মসজিদ রঙ্গ !!

বেশ কিছুদিন আগের কথা | ব্যস্ততার মধ্যে থাকতে থাকতে একদম বিরক্ত হয়ে গিয়েছিলাম |
তাই বিরক্তি দূর করে মানসিক চাপ কমাতে একটু সময় বের করে ঘুড়তে বের হলাম দুই বন্ধুর সাথে | সেদিন ছিল শুক্রবার এবং বলা বাহুল্য যে আমার বন্ধুদ্বয় আবার বিশাল ধার্মিক মানুষ | তো ঘুরতে ঘুরতে দুপুর হয়ে গেল | আর ভর দুপুরে আযানের শব্দ তাদের বোধ হতে বাধ্য করল যে সেদিন ছিল শুক্রবার বা ইসলামানুসারে জুম্মাবার | হঠাৎই তারা দুজনে বেশ কঠোর রূপ ধারণ করে বলতে শুরু করল তারা নামাজ পড়তে যাবে তাও আবার আমাকে নিয়ে | ঠিক এই ভয়টাই যেন পাচ্ছিলাম | আমার বন্ধুদ্বয় ভয়ানক রকমের নাছোরবান্দা | আমার আর কী সাধ্যি তাদের কথার বাইরে যাব | অবশেষে ঠিক করলাম তাদের সাথে নামাজ পড়তে নয় তবে মসজিদ দর্শনে যাব | অর্থাৎ তারা নামাজ পড়বে আর আমি তাদের নামাজ দর্শন করবো | তাতে অবশ্য আমার তেমন একটা সমস্যা ছিল নাহ | কারণ আমি মুসলিমদের যেভাবে বুকে টেনে নিই , হিন্দুদের পূজা মন্ডপেও যেতে তেমনি দ্বিধা করি না আবার কোন নাস্তিকেও আপনা ভাই বলে সম্বোধন করতেও একটু ভাবি না | আমার কাছে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষ পরিচয়টাই সব থেকে বেশী গ্রহণযোগ্য | তাই গেলাম তাদের সাথে |

শুরুতেই একটা জায়গায় বেশ কিছু পানির কল , যেখানে মানুষ গিয়ে তাদের আপাদমস্তক বিভিন্ন অঙ্গ পানি দিয়ে পরিষ্কার করছে | মসজিদের ভেতরে ঢুকতে হলে মসজিদের পবিত্রতা রক্ষার্থে আগে ময়লা পরিষ্কার করতে হবে যা উযূ নামে পরিচিত | আমিও তাদের দেখাদেখি তাই উযূ করলাম | উযূ করার সময় আমার মনে এক প্রশ্ন জাগল , এই যে শরীরের ময়লা পানি দিয়ে ধুয়ে দূর করে ঢুকছি কিন্তু মনে যে ময়লা বহু বছর ধরে পড়ে থাকতে থাকতে পচে গেছে , তা তো আর দূর হচ্ছেনা ? কিংবা মনের দুর্গন্ধ নিয়ে মসজিদে ঢুকলেও বা মসজিদের পবিত্রতা কতটা রক্ষা হবে , সেটাও তো বেশ ভাবার বিষয় | পরক্ষণেই মনে করলাম , নাহ ! এখানে যারা ঢুকছে নামাজ পড়তে , তারা সবাই তো মুসলমান এবং ধোয়া তুলসি পাতা | তাদের মনে জন্ম জন্মান্তরের জন্য আতর গোলাপ ছড়ানো আছে | তারা কোন খারাপ কাজের ধারে কাছেই যেতে পারে না ! তাই বাকী সবাইকে ধোয়া তুলসি পাতা এবং নিজেকে পচা বিল পাতা ভেবে দুঃখ মনে মসজিদে ঢুকলাম |

মসজিদের ভেতরে বিশাল রাজকীয় অবস্থা | ফ্যান,লাইট,গালিচা,এসি কিছুর অভাব নেই | রাজকীয় অবস্থা দেখেই বোঝা যায় মানুষ কত ভালবাসে মসজিদ তৈরির জন্য হারাম-হালাল নির্বিশেষে টাকা দান করে | আমি আমার বন্ধুদের সাথে একদম পেছনের সাড়িতে গিয়ে বসলাম | অবশ্য দুটি কারণ ছিল এর পেছনে | প্রথমত আমি নামাজ পড়ব না , তাই সামনে বসলে যে কোন সময় একটা আকষ্মিক কটু কথা শোনার সম্ভাবনা আছে | আর দ্বিতীয়ত আমার সাথে একটা ব্যাগ ছিল যেখানে ডিএসএলআর এর মত কিছু দামী এবং অতি প্রয়োজনীয় জিনিস রাখা ছিল | তাই এই ব্যাগ যেখানে সেখানে রাখার সাহস আমার ছিল না | আমার বন্ধুদ্বয় ব্যাগ নিজের কাছে রাখতে দেখে সুর করে বলল এখানে সবাই নামাজ পড়তে এসেছে , তোমার এই তুচ্ছ কিছু জিনিস নিতে কেউ আসে নি | শুনে বললাম, হ্যা তা বটে যেখান থেকে সামান্য জুতা চুরি হয়ে যায় , সেখানে আমার এই জিনিসগুলোর নিরাপত্তা কতটুকু তা আর বুক ফুলিয়ে বলতে হবে না |

যাহোক পাশে বসে আছি , হঠাৎ লক্ষ্য করলাম আমার পাশে বসা একটি লোক পাগড়ি , পান্জাবি পরে দিব্বি ঘুমাচ্ছে | তার পোশাক দেখে মনে হলো নির্ঘাত বেটা কোন মোল্লা বা হাজী প্রকৃতির মানুষ | আমার বন্ধুরা তাকে দেখে ডাকতে গেল | আমি ওদের বাধা দিয়ে বললাম , কী দরকার ডাকার , বেচারা হয়তো ক্লান্ত তাই ঘুমোচ্ছে | তার উপর প্রচণ্ড উত্তাপের মাঝে একটু এসির ঠাণ্ডা বাতাস পেলে কারই বা মন না চায় যে একটু শরীর টান টান করে ঘুম দেই ! আমার বন্ধুরা বলল , নাহ মসজিদে ঘুমানো হারাম | মনে মনে বললাম , বেটা ঘুম কী আর মসজিদ মন্দির বোঝে ? বলি কী দরকার মশাই এর উপর হালাল হারামের তখমা বসানোর ! বন্ধুদের উপদ্রপে ঘুম থেকে উঠে বেচারা মুখশ্রীকে এমন ভাব করল যা দেখে এটুকু বুঝলাম তারও অনুভূতি অনেকটা আমার মতই হয়েছে |

কিছুক্ষণের মধ্যেই ইমাম সাহেব উচ্চশব্দে কী কী যেন পড়তে শুরু করলো আরবি ভাষায় | কয়েক মিনিট শোনার পর অতৃপ্তি ধরে গেল | একটি অচেনা ভাষায় উচ্চ শব্দে কথা বলতে থাকলে কতক্ষণই বা ভালো লাগবে ? কী বলছে সুর করে , গল্প না গান না কবিতা কিছুই তো বুঝি না | আর মানে না বুঝে অযথা এসব বয়ান শুনেই বা কী লাভ ? অযথা বিরক্তি !

বয়ান শুনতে শুনতে হঠাৎ চোখে পড়ল একটা বাক্স একজনের থেকে আরেক জনের কাছে পর্যায়ক্রমে পৌছে দেয়া হচ্ছে | লক্ষ্য করলাম সবাই তাতে কিছু করে টাকা দিচ্ছে | আমার বন্ধুরাও দিল | তা দেখে আমি জিজ্ঞেস করলাম এই টাকা কী জন্য দেয়া হচ্ছে | তারা বললো এগুলো দিয়ে মসজিদের উন্নয়ণ করা হবে , মসজিদে আরও ফ্যান এসি লাগিয়ে বিলাসবহূল করা হবে | শত হলেও আল্লাহর ঘর বলে কথা ! তারা আমাকেও কিছু দিতে বললো | আমি মুখে স্বল্প পরিসরে দুখানা ভাজ এনে বললাম আমার কাছে টাকা নাই , দিতে পারবো না | তারা আমাকে ফকির বলে সামান্য মশকরা করে পরের জনের কাছে পৌছে দিল বাক্সটা |

বেশ কিছু সময় দুর্বোধ্য ভাষায় বয়ান দেয়ার পর সবাই দাড়িয়ে গেল নামাজ পড়তে | আমার বন্ধুদ্বয় এবার আমাকে দাড়াতে বললো এবং তাদের অনুসরণ করে নামাজ পড়তে বললো | আমি তাদের দিকে তাকিয়ে এক মুহুর্তের জন্য বেয়াক্কেল বনে গেলাম | আমি তাদের মসজিদে আসার আগের শর্তের কথা মনে করিয়ে দিতেই তারা বেশ উচ্চ শব্দে আমাকে ধমক দিয়ে বললো মসজিদে এসেছো নামাজও পড়তেই হবে | আমার বন্ধুদ্বয়ের কথা শুনে আশেপাশের বেশ কয়েকটা টুপি পান্জাবী পড়া মোল্লা আমার দিকে বেশ রাগী চোখে তাকাল | তাদের মুখদর্শন করে আমার ভিতর কেমন যেন একটা ভয় কাজ করতে লাগল | এমনিতেই রাস্তায় পড়ে থাকা অভিজিৎ দাদার ক্ষত বিক্ষত লাশ যেদিন দেখেছিলাম , তার পর থেকে টুপি পান্জাবী পড়া মোল্লা দেখলে আমার বড্ড ভয় হয় | হোক না মসজিদের ভিতর , মোল্লা তো , রক্তে তো বইছে সেই জল্লাদের মত কল্লা কাটার শক্তি | পাছে জীবনের এক শঙ্কা থাকে এই ভেবে দাড়িয়ে গেলাম নামাজ পড়তে | যেখানে প্রাণ বাচানোর দায় সেখানে আমি আপোষহীন | এখনো বিয়ে-শাদি করি নি বাপু , এত তাড়াতাড়ি মোল্লাদের হাতে কল্লা দিয়ে সব হারাতে চাই না |

যাহোক শুরু করলাম সবার সাথে অঙ্গভঙ্গি মেলানো | নানা রকমে সবাই অনেকটা ব্যায়াম করতে লাগলো | কখনো পুরো মাটিতে লেপটে সিজদা , কখনো অর্ধ নুয়ে পড়ে রুকু , কখনো এক ধান্দায় দাড়িয়ে , কখনো আবার হালকা বিশ্রাম স্বরূপ বসে থাকা | সাথে সুর করে আরবি ভাষায় বিভিন্ন কিছু তো চলছেই | তবে এবারের বয়ানের আকার অবশ্য বেশ ছোট ছিল , শুনে মনে হলো হয়তো কোন কবিতা পাঠ চলছে | কিন্তু আফসোস , মানে তো আর বুঝছি না , তাই অনুভূতিশূণ্য অবুঝের মত শুনে যাচ্ছি |

দুই দফায় এগুলো শেষ করে সবেই হাশিমুখে উঠতে চলেছি , এমন সময় আমার বন্ধুদ্বয় আবার বলল আরও দুই রাকাত নাকি বাকী | তাদের কথা শুনে আমার মুখের এমন এক হাল হলো যা দেখে বন্ধুরা না হেসে পারলো না | এই দফায় তারাই বাকী নামাজ পড়া শুরু করল , আর আমি বসে রইলাম এক কোণে |

অবশেষে তাদের নামাজ শেষ হলো এবং বাইরে বেরিয়ে এলাম | মসজিদের গেটের বাইরে দেখলাম বেশ কয়েকজন ভিক্ষুক হাত বাড়িয়ে বসে আছে ভিক্ষার অপেক্ষায় | তাদের মাঝে একজন দেখলাম পঙ্গু মানুষ | বেচারার দুটো পা নেই | সে ভীষণ করুণ সুরে কয়েকটি টাকা ভিক্ষা প্রার্থনা করছে | মুখ দেখে মনে হলো দুদিন যাবৎ পেটে দানাপানি কিছু পড়ে নি | কিন্তু এত নামাজী,হাজী, মহামানব মুসল্লী কারও নজর সেদিকে নেই | আর থাকবেই বা কী করে সবাই তো আল্লাহর ঘর তৈরির জন্যই টাকা দিয়েছে | এদের মত দুস্থের সহায়তা করার আর কী দরকার ! বেচারার মুখের দিকে তাকিয়ে আর থাকতে পারলাম না | পকেট থেকে বিশ টাকার একটি নোট বের করে হাতে ধরিয়ে দিলাম | এবারে সে আমার দিকে তাকালো | ভর দুপুরের রৌদ্রের আলোয় স্পষ্ট দেখতে পেলাম তার চোখের কোণে দুফোটা জল জমে গেছে | এই বুঝি বাধ ভেঙে বেরিয়ে এসে ভিজিয়ে দিবে সমগ্র বিশ্বের ঘুমন্ত মানব বিবেককে | কয়েক পলক তাকিয়ে বেচারা বললো , বাবা আল্লাহ আপনাকে আরও দিবেন , আপনার মত ঈমানদারের মঙ্গল আল্লাহ নিশ্চই করবেন | শুনে আমি কোন রকমে হাসি চেপে সরে এলাম তার সামনে থেকে | মনে মনে বললাম বেচারা শুধু আমার মানবতা দেখেই আমাকে পাক্কা ঈমানদার মনে করলো , সে তো আর জানে না আল্লার কাছে নাস্তিক মানবতাবাদীর চেয়ে স্বার্থপর নামাজী ব্যক্তি বেশী প্রিয় | আমি নামাজী নই , মুসলমান নই তো আমার সব ভাল কাজ মুল্যহীন | নামাজ কিংবা আল্লার গুণগান ছেড়ে শুধু মানব সেবা করার মানে নরকের পথে এগিয়ে যাওয়া | তা যাই হোক , মৃত্যুর পর নরকের ভয় করি না | তবে যারা দুনিয়াতে নরক খাটছে বিনা কারণে , তাদের কষ্ট একটু কমাতে পারলেই আমি স্বার্থক |

এতক্ষণের কর্মকাণ্ড দেখে আমার বন্ধুদ্বয় বেশ অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে | তাদের কাছে যেতেই তারা বললো , একটু আগে যে বললি টাকা নেই , তো এখন টাকা কী করে এলো ? আর মসজিদে না দিয়ে একটা ভিক্ষুককে টাকা দেয়ার কী মানে !! আমি বললাম –

হ্যা টাকা ছিল তবে তা কোন অদৃশ্য সৃষ্টিকর্তার জন্য বিলাসবহুল ঘর তৈরির জন্য নয় | এ পৃথিবীতে এমন বহু মানুষ আছে যারা ফ্যানের বাতাস তো দূর , দুবেলা দুমুঠো খেতে পর্যন্ত পায় না | অনাহারে যেখানে মানুষ ডুকরে কাদে , সেখানে আমি এক বিলাসবহুল প্রাসাদ তৈরির জন্য টাকা দিব ? আমি টাকা দিয়েছি এমন একজনকে যার অধিকার সৃষ্টিকর্তা জন্মের সময় কেড়ে নিয়েছে , তার দুটি পা | আমি তাকে টাকা দিয়েছি যে আমারই মত এক মানুষ | আমি তাকে টাকা দিয়েছি যে দুদিন অনাহারে থাকলেও তার দিকে তাকানোর সময় সৃষ্টিকর্তার হয় না | আমি তাকে টাকা দিয়েছি যে হাত বাড়িয়ে চোখের জল ফেলে ভিক্ষা চাইলে , চিৎকার করলেও তার ডাক সৃষ্টিকর্তার নিকট পৌছে না | হ্যা ইসলাম যদি বলে অসহায়ের আগে মসজিদ তৈরির কথা তবে আমি গর্বিত আমি অমুসলিম মানবতাবাদী নাস্তিক | সব ঈমানদার আল্লার ঘর তৈরিতে টাকা দিয়ে মৃত্যুর পর জন্নাতী হুর লাভ করুক , আর আমি দুস্থের সহায়তা করে নরকে যেতে প্রস্তুত হচ্ছি | আমি চাই না এমন সৃষ্টিকর্তা বা তার জন্নাত যার এতটুকু সময় নেই তার বান্দার চোখের জল মুছে দেয়ার , তার কষ্ট দূর করার | আল্লার তো বিশ্ব জোড়া মসজিদ নামক অনেক ঘর আছে | আমি না হয় তার জন্যই ঘর বানাই যার থাকার মত একটি ঘরও নেই !! আল্লার তো ধন-সম্পদের অভাব নেই | আমি না হয় তাকেই টাকা দেই যার দুবেলা খাওয়ার মত টাকাও নেই !!!
আমি মৃত্যু চাই না , চাই না আমি জান্নাতের শত শত দাসী | আমি চাই অসহায়ের সাহায্য করে তাদের হৃদয়ে চির অমর হতে | আমার কাছে নিঃস অসহায় মানুষের হৃদয়ে একটুকু ঠাই জান্নাতের বিশাল প্রাসাদের থেকে শ্রেয় | জান্নাতের শত শত দাসীর সেবার চাইতে দুস্থ হৃদয়ের ভালবাসা অনেক বেশী মূল্যবান ….

শোন হে মুমিন ঈমানদারগণ , “তোমরা তাদের দান করো যাদের আল্লাহ দিতে পারেন নি | তাদের অধিকার আদায় করো যাদের অধিকার আল্লাহ আদায় করতে পারেন নি | মৃত্যুর পর জন্নাতের আশা না করে দুনিয়াতেই পুরো বিশ্বকে জান্নাতে পরিণত করতে আক্রে ধরো এক মানবতার পথকে ……..”

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৪ thoughts on “মসজিদ রঙ্গ !!

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 23 = 27