সুন্দরবন বাঁচান – দেশ বাঁচান

বাঘেরহাটের রামপালে ভারতের সহযোগিতায় যে কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের চুক্তি করা হয়েছে তার ব্যয় ধরা হয়েছে ১.৫ বিলিয়ন ডলার। অনেকেই বলছেন প্রকল্পের জায়গাটি সুন্দরবন থেকে ১৪ কিলোমিটার বাইরে কেও বা বলছেন ৯ কিলোমিটার বাইরে। আমি বলছি এটা সুন্দরবনের ভেতরে, কারন এই জায়গাটি একসময় সুন্দরবন ছিল। ব্যাপক হারে জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং বনাঞ্চল ধ্বংসের কারনে আগামী ১০ বছর পর যদি সুন্দরবনের আরো ২০ কিলোমিটার এলাকা খালি হয়ে যায় আর কেউ একজন ১০ কিলোমিটার দূরে একটা চা দোকান দেয় তাহলে আমরা বলব এটা সুন্দরবনের ভেতরেই। রামপালের প্রস্তাবিত বিদ্যুৎ কেন্দ্রটিও সেকারনে সুন্দরবনের ভেতরেই।

আর যদি তর্কের খাতিরে কোন পক্ষ এটিকে সুন্দরবনের বাইরে বলতে চানও আপত্তি নাই। ধরে নিলাম সুন্দরবনের বাইরে। তাহলে কি সুন্দরবনের এবং তার চারপাশের প্রতিবেশগত বিপর্যয় এড়ানো যাবে? এটি একটি অবাস্তব প্রশ্ন। প্রতিবেশগত বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব নয়। কারন

১৮৩০ একর ধানি জমিতে কম করে হিসেব করলেও প্রতি মৌসুমে ১,১০,৭১৫ মন ধান উৎপাদন সম্ভব এই ধানটা কোত্থেকে আসবে? এই ফসল কম উৎপাদনের ফলে খাদ্য নিরাপত্তা ক্ষতিগ্রস্ত হলে তখন কি বিদ্যুৎ খেয়ে মানুষ পেট ভরবে?

সরকার হয়তো বলবে আমরা বিদ্যুৎ ব্যবহার করে শিল্প উৎপাদন বাড়াব। কর্মসংস্থান বাড়বে, মানুষের আয় বাড়বে, রাষ্ট্রের আয় বাড়বে তারফলে আমরা বিদেশ থেকে শস্য আমদানি করবো। কিন্তু হিসেব করলে সরকারের এসব কিতাবি কথা পুরাই মিথ্যা বলে প্রমানিত হবে। কারন শস্য উৎপাদন নিজেই একটি বিশাল শিল্প, এর সাথে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান, জীবন, জীবিকা জড়িত। সুতরাং ত্যানা পেচিয়ে গু খাওয়ার কোন প্রয়োজন আছে বলে মনে হয়না।

যে ৮০০০ পরিবার উচ্ছেদ হবে তাদের বাসস্থানের কি হবে? কোথায় যাবে এই ৮০০০ পরিবার? তারা কি বস্তিতে থাকার জন্য ঢাকা অথবা বড় শহরগুলোতে আশ্রয় নিবে? নাকি স্রেফ উদ্বাস্তু?

সরকার হয়তো বলবে আমরা তাদের জন্য বিকল্প বাসস্থানের ব্যবস্থা করবো, আমাদের প্রশ্ন কোথায় করবেন? কিভাবে করবেন? অবাস্তব ধারনা দিয়ে আর কতকাল জনগণের রক্ত চুষে খাবেন? নাকি থাকার জায়গাও বিদেশ থেকে আমদানি করবেন?

বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করার ফলে হয়তো ৬০০ লোকের কর্মসংস্থান হবে, ৮০০০ পরিবারের একজন করে রোজগারি মানুষ হিসেব করলে বাকী ৭,৪০০ পরিবারের ৭,৪০০ জনের কর্মসংস্থানের কি হবে?

গত ২২ বছরে বৃহত্তর খুলনা অঞ্চলের বহু শিল্প কল-কারখানা বন্ধ হয়েছে অথবা ওয়ার্ল্ড ব্যাংক আর আই এম এফ এর প্রেসকিপশনে বন্ধ করা হয়েছে, হাজার হাজার শ্রমিক কর্মহীন হয়েছেন। এই সব কল-কারখানার সাথে থার্ড-পার্টি হিসেবে সম্পর্কিত প্রচুর ব্যবসায়ি পথে বসে গিয়েছেন। সেগুলো নতুন করে চালু করা, নতুন শিল্প স্থাপন করে কর্মসংস্থান তৈরি করার কোন কথা শোনা যায়না, উপরন্তু রামপালের বিদ্যুৎ দিয়ে শিল্প স্থাপন হলে সেগুলিতে কর্মসংস্থান হবে এরকম কথায় কি বিশ্বাস করা যায়?

কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পের বিষাক্ত গ্যাস আর ছাই কি বিস্তৃত সুন্দরবনে ছড়িয়ে পড়বেনা? বায়ু, পানি দুষিত হওয়া সহ এসিড বৃষ্টি সরকার কিভাবে ঠেকাবে? কয়লা পরিবহন করার জন্য যে পশুর নদী ব্যবহার করা হবে তাতে উচ্চ শব্দ ও পরিবহনের দুষনের কারনে পশুর নদী এবং সংলগ্ন সুন্দরবনের প্রাকৃতিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়াটা সরকার কিভাবে ঠেকাবে?

মহান বিজ্ঞানী নিউটন একটি প্রাকৃতিক সত্য আবিষ্কার করেছিলেন। প্রত্যেক ক্রিয়ার একটি সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে। এই কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য প্রকৃতি যেভাবে আঘাত প্রাপ্ত হবে প্রকৃতি তার জবাবে আমাদের ছেড়ে দিবেনা।

পশুর নদী থেকে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন চালু রাখার জন্য যে পানি উত্তোলন করা হবে এবং তার বেশিরভাগটাই আবার উচ্চ তাপমাত্রায় এবং তরল বর্জ্য ঘণ্টায় ১০০ ঘনমিটার হারে পশুর নদীতেই ছেড়ে দেয়া হবে তাতে কি পশুর নদী একটি মৃত নদীতে পরিনত হবেনা?

পশুর নদী মরে গেলে এই রাষ্ট্রের ক্ষমতায় থাকা দলগুলোর কিছুই যায় আসেনা। যায় আসে প্রকৃতির, মাছেদের, মানুষের এবং এই নদীর সাথে যাদের প্রতিদিনের জীবন জীবিকা জড়িত।

রেডিয়াম, ক্রোমিয়াম, মার্কারি, আর্সেনিক, লেড সহ আর বেশ কিছু বিষাক্ত মৌলিক পদার্থ মিশ্রিত ফ্লাই অ্যাশ আর বটম অ্যাশ যে প্রকল্পের ১৮৩০ একরের মধ্যে ১৪১৪ একর ভরাট করার কাজে ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার এগুলো কি মাটি হিসেবে উপযুক্ত? এগুলো কি সেই স্থান সহ আসেপাশের পুরো কৃষি জমি এবং মাটি – পানির স্তরকে বিষাক্ত করে ফেলবে না?

মাটি পানি বিষাক্ত হলেও সরকারগুলোর কিছুই যায় আসেনা। তারা এই বিদ্যুৎ প্রকল্প সেই সব ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ, পরিবেশ, বন ফসলের কথা চিন্তা করে করছেনা। যেকোনো মূল্যে তারা এই প্রকল্প সফল করার চেষ্টা করবে তাদেরই স্বার্থে। আমরাও এই প্রকল্প হতে দিবনা আমাদেরই স্বার্থে। কারন তারা আমাদের মানুষ মনে করেনা। কিন্তু আমরা মানুষ।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৭ thoughts on “সুন্দরবন বাঁচান – দেশ বাঁচান

  1. ১৮৩০ একর ধানি জমিতে কম করে

    ১৮৩০ একর ধানি জমিতে কম করে হিসেব করলেও প্রতি মৌসুমে ১,১০,৭১৫ মন ধান উৎপাদন সম্ভব এই ধানটা কোত্থেকে আসবে? এই ফসল কম উৎপাদনের ফলে খাদ্য নিরাপত্তা ক্ষতিগ্রস্ত হলে তখন কি বিদ্যুৎ খেয়ে মানুষ পেট ভরবে?

    তাদের তো ট্যাকা পয়স্যা মেলা।তারা বিদ্যেশ থ্যাইক্যা আইন্যা খাইতে পারবে।মাগার আমরা তো ম্যাঙ্গো ম্যান।খালী চুষবে।

    1. আমি তো ইনফরমেশন জেনেই লিখেছি,
      আমি তো ইনফরমেশন জেনেই লিখেছি, আপনি যদি অন্য কিছু জেনে থাকেন তাহলে আমাদের সাথে শেয়ার করেন, সবারই উপকার হয় তাতে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

4 + 3 =