অন্যরকম বৈশাখ : সমকামিতা

আমার তনয়,

তোর কি মনে আছে সেই ছোট্ট বেলার কথা, যেদিন প্রথম তোকে স্কুলে ভর্তি করাতে নিয়ে গেলাম ? এত ছোট্ট বয়সের কথা মনে না থাকাটাই স্বাভাবিক। তোর পাশে আমি টানা তিন ঘন্টা বসে রইলাম। আবার তোকে কোলে নিয়ে আইসক্রীম খেয়ে দুজনে বাসায় আসলাম। মনে আছে রে বাবা ? সময়ের সাথে সাথে আমার ছোট্ট খোকন মানিক এত বড় হয়ে গিয়েছে । প্রথম যেদিন তোর কান্না শুনেছিলাম সেদিন আমিও কেঁদেছিলাম। আমার সাত রাজার মানিক কে আমি কোলে নিয়ে বলেছিলাম আমি ছেলের বাপ। আমার লক্ষ্মী মানিক রতনের ছোট্ট ছোট্ট পা দু খানা আমার বুকের মধ্যে কত বার হাটা হাটি করেছে ! আমার লক্ষ্মী মানিক রতনের হাত গুলো আমাকে জরিয়ে ধরে কত দিন যে আমার কোলে ঘুমিয়েছে ! আমার লক্ষ্মী মানিক রতন কে কত দিন যে আমার পিঠে চড়িয়ে রাজ কুমার বানিয়েছি ! আমার খোকন আমার চোখের সামনে যে কবে বড় হয়ে গেল টেরই পাই নি।

মানুষ সময়ের সাথে বদলে যায়, কিন্তু আমাদের খোকন সোনা আমাদের জন্য বিন্দু মাত্র পাল্টায়নি। আমাদের খোকন মানিক আমাদের কাছে সেই ছোট্ট সোনামানিকই রয়ে আছে। বলতে পারিস বাবা, কত দিন তোর মাথায় হাত বুলাই না ? কত দিন তোর ঘরের লাইট টা অফ করে দেই না ? কত দিন তোর মুখটা দেখি না ? কত দিন তোর মাকে জিজ্ঞেস করি না খোকন সোনা খেয়েছে কিনা ? বলতে পারিস বাবা ?

জানিস বাবা, তোর মা প্রতিদিন সকালে উঠে তোর বইগুলো আঁচল দিয়ে মুছে পরিষ্কার করে, বুকে নিয়ে কাঁদে । তোর মেডেল, পুরুষ্কার গুলো দেখে আর কাঁদে। আমিও মাঝে মাঝে আমাদের ছবিটার দিকে তাকিয়ে কাঁদি। তোর মাকে একটুও বুঝতে দেই না। মাঝে মাঝে তোর মা আমাকেই ভীষণরকম দোষারপ করে। মাঝে মাঝে আমাকে জড়িয়ে ধরেও কাঁদে তোর মা। তোর ছোট্ট বেলার তোর সেই ন্যাংটা ছবিটা নিয়ে আমি প্রায়ই ঠাট্টা করার চেষ্টা করি, আমার সোনা মানিকের ছোট্ট বেলার ছবিটা দেখে আমরা বুড়োবুড়ি প্রায়ই হাসতে চেষ্টা করি কিন্তু তোর মা কেন যেন হাসি কান্না একত্র করে ফেলেন, হাসি কান্নার জলে আপ্লুত হয়ে পড়ি আমরা।

বাবা মানিক আমার, তোর কি ইচ্ছে করে না এই অভাগা বাবা কে একবার দেখতে, একটুও ইচ্ছে করে না তোর মায়ের শুকিয়ে যাওয়া মুখটা দেখতে ? একটুও ইচ্ছে করে না ? তোর মা তোর পছন্দের লাচ্ছি সেমাই রান্না করে, পোলাও রান্না করে তোর অপেক্ষায় বসে থাকে। তুই অফিস থেকে ফিরেই হয়তো পোলাও দেখে মাকে জড়িয়ে ধরে বলবি “আমার লক্ষ্মী মা” । তোর কি একটুও ইচ্ছে হয় না বাবা ?

গত বৈশাখে তোর দেয়া শাড়িটা তোর মা বালিশের কাছে রেখেছে। বার বার হাত বুলিয়ে কি যেন খোঁজার চেষ্টা করে, কি যেন পাবার চেষ্টা করে, কি যেন জানার চেষ্টা করে।

জানিস বাবা, তোর জন্য একটা ডিপিএস করেছিলাম। গতকাল সেটা ম্যাচুর্ড হলো। তুই ইউরোপে পিএইচডি করবি বলে টাকাটা জমাচ্ছিলাম। তোর মা ব্যাংকে বসেই যে কি কান্না কাঁদলো , বাবা তুই কেন এরম করলি বাবা ! আমাদের কেন কাঁদালি এভাবে !

তোর বন্ধু সাহেদ প্রায়ই আমাদের দেখতে আসে। ওর কাছে তোর অনেক কথাই জানতে পেরেছি। তোর মনের সব কথা তোর মা টের পেত। এই কথা কেন টের পেল না ? কেন তুই তোর মাকে , আমাকে তোর মনের কথা গুলো বললি না, কেন আমাদের কাছে লুকিয়ে নিজেকে এভাবে কষ্ট দিলি। একটা বার বলেই দেখতি, শুধু একটা বার ! শুধু একটা বার ! শুধু একটা বার বলতি আমাদের বাবা ! একা একা নিজেকে নিয়ে সমাজের সাথে কেন লড়াই করলি, নিজের কষ্টগুলোকে কেন নিজের মাঝেই লুকিয়ে রাখলি ! আমাদের নিয়ে, সমাজ নিয়ে তোর এত ভয় ছিল আমরা কেন টের পেলাম না!

মাঝে মাঝে নিজেকে খুব অপরাধী মনে হয়, মনে হয় তোর চলে যাওয়ার জন্য আমিই দায়ী। সমাজের এই রক্ত চোষা জীবগুলোর তৈরি করা নিয়মের জন্য আমি আজ অপরাধী বাবা। আমি নিজ হাতে আমার ছেলেকে খুন করেছি। হ্যাঁ বাবা, তোর মৃত্যুর জন্য আমিই দায়ী, তোর চলে যাওয়ার জন্য আমিই দায়ী। আমাকে মাফ করে দিস বাবা।

ইতি—
অপরাধী বাবা

পুনশ্চঃ তনয় কিছুদিন আগে আত্মহত্যা করে। তনয়ের বাবা তনয়ের বন্ধু সাহেদের কাছে জানতে পারে তনয় ছিল একজন সমকামি। তনয়ের বাবা ছেলেকে হারিয়ে নিজেকে এখন অপরাধী মনে করেন।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 6 = 4