শরীরে হাত, পাল্টা আঘাত


প্রতিদিন দেশে যে ঘটনা না ঘটে থাকে না সে হল ধর্ষণ, ইভ টিজিং, যৌন হয়রানী। যত মেয়ে ঘরের বাইরে বের হয় পড়াশুনা বা কাজের জন্য বা কোনো কারণ ছাড়া তাদের মধ্যে অধিকাংশ প্রায় প্রতিদিনই বিভিন্ন রকম যৌন নিপীড়নের শিকার হয়। বাসে রাস্তায় অলিতে-গলিতে ভিড়ে বা নির্জনে। কতো কতো প্রতিবাদ সমাবেশ ইভেন্ট আন্দোলন মিছিল হয় ধর্ষণ বন্ধ হওয়ার জন্য, শাস্তি হওয়ার জন্য, ইভ-টিজিং বন্ধ হওয়ার জন্য, সর্বোপরি নারীরা যাতে একটু নিরাপদে চলতে পারে সেটা নিশ্চিত করার জন্য। কিন্তু দিন শেষে ফলাফল হয় শূন্য। সেই পথে ভিড়ে বাসে নির্জনে শরীরে অস্বস্তিকর আক্রমণ হয়ই, আর ধর্ষণ, সেতো অনেকটা ডাল ভাতের মত । ইচ্ছে হলেই যেন যেকোনো নারীকে তুলে নেওয়া যায়। আর বিচার পাওয়া আর আকাশের চাঁদ হাতে পাওয়া যে একই তাঁর চাক্ষুষ প্রমাণ অহরহ রয়েছে। তনু বা তনুদের বিচার পাওয়া যে কতো দুঃসাধ্য ব্যাপার তা প্রশাসন চমৎকার ভাবেই বুঝিয়ে দিয়েছে।
তবে কি নারীরা ঘরের বাইরে যাবে না, পড়বে না, কাজ করবে না, বাসে উঠবে না, ভিড়ে যাবে না, নির্জনে যাবে না, উৎসবে মেতে উঠবে না? আসন্ন পহেলা বৈশাখে কি গত বছরের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটবে? যেখানে প্রশাসন কড়া নিরাপত্তার ব্যবস্থা করবে সেখানে তারা উল্টো বলে দিয়েছে ৫ টার মধ্যে অনুষ্ঠান শেষ করতে নতুবা অপ্রীতিকর কিছু হলে তারা দায়ী নয়। ব্যাপারটি তাহলে কি এই দাঁড়ায় , যে মেয়ে তুমি বের হয়েছ কেন, এখন তো একটু যৌন নিপীড়ন, গায়ে হাত্‌ ধাক্কাধাক্কি কাপড় খোলা বৈধ? স্পষ্ট ভাষায় প্রশাসন জানিয়ে দিয়েছে তারা নিরাপত্তা দিতে পারবে না, যেখানে সিসিটিভি ফুটেজ দিয়ে অপরাধী ধরা যায় না সেখানে কোন রকম নিরাপত্তার আশা করা বোকামি। তবে এর জন্য মেয়ে ঘরে বসে থাকবে কেন? ভয় পেয়ে যদি অনুষ্ঠানই বর্জন করি, ঘরের বাইরে যাওয়াই বন্ধ করে দেই, সন্ধ্যায় পর বের হতে হাজার বার চিন্তা করি তবে জয়ী হল কে? সেই লাঞ্ছনাকারী এবং যারা চায় মেয়েরা বের না হোক। যখন বাইরে থেকে নিরাপত্তা পাবো না তখন নিজেদেরই নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে হবে। স্বভাবতই মেয়েরা নিজেদের দুর্বল অসহায় অনিরাপদ ভাবতে অভ্যস্ত। এই অভ্যস্ততার কারণে পুরুষ তাঁকে আরও বেশি হেনস্থা করতে চায়। প্রথমত এই চিন্তা থেকে বের হয়ে এসে কিছু বিষয়ে সচেতন হয়ে চলাফেরা করলে ১০০ ভাগ না হোক কিছুটা অপ্রীতিকর ঘটনা থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব।

= চারপাশ সম্পর্কে সচেতন থাকুন। ভিড়ে বা নির্জনে যেখানেই থাকুন, আশেপাশে কী হচ্ছে কেমন মানুষ আছে চারপাশ জুড়ে সেই সম্পর্কে সজাগ থাকুন। বন্ধুদের সাথে থাকলে অনেকেই আশেপাশে সম্পর্কে সচেতন থাকে না। তখনই চলতে গিয়ে হুট করে কেউ আপনার গায়ে হাত দিয়ে দেয়। তাই সবসময় চারপাশ সম্পর্কে সজাগ থাকবেন।

= কেউ আপনাকে ফলো করছে এমন মনে হলে সাথে সাথেই সজাগ হন। অথবা যদি কারণ ছাড়াই মনে হয় যে আশেপাশে খারাপ কিছু হবে, বা খারাপ মানুষ জন আছে বা কেউ আপনাকে বাজে ভাবে দেখছে তবে এই সব অনুভূতিকে গুরুত্ব দিবেন। ভুল ভাবছেন বলে এড়িয়ে যাবেন না। এই গুরুত্ব দেওয়াই হয়তো আপনাকে বাঁচিয়ে দিতে পারে খারাপ কিছু হওয়া থেকে।

= যতটা সম্ভব ফ্ল্যাট স্যান্ডেল বা জুতা পরুন। যদি এমন কোনো পরিস্থিতির মধ্যে পড়েই যান যে সেখান থেকে বাঁচার জন্য দৌড়াতে হয় তবে হীল জুতো আপনাকে অসুবিধায় ফেলবে।

= ব্যাগ ব্যবহার করুণ লম্বা লেস সহকারে, যেগুলো হাতে না রেখে কাঁধে বা শরীরের সাথে ঝুলানো যায়। যাতে আপনার দুই হাত মুক্ত থাকে।

= মোবাইল ফোনে স্পিড ডাইলে এমন কারো নাম্বার সেভ করে রাখুন যাকে বিপদে কল করলে সাথে সাথে পাওয়া যাবে বা আপনাকে সাহায্য করতে তৎক্ষণাৎ ছুটে আসবে।

= ভিড়ে হোক বা নির্জনে মোবাইল নিয়ে বেশি ব্যস্ত থাকবেন না। অনেকেই আশেপাশে অসস্থিকর কিছু দেখলে বা কেউ ফলো করছে দেখলে মোবাইল নিয়ে চেট বা অন্য কিছু নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যায়। যেটি বিপদ আরও বাড়িয়ে দেয়। যত আপনি মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত থাকবেন ততই আপনার মনোযোগ মোবাইলের দিকেই যাবে, সেই সুযোগে যার যা করার করে ফেলবে।

= সরাসরি তাকান। কেউ আপনার দিকে খারাপ ভাবে তাকাচ্ছে, আকারে ইঙ্গিতে খারাপ ভাবপ্রকাশ করছে, আপনি ইচ্ছে করেই এমন ভাব করছেন যেন আপনি দেখেন নি বা দেখেও এড়িয়ে যাচ্ছেন তবে অপরাধী আরও বেশি করে করবে। কারণ সে বুঝে যাবে আপনি ভয় পেয়েছেন। আপনি ভয় পান নি, এটি বুঝিয়ে দেওয়ার মোক্ষম উপায় তার দিকে সরাসরি তাকান। তাকে বুঝান আপনি অবগত তার গতিবিধি সম্পর্কে। প্রয়োজনে জিজ্ঞেস করুণ, কিছুটা অসস্থিকর অবস্থায় সেও পড়ে যাবে। আশেপাশে মানুষদের জানান দিয়ে তাকে ডাক দিন। অন্যান্য মানুষরা যখন তার দিকে নজর দিবে তখন সে ভয় পেতে বাধ্য।

= কেউ যদি প্ল্যান করে আপনাকে বিরক্ত করতে চায় তবে সে সব সময় আপনার গতিবিধি সম্পর্কে ধারণা রাখবে। তাই সব জায়গায় গিয়ে ফেসবুকে চেকইন সাথে সাথেই দিবেন না। চলে আসার সময় চেকইন দিন, যাতে ফলোকারি আপনাকে খুঁজে না পায়।

= যদি দৌড়াতেই হয় নিজেকে রক্ষা করার জন্য তবে জীগজ্যাগ প্যাটার্নে দৌড়ান। অর্থাৎ নির্দিষ্ট রাস্তা ধরে না গিয়ে, এলোমেলো ভাবে দৌড়ান। তাতে আক্রমণকারী বিভ্রান্ত হয়ে যাবে।

= বাসে ট্রেনে বা অন্য যেকোনো পাবলিক যানবাহনে কোনও খারাপ স্পর্শ পেলে সাথে সাথে প্রতিবাদ করুণ। প্রয়োজনে চিৎকার করুণ। মানুষ জেনে যাবে এই ভয়ে চুপ করে থাকা মানে লাঞ্ছনাকারীকে আরও বেশি সুযোগ করে দেওয়া। মানুষ না জেনেও তো মেয়ে তুমি তোমার খারাপ লাগা থেকে বাঁচতে পারছ না, বরং জানিয়ে দিলে তাকে অপদস্থ করা যাবে। আগে নিজের সম্মান রক্ষা করা শিখতে হবে পরে কে কী ভাবল তা নিয়ে ভাবা যাবে।

= পাল্টা আঘাত করতে শিখুন। ব্যাপারটি শক্তির নয়। বরং লজ্জার। নিজের শরীরে আঘাত আসলেও মেয়েরা লজ্জায় কুঁকড়ে গিয়ে সেটি হজম করে কিন্তু পাল্টা আক্রমণ করতে চায় না। সকল সংকোচ ত্যাগ করে তার অণ্ডকোষ চেপে ধরুন শক্ত হাতে, সে কাবু হতে বাধ্য। তার পেটে ঘুষি মারতে সাহস করুণ, হাঁটু বরাবর লাথি মারতে শিখুন, চোখে আঘাত করুন। যত মনে করবেন “ছি ছি মানুষ কি ভাববে” ততই নিজেকে সপে দিচ্ছেন ওই নোংরা হাতে।

= মানুষের সাহায্য পাওয়ার জন্য প্রয়োজনে অন্য শব্দের ব্যবহার করে মনোযোগ আকর্ষণ করুণ। “ বাচাও” বলার চেয়ে “আগুন” “সাপ” বলে চিৎকার করুণ।

= সম্ভব হলে ব্যাগে ছুরি রাখুন। যদি নিজেকে চরম খারাপ অবস্থায় আবিষ্কার করেন তবে তার পেটে ছুরি ঢুকাতে দ্বিতীয় বার ভাববেন না। আগে নিজের রক্ষা পরে অন্যের হিসেব। “একটা মানুষকে মেরে ফেলবো” অথবা ভয় পেয়ে পিছিয়ে যাওয়া মানেই আপনি অত্যাচারিত হলেন।
শুধু এটি মনে রাখুন যে সমাজ যে রাষ্ট্র যে পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা আপনাকে নিরাপত্তা দিতে পারে না , দিতে চায়ও না, অপরাধীর বিচার করতে পারে না সেই সমাজে যদি নিজেকে সুরক্ষিত করে চলতে চান তবে কিছুটা সাহস এবং কিছুটা দুঃসাহস নিয়ে চলতে হবে।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “শরীরে হাত, পাল্টা আঘাত

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

17 − = 14