একটি বিশেষ শ্রেণি বললেই সেটা ইসলাম হয়ে যায় না, বরং আল্লাহর বাণী আর রসুলাল্লাহর (সা.) জীবনাদর্শই ইসলাম


স্বাধীনতার ৪৫ বছর চলছে। এই দীর্ঘ সময়েও আমাদের জাতীয় সংহতি গড়ে উঠতে পারে নি, যার জন্য বিশেষভাবে দায়ী ধর্মকে ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহারকারী একটি গোষ্ঠী। তারা একেক জন একেকভাবে ইসলামকে ব্যাখ্যা করছে।
তাদের একটি অংশ প্রিয় ধর্ম ইসলামের অপব্যাখ্যা করে বিভিন্ন ধরনের জাতিবিনাশী কর্মকাণ্ড করে যাচ্ছে। মানুষের ঈমানকে ভুল খাতে প্রবাহিত করে ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর স্বার্থ উদ্ধার করা, জঙ্গিবাদী কাজ, গুপ্তহত্যা, মানুষের ধর্মানুভূতিকে উত্তপ্ত করে বিভিন্ন ইস্যুতে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করা ইত্যাদি ইসলামের শিক্ষা নয়।

কিন্তু যারা এগুলো করছে তারা ইসলামের বরাত (Reference) ব্যবহার করেই তা করছে। ইসলাম সম্পর্কে সঠিক ধারণা, আকিদা (Concept) না থাকার কারণে সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষ বিশ্বাস করে যে এগুলো ধর্মরক্ষার কাজ, করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হবেন।এভাবেই ভয়ঙ্কর অন্যায় কাজকেও জায়েজ করে ধর্মবিশ্বাসী মানুষকে ভুল পথে পরিচালিত করা হয়। অনেকেই অনুধাবন করেন যে, এটা ইসলাম নয়, কিন্তু সেটা প্রকাশ করার সাহস পান না।

কারণ প্রথমত ধর্মীয় মতবাদকে ভ্রান্ত বলে আখ্যায়িত করার জন্য যথেষ্ট ধর্মীয় যুক্তি, দলিল, রেফারেন্স নেই, দ্বিতীয়ত যেই তাদের ভুল ধরবে তার বিরুদ্ধেই উগ্রপন্থীরা খড়গহস্ত হয়ে ওঠে সে ব্যক্তি হোক, বা রাষ্ট্রই হোক।অর্থাৎ সিদ্ধান্ত দাঁড়াচ্ছে এমন যে, স্বার্থান্বেষী ঐ শ্রেণিটি ইসলামের যে ব্যাখ্যা দেবে, যেটাকে ইসলামের কাজ বলবে, যেভাবে করতে বলবে সেটাই হবে ইসলাম, সেটাই সবাইকে মানতে হবে। কারণ তারা সংখ্যায় বেশি, মানুষের ঈমানী চেতনা তাদের হাতে বন্দী।

কোনো গবেষক, কোনো চিন্তাশীল মানুষ, আলেম, সুশীল সমাজ বা গণমাধ্যম যারাই তাদের ভুল ধরবে তাদেরকেই তারা নাস্তিক কাফের মুরতাদ আখ্যা দিয়ে তাণ্ডব শুরু করে দেবে। কোথায় কী শব্দটি ব্যবহার করলে, কী অপবাদ আরোপ করলে মানুষ উত্তেজিত হবে তারা তা ভালো করেই জানে।
মিথ্যা কথার ভিত্তিতে উন্মাদনা সৃষ্টি করা কখনোই মহানবীর (দ.) শিক্ষা হতে পারে না। তারা তাদের ধ্যান-ধারণাকে মানুষের উপর চাপিয়ে দিতে চায়। তাদের এসব কূপমণ্ডূকতার পরিণামে ইসলাম এখন শান্তি ও মুক্তির উপায় হওয়ার পরিবর্তে একটি ভীতিকর সঙ্কটে পরিণত হয়েছে।

এর কোনো টেকসই সমাধানও করা যাচ্ছে না। দিন দিন সমস্যাটি জটিল ও অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠছে। তাই এখন জাতির অস্তিত্বের স্বার্থে ধর্মের নামে এসকল অধর্মের বিরুদ্ধে জনগণকে সোচ্চার হওয়ার সময় এসেছে। এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে, রসুলাল্লাহ ও তাঁর আসহাবদের দুনিয়া থেকে বিদায়ের অনেক পরে জাতির মধ্যে সৃষ্টি হওয়া বিভিন্ন মাজহাব-তরিকার বিশেষজ্ঞদের দীনের ছোটখাটো বিষয় নিয়ে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিশ্লেষণের উপর ভিত্তি করে লক্ষ লক্ষ ফতোয়া, মনগড়া মাসলা মাসায়েলের পাহাড় সৃষ্টি হয়েছে। সেগুলোর কারণেই সৃষ্টি হয়েছে যত মতবিরোধ, হানাহানি, অন্ধত্ব।

আমরা হেযবুত তওহীদ বলছি, এই স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীটি যেটাকে ইসলাম বলবেন সেটাকেই ইসলাম বলে সবাইকে মেনে নিতে হবে, এ অন্যায় দাবি আমরা মানি না। আমরা মনে করি, আল্লাহ কোর’আনে যা বলেছেন এবং রসুলাল্লাহ (সা.) যা করেছেন সেটাই হচ্ছে ইসলাম। যে বিষয়ে আল্লাহ-রসুলের কোনো বক্তব্য আছে, তার বিপরীত কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। আর এটাই কলেমা, তওহীদের মর্মবাণী।
আমরা আরো বলছি, ইসলামের কাজ করে অর্থগ্রহণ করা আল্লাহ স্বয়ং হারাম করেছেন (সুরা বাকারা ১৭৪, সুরা ইয়াসিন ২১), অন্যের উপর জোর করে কোনো মতামত, পোশাক-আশাক বা সংস্কৃতি চাপিয়ে দেওয়া ইসলামের নীতি নয় (সুরা বাকারা ২৫৬), শালীনতা রক্ষা করে পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও জাতীয় সামাজিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে একত্রে কাজ করতে পারে, ইসলাম প্রতিষ্ঠার নামে যে জঙ্গিবাদ ও রাজনীতি চলছে সেগুলো ইসলামের নীতিবহির্ভূতভাবে করা হচ্ছে ইত্যাদি।

কীভাবে তা আমরা দলিল, যুক্তি, প্রমাণ দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছি। ইসলাম বিরোধী, আইন-শৃঙ্খলা পরিপন্থী এবং মানুষের ক্ষতিকর কোনো কাজ হেযবুত তওহীদ কোনোদিন করে নি, করা সম্ভবও নয়।আমরা চাই মানুষ প্রকৃত ইসলামের চর্চা করুক, ইসলামের নামে ধোঁকাবাজি অনাচার বন্ধ হোক। যার যা খুশি তাই ইসলামের নামে চালিয়ে দেবে, আর সেটাকেই অন্যদের মেনে নিতে হবে এটা অন্যায়। এ অন্যায়ের অবসান হোক।তবে হ্যাঁ, তাদের যে কথা কোর’আন ও রসুলাল্লাহর জীবনাদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সে কথাকে আমরা অবশ্যই মানি।

আল্লাহ ইসলামকে সহজ সরল পথ বা সেরাতুল মুস্তাকীম বলেছেন, তিনি কোর’আনকে বোঝার জন্য সহজ করে দিয়েছেন (সুরা কামার ১৭, ২২, ৩২, ৪০)। সুতরাং সাধারণ মানুষ ইসলাম বুঝবে না, কোর’আন বুঝবে না এমন বিপরীত কথা আমরা মানি না।

ইসলাম প্রতিষ্ঠার নামে এমন অনেক কর্মকাণ্ডই করা হয় যার দরুন ধর্ম ও প্রতিষ্ঠিত সমাজব্যবস্থা এখন প্রায়শই মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এতে ইসলামের কোনো লাভ হয় না, উল্টো ইসলামবিদ্বেষীরা অপপ্রচারের সুযোগ পেয়ে যায়। বড় ধরনের বিপর্যয় হওয়ার আগেই এ থেকে জাতিকে রক্ষা করতে সকল ধর্মপ্রাণ মানুষ, সাংবাদিক ও সচেতন মহলের এগিয়ে আসা অপরিহার্য।

(একাত্তর জার্নালে একজন মুফতির সাক্ষাৎকার)

শক্তি প্রয়োগ করে এই শ্রেণিটিকে দমন করা যৌক্তিক নয়, সম্ভবও নয়। ইসলামের প্রকৃত রূপ সুস্পষ্টভাবে না জানার কারণে বৃহত্তর জনগোষ্ঠী তাদেরকেই ধর্মের কর্তৃপক্ষ মনে করেন। অপরদিকে তাদের অন্যায়কে সমীহ করে প্রশ্রয় দেওয়া হলে ধর্মের নামে উন্মাদনা জাতিকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেবে।

যেহেতু বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর ধর্মবিশ্বাসকে অবজ্ঞা বা খাটো করে দেখার কোনো সুযোগ নেই, তাই একটাই উপায় আছে, তাহলো ধর্মের প্রকৃত শিক্ষা জাতির সামনে তুলে ধরা, তাদের ধর্মবিশ্বাসকে সঠিক খাতে প্রবাহিত করে জাতীয় রাষ্ট্রীয় উন্নয়নে, মানবতার কল্যাণে কাজে লাগানো। এজন্য প্রথমেই দাঙ্গা বিস্তারকারীদের এই পথ যে ভুল তা কোর’আন হাদীসের আলোকে মানুষের সামনে প্রকাশ করতে হবে।

আমরা আমাদের ঈমানী কর্তব্য ও সামাজিক দায়িত্ববোধ থেকে আল্লাহর তওহীদের মূল মর্মবাণী প্রচার করছি এবং ইসলামের নামে চলমান যাবতীয় অন্যায় ও ইসলাম-বহির্ভূত কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছি। তাই তারা আমাদেরকে অতীতে খ্রিষ্টান, কাফের, ইত্যাদি ফতোয়া দিয়েছে।বর্তমানেও তারা অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে যে, আমরা নাকি ইসলামবিরোধী, কুফরি সংগঠন। তারা আমাদের কাজে বাধা সৃষ্টি করছে, অনেকের বাড়িঘর লুট-পাট করে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিয়েছে, অনেকের অঙ্গহানী ঘটিয়েছে, আমাদের নির্মাণাধীন মসজিদ ভাঙচুর করেছে এমনকি প্রকাশ্য দিবালোকে তারা আমাদের কর্মীদের জবাই করে চোখ তুলে হাত-পায়ের রগ কেটে হত্যা করেছে এবং তাদের দেহ আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিয়েছে।

তথাপি আমরা সত্য প্রকাশে পিছপা হই নি। কারণ এই জাতীয় সমস্যার সমাধানটি আরা জাতির কাছে তুলে ধরতে চাই। মানবতার কল্যাণে, ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রে শান্তি প্রতিষ্ঠায় ইসলামের প্রকৃত শিক্ষার বিকল্প নেই। আসুন আমরা সবাই মিলে সমাজকে ধর্মের অপব্যাখ্যার থাবা থেকে উদ্ধার করি।

https://www.facebook.com/asadali.ht

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on “একটি বিশেষ শ্রেণি বললেই সেটা ইসলাম হয়ে যায় না, বরং আল্লাহর বাণী আর রসুলাল্লাহর (সা.) জীবনাদর্শই ইসলাম

  1. ইস্লামের ঠিক কোন বিধানের
    ইস্লামের ঠিক কোন বিধানের ব্যাখ্যা দিয়ে সেই বিশেষ গোষ্ঠী বিশেষ কোন সার্থ হাসিল করতে চায়??কেন অই ব্যাখ্যা না মেনে আপনার ব্যাখ্যা অনুসরণ করবো??বিস্তারিত যদি আলোচনা করতেন, মুসল্মান জাতি এই বিভ্রান্তি হয়ত কাটিয়ে উঠতে পারবে বলে আমি মনে করি।

    1. নাস্তিক হত্যা করার কথাই ধরুন।
      নাস্তিক হত্যা করার কথাই ধরুন। কিংবা প্রায়ই বিভিন্ন ইস্যুতে ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টি করে ধর্মভীরু মানুষকে রাষ্ট্রের মুখোমুখী দাঁড়া করানোর বিষয়টা ধরুন। কোর’আনের আয়াতের অপব্যাখ্যা দিয়ে, আল্লাহর কোর’আনবিরোধী ফিকাহশাস্ত্র গড়ে তুলে সেই মনগড়া বিধান মোতাবেক এই ধরনের কর্মকাণ্ডকে জায়েজ করা হয়ে থাকে। এতে ইসলামের কোনো লাভ হয় না, মুসলমান জাতিরও কোনো লাভ হয় না, তবে এ ধরনের ভণ্ডামী কেবল উপকৃত করে ধর্মজীবীদের। রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে সুবিধা আদায় করে তারা।

      সামগ্রিকভাবে ইসলাম সম্পর্কে যার কনসেপ্ট পরিষ্কার, তাকে এভাবে অপব্যাখ্যা দিয়ে রাজনৈতিক স্বার্থে বা অন্য কোনো স্বার্থে কাজে লাগানো সম্ভব নয়।

      আমাদের ব্যাখ্যা মেনে নিতে কাউকে জোর করছি না। আমরা কেবল চাচ্ছি- আমাদের বক্তব্যটা সবাই জানুক। এটুকুই যথেষ্ট মনে করি। মিথ্যাকে ইনিয়ে-বিনিয়ে গ্রহণ করাতে হয়, ছলনার আশ্রয় নিতে হয়, গোপন করতে হয় অনেক কিছু, কিন্তু সত্য সহজ-সরল। তার নিজস্ব আকর্ষণক্ষমতা আছে। মানুষ আমাদের বক্তব্য জানলে তারা নিজেরাই বুঝতে পারবে কেন তারা আমাদের ব্যাখ্যা গ্রহণ করবে আর কেন ওদেরকে প্রত্যাখ্যান করবে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 3 = 1