ইলিশ কথনঃ পহেলা বৈশাখে ইলিশ ‘হ্যা’ নাকি ইলিশ ‘না’!


বর্তমান সময়ে এই বঙ্গদেশে যদি কোন পয়গম্বরের আবির্ভাব ঘটে তাহলে উনার বেহেস্তের বর্ণনায় থাকতে পারে,

“তোমরা যদি আমার উপর বিশ্বাস স্থাপন করো তাহলে তোমাদের জন্য মৃত্যুর পরে অপেক্ষা করছে অনন্ত উপভোগের জীবন। যেখানের নদীতে প্রবাহিত হয় ঝাঁকে ঝাঁকে তিন কেজি ওজন বিশিষ্ট পেটে ডিম আসি আসি করা পদ্মা নদীর ফ্লেভারের তেল চুপচুপে ইলিশ মাছ! চাহিবামাত্র যাহা তোমাদের সম্মুখে মুচমুচে ভাঁজা অবস্থায় অথবা সর্ষে বাটা দিয়ে উপাদেয় রুপে পরিবেশিত অবস্থায় পাইবে এবং গলধঃকরণের সময় সেই মাছের টুকরোগুলো হবে কাঁটামুক্ত!”

আমি আমার ভাস্তীকে কিছুক্ষণ আগে জিজ্ঞেস করছিলাম, তুই কি পহেলা বৈশাখে ইলিশ মাছ ‘হ্যা’ নাকি ইলিশ মাছ ‘না’?

সে আমাকে নির্দ্বিধায় উত্তর দিলো, ‘হ্যা’!

আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘কেন’?

সে উত্তর দিলো,

‘আমার যেকোন সময় খেতে ভালোলাগে। ছোটবেলা থেকেই তো খাই। তো বৈশাখের আনন্দের দিনে পছন্দের খাবার খাবো না?’

যুক্তিটা ভালো। ও ছোটবেলা থেকে যে সংস্কৃতি কিংবা আচার আচরণ দেখে বড় হয়েছে তাই তো তার কাছে সঠিক বলে মনে হবে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে সংস্কৃতিটা আসলে কি অথবা ইলিশ কি বাঙ্গালীর সংস্কৃতির অংশ নাকি ঐতিহ্য?

পুরো দেশ কিংবা ভারতীয় অংশের বাঙ্গালীরা সহ আমরা জাতিতে বাঙ্গালী। আমাদের মধ্যে অনেক কমন ব্যাপার আছে। সবচেয়ে বড় সাদৃশ্য হচ্ছে ভাষা, যেটা আমাদের এক করে। এর বাইরে খাদ্যাভ্যাস অথবা নানা আচার অঞ্চলভেদে ভিন্ন হয়। গ্রামের মানুষ পান্তা খেতো, একসময় শহরের মানুষও খেতো সীমিত পর্যায়ে যখন ফ্রিজ আসেনি এবং দিনে ঝামেলা কমাতে বাড়িতে একবারই রান্না হতো। এখন গ্রামে পান্তা কিছুটা আছে, শহরে একদমই নেই। শহরে কেবল পহেলা বৈশাখে ফিরে আসে যেটা পান্তা না। গরম ভাতেই পানি ঢেলে পান্তা নাম দিয়ে দেয়া হয়। ব্যক্তিগতভাবে আমার পান্তাও পছন্দ না, আমি জীবনে মুখে দেবারও চেষ্টা করিনি। পান্তার গেঁজে যাওয়া গন্ধটা আমার পছন্দ না। একেক মানুষের রুচি একেকরকম। তবে একসময় ঢাকা শহরের মধ্যবিত্ত শ্রেণী এক অদ্ভুত ব্যাপার শুরু করে দেয়, শুরুটা সম্ভবত আশির দশকেই। তারা পান্তার সাথে ইলিশ জুড়ে দিলো। শুরুটা হলো দেশের সবচেয়ে প্রগতিশীল এলাকা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশেপাশেই। তখনকার শিক্ষিত বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া অংশ কিংবা মধ্যবিত্ত শিক্ষিত অংশ কি সংস্কৃতি সচেতন ছিলো না?

এটাকে একটা ফিউশন বলা যেতে পারে। শহরের মধবিত্ত শ্রেণীর অতি পছন্দের ইলিশের সাথে গ্রামের গরীব কৃষক শ্রেণীর পান্তার ফিউশন। এবং তারা ধীরে ধীরে এ ব্যাপারটা জনপ্রিয়ও করে ফেলে। হুজুগে বাঙ্গালী বলে একটা কথা আছে, সে কথাটা খুব বেশি মিথ্যাও যে নয় তার প্রমাণ এই পান্তা ইলিশের ব্যাপারটাও। সারা বাংলাদেশের এমন একটা পরিবার দেখাতে পারবেন কেউ, যেখানে পহেলা বৈশাখ ছাড়া অন্য কোনদিন ইলিশ পান্তার সাথে খাওয়া হয়? ব্যাপারটা ব্যাঙ্গাত্মক এবং বিভ্রান্তিকর নতুন প্রজন্মের জন্য। তারা ভাবছে এটাই সংস্কৃতি, হাজার বছরের হয়তো নয়, তবে বাপ দাদার মধ্যে ছিল সেটা তারা সম্ভবত সেটা ধরেই নেয় আমার ভাস্তির মতো।

আমার মাও নিশিচিতভাবে ফ্রিজের কোন কোণে দু একটা ইলিশ রেখে দিয়েছেন। উনি এতো কি বুঝেন এসবের, সবাই চায় তার সন্তানেরা উতসবে ভালোমন্দ খাবে। তবে এই ব্যাপারটা শুরু হয়েছে ২০০০ সালের পর থেকে, আগে এমন করতেন না। আর্থিক সামর্থ্য বৃদ্ধি পাবার সাথে সাথে অযৌক্তিক কিংবা দেখাদেখি শিখে নেয়া শখ ডানা মেলে দেয়।

আমরা যারা সাধারণ শিক্ষিত মধ্যবিত্ত নগরবাসী। আমরা যারা একেবারে ঢাকায় বেড়ে উঠেছি তাদের সংস্কৃতির শেকড় আর যারা গ্রামে কিংবা অন্য অঞ্চলে বড় হয়েছে তাদের সংস্কৃতির বোধ এক নয়। এখন যে এতো মানুষ পান্তা ইলিশ খাচ্ছে এটাও ক্ষুদ্র অংশের সংস্কৃতি। সংস্কৃতি সবসময় পরিবর্তনশীল এবং তার সাথে অনেক নতুন কিছু যোগ হবে। জব্বরেরবলি খেলা বাংলার সব অঞ্চলের সংস্কৃতির অংশ নয় আবার এটা বাঙ্গালীরই সংস্কৃতির অংশ, সেইসাথে ঐতিহ্যেরও অংশ। যদি বলি পান্তা ইলিশ সংস্কৃতির অংশ নয়, তবে ছায়ানটের বর্ষবরণের অনুষ্ঠান কিংবা মঙ্গল শোভাযাত্রাও আমাদের সংস্কৃতির অংশ নয়। এগুলো তো শুরুই হলো অল্প সময় আগে। তবে এখন এসবই আমাদের সংস্কৃতির অংশ হয়ে গেছে। আর শত বছর ধরে বা হাজার বছর ধরে এ অঞ্চলে যা আছে, ধরে রেখেছি আমরা, তা হচ্ছে ঐতিহ্য। সে হিসেবে ইলিশ আমাদের ঐতিহ্য যা সংস্কৃতিতেও প্রভাব রাখছে। তবে আমরা আমাদের ঐতিহ্য নিয়ে এমন একটা ব্যাঙ্গাত্মক ব্যাপার না করলেও পারতাম। পান্তা ইলিশের ব্যাপারটাকে আমি বলবো অপসংস্কৃতি। এই ফিউশন করে শেষ পর্যন্ত লাভটা হলো কি? ধোঁকা দিলাম কাকে?

যাইহোক, ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি ইলিশের দাম বৈশাখ ছাড়া অন্য সময়ে তেমন বেশি থাকেনা আগের সময়ের হিসেবেও। ইলিশ সব সময়েই অভিজাত শ্রেণীর কিংবা সামর্থ্যবানদের খাবার ছিল। যাদের অর্থ কম, তারা বহু বছর আগের প্রাচুর্য্যের সময়েও জটকাই কিনতো। বছর দশেক আগে এক কেজি গরুর মাংসের দাম ছিল সম্ভবত ১৪০-১৫০ টাকা, এখন ৪০০ টাকা। ইলিশ তখনও ছিলো ৪০০-৫০০ টাকা কেজি। এখন বৈশাখ বাদে অন্য সময় ১২০০-১৫০০ টাকা হয়। কুরবানীর ঈদের সময়ও তো গরুর দামও বাড়ে, বাড়ে না? যাদের টাকা আছে তাদের সংস্কৃতি নষ্ট হচ্ছে দোহাই দিয়ে কিভাবে ঠেকানো যাবে? ওরা তো বুঝবে রসনাবিলাস, টাকা ওদের কাছে বছরের কোন সময়েই ব্যাপার না। উৎসবে তো আরো হাত খুলে ব্যয় করেন উনারা।

তবে প্রশ্ন হলো ৫ বছর আগের চেয়ে এখন ইলিশের উৎপাদন প্রায় দ্বিগুণ। এতো ইলিশ যায় কোথায়? কে খায় এতো ইলিশ? দাম বেশি দেখে নিজেও তো খাওয়া কমিয়ে দিয়েছি। ২০১০ সালে উৎপাদন ছিল দুই লাখ টনের একটু বেশি, এখন চার লাখ টনের উপর। সরকারী হিসেবে রপ্তানী ১০-১৫ হাজার টনের বেশি নয়। কিন্তু আসল ব্যাপার হলো রপ্তানীটাই বেশি হয় সরকারী হিসেবের বাইরে। বড় এবং ভালো ইলিশগুলো চলে যায় অন্যদিকে। যার পরিমাণ সরকারী হিসেবের অনেকগুণ বেশি। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের ভাগে জটে জাটকা। বড়লোকের জন্য আমেরিকা গেলেও পদ্মার ইলিশ লাভ কোন ব্যাপার না। ইলিশ বেশি কোথায় যায় তাও সবার জানা। আজকের বাজার দর চেক করে জানলাম কলকাতায় ৮০০ গ্রামের একটি ইলিশের দাম আজ বাংলাদেশী টাকায় ৯০০ টাকা। যেটা বাংলাদেশে ১৫০০ টাকা হয়ে গেছে। কে খায় এতো গুড়? ওরা কোথা থেকে সরবরাহ পায় ইলিশ? ব্যাপারটা একটু চিন্তা করে দেখেন। জটিল কিছু না…

বাংলাদেশ থেকে ৬০০ গ্রাম থেকে এক কেজি ওজনের ইলিশের রপ্তানিমূল্য কেজিপ্রতি ৫০০ টাকা। এক থেকে দেড় কেজি ওজনের ইলিশের কেজিপ্রতি মূল্য ৭০০ টাকা এবং দেড় কেজির বেশি ওজনের ইলিশের কেজিপ্রতি মূল্য ১০০০ টাকার মতো যা সরকার নির্ধারিত। এদেশের ভালো ইলিশগুলোই বিদেশে রপ্তানি হয়। অথচ নিজ দেশের মানুষ একই ইলিশ কিনে খায় অনেক বেশি দামে। আমরা বিদেশে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের জন্য যেই অংকে ইলিশ রপ্তানী হয় অন্তত সে অংকে ইলিশ চাই। এজন্য রপ্তানী বন্ধ করা হলে সেটাই করা হোক অথবা সমুদ্র, নদীপথ সহ ইলিশ পাচারের রুটগুলোতে কড়া নজরদারী চাই। কিন্তু কেউ কি করবে সে ব্যবস্থা? যারা করবার কথা তারাই তো তা না করায় যে পরিমাণ অর্থ পকেটে ভরে তা দিয়ে এক হালি ইলিশ লাখ টাকায় কিনতেও তাদের অসুবিধা হয় না।

আমি ছাপোষা মানুষ, সীমিত আয়ের চাকুরীজীবি, আমার পক্ষে ইলিশের জন্য এতো ব্যয় সম্ভব না। তবে আমিও চাই সারা বছর ধরে মাঝে মাঝে শখ মেটাবার জন্য হলেও যেন ইলিশের দামটা ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে থাকে। আর বৈশাখে ইলিশকে আমি ‘হ্যা’ বলবো সামর্থ্যের উপর নির্ভর করে। এ সময়ে কি সাগরে ইলিশ আহরণ বন্ধ কিংবা ক্রয় নিষিদ্ধ? তা কিন্তু নয়। এখানের কেউ না কিনলে সেটাও পাচার হয়ে যাবে। ইলিশ বিক্রি না হয়ে পচে যাবার জিনিস না। ফ্রিজে থেকে গন্ধ হয়ে গেলেও মানুষ খাবে।

কিন্তু পান্তা দিয়ে ইলিশের ম্যানুফ্যাকচারড কালচার? কখনোই ‘না’!

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৪ thoughts on “ইলিশ কথনঃ পহেলা বৈশাখে ইলিশ ‘হ্যা’ নাকি ইলিশ ‘না’!

  1. ইলিশ আমাদের জাতীয় মাছ।কতদিন
    ইলিশ আমাদের জাতীয় মাছ।কতদিন হইল ইলিশ খাওয়া হয়নি তা মনে পড়ে না।খাওয়া তো দূরের কথা,গ্রাম্য হাট-বাজারে ইলিশ কে চোখের দেখাও দেখার সুযোগ হয়না।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

25 − = 15