পহেলা বৈশাখ উদযাপনঃ কাদের জন্য এবং কিভাবে হুমকি?

এই উপমহাদেশে মুঘল রাজাদের শাসনামলে কৃষকদের খাজনা দিতে হতো হিজরী সালের সাথে মিলিয়ে হিজরী নববর্ষে। কিন্তু চন্দ্র নির্ভর এ বর্ষ হিসেব পদ্ধতিতে দেখা যেতো কৃষক ঘরে ধান তোলার আগেই বছর শুরু হয়ে যেতো তাই খাজনা দিতে পারতো না। আর চন্দ্রবর্ষে বা হিজরী বর্ষ অনুসারে ঋতুগুলো ঠিক থাকে না, কারণ হিজরী হিসেবে ৩৫৪ দিনে এক বছর, যেখানে সূর্য নির্ভর বর্ষের হিসেবে বছর পূর্ণ হয় ৩৬৫ দিনে। তাই ঋতুগুলোর সাথে তাল মিলিয়ে খাজনা আদায়ের সুবিধার জন্য মুঘল সম্রাট আকবর নতুন বর্ষগণনা পদ্ধতি তৈরীর নির্দেশ দেন অার সে অনুযায়ী বাংলার বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদ ফতেহউল্লাহ সিরাজি সৌর সন এবং আরবি হিজরী সনের উপর ভিত্তি করে নতুন বাংলা সনের নিয়ম বিনির্মাণ করেন। ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০ই মার্চ বা ১১ই মার্চ থেকে বাংলা সন গণনা শুরু হয়। তবে এই গণনা পদ্ধতি কার্যকর করা হয় আকবরের সিংহাসন আরোহণের সময় (৫ই নভেম্বর, ১৫৫৬) থেকে। ১৪৩৩ হিজরী সাল মোতাবেক বাংলা ১৩১৮-১৯ সাল হয়। মজার ব্যাপার হলো পূর্বে বাংলায় শকাব্দ বা শক বর্ষে চৈত্র মাস ছিলো বাংলা বর্ষের প্রথম মাস। ৯৬৩ হিজরী সালের মুহাররাম মাস ছিল বাংলা বৈশাখ মাস, এজন্য বৈশাখ মাসকেই বঙ্গাব্দ বা বাংলা বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস এবং ১লা বৈশাখকে নববর্ষ ধরা হয়।

মূলত খাজনা আদায়ের উপর ভিত্তি করে বর্তমান বাংলা নর্ববর্ষের সূচনা। তখন শুধু খাজনা আদায় আর ব্যবসায়ীদের নতুন হিসেবের খাতা খোলার জন্য ঋণের টাকা পরিশোধের করতে হালখাতা পদ্ধতি চালু করে যেখানে টাকা পরিশোধের দিন মিষ্টি-জাতীয় খাবার দিয়ে পাওনাদারদের আপ্যায়ন করা হতো। পরবর্তীতে এ দিনে গ্রামে-গঞ্জে নাগরদোলা আর মেলার মাধ্যমে বিনোদনের ব্যাবস্থা করা হতো। মূলত কৃষকদের প্রশাসনের কাছে ঋণমুক্তি বা খাজনা পরিশোধের আনন্দের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে এই উৎসব পালন করা হতো। বৃটিশ শাসকদের খুশী করতে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে বিজয় কামনা করে পহেলা বৈশাখে হোম কীর্তন আর পূজার ব্যবস্থা হয়। দেশভাগের আগে এটাই ছিলো নববর্ষ উদযাপনের পদ্ধতি। পঞ্চাশের দশকে ভাষা আর সংস্কৃতির পার্থক্যটা যখন পাকিস্তানী শাসকরা বুঝিয়ে দিচ্ছিলো আর বাংলা সংস্কৃতির বাইরে পাকিস্তানিদের ‘কমন’ ভাষা আর সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছিলো তখন মূলত বাংলাদেশীরা নিজেদের আলাদা সংস্কৃতিটা ঘটা করে প্রকাশ করে প্রতিবাদের মাধ্যম হিসেবে। ষাটের দশকের শেষের দিকে ১৯৬৭ সাল থেকে রমনা বটমূলে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান জনপ্রিয়তা লাভ করে। সেই থেকে এখনো রমনা বটমূলে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান পালন করে আসা হয় যদিও মাঝে বোমা হামলা করে এটাকে হিন্দুয়ানী সংস্কৃতি হিসেবে প্রচার করে বন্ধের প্রয়াস ছিলো একটা বিশেষ গোষ্ঠীর। শুধু পহেলা বৈশাখ না, ভাষা শহীদদের স্মরণে শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পন আর স্বাধীনতা আর বিজয় দিবসে জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পন করে শহীদদের স্মরণকেও পূজা হিসেবে আখ্যা দিয়ে ইসলাম ধর্মের বিপরীতে দাঁড় করানোর প্রয়াসটা বেশ লক্ষণীয়। শহীদ দিবস বা পহেলা বৈশাখের মতো অনুষ্ঠানগুলো নিয়ে পাকিস্তান আমলের রাষ্ট্রীয় প্রচারযন্ত্রের পূর্ব পাকিস্তান বিরোধী প্রচারযন্ত্রের মতো এখনো কিছু মানুষ বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় আর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলো হিন্দুয়ানী সংস্কৃতি বলে মুসলমানদের উদযাপনে নিরুৎসাহীত করে আসছে।

১৯৮৯ সাল থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে পহেলা বৈশাখের সকালে মঙ্গল শোভাযাত্রা বের হয়ে শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে পুনরায় চারুকলা ইনস্টিটিউটে এসে শেষ হয়। এই শোভাযাত্রায় গ্রামীণ জীবন এবং আবহমান বাংলাকে ফুটিয়ে তোলা হয়। এখন এসব মুখোশ আর পশুপাখির ছবিকে হিন্দুদের পূজার সাথে তুলনা করে অপসংস্কৃতি বা আমদানী করা বাজে সংস্কৃতি হিসেবে চিহ্নিত করে অনেকে। ইসলামিক স্কলারদের মতে হারাম হিসেবে দেখা হয় পূজা পালন। এখন কারো যদি সংস্কৃতিক জ্ঞান না থাকে, ইতিহাস না জেনে হিন্দুদের পূজা মনে হয়ে থাকে তবে সে শোভাযাত্রায় অংশ না নেয়াই ভাল। ধর্মের সাথে সাংঘর্ষিক মনে হলে সেখানে আপনার অংশ নেয়া না নেয়াটা ব্যাক্তিগত ব্যাপার।

এমন অনেক কাজই আছে যা আমাদের ধর্মের সাথে সাংঘর্ষিক, তাও আমরা জেনে শুনে করে থাকি। কিন্তু পহেলা বৈশাখ পালন করা না করা একদমই ব্যাক্তিগত ব্যাপার, আর রাষ্ট্রীয়ভাবে নিষিদ্ধ করার দাবি তো জোর খাটানোর চরম পর্যায়। কোন সংস্কৃতির ভাল দিক নেয়া আর খারাপ দিক বর্জন করা এক ব্যাপার, আর পুরোপুরি নিজস্ব একটা ট্রেডিশনকে অন্য ধর্মের বা সংস্কৃতির অংশ হিসেবে দেখিয়ে বন্ধ করার দাবি হাস্যকর। হিন্দুরা বাংলা নববর্ষে (যা কি না পূর্বে শকাব্দ নামে পরিচিত ছিলো) অনেক বছর আগে থেকেই পুরো ভারতবর্ষে তাদের পূজা-আর্চনা আর উৎসব করে আসছে, বাংলাদেশে বা এই বঙ্গে নববর্ষ পালনের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন।

এরপর গতবছর টিএসসিতে পহেলা বৈশাখে নারী লাঞ্চনার ঘটনার পর তো পহেলা বৈশাখে নিরাপত্তা একটা বড় ইস্যু। অকর্ম ঘটানোদের বিচার তো দূরের কথা, নতুন করে অকর্মের ভয়ে নিয়ম-কানুনের বেড়াজালে পহেলা বৈশাখ পালনের নির্দেশের মাধ্যমে বাংলা নববর্ষের আনুষ্ঠানিকতা পালনে একরকম চোখ রাঙ্গানিই প্রদর্শন হলো!

আসলে যেটা পাকিস্তান আমলে চোখ রাঙ্গানি দিয়ে বন্ধ করেনি, রমনা বটমূলে বৈশাখ উদযাপন বোমা মেরে বন্ধ করা যায়নি, স্রেফ বাংলা কালচারকে মুখোশে আর ভাস্করে এনে প্রকাশটা ধর্মের বিপরীতে দাড় করিয়ে বন্ধ করা যায়নি সেই পহেলা বৈশাখকে এক নারী লাঞ্চনার ঘটনা দিয়ে দমিয়ে ফেলা যায় কি না ভবিষ্যত বলে দেবে। তবে এটা ঠিক এদেশের বিরাট একটা জনগোষ্ঠী ঠিক মতো নিজের ধর্মটা তো জানেই না (হুজুর নির্ভর ধর্ম পালনকারী) আর সেই সাথে নিজে জাতিসত্ত্বার ইতিহাস-ঐতিহ্য সম্পর্কেও জানে না। একটা জাতি নিজের নিজস্বতা হারিয়ে কালের গহ্বরে তলিয়ে যেতে এই অজ্ঞতাই যথেষ্ট। এজন্য কোন ধর্ম বা জাতিসত্ত্বা দায়ী নয়, দায়টা সম্পূর্ণ ওই জাতিগোষ্ঠীর.. যারা তাদের অতীত জানতে চায় না.. গুজবে আর অপপ্রচারে বিশ্বাস করে নিজেদের সহীহ প্রমাণে ব্যস্ত থাকে.. সৃষ্টিকর্তার কাছে সহীহ বান্দা হতে চায় না, সহীহ হতে চায় অপাদমস্তক আগাছাভর্তি একটা সমাজের কাছে!

নিজের জাতিসত্ত্বাটার নাম ‘বাঙ্গালী মুসলামান’ নাকি ‘মুসলিম বাঙ্গালী’ সেটাও কদিন পর বিতর্কে পড়ে বাঙ্গালী সত্ত্বা বিলিন হবার দশা হবে!

নববর্ষের শুভেচ্ছা সবাইকে।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

41 − 35 =