প্রথম টিউশনির শেষ দিন

আমি তখন সেকেন্ড ইয়ারে পড়ি । এক বছর হল ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছি। ছাত্র রাজনীতি করতাম। কোন এক দৈনিকে চাপাতি হাতে আমার একটি ছবি ছাপল । আমি সহ বন্ধুরা অনেক খুশি। অনেকে ফোন করে কংরাচুলেশন জানানোসহ পার্টির আয়োজন করতে বলল। জাতীয় দৈনিকে ছবি এসেছে কম কথা নয়। ছাত্র নেতারা দেখে খুশি হল। বুঝলাম প্রমোশন পাব কারন তারা আমার পারফরমেঞ্চে প্রসন্ন হয়েছে। কিন্তু প্রসন্ন হল না ভাগ্য।
আমার পারফরমেঞ্চে পার্টির নেতারা খুশি হলেও খুশি হতে পারল না আমার বাবা মা। তারা যে খুশি হয়নি তার প্রভাব ৩০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে আমার কাছে পউছিতে সময় লাগল একমাস। পরের মাসে বাড়ি থেকে টাকা পাঠানো বন্ধ হয়ে গেল।
অনেক কষ্টের মধ্যে দিন কাটতে লাগল। বন্ধুদের কাছ থেকে ধার নিয়ে শোধ না দেওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধিপূর্বক , টাকা চেয়ে না পাওয়ার প্রবণতা তীব্র হল। বড় ভাইদের কাছে ধর্না দিতে লাগলাম একটা টিউশনির জন্য। বড় ভাইরা বিভিন্ন ভঙ্গিতে বলতে লাগল – ইশ একদিন আগে যদি বলতে, আজ সকালে বললেও হত, টিউশনিটা আজ সকালেই একজনকেই দিয়ে দিলাম। পরের মাসে যোগাযোগ কর। সব বড় ভাইদের কথাগুলো মনে হল তারা একই লিরিক ভিন্ন ভিন্ন সুরে গাচ্ছে। বুঝতে পারলাম, এদের কাছে টিউশনি নাই, পার্ট নেওয়ার জন্য বলছে। তবু চেষ্টার কোন ত্রুটি করলাম না।
তমাল নামে এক বড় ভাইয়ের কাছে গেলে ভাই যা বলল তা আগের ভাইদের ঠিক উল্টা। তমাল ভাই বলল- তুমি খুব ভাল সময়ে আসছ, এক ঘণ্টা পরে এলেও পেতে না। তোমার ভাগ্য খুব ভাল। তমাল ভাই ঠিকানা দিয়ে দিল- শুক্রাবাদ, যেতে হবে শুক্রবার পাঁচটায় ।
শুক্রবার আসল, একটু একটু করে টেনশনও বাড়তে লাগল, স্নায়ু চাপ টের পেলাম। এদিকে পকেটে টাকাও নাই। বন্ধুদের কাছে টাকা ধার চাইলাম, সেকুরিতি হিসেবে টিউশনির কথা বললাম। কেউ আমার টিউশনি পাওয়ার কথা বিশ্বাস করল না। বুঝলাম বন্ধুমহলে আমার চাপাবাজির ইমেজ প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে।
পাঁচ টাকা নিয়ে বের হলাম টিউশনির পথে। ভাবলাম যাওয়ার সময় হেঁটে গিয়ে আসার সময় বাসে আসব। কিন্তু সে গুড়ে বালি পড়ল। হেঁটে হেঁটে শুক্রাবাদ সিগন্যালে পৌছালাম। নিউ মডেল কলেজের সামনে একদল বেদেনি সাপ নিয়ে উপস্থিত। সাপের ভয় থেকে বাঁচতে বাধ্য হয়ে পকেটটাকে সাহারার মরুভূমি বানিয়ে ফেলতে হল।
টিউশনির বাসার সামনে গিয়ে কলিং বেল চাপলাম। কোন সাড়া শব্দ পেলাম না। ভাবলাম হয়ত কম জোরে চাপা হয়েছে। এবার পর পর তিনবার জোরে জোরে চাপ দিলাম। পরের তিন বারই বেজে উঠল। ভিতর থেকে একজন মধ্যবয়স্ক লোক দরজা খুলে বিরক্তি নিয়ে বলল কি চায়? টিচার বলতে গিয়ে বললাম- টিসার।
বাসার ভিতরে ঢুকে একজন মহিলাকে দেখে সালাম দিলাম। মহিলা সালামের উত্তর না দিয়ে হাসতে লাগল। যে লোকটি আমার দরজা খুলে দিয়েছিল সে লোকটি আমার ছাত্রের বাবা, আমার দিকে আবারও বিরক্তি নিয়ে তাকাল। বিরক্তির কারন পরে বুঝেছিলাম- আমি যাকে সালাম দিয়েছি সে আসলে কাজের বুয়া। আমার দরজা খুলে দিতে এসেছিল। কিন্তু আমি এমন জোরে বেল চেপেছি বাধ্য হয়ে স্বয়ং গৃহকর্তা উঠে এসেছেন। তাতে কি! সালাম দেয়া তো কোন দোষের না। সালাম দেয়াতে দোষের কিছু ছিলও না। কিন্তু গৃহকর্তা রাগ করেছিল এ কারনে যে গৃহকর্তার পাশে গৃহকর্ত্রীকে না বসিয়ে গৃহের দাসীকে বসিয়েছিলাম।
বেশ লজ্জিত ও বিব্রত হয়ে ছাত্রকে পড়াতে লাগলাম। আমার ছাত্র তখন ক্লাস সেভেনে পড়ত। এ বই ও বই হাতড়ালাম। তারপর কয়েকটা ত্রান্সলেশন করতে দিয়ে বসে রইলাম। এদিকে ব্লাডারে প্রেসার ক্রমশ বাড়তে লাগল। কেন এমন হল বুঝতে পারলাম না। হয়ত টেনশনের কারনে। অনেকক্ষণ চেপে রাখার চেষ্টা করলাম, পারলাম না। চাপ বেড়েই চলল । ছাত্রকে বললাম- তোমাদের ওয়াশরুমটা কোনদিকে? ছাত্র হাত দিয়ে বাথরুমটা দেখিয়ে দিল। আমি বাথরুমের সামনে গিয়ে দেখলাম বাথরুমটা বন্ধ। ভিতরে পানি পড়ার শব্দও পেলাম। কিন্তু এটা কিভাবে ঘটল জানি না, বলতেও পারব না। হয়ত অনেকে বিশ্বাস করবে না, কিন্তু এটা ঘটেছিল। বাথরুমের দরজা বন্ধ পেয়ে ফিরে আসার সময় দীর্ঘ দিনের অভ্যাসবশত সম্পূর্ণ অবচেতনভাবে বাথরুমের দরজার ছিটকিনি লাগিয়ে লাইটের সুইচটা অফ করে দিয়ে আগের জায়গায় ফিরে এলাম। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে আমার চৈতন্য ফিরে এল, যখন বাথরুমের ভিতর থেকে মহিলার চিৎকার চেঁচামেচি শুনতে পেলাম- কে রে লাইট অফ করে দিছিস, আবার শিটকিনি লাগানো? মহিলা জোরে জোরে বাথরুমের দরজায় শব্দ করতে লাগল, দরজার কিছু হল না, ঘা টা লাগল আমার বুকে। নিদারুন বিব্রতকর অবস্থায় অর্ধেক হয়ে গেলাম। ছাত্র আমার দিকে একবার তাকাল তারপর উঠে বাথরুমের দরজা খুলতে গেল। আমি আর বসে থাকতে পারলাম না। প্রচণ্ড ব্লাডারের চাপ নিয়েই আস্তে আস্তে বেরিয়ে পড়ার সময় শুনতে পেলাম ছাত্রের মা (যিনি বাথরুমের ভিতরে ছিলেন) তপ্ত বাক্যে গালি গালাজ করছে। আর ফিরে তাকালাম না, প্রতিবাদ দুরের কথা।
রাস্তায় বেরিয়ে পড়লাম। ফোন বেজে উঠল। বাড়ি থেকে ফোন করে বলল- কাল টাকা পাঠাব, তুলে নিও। ওটাই আমার জীবনের প্রথম টিউশনির প্রথম ও শেষ দিন

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on “প্রথম টিউশনির শেষ দিন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

84 + = 91