পাগলাকুকুর এবং যুবতীদের ভবিষ্যৎ (জীবনের গল্প)

পাগলাকুকুর এবং যুবতীদের ভবিষ্যৎ (জীবনের গল্প)
সাইয়িদ রফিকুল হক

আতিয়ার-সাহেব অফিস থেকে বাসায় ফিরে হাত-মুখ ধুয়ে সারাসন্ধ্যা বারান্দায় বসে রইলেন। তার কিছু ভালো লাগছে না। আর বুঝা যায়, আজ তার মনটা খুব খারাপ। তাই, তিনি চুপচাপ বাসার সামনের বারান্দায় বসে আছেন। তার মন খারাপ হলে তিনি এই কাজটি করেন। আর একনাগাড়ে দীর্ঘক্ষণ আপনমনে বারান্দায় বসে থাকেন। তার বাসার লোকেরাও এটা জানে। সেইজন্য তারা এই সময়টা তার কাছে বেশি আসে না। তাকে একটুখানি নিরিবিলি থাকতে দেয়। তবে ফারহানা এসব মানে না। সে বাসায় থাকলে যখন-তখন তার বাবার কাছে চলে আসতে পারে। আতিয়ার-সাহেবও মেয়েকে কখনও কিছু বলেন না। ফারহানার প্রতি তার অসম্ভব একটা টান রয়েছে।

তিনি খুব মন খারাপ করে সেই বিকাল থেকে বারান্দায় বসে রয়েছেন। অবশ্য একফাঁকে তিনি একটুখানি সময়ের জন্য উঠে ভিতরে ঢুকে মাগরিবের নামাজ পড়ে এসেছেন। আর-একবার শুধু কাজের মেয়েটিকে জিজ্ঞাসা করেছেন, ফারহানা ফিরেছে কিনা? ফেরেনি, শুনে তার মনটা আরও খারাপ হয়েছে। সন্ধ্যা হয়ে এলো। তবুও মেয়েটি এখনও বাসায় ফিরলো না! একটা অজানা আশংকা তার মনে বাসা বাঁধতে থাকে। আসলে, মেয়েটি বাসায় না ফেরা পর্যন্ত তিনি শান্তি ও স্বস্তি পান না। প্রায় প্রতিদিন তার এরকমটা হচ্ছে। মেয়েটি বাসায় ফিরতে একটুখানি বিলম্ব করলে তিনি অমনি চিন্তায় পড়ে যান। তাছাড়া, দিনকাল এখন ভালো যাচ্ছে না।

ফারহানা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। এটি ঢাকা-শহরের নীলক্ষেতের পাশে। এই বিশ্ববিদ্যালয়টি সবাই চেনে। এটি দেশের নামকরা একটি বিশ্ববিদ্যালয়। এজন্য আতিয়ার-সাহেবের মনে বিরাট আনন্দ। তার দুটি মেয়ে আর একটি ছেলে। আর ছেলেটি সবার ছোট। সে সবেমাত্র ক্লাস এইটে পড়ে। আর তার মেজো মেয়েটি সিটি আদর্শ কলেজে পড়ে। সামনে সে এইচএসসি পরীক্ষা দেবে। ছেলে-মেয়েদের পড়ালেখা নিয়ে তাকে কখনও দুশ্চিন্তা করতে হয় না। তার ছেলে-মেয়েরা নিজে থেকেই পড়ালেখা করে। আর এই বিষয়টি দেখার দায়িত্ব তার স্ত্রী জাহানারা বেগমের।

আতিয়ার-সাহেব তার বড় মেয়েটির কথা ভাবতে থাকেন। মেয়েটি বাসায় না আসা পর্যন্ত পুরা বাসাটা একদম খালি-খালি মনে হয়। বড় লক্ষ্মীমেয়ে ফারহানা। তার কাছে সবসময় তা-ই মনে হয়। আর তার চোখে মেয়েটি অসম্ভব গুণবতী। এমন সুন্দর একটি গুণবতী-মেয়ে যেন ভুল করে এই সমাজে এসে পড়েছে। তার মনে খুব মায়া-দয়া। আতিয়ার-সাহেব সবসময় ভাবেন: এতো মায়া সে পেলো কীভাবে?
এরই মধ্যে কাজের মেয়েটি আরেকবার বারান্দার কাছে এসে বললো, “খালুজী, আপনারে চা দেবো? খালাম্মা আপনারে এখন চা খাইতে কইছেন।”
আতিয়ার-সাহেব কিছুক্ষণ কোনো কথা না বলে মেয়েটির মুখের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। আর ভাবলেন: এই মেয়েটি তার মেজো মেয়েটির প্রায় সমবয়সী। অথচ, ওর কোনো পড়ালেখা হলো না। এটি কেমন হলো! আর তিনি আরেকটি বিষয় নিয়ে ভাবলেন: মেয়েটি দেখতে ভালো। শ্যামলাবরণের একটা সুন্দরী মেয়েই তাকে বলা যায়। কিন্তু এই মেয়েটির জীবনের নিরাপত্তা কোথায়? গ্রামে-শহরে সবজায়গায় মেয়েরা এখন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। কে দেবে তাদের একটুখানি নিরাপত্তা? আর এখন কোনো মেয়ে যদি সুন্দরী-যুবতী হয়, তাহলে তো আর রক্ষা নাই। এই সমাজে কে দিবে তার নিরাপত্তা? কত শকুন, কত হায়েনা আর কত পাগলাকুকুর তাকে কামড়ানোর জন্য পিছু নিবে। তাছাড়া, সমাজে এখন যে-ভাবে পাগলাকুকুরের সংখ্যা বাড়ছে! আর এসব ভাবতে-ভাবতে একরকম আঁতকে উঠলেন আতিয়ার-সাহেব। আর তার কেবলই মনে হতে লাগলো: এখানে, যুবতী-সুন্দরীদের নিরাপত্তা কোথায়? এবং তাদের ভবিষ্যৎই বা কী?
অনেককথা ভাবতে-ভাবতে আতিয়ার-সাহেব দিশেহারা হয়ে পড়েন। সমাজে এখন মেয়েদের নিরাপত্তা নাই। অথচ, তার ঘরে দুটি মেয়ে রয়েছে। আর দুজনেই যুবতী! এদের নিরাপত্তা তিনি কীভাবে দিবেন? আর এখন ঘর থেকে বের হলেই যেন একটি মেয়ের জন্য আপদবিপদ অপেক্ষা করছে!

আতিয়ার-সাহেব কিছুক্ষণ ওর দিকে তাকিয়েছিলেন বলে ওর কিছুটা লজ্জা করছিলো। কিন্তু আতিয়ার-সাহেবের চোখের দৃষ্টিতে পিতৃস্নেহ ছাড়া আর-কিছু নাই। সেটা এই মেয়েটিও জানে। তবুও একটু লজ্জা-লজ্জা লাগে। হাজার হলেও সে মেয়ে তো!
মেয়েটি ভাবছিলো: আতিয়ার-সাহেব বুঝি ওর কথা শুনতে পাননি। তাই, সে আরেকটু কাছে এগিয়ে এসে বললো, “খালুজী, খাল্লাম্মা আপনাকে চা খাইতে কইছেন। এখন খাবেন?”
এবার আতিয়ার-সাহেব যেন সম্বিৎ ফিরে পেয়ে বললেন, “নারে, এখন চা পান করবো না?”
তারপর তিনি একটু হেসে বললেন, “তোকে না কতবার বলেছি চা খাওয়ার কথা বলবি না। চা শুধু পান করতে হয়।”
শুনে মেয়েটি হেসে ফেললো। আর বললো, “মনে থাকে না খালুজী।”
এরই মধ্যে ফারহানার গলার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। আতিয়ার-সাহেব এবার সচকিত হলেন। আর তিনি কিছু বলার আগেই কাজের মেয়েটি বললো, “খালুজী, বড়আপা আইছেন।”
আতিয়ার-সাহেব এবার খুব স্বস্তির সঙ্গে একটা নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, “আচ্ছা।”
এইমাত্র আতিয়ার-সাহেব একটা ভয়ানক মানসিক-দুশ্চিন্তা থেকে রেহাই পেলেন। আর একটা দিনের জন্য হলেও মেয়েটি তার বিপদমুক্ত। এখন মানুষকে প্রতিদিন বিপদমুক্ত থাকার কথা ভাবতে হয়। আর একদিন একটুখানি ঊনিশ-বিশ হলে জীবনটা হঠাৎ পাল্টে যেতে পারে।

কয়েক মিনিট পরে ফারহানা বারান্দায় এসে বাবার পাশে বসে মধুরস্বরে বললো, “আজ আবার কী হয়েছে বাবা? তুমি এখনও চা পান করোনি! কী হয়েছে তোমার? আমাকে একটু খুলে বলো তো।”
আতিয়ার-সাহেব এবার খুব মন খারাপ করে বললেন, “আমার মনটা আজ খুব খারাপ মা। আর সেই সকাল থেকে খারাপ হয়ে আছে। মনটি সহজে ভালো হচ্ছে না। চারপাশের সামাজিক-বিশৃঙ্খলা আমাদের ভালো থাকতে দিচ্ছে না।”
ফারহানা সমব্যথাপ্রকাশ করার ভঙ্গিতে বললো, “কিন্তু কেন বাবা? কারণটি বলো তো?”
আতিয়ার-সাহেব এবার একটু নড়েচড়ে বসে বললেন, “আজ দৈনিক পত্রিকা পড়ে দেখলাম: দেশের বিভিন্নস্থানে চার-চারটি মেয়ে ধর্ষিত হয়েছে! আর তা-ও এই ঢাকা-শহরের আশেপাশে! প্রতিদিন এভাবে ধর্ষণের খবর শুনে একটুও ভালো লাগে না মা আমার। মা-গো, সেই থেকে আমার মনটা হঠাৎ খারাপ হয়ে গেল। এর মধ্যে দুইটি মেয়ে কলেজে পড়তো। আর দুটি মেয়ে একেবারে শিশু! বড় মেয়ে দুটিকে ধর্ষণের পর পাষণ্ডরা তাদের গলা কেটে হত্যা করেছে! কী পৈশাচিক আর কী বীভৎস ঘটনা বলতে পারিস মা? আমি এসব একদম সহ্য করতে পারি না।”
ফারহানা সব শুনে বললো, “থাক বাবা, মন খারাপ করে আর কী করবে? আমরা এখন একটা মন্দ-সময় পার করছি। এখানে, মানুষের জীবনের মূল্য কমে গেছে। আর বেড়ে গেছে পশুদের শক্তিপ্রদর্শনের খেলা।”
আতিয়ার-সাহেব তবুও মনভার করে বলতে লাগলেন: আমি ভেবে দেখলাম, শহরে-গ্রামে সর্বত্র পাগলাকুকুরের সংখ্যা বেড়ে গেছে। এ্ররা ভিন্নজাতের কুকুর। এরা মানুষের মতো দেখতে। আর এদের বেশ-ভূষাও মানুষের মতো। কিন্তু এরা কখনও মানুষ নয়। এরা সমাজের পাগলাকুকুর। আর এই পাগলাকুকুরগুলোকে নিধন করার দায়িত্ব কিন্তু রাষ্ট্রের। কিন্তু আমাদের রাষ্ট্র সেই কাজটি তো করছে না। আমি ভেবে পাই না, পাগলাকুকুরগুলোকে বাঁচিয়ে রেখে রাষ্ট্রের কী লাভ? কতকগুলো বিপথগামী নষ্টমানুষের জারজপুত্ররা এখন আমাদের সমাজ-রাষ্ট্রকে কলুষিত করছে। কিন্তু রাষ্ট্র এদের নির্মূল করার জন্য আজ পর্যন্ত তেমন-কিছু করে নাই। তাই, আমার মনে বড় ভয়।”
ফারহানা বাবার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে বললো, “বাবা, তুমি এই সমাজবিরোধী-পাগলাকুকুরগুলোকে নিধন করার কথা বলছিলে না? ওদের কিন্তু নির্মূল করা সহজ। কিন্তু আমাদের দেশের একটি শ্রেণী এদের লালনপালন করতে ব্যস্ত। আর এই সুযোগে আশ্রয়প্রশ্রয় পেয়ে কুকুরগুলো নিরীহ-মেয়েদের উপরে শক্তিপ্রদর্শন করছে। এর জন্য সমাজের একটি দূষিত রাজনৈতিক শক্তি জড়িত। এরা সমাজ-রাষ্ট্রের এই পাগলাকুকুরগুলো খাইয়ে-পরিয়ে বাঁচিয়ে রাখছে নিজেদের স্বার্থে। এই দুর্বৃত্তদের হাত থেকে জাতি রেহাই না পেলে মানবজাতির কোনো মুক্তি নাই।”
আতিয়ার-সাহেব আরও কিছু বলতে চাচ্ছিলেন, এমন সময় তাকে বাধা দিয়ে ফারহানা বললো, “তুমি একটু বসো বাবা, আগে আমি চা নিয়ে আসি।”
ফারহানা ভিতরে যেতেই আতিয়ার-সাহেব ভাবতে লাগলেন: আগে পৌরসভা-সিটি-কর্পোরেশনের উদ্যোগে শহর-এলাকায় ইনজেকশন দিয়ে পাগলাকুকুর মেরে ফেলা হতো। আর তখন রাস্তাঘাটে ছেলে-মেয়েরা স্কুল-কলেজে যেতে আর কোনো বিপদে পড়তো না। কিন্তু এখন আর এই কাজটি করা হয় না। এখন দেশের একশ্রেণীর কুকুরপ্রেমিক-এনজিওরা পাগলাকুকুর নিধনে বাধা দিচ্ছে! আর তারা কিছুতেই পাগলাকুকুর মারতে দিবে না। এতে নাকি পরিবেশ বিপন্ন হবে। ওদের ধারণা: পাগলাকুকুরে পরিবেশ রক্ষা করবে? এদিকে মানুষ বিপন্ন হয়ে যাচ্ছে সেদিকে ওদের কোনো খেয়াল নাই। ওরা ব্যস্ত আছে কুকুর নিয়ে! ঠিক একইভাবে এই সমাজে ধর্ষক-লম্পট-নারীলোভী শূয়রগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য একটি শ্রেণী সবসময় তৎপর। এরা নষ্ট-মানসিকতার অধিকারী রাজনৈতিক দুর্বৃত্ত। এদের শায়েস্তা করার জন্য দেশে একজন মহামানবের আবির্ভাব প্রয়োজন।
ফারহানা ছোট্ট টেবিলটার উপরে চায়ের কাপটা নামিয়ে রেখে বললো, “আগে চা-টা পান করে নাও বাবা। এদিকে সেই বিকাল থেকে তুমি তো এখনও পর্যন্ত কিছু খাওনি।”
আতিয়ার-সাহেব চায়ের কাপটা হাতে তুলে হালকা একটা চুমুক দিয়ে বললেন, “মাগো, আমি এতোক্ষণ কী ভাবছিলাম জানিস?”
ফারহানা চা-পান করতে-করতে একটু হেসে বললো, “তুমি না বললে জানবো কেমন করে? আমি তো জ্যোতিষী না বাবা!”
দীর্ঘসময় পরে আতিয়ার-সাহেব এবার একটু হাসলেন। তার মনটা এখন আস্তে-আস্তে স্বাভাবিক হচ্ছে। তিনি চায়ের কাপটা টেবিলে রেখে বললেন, “ভাবছিলাম: আগে সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগে শহরের পাগলাকুকুরগুলোকে বিষাক্ত ইনজেকশন দিয়ে হত্যা করা হতো। এখন সেটি এনজিওদের ষড়যন্ত্রে বন্ধ হয়ে গেছে। এই পাগলাকুকুর নিধনের মতো সমাজ-রাষ্ট্র থেকে লম্পট-ধর্ষকগুলোকে ইনজেকশন প্রয়োগ করে রাষ্ট্র এদের কেন নির্মূল করে না? এদের এখন নির্বিচারে কুকুর-মারা ইনজেকশন প্রয়োগ করে মেরে ফেলা উচিত। আর তা-না-হলে এই সমাজে কোনো তরুণী, যুবতী, সুন্দরী আর মানসম্মান নিয়ে বাঁচতে পারবে না।”
ফারহানা হেসে বললো, “বাবা, বলছিলাম কি রাষ্ট্রের একটি প্রভাবশালী অংশ সমাজবিরোধী পাগলাকুকুরদের লালনপালন করে আসছে। এদের স্বার্থে এরা পাগলাকুকুরগুলোকে সবসময় প্রতিপালন করছে। এরা তোমার-আমার কথা শুনবে না বাবা। তাই, এদের কাছে তোমার এই মহৎ-আশা করাটাও ঠিক নয়।”
আতিয়ার-সাহেব মেয়ের কথায় দমে গেলেন না। তিনি একটু ভেবেচিন্তে বললেন, “কিন্তু আমি ভাবছি: আমাদের জেগে উঠতে হবে, আর আমাদের এক্ষেত্রে বারুদের মতো জ্বলে উঠতে হবে—এই সামাজিক-কালব্যাধি ধর্ষণের বিরুদ্ধে। আর এজন্য আমাদের এখনই সংগঠিত হতে হবে। আর আমাদের আজ-এক্ষুনি ধর্ষণবিরোধী একটি শক্তিশালী সংগঠন গড়ে তুলতে হবে।”
ফারহানা সব শুনে বললো, “বাবা, তুমি পারবে কিনা আমি জানি না। কারণ, আমাদের সমাজে এখন মানুষ কমে যাচ্ছে। আর এখন মানুষ একজনের বিপদকে একজনেরই মনে করছে। তবে আশার কথা হলো: এখন কিছুসংখ্যক মানুষ জেগে উঠেছে। আর তোমার সঙ্গে আমিও আছি বাবা।”
আতিয়ার-সাহেব পরম মমতায় মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, “তবুও তো কিছু-একটা আশা করতে হবে মা। নইলে তো আমাদের সমাজটা বদলাবে না। আর এই সমাজটা একটুখানি না বদলালে মেয়েরা কীভাবে বাঁচবে। মানুষের নিরাপত্তার স্বার্থে এই পাগলাকুকুরগুলোকে নিধন করতেই হবে। আর এটা করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের এবং রাষ্ট্রের সেবক: গণতান্ত্রিক সরকারের।”
ফারহানা বললো, “তা ঠিক বাবা।”
তারপর সে প্রসঙ্গটা একটু ঘুরিয়ে বললো, “তুমি বলছিলে, ভিকটিম দুটি মেয়ে নাকি কলেজে পড়তো। কী আশ্চর্য বাবা! আজকাল শিক্ষিত-মেয়েদেরও জীবনের কোনো নিরাপত্তা নাই।”
ফারহানার কথাটা শেষ হতে-না-হতেই আতিয়ার-সাহেব বললেন, “সেইজন্যই তো আমি সবসময় তোদের নিয়ে একটা দুশ্চিন্তায় থাকি মা। আর আমার দুটি রাজকন্যাসম মায়ের চিন্তায় আমার প্রায় রাতে ঘুম আসে না।”
“তুমি এসব আর ভাববে না-তো বাবা। আর আমাদের ভাগ্যে যা আছে তা-ই হবে। তুমি এসব ভেবে-ভেবে নিজের শরীরের ক্ষতি করবে কেন?”—ফারহানা কথাটা বলে ওর বাবার মুখের দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে থাকে।
ওরা দুজনে আরও কিছুক্ষণ নিজেদের মতো করে বারান্দায় চুপচাপ বসে রইলো। তারপর একসময় আতিয়ার-সাহেব মেয়ের দিকে চেয়ে খুব নরমসুরে বললেন, “মাগো, একটা কথা তোর কাছে জানতে চাই। আর তুই সাফ-সাফ জবাব দিবি কিন্তু?”
ফারহানা খুব স্বাভাবিকভাবে বললো, “বলো বাবা। আমি জবাব দেবো।”
আতিয়ার-সাহেব এবার কোনো ভনিতা না করে সরাসরি বললেন, “তোর পিছনে কোনো পাগলাকুকুর লাগেনি তো মা?”
ফারহানা এবার একটু হেসে ফেললো আর বললো, “না বাবা, আমার জানামতে: এখনও পর্যন্ত কাউকে দেখিনি। আরও একটা কথা শুনে রাখো: তোমার ছোট মেয়েটিও এখনও পর্যন্ত নিরাপদেই আছে। তাই, তুমি নিশ্চিন্ত থাকতে পারো।”
এবার আতিয়ার-সাহেব সত্যি-সত্যি একেবারে স্বাভাবিক হয়ে গেলেন। আর বললেন, “আমি এখন নিশ্চিন্ত হলাম মা। আর এইমাত্র তুই আমাকে নিশ্চিন্ত করলি মা।”

পরদিন অফিসে গিয়ে আতিয়ার-সাহেব তার অফিসের কয়েকজন কলিগের সঙ্গে ধর্ষণবিষয়ে আলোচনা করলেন। লাঞ্চের পরে তিনি একফাঁকে তার ঘনিষ্ঠজনদের সঙ্গে এই বিষয়টা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করলেন। আর তিনি লক্ষ্য করলেন, কিছুসংখ্যক মানুষ এখন যথেষ্ট সচেতন হয়েছে। আর ধর্ষণের বিরুদ্ধে তাদের ধারণাও ইতিবাচক। আলোচনা অনেকদূর গড়ালে তিনি সাহস করে সবার উদ্দেশ্যে বললেন, “ধর্ষণের বিরুদ্ধে আমাদের একটি সামাজিক-আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। এজন্য আগে আমাদের সংগঠিত হতে হবে। আর আমাদের দাবি করতে হবে: ধর্ষণের একমাত্র শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। আর এদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে হবে পাগলাকুকুর-মারার বিষাক্ত-ইনজেকশন দিয়ে। কারণ, সমাজে-রাষ্ট্রে যে-সব ধর্ষণকারী-লম্পট আছে, এরা স্রেফ পাগলাকুকুর। এদের জন্য আমাদের মিথ্যা-দরদ দেখিয়ে কোনো লাভ নাই। সময় এসেছে আমাদের এখন ঘুরে দাঁড়াবার। আর তাই, আমাদের কঠোরহস্তে এই পাগলাকুকুরদের দমন করতে হবে। সমাজে মানুষ দামি। আর মানুষের জন্যই এই পৃথিবী। এখানে, মানুষ রাজত্ব করবে। আর মানুষের এই পৃথিবীতে মানুষ পাগলাকুকুরের কামড়ে মারা যাবে তা হতে পারে না। এর একটা বিহিত আজ আমাদের করতেই হবে। এখন মানুষকে বাঁচাতে হবে। আর আমাদের এই সমাজ-রাষ্ট্রের প্রতিটি নারী আমাদের কারও-না-কারও মা-বোন। এদের জীবন ও সম্মান দুইই আজ আমাদের বাঁচাতে হবে। আর এজন্য চাই একটি ধর্ষণবিরোধী-সংগঠন।”
আতিয়ার-সাহেব যেন একটা ছোটোখাটো বক্তৃতা দিয়ে ফেললেন। তার কিছুসংখ্যক সহকর্মীরা তার কথা শুনে মুগ্ধ হয়েছেন। তারা সঙ্গে-সঙ্গে তাদের ধর্ষণবিরোধী মনোভাব ব্যক্ত করলেন। এমন সময় এই অফিসের একজন কেরানী এগিয়ে এলো তাদের আলোচনায় যোগ দিতে। শ্মশ্রুমণ্ডিত এই কেরানী তাবলীগজামাতের লোক। সে সবার কাছে এসেই ফস করে বলে বসলো, “দেশে ধর্ষণ বাড়বে না-তো কী হবে? দেশে মেয়েছেলে যে-ভাবে বেপর্দা হইতাছে! তাতে আল্লাহর আরও গজব বাড়বে।”
লোকটার কথা শুনে মনে হলো: দেশে গজব বাড়লে সে যেনো খুব খুশি হবে। আর তার মুখ থেকে নিঃসৃত কথাগুলো কারও ভালো লাগেনি।
আতিয়ার-সাহেব ভিতরে-ভিতরে খুব রেগে গিয়েছেন। কিন্তু তিনি বাইরে তা প্রকাশ না করে শুধু লোকটার মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, “দেশে আমি কাউকে বেপর্দা দেখি না। আমাদের দেশের মেয়েরা স্বাভাবিক পোশাকআশাক পরছে। আর একাত্তর সালে তো আমাদের দেশের মেয়েরা ঘরের ভিতরে থাকতো! তবুও তো তাদের জোরপূর্বক ধর্ষণ করতো পাকিস্তানী-হানাদারবাহিনী, আর এদেশীয় কুলাঙ্গার রাজাকার, আলবদর, আলশামস ও শান্তিকমিটি’র সদস্যরা। তাদের কী অপরাধ ছিল? আসলে ভাই, এটা হলো আমাদের মানসিকতা। আপনার কথায় বুঝতে পারলাম: আপনি ধর্ষকের সমর্থক। আর আপনি নিজে কোনো কারণে হয়তো এখন কাউকে ধর্ষণ করতে পারছেন বলে কারও দ্বারা ধর্ষণের খবর শুনে আনন্দ অনুভব করছেন।”
লোকটা তখন আমতা-আমতা করে বললো, “না, মানে, আমি বলতে চাচ্ছিলাম…।”
সবাই তাকে বাধা দিয়ে থামিয়ে দিলো। সে রাগে একদিকে চলে গেল। এই লোকটার কাছে ধর্ম একটা বাহ্যিক বিষয়। তাই, সে লম্বা দাড়ি ও লম্বা জোব্বা ধারণ করেছে। সে প্রতিমাসে দুইনাম্বারি করে ছুটি ভোগ করে তাবলীগের সাপ্তাহিক চিল্লায় যায়। এতে তার মনে কখনও পাপবোধ জাগ্রত হয় না। আর একবারও তার বিবেক দংশিত হয় না যে, সে দেশের কাজে ফাঁকি দিয়ে দেশের কত ক্ষতি করছে। এই বিবেকহীন লোকগুলো এখন ধর্ম বলতে বোঝে শুধু বাহ্যিক আড়ম্বরপূর্ণ জীবনব্যবস্থাকে। আর এরা সারাজীবন শুধু একটা ভণ্ড হতেই ভালোবাসে।

অফিস-ছুটির আগে আতিয়ার-সাহেবের বস তাকে তার রুমে ডেকে নিলেন। এতে আতিয়ার-সাহেব কখনও বিচলিত হন না। আজও তিনি সামান্যতম বিচলিত হলেন না। কারণ, তার জানা আছে, তিনি মন দিয়ে সময়মতো অফিসের কাজকর্ম সম্পন্ন করে থাকেন।

তিনি বসের রুমে ঢুকে কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইলেন। আর দেখলেন, বস এখন মোবাইলফোনে ব্যস্ত। তিনি বসে-বসে বসের তামাশা দেখতে লাগলেন।
আরও কিছুক্ষণ পরে তার বস ফোনটা রেখে বললো, “আপনাকে ডেকেছি একটা বিষয়ে আলাপ করার জন্য। যদিও বিষয়টা কোনো অফিসিয়াল কোনোকিছু নয়। একান্তই ব্যক্তিগত। আর তবুও তা এখন অফিসের বিষয়। তাই, আমাকে বলতে হচ্ছে। একটু আগে আমাদের কেরানী ইমরান সাহেবের মুখে শুনলাম: আপনি নাকি কী-এক ধর্ষণবিরোধী জনমতগঠন করার জন্য একটা সংগঠন গড়ে তুলতে চাচ্ছেন? আর আপনি নাকি ইমরান সাহেবকে অপমান করেছেন?”
আতিয়ার-সাহেব তার বসের কথা শুনে বুঝতে পারলেন: লোকটা সরাসরি ধর্ষণের পক্ষে। আর এযাবৎ সে অফিসের কয়েকজন কলিগের সঙ্গে আপত্তিকর সম্পর্ক গড়ে তোলার পাশাপাশি অফিসের বাইরে হয়তো কাউকে ধর্ষণও করেছে। আর সে এ-বিষয়ে খুব অভিজ্ঞ। দেশের একটা পাকা ধর্ষকও হবে হয়তো সে! তাই, সে এভাবে তাচ্ছিল্য করে কথাটা বলতে পেরেছে। আরও বুঝলেন: এই অফিসের কেরানী-ইমরান একটা ধর্ষকবাদী-জানোয়ার। আর একাত্তরে তার বাপ-দাদা হয়তো বাঙালি-নারীদের ধর্ষণ করেছিলো। এখন পাপ ঢাকার জন্য ইমরানরা হাজী সেজেছে।

তিনি রাগান্বিত না হয়ে বললেন, “স্যার, আপনার কথা আংশিক সত্য। আর আমাদের অফিসের কেরানী-ইমরান সাহেব সংগঠন সম্পর্কে আপনার কাছে যা-বলেছে তা সম্পূর্ণ সত্য। প্রথমে আমরা জনমত গড়ে তুলবো, তারপর আস্তে-আস্তে একটা ধর্ষণবিরোধী বিশাল সংগঠন গড়ে তুলবো। কারণ, ধর্ষণকারীরা এই সমাজের জারজসন্তান। আর দুনিয়ার সব ধর্ষকই জারজ আর পাগলাকুকুর। এদের রাষ্ট্রীয়ভাবে মেরে ফেলার ব্যবস্থা করতে হবে। আর তা বিষাক্ত-ইনজেকশন দিয়ে। আর আমি কেরানী-ইমরান সাহেবকে তো অপমান করিনি! বরং সেই আমাদের সবার সঙ্গে…।”

হাততুলে বস তাকে থামিয়ে দিলো। এই সামান্য কয়টি কথা শুনেই তার মাথা ঘুরে গেছে। সে বুঝে গেছে, লোকজন জেগে উঠলে তাদের লাম্পট্যবিকাশের দিন শেষ। তাই, তারা এখন শংকিত।
তারপর একটু সময় নিয়ে তার বস আবার বলতে লাগলো, “আপনি সরকারি-চাকরি করে যদি এসব কথাপ্রচার করেন, আর ওইসব সংগঠন করার পাগলামি করেন, তাহলে, আমি তা উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাতে বাধ্য হবো। তখন কিন্তু আপনার চাকরি নিয়ে টানাটানি শুরু হয়ে যাবে। আর সরকারি-চাকরির বিধিবিধান আপনার জানা আছে কিনা আমি তা জানি না।”
আতিয়ার-সাহেব বুঝে গেছেন: তার ধর্ষণবিরোধীঅভিযানে প্রথম বাধা তার এই ধর্ষক-বস। কিন্তু এ-কে এভাবে ছেড়ে দেওয়া যাবে না। তিনি বসের হুমকিতে সামান্য বিচলিত না হয়ে একটু সময় নিয়ে বললেন, “স্যার, আপনি আমার বিরুদ্ধে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করবেন! আর আমি সরাসরি আপনার বিরুদ্ধে অভিযোগ করবো শাহবাগে গণজাগরণমঞ্চের কাছে। আর আমিও আইন জানি স্যার। আমি কোনো রাজনৈতিক দলগঠন করছি না। তাই, আমার দিক থেকে ধর্ষণবিরোধী-সংগঠন গড়ে তুলতে কোনো বাধা নাই।”
কথাগুলো শেষ হতেই আতিয়ার-সাহেবের মনে হলো: গণজাগরণমঞ্চের কথা বলতেই কেল্লা ফতে! লোকটা হয়তো এইমাত্র ভয়ে-আতংকে প্যান্টভরে প্রস্রাব করে ফেলেছে। কারণ, চারপাশে এখন তিনি প্রস্রাবের যেন একটু-একটু গন্ধ পাচ্ছেন!
তিনি আরও লক্ষ্য করলেন, তার বসের মুখটি এখন একেবারে অন্ধকারে ঢাকা, যেন আষাঢ়-মাসের কালিমাখা মেঘ। ফর্সামুখখানি একদম কালো হয়ে গিয়েছে। আর তার মুখে কোনা কথা নাই।

অফিসের সময় শেষ। আতিয়ার-সাহেব আর বসে না থেকে বসকে সালাম দিয়ে তার রুম থেকে বেরিয়ে এলেন। তার মুখে একটা বিরাটকিছু বিজয়ের হাসি। আর এই বিজয়মুহূর্তে তার আদরের কন্যা ফারহানার কথাটা খুব মনে হচ্ছে। বসের সঙ্গে তার আলাপের শেষমুহূর্তের কথা শুনলে সে হয়তো ভীষণ খুশি হবে।

সাইয়িদ রফিকুল হক
মিরপুর, ঢাকা, বাংলাদেশ।
০১/০৪/২০১৬

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 78 = 84