইয়া দেখি উধাও আকাশ। যতদুর চোখ যায় কেবল গাছের শাখা প্রশাখা, ডাল পাতা; এলাহী কাজকারবার। চীফরে জিগাইলাম, – “এই গাছের শেষ কই?”

চীফ উত্তর দিলো, – “একটি দুরন্ত গতির আরবীয় ঘোড়ায় করে রওনা দিলে মাসখানেক চলার পর ডালপালার পরিধি শেষ হবে। দেখতে পাবেন মুক্ত আকাশ!! আবার আপনি বললে এই গাছটাকে কাস্টমাইজ কইরা দিতে পারি। মাথার উপরে তাকাইলে যেইখানে যেইখানে আকাশ দেখতে চান সেইখানে সেইখানে ফুটা কইরা দেয়া কোন ব্যাপারই না। দেহতে পারবেন মনের মাধুরী মেশানো হাই ডেফিনিশন আকাশ! করবো ফুটা??“

আমি বললাম,- “কস্কি চীফ??!! একটা গাছের তলায় বসমু, তাতেও আগে ভাইবা নিতে হবে গাছটা কেমন হবে? এইসব অসাধারন জিনিসপত্র না দিয়া একটা সাধারন জিনিস দেয়া যাইতোনা??”

চীফ জবাব দিলো,- “স্যার। এইসব আপনাদের মন মতই ডিজাইন করা হইছে। জীবনে আপনাদের দরকার ছিলো দশ তোলা সোনা, আপনারা চাইছেন টন টন সোনা, তাও মন ভরেনাই। একটা ছিমছাপ কক্ষেই থাকতে পারতেন, আরাম একই থাকতো। কিন্তু আপনারা চাইছেন বিশাল প্রাসাদ, গগনভেদী অট্টালিকা। এইখানে সেইটারেই আরো বেশি করে দেয়া হইতেছে। আপনাদের আনন্দ আরো বেশি হওয়া উচিত।“আমার মনে পইরা গেলো দুনিয়ার কোন এক বাঙ্গালী গায়কের কোন এক অখ্যাত গান,

“কি ভাবার কথা কি ভাবছি? কি দেখার কথা কি দেখছি???”

খুবই সত্যি মনে হইলো এই দুইটা লাইন। কেবল এর ইমিডিয়েট পরের লাইনটা মনে আনলামনা মুল ভাবনা হারাইয়া যাইতে পারে বইলা। উনিও যদি এই মুহুর্তে বেহেস্তে থাকেন তাইলে এই লাইন দুইটার পরে লিখতে চাইবেন,

“জন্ম মৃত্যু পার হইয়া আমি মাইঙ্কা চিপায় পরছি।“

আমি নিশ্চিত। পুরাপুরি নিশ্চিত!!

যাইহোক, এরপর বৃক্ষতলে বসিয়া বাংলা ফাইভ টানার চিন্তাও দিলাম বাদ। ভাবলাম আর কি করা যায়। চীফরে বললাম,- “আমাদের প্রাসাদে নিয়া যাও কোনো। সেইরকম প্রাসাদ, যা দেইখা চক্ষু জুড়াইয়া যাবে। ঘুম দিতে চাই, শতবর্ষ ব্যাপী শান্তির ঘুম। সকালের আলস আরাম আরাম ঘুম। যেই ঘুমের মায়া ত্যাগ কইরা জাগতে ইচ্ছা হয়না। বলতে দেরী কেবল, চীফ নিয়া হাজির করলো বিশাল এক প্রাসাদে। এরও উপরের ছাদ খুইজা পাইনা, এত্ত বিশাল!! স্টেডিয়ামের চেয়েও বড় রুম, ফাকা ফাকা লাগে। ফার্নিচার দেখতেছিনা কোন। ফ্লোর হীরা দিয়া বানাইছে নাকি কে জানে। নীচের দিকে তাকাইতে ভয় লাগে!! কুমুরে মনে মনে কইলাম,- “দেখছিস অবস্থ্যা?? এ কই আইনা ফালাইলো আবার? আয়, ঘুম দেই। সেই ছোটবেলার মতো বুকের উপর উইঠা গুটিসুটি মাইরা আরামছে ঘুম দিস।“

কুমুও “মিয়াও মিয়াও” কইরা সম্মতি জানাইলো। আবার সেই নরম বিছানায় উঠলাম, তবে এইবার আর ভুল হইলোনা। নরম বিছানায় শুইলে আমার ঘুম হইতোনা। চীফরে মনে মনে বুঝাইয়া দিলাম যে আমি নরম বিছানার বদলে শক্ত তক্তা টাইপের বিছানায় শুইতে চাই মানসিক শান্তির কারনে। তারই ব্যবস্থা হইলো চোখের পলকে আর কুমুর নরম বিছানা হইলাম আমি। প্রিয় কারো সাথে থাকার চেয়ে শান্তি আর কিছুতে নাই। আর এখন তো কুমুর মনের কথাও বুঝতে পারি, যদিও ভাসা ভাসা। হাজার হইলেও মানুষ আর অন্য প্রানীর চিন্তা তো এক হয়না।

শুইয়া শুইয়া কুমুর সাথে ভাব বিনিময় হইতে থাকলো। আমি কুমুরে কইলাম, – “কুমুরে, তুই হইলি এই একাকী বেহেস্তে আমার একমাত্র আসল সঙ্গী। তুই এখন থাইকা আমার লগেই থাকিস। পারলে রিকোয়েস্ট কইরা তোরে মানুষ বানাইয়া নেয়া যায় নাকি তাও ভাবা যায়। আহলাদী বিলাই থাইকা হইয়া যাইতে পারিস সুন্দরী তরুণী!! একটা পোলা আর মাইয়া বলে কখনো দোস্ত হয়না। আমরা এইটা ভুল প্রমান কইরা দিতে পারি। যদিও ফাঁকিবাজি হএ ব্যাপারটা। আমিতো জানি তুই আসলে বিলাই। আর বিলাই মাইয়াই হোক আর হুরই হোক, বিলাইয়ের লগে কি ওইসব সম্ভব??”

কুমু আপত্তি জানাইলো, কইলো,- “তীব্র আপত্তি জানাই এই চিন্তার। আমি মানুষ হইলে আমারে খাইতে বলবা রান্না করা খাওন। কাচা ইন্দুর খাইতে দেখলে করবা ওয়াক ওয়াক। ইন্দুর সুতায় বাইন্ধা খেলাধুলা করতে নিলে বলবা এইসব কি করস। আমারে বিড়ালই থাকতে দাও। বরং তোমার ইচ্ছা হইলে বিড়াল হও। এই প্রার্থনাও তো তুমি করছিলা।“

আমি ভাইবা দেখলাম বিড়াল জীবন আসলে আমারে দিয়া সম্ভব না। পশুর মানসিকতা মানুষের মধ্যে আনা সম্ভব না, মানুষের ভালোলাগা মন্দলাগাও বিড়ালের ভেতরে ঢুকানো সম্ভব না। তাইলে মানুষ বিড়াল গরু ছাগল সব একই হইতো। আমাদের আলাদা আলাদা রুপেই সম্প্রীতিপূর্ন সহাবস্থান দরকার।

আমি এইসব ভাইবা বললাম,- “ঠিকই বলছিস রে কুমু। এমনি এমনিই থাক তাইলে।“

এরপর অনেক গল্প হইলো মনে মনে। গল্পের শেষে জম্পেস ঘুম, আবার শতবর্ষব্যাপী ঘুম! ঘুম ভাংতেই পাশে হাতড়াইয়া আমার ফোনটা খুজলাম। দুনিয়ায় থাকতে আমার অভ্যাস ছিলো ঘুম থাইকা উইঠাই ফোনকল ডিউটি দেয়া। সময়মত একজনরে কল না দিলে সংসার ভাঙ্গার উপক্রম হইতো, যদিও সেই কাল্পনিক সংসার কখনো শুরু করাই হয়নাই। ফোন না পাইয়া বেশ অনেকটা সময় ভ্যাবাচ্যাকা খাইয়া পইরা থাকলাম। ভাবতে থাকলাম আমি আসলে কোথায়?

চীফ আলতো স্বরে জানান দিলো,- “বেহেস্তে স্যার, ইন হেভেন!!”

আমার সব মনে পরলো আবার। মন খারাপ হইলো, ভীষন হইলো। মৃত্যু আমারে বেহেস্ত দিছে, কিন্তু কই গ্যালো আমার প্রিয় সেই মুখ? কই গেলো অধিকার আর মায়া মাখা সেই ভয়??

আমার মনে পরলো তার কথা। যারে একদিন এমনি এমনি বলছিলাম, বেহেস্তে যদি সে না থাকে সেই বেহেস্তও আমার বেহেস্তত মনে হবেনা। এখন ভাবতেছি, হালকা চাপাবাজি মার্কা খুশী করার জন্য বলা সেই তুচ্ছ কথাটা এতো সত্যি সত্যি মনে হওয়ার কি দরকার ছিলো? এক মহাশুন্য ভর্তি হাহাকার অনুভব করলাম, বইলা বোঝান যাবেনা কী ভয়াবহ সেই অপূর্নতা এই বেহেস্তের ভেতরে থাইকাও…

আমি চীফরে বললাম,- “আমি তারে দেখতে চাই, এখনি চাই!!“

চীফ জবাব দিলো,- “স্যরি স্যার। আপনার এই ইচ্ছা পূরন করা আপাতত সম্ভব না!!”

(চলবে… )

##
মুক্তগদ্যের অংশ ধারকৃত এবং পরিবর্তিত

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

72 − = 70