নাগরিক দাম্পত্য ২

———————————–
ফিরে দেখা
https://www.facebook.com/shuponn.shahriyar/posts/155450014816371:0
——————————————————————————-

তোর এতো আদর করে ডাকতে ইচ্ছে করে— তুই ভালো কিছু বলে ডাক, ভালো কোনো নামে ডাক— তা না, তুই সেই আজে-বাজে নামেই ডাকবি— মেজাজ খারাপ না হয়ে যায়?
কে দেখে কার মেজাজ? যখনই সুশানকে আদর করতে ইচ্ছে করে, তখনই কী সব অদ্ভুত অদ্ভুত নামে তাকে ডাকতে শুরু করে নীহা। সেসব নাম সে কোথায় পায়, বা কোন্ ব্যাকরণের নিয়মানুসারে চেঞ্জ করে, তা কেউ বলতে পারবে না।
বিয়ের বছরের কথা। প্রথম কিছুদিন সে সুশানকে ‘ময়না’ নামে ডাকলো। ‘ময়না’ নামটা যদিও এদেশের মেয়েদের ক্ষেত্রেই বেশি মানানসই, তারপরেও সুশান কিছুই বললো না নীহাকে— আদর করে ডাকছে— ডাকুক। আদরের আবার লিঙ্গভেদ হয় নাকি!
এমন কথাই বা বলছি কেনো? ব্যাপারটা নিয়ে প্রতিবাদ করে সুশান তো একবার বলেওছিলো— “তুমি যেনো আমাকে আর ‘ময়না’ নামে ডাকবা না।”
নীহা স্বাভাবিকভাবেই বললো— ‘কেনো?’
‘ওটা মেয়েদের নাম।’
‘তাতে কী?’
“তাতে কী’ মানে? আমি কি মেয়ে নাকি, যে আমাকে তুমি ঐ নামে ডাকবা?”
‘মেয়ে না হলে ডাকা যাবে না?’
‘না, ডাকা যাবে না।’
‘আচ্ছা যাও, ডাকবো না। আমাদের একটা মেয়ে হোক— তাকে ঐ নামটা দিয়ে তোমাকে অন্য একটা সুন্দর নাম দিয়ে দেবো। তখন থেকে সেই নামেই তোমাকে ডাকবো। ঠিক আছে, ময়না?’
কথাটা শেষ করেই সে আদর করে সুশানের নাকটা টিপে দিলো। কেমন টাটকা একটা আদর পেলো, তারপরও সুশান রেগে উঠলো। বললো— ‘আবার?’
“হ্যাঁ ‘আবার’। মেয়েটা আগে হোক, দুনিয়াতে আসুক, তারপরে ‘নাবার’।”
আলতো করে নাক টিপে দেয়া, থুতনি চেপে ধরা, চোয়ালের চামড়া ধরে টানা— নীহার আদরের প্রকাশ্য রূপ এগুলো। এবার সে সুশানের চোয়াল ধরে টেনে দিলো। সুশান সেদিকে খেয়াল না করে বললো— “নাবার’টা আবার কী জিনিস?”
“নাবার’ বুঝলে না? ‘নাবার’ হলো— না + আবার। ‘না’ এবং ‘আবার’— এদের সন্ধি। যার অর্থ— পুনরায় নহে। Not again.”
সুশান হাসতে হাসতে বললো— ‘নী, তুমি যে কী!’

অতএব, ‘ময়না’ নামটা নিয়ে আর কোনো গ্যাঞ্জাম থাকলো না। থাকবে কী? গ্যাঞ্জাম করার কথা তো সুশানের মাথা থেকেই আউট হয়ে গেলো।
তারপর হঠাৎ করে একদিন দেখা গেলো ‘ময়না’ নামে তাকে আর ডাকছে না নীহা— ডাকছে ‘মনা’ নামে। মাঝখানের ‘য়’ সরিয়ে দিয়ে ‘মনা’। যাক ভালো কথা— এই নামটাতে রাগ করা যায় না— অনেক বাবা-মা-ই তাদের ছেলেকে আদর করে ‘মনা’ ডাকে। বৌও না হয় এই নামেই একটু আধটু আদর করলো— ক্ষতি কী? কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই সেই ‘মনা’ হয়ে গেলো ‘মনু’। আর তো মেনে নেয়া যায় না! একবার সুশানের দাদীর দুইটা ছাগলের বাচ্চা হয়েছিলো। বাচ্চা দুটোর একটার নাম রাখা হয়েছিলো ‘ছনু’, অন্যটার নাম ‘মনু’। আর আজ তার নাম ‘মনু’। সে কি ছাগলের বাচ্চা নাকি, যে তাকে ‘মনু’ বলে ডাকতে হবে? বাংলাদেশে কি নামের অভাব পড়ে গেছে? এ নিয়ে একদিন অনেক রাগারাগিও করলো সে। ফলে ‘মনু’ নামটা আর থাকলো না, ‘মনু’কে আউট করে দিয়ে সেখানে স্থান নিলো— ‘মন্টু’। যাক, এ নামটাকে মন্দ বলা চলে না— সুশানের হাইস্কুল লাইফে যে মানুষটা তাদের হেডমাস্টার হিসেবে ছিলেন, তাঁর নাম ছিলো মন্টু। সবাই ডাকতো— মন্টু স্যার। সেই মন্টু স্যার তাকে যারপরনাই স্নেহ করতেন।
‘মন্টু’ নামটা সুশানের পছন্দ হলেও সেটা বেশি দিন টিকলো না। হঠাৎ করে একদিন নীহা তাকে ‘সোনা’ নামে ডাকা শুরু করলো। সেই ‘সোনা’ একদিন ‘সুনু’ হলো, তারপর একদিন— ‘সোন্টু’।

বর্তমানে সুশানের আদরের নাম— ‘পাটু’। এই ‘পাটু’ প্রথমে ছিলো ‘পাখি’। ‘পাখি’ থেকে হলো ‘পাটি’। তারপর কবে একদিন ‘পাটি’ পরিবর্তীত হয়ে হয়ে গেলো ‘পাটু’। এখন এসবে অভ্যেস হয়ে গেছে সুশানের। এখন আর তার রাগ-টাগ কিছু আসে না— বরং হাসি পায়। সে মিচমিচ করে হাসে আর কথা বলে।
আর নীহাটাও সেই রকম— তার আদর প্রদানেরও নির্দিষ্ট কোনো টাইম-ট্যাবল নেই। সময়-অসময় নেই। আজ। খেয়ে-দেয়ে সুশান শুয়েছে। ঘুমে তার চোখ জড়িয়ে আসছে। এই সময় নীহা হঠাৎ তার গায়ের ভেতর এসে গালে টুক করে একটা চুমু বসিয়ে দিয়ে বললো— ‘আমার পাটু সোনা।’
এরপর আর রাগ করা যায় কীভাবে? ঘুম ঘুম চোখেই সুশান মৃদু হেসে বললো— ‘আচ্ছা নী, তুমি যে তোমার সঞ্চয়ের সব নাম, সব আদর আমাকে দিয়ে ফুরিয়ে ফেলছো— আমি যদি চাই, ক’দিন বাদেই আমার মেয়েটা পৃথিবীতে আসবে, তার জন্যে অন্তত কিছু রাখো! সে তো এসেই কান্নাকাটি শুরু করবে।’
নীহা সুশানের গালে নাক ঘসতে ঘসতে বললো— ‘কে আদর করবে তোমার মেয়েকে? আমি? তোমার মেয়েকে আমি মেরে আলুভর্তা বানিয়ে ফেলবো। তোমার মেয়েকে তুমি আদর করে বেড়াওগে যাও। আমার অতো মেয়ের শখ নেই। আমার ছেলে দরকার। আচ্ছা, আমার ছেলেটার একটা নাম ঠিক করো না! এমন একটা নাম রাখতে হবে, যে নামটা আজ পর্যন্ত কেউ কাউকে রাখে নি। Unique name.’
সুশানের মাথায় হঠাৎ একটা দুষ্টবুদ্ধি নড়ে-চড়ে উঠলো। সিরিয়াস হবার ভান করে স্বাভাবিক চেহারা করে সে বললো— ‘নী, দেখেছো কী আশ্চর্য ব্যাপার— খুব সুন্দর একটা নাম মাথায় এসে গেছে! এইমাত্র আসলো!’
নীহা বেশ আগ্রহ নিয়ে বললো— ‘কী নাম কী নাম? বলো বলো।’
‘তোমার ছেলেটার এই নামটাই রাখা হবে। সিদ্ধান্ত হয়ে গেলো।’
‘আহা বলোই না— কী নাম?’
“তোমার ছেলের নাম রাখা হবে— ‘গু’। এই নামটা আজ পর্যন্ত কেউ কাউকে রাখে নি। Unique name. I’m sure.”
নীহা এবার রেগে উঠলো। গালে নাক ঘসা অফ করে নিজের শরীরটা সম্পূর্ণরূপে সুশানের শরীরে তুলে দিয়ে তার বুকের উপর অন্ধের মতো ঘুসি মারতে মারতে বললো— “আমার ছেলের নাম যদি ‘গু’ হয়, তোমার মেয়ের নাম তাহলে আমি রাখবো ‘মুত্’। এই নামটাও আজ পর্যন্ত কেউ কাউকে রাখে নি। I am also sure that it is a unique name.’

——————————-
নাগরিক দাম্পত্য ৩
[অপেক্ষা করুন]
————————————————–
প্রেম-অপ্রেমের গল্প—
নাগরিক দাম্পত্য । সুপণ শাহরিয়ার

শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published.