ব্যাক্তিগত ডায়েরী: আমার বিচার হোক, এটাই আমি চাই

“প্রকাশ্যে চুমু খাওয়া- এই দেশে অপরাধ/ ঘুষ খাওয়া কিছুতেই নয়” গিটার হাতে বাউল নচিকেতার কন্ঠে এ গান শুনে সবাই নড়েচড়ে না উঠলেও কেউ না কেউ একটু দম নেন। কারণ বর্তমান বাংলাদেশে কোন কর্ম যে অন্যায়, আর কোন কর্ম ন্যায় তা স্বর্য় রাষ্ট্রযন্ত্র জানেনা। কারণ জনসেবার নাম করে যত কার্যালয়ে যত টেবিল পাতা হয়েছে সবখানেই বা হাতের কাজ চলে অধিকারের মত। ফলে বাংলাদেশ যেন নচিকেতার আর একটি গান, “কোন এক উল্টো রাজার উল্টো, বুঝলি প্রজার দেশে।

৬ এপ্রিল আমার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক ভাবে আদালতে বিচার কার্য শুরু হয়েছে। বরিশাল নগরীর মোস্ট ওয়ানটেড টপ টেরর ‘রফিকুল ইসলাম খোকন’ ওরফে মামা খোকনের দায়ের করা মামলায় এ বিচার শুরু হয়। আমার বিরুদ্ধে দায়ের করা ‘মানহানি মামলা’ এটি কত নাম্বার তা ঠিক করে বলতে পারবো না। তবে আফসোস হয় একজন সন্ত্রাসীর মুখোশের সামনে মহামান্য আদালতে আমরা যখন নিরব থাকি। বরিশালের গোরাপত্তনে জমিদার দনুজ মর্দন এর আলম থেকে বর্তমান পর্যন্ত যেমন একটি ইতিহাস, তদ্রুপ ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত মামা খোকনের কর্মকান্ড বরিশালে যথারীতি লোমহর্ষক ইতিহাস। আজও সেই সন্ত্রাসীর রাম-রাজত্ব চলছে অনেকটা সমানে। কারণ আওয়ামী দুঃশাসনের নেই আমলে মামা খোকন নাজিরাপুল টর্চারসেল স্থাপন করে প্রচলিত আদালতের বাইরে নিজের আদালতে বিচার করতো। তখন কিন্তু তাকে কেউ থামাতে যায়নি। যদিও এখন দেশের প্রচলিত আদালতের উকিল তিনি ফলে মেঘ না চাইতেই বৃষ্টিপাত। কৌশলগত কারনে রাষ্ট্রীয় প্রটোকলের অন্তঃনেই। সেদিন আদালতে আইনজীবিদের যুক্তি তর্কের সময় যখন একজন আইনজীবি বলছিল মহামান্য আদালত রফিকুল ইসলাম খোকন একজন সম্ভ্রান্ত মানুষ। তখন মাথা নত হয়ে আসছিল। বস্তুত, তিনি কোন দিকে সম্ভ্রান্ত- অপরাধী হিসেবে নাকি অন্যান্য দিক থেকে ?

নগরীতে পুলিশ কামাল হত্যা রাজনৈতিক দিক থেকে আলোচিত এক হত্যাকান্ড। প্রতিবেদনে এমন তথ্যই ফলাও করেছি। যে হত্যাকান্ডের সাথে এই সম্ভ্রান্ত মামা খোকন প্রত্যক্ষভাবে জড়িত বলে তদন্ত প্রতিবেদনে প্রতিয়মান। যদিও মামলাটি থেকে অজ্ঞাত এক কারনে সমস্ত আসামীদের অব্যাহতি দেয়া হয়। তবে পুলিশ কামালের পরিবার কিন্তু এখনো মামা খোকনের নাম শুনলে আতঙ্কে থাকে। শুধু পুলিশ কামাল হত্যা নয়, চাঁদাবাজী-দখলবাঁজী, টর্চার সেলে নির্যাতন হাতের কড় গুনে বলা দুস্কর। তাকে এখনো মানুষ সাত খলিফার নেতা বলে ডাকে। এমনকি যে আইনজীবি সম্ভ্রান্ত বলে আদালতের কাছে একজন সস্ত্রাসীকে ভাল মানুষ হিসেবে প্রতিস্থাপন করতে চেয়েছেন, তিনিও জানেন মামা খোকন আসলে কেমন মানুষ।

যা হোক মামা খোকন আমার প্রসংগ নয়। আমার প্রসংগ হল আমার বিচার শুরু হয়েছে আদালতে। আমিও চাই আমার কঠোর বিচার হোক। অপরাধী যে দেশে খোলস পাল্টে অনায়াসে আইনবীদ হয়ে উঠতে পারেন আর যে দেশে সন্ত্রাসীকে সন্ত্রাসী বললে মামলা হয় সে দেশে আমার কঠোর বিচার হওয়াই বাঞ্চনীয়। কারণ আমি মানুষকে খুন করিনি। কারও কাছে অস্ত্র ঠেকিয়ে চাঁদা চাইনি বা দল বেধে গিয়ে হামলা-ভাংচুর, লুট-পাট করিনি। আমি শুধু লিখেছি বা বলেছি। তাতেই বিচারের জন্য অপরাধী সেজে কাঠগোড়ায় দাড়াতে হয়েছে। তবে এটুকু নিশ্চিত যদি মানুষকে খুন করতাম তাহলে নিশ্চয়ই সম্ভ্রান্ত হয়ে উঠতাম। অন্তত অপরাধী সেজে আদালতের কাঠগড়ায় দাড়াতে হতো না।

মার্চ মাসের ২৩ তারিখের ঘটনা। আমার এক সহকর্মীকে প্রকাশ্যে মারধর করে রাস্তায় ফেলে রেখে যায় একটি মাদক ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট। প্রায় ১০ ঘন্টা পর জ্ঞান ফেরে সহকর্মীর। এ ঘটনায় কোতয়ালি থানায় ২৫ মার্চ মামলা করতে গেলে অভিযোগ শুনে দাঁত কেলিয়ে হেসেছেন পুলিশ কর্তারা। আজ পর্যন্ত অর্থাৎ দীর্ঘ ১৮ দিনেও অভিযোগটি নেয়নি থানা পুলিশ। বাংলাদেশে নির্যাতিতের পক্ষে কেউ কোনদিন, কোন রাষ্ট্রীয় সংস্থা দাড়িয়েছে বলে নজির নেই। যদি কোথাও এর ব্যাত্যয় হয় তা স্বার্থের জন্য। সুতরাং অপরাধীদের পক্ষেই রাষ্ট্রযন্ত্র কাজ করে আসছে। এর কারণ, অর্থ আয়ের প্রবল ইচ্ছা আর সামগ্রীক ভাবে মানবিক অবক্ষয়।
গত বছর ২০১৫ সালের ১১ আগষ্ট আমাকে সহ ৬ জনকে নাস্তিক ও ইসলাম বিরোধী আখ্যা দিয়ে ফেসবুকের মাধ্যমে প্রকাশ্যে হত্যার হুমকী দেয়। আমরা প্রশাসনের আশ্রয় চেয়েছি। আইনের ছায়াতলে দাড়িয়েছি। এ ঘটনায় একটি জিডি করা হয় থানায়। সেই শুরু হলো নতুন ঝামেলা। তদন্তকারী কর্মকর্তারা এমন ভাবে আমাকে সহ কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করলো যে হত্যার হুমকী পেয়েছি কেন- সেই অপরাধে পারেতো গ্রেফতার করে। জিজ্ঞাসাবাদের নামে একদিন পুলিশ কমিশনারের কার্যালয়ে তো অপরদিন গোয়েন্দা অফিসে কাটাতে হয়েছে। আমরা এতবার বলেছি, আমাদের সন্দেহের উর্ধ্বে না রেখে পাশাপাশি লেখক এবং রাজনৈতিক কিছু উগ্র সংগঠন নগরীতে কাজ করছে, সংঘবদ্ধ হচ্ছে তাদেরও একটু-আধটু সন্দেহ করুন। কিন্তু তেমন দয়া কেউ করেনি। পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে অতিষ্ট হয়ে শেষে বলতে বাধ্য হয়েছিলাম, ভিক্ষার দরকার নেই বাপ, কুত্তা ঠেকাও। অর্থাৎ জীবন রক্ষার নামে জিজ্ঞাসাবাদের দুরমুস স্কন্ধের উপর থেকে সড়াও। তবে একথা অস্বীকার করা যাবে না পুলিশ আমাদের নিরাপত্তা দিতে সার্বক্ষনিক চেষ্টা চালিয়েছে। মর্মাহতের কথা হলো দিনের পর দিন চলে যায়। আমাদের আতঙ্ক বাড়তে থাকে। অথচ উদ্ঘাটন হয়না কে বা কারা আমাদের ‘কথা বলার অপরাধে’ হত্যা করতে উদ্যাত ? আজও কিন্তু সেই কথা বলার অপরাধে আমাকে আসামী হয়ে কাঠগড়ায় দাড়াতে হলো।

স্বৈরাচার এরশাদ সরকার পতনে “স্বৈরাচার নিপাত যাক/ গণতন্ত্র মুক্তি পাক” বুকে পিঠে লিখে প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে খুন হয়েছিলেন আমার মামা শহীদ নূর হোসেন। বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় তার অবদানকে ঠেলে ফেলার পথ নেই। গণতন্ত্রের জন্য শহীদ নূর হোসেনের এই সাহস ও দৃঢ়তা বিশ্বের দরবারে দৃষ্টান্ত। কিন্তু গণতন্ত্র কতটুকু এসেছে ? নূর হোসেনের মৃত্যু কি আদৌ স্বৈরতন্ত্র হটাতে পেরেছে দেশ থেকে ? বর্তমান অবস্থাতো ভয়ানক খারাপ। মা প্রায়ই বলেন, তোর মামা খুন হবার অপরাধে হুলো এরশাদের পতন হয়। আমি মনে করি এরশাদ স্বৈরাচার হলেও মানবীয় পর্যায়ে বা জনতার ভয় তার মাঝে ছিল। কিন্তু এখন সব পাল্টে গেছে। গণতন্ত্রের মুখোশে রাষ্ট্রব্যবস্থার পেছনের দরজায় দানবীয় স্বৈরতন্ত্র প্রাণ খুলে হাসছে। আমরা মানে জনগণ সেই তন্ত্রের গনিমতের মাল। নয়তো মানুষ খুন এখন কোন ঘটনা নয়। রাজনৈতিক প্রশ্ন বাদই দিলাম। ২২ মার্চ মঠবাড়িয়ার ধানীসাফা ভোট কেন্দ্রে পাখির মত গুলি করে মানুষ মালো পুলিশ-বিজিবি। বাঁশখালিতে বসতভিটা রক্ষার দাবী জানাতে গিয়ে ঝড়ে পরে তাজা প্রাণ। কই সরকারতো জনতার কাছে এ ব্যাপারে কৈফিয়ৎ দিচ্ছে না। তাহলে আমার মায়ের ঐ কথাটা কি বদলে ফেলতে হবে ? যে, ‘তোর মামা খুব হবার অপরাধে হুলো এরশাদের পতন হয়’ এখনতো শত শত নিরিহ মানুষ মরে যায় দাবী জানাতে গিয়ে, অধিকার রক্ষা করতে গিয়ে। সরকার কিছু মনেই করেনা। আগে সরকারকে জনগণের গোলাম নিয়োগ দেয়া হত, এখন সরকার জনগণকে গোলাম বানিয়েছে।

এটা কি জাতির জনকের স্বপ্ন ছিল ? ৭ মার্চের ভাষনে বলেছিলেন, ‘আমার টাকায় অস্ত্র কিনেছি বিদেশী শত্রুর থেকে দেশকে রক্ষা করার জন্য। সেই অস্ত্র ব্যবহার হচ্ছে আমার দেশের গরীব-দুঃখী-আর্ত মানুষের বুকে। আমার ছেলেদের বুকে হচ্ছে গুলি। —— ঐ শহীদের রক্তের উপর পা দিয়ে শেখ মুজিবুর রহমান কিছুতেই এ্যাসেম্বিলিতে বসতে পারেনা’। অথচ জাতির জনকের স্বপ্ন এখন হারে হারে ভুলুন্ঠিত। এমনকি তার হাতে গড়ে ওঠা আওয়ামীলীগেও। রাষ্ট্র ব্যবস্থা এখন অস্ত্র কেনেন বিদেশী শত্রুদের সাথে মিত্রতা বজায় রাখতে; দেশের গরীব-দুঃখী আর্ত মানুষের বুকেই অস্ত্র চালাতে ট্যাক্স নেন।

এই যখন সমগ্র বাংলাদেশ, সেখানে আমিতো কোথাকার নৌদ্দ- ছৌদ্দা। সম্ভ্রান্ত মামা খোকনের বিরুদ্ধে কথা বলায় আমার বিচার হওয়াটাই স্বাভাবিক। বরংছ অবাক হতাম যদি বিচার না হত। কারণ তার হাতে আছে রাজনৈতিক তকমা আর অস্ত্র। পক্ষান্তরে আমি মিয়া লোকাল পত্রিকার দেড় টাকার সাংবাদিক। হাতে পাঁচ টাকার কলম। সন্ত্রাসীকে, সন্ত্রাসী বলাটাওতো এদেশে অপরাধ। সুতরাং আমার বিচার হোক, এটাই চাই।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 6 = 2