শুরু হোক নুতনের জয়গান…

আমার ছোটবেলায় পহেলা বৈশাখ ছিলো এক অন্য মাত্রার। অন্য কোন দিনই এমনভাবে শুরু হতো না। সকাল থেকেই মনের ভেতর শুরু হতো অদ্ভুত এক চাঞ্চল্য। কখন বিকাল হবে, বাবা কিংবা মা অথবা দুজনেরই সাথে মেলায় যাওয়ার চাঞ্চল্য। বাঁশের তৈরি লম্বা বেলুন বাঁশি, কাগজ-কাঠি আর মাটির তৈরি টানা গাড়ী (টেনে টেনে চালালে ঢপ ঢপ করে ড্রামের মতো বাজতো) আর রং করা পোড়া মাটি ও তুলোর তৈরি মাথা ঝাঁকানো বুড়ো দাদুর পুতুল; এই ছিলো আমার প্রধান আকর্ষণ। সবুজে ঘেড়া আমার ছোট্ট শহর বরিশালের বিএম স্কুল (ব্রজমোহন উচ্চ বিদ্যালয়-অশ্বিনী কুমার দত্ত কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত) মাঠে বসতো শহরের সব থেকে বড় বৈশাখী মেলা। আমার ঐ ছোট্ট বয়সে এই স্টেডিয়ামের সমান ঢেউ খেলানো মাঠটি ছিলো দাদির মুখো শোনা রূপকথার গল্পের সেই তেপান্তরের মাঠের মতো; দিগন্ত বিস্তৃত এক হরিৎ সাগর। যেবার মেলায় প্রথম গল্পের বইয়ের দোকান হলো সেবার আমার টিফিনের জমানো টাকা দিয়ে নিজের পছন্দে বই কিনলাম-দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদারের ‘ঠাকুরমার ঝুলি’। আহা সেকি আনন্দ! লিখতে লিখতেও গা শিউড়ে উঠছে সেদিনকার সেই অনুভুতি স্মরণ করে। কেউ কি ফিরিয়ে দেবে আমার ছোট্ট বেলার নানান রঙের দিনগুলি, আমার প্রাণ জুড়ানো-মন ভুলানো পহেলা বৈশাখ, আমার তেপান্তরের মাঠের বৈশাখী মেলা।

কৃষিনির্ভর ভারতবর্ষে খাজনা আদায়ের জন্য সম্রাট আকবর হিজরি সন থেকে ঋণ নিয়ে শুরু করেছিলেন বাংলা সাল গণনা বা বঙ্গাব্দ। সামন্তবাদী জমিদারি সমাজে প্রজা কৃষক তার সারা বছরের উপার্জিত ধন বছরের প্রথম দিন জমিদার রাজের পায়ে সেলামি দিত খাজনা হিসেবে, বিনিময়ে জমিদার গিন্নির হেঁসেল থেকে কিছু মিষ্টান্ন বা পায়েস হয়তো কৃষক তার ছেলেপুলে নিয়ে খেতো। কিন্তু এই খাজনা আদায়ের পিছনের যে কত জীবনের বেদনাদায়ক-অমানবিক গল্প হারিয়ে গেছে কালের গহ্বরে কে বা জানে? মাসি-পিসির ছেলে ভুলানো ছড়াগান ‘খোকা ঘুমালো, পাড়া জুড়ালো…..খাজনা দিবো কিসে;’ কিংবা শরৎবাবুর ‘গফুর-মহেষ-আমিনা’-এর গল্পে হয়তো লুকিয়ে আছে সেই বেদনার গল্প; হয়তো অনেক রূপকথা, উপকথা বা ছড়াগানে লুকিয়ে আছে সেই কষ্টকাব্যগুলো।

প্রাচীনকাল থেকে এই শস্য-শ্যমলা বঙ্গভূমে কুটির থেকে গড়ে ওঠা ক্ষুদ্র শিল্পগুলো কুটিরেই পরে ছিলো, কিন্তু বাদ সাধলো ঐ সামন্ত্রপ্রথা। জমিদারবাবুর পাইক-পেয়াদা লেঠেল বাহিনির শোষন-শাসনে বড় কৃষক হলো ছোট কৃষক, ছোটরা হলো প্রান্তিক আর প্রান্তিক কৃষক সর্বশান্ত হয়ে ভূমিদাসে রূপান্তরিত হলো; এক একজন গায়ে-গতরে শক্ত সমর্থ কিন্তু আর্থ-সামজিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হেলে চাষা। তাতেও শেষ রক্ষা হয়নি অনেকেরই, শেষ পর্যন্ত কামার-কুমোর-তাতি-জেলেদের সাথে যোগাল দেয়ার কাজ নয়তো তাদের উৎপাদিত পণ্য হাট-বাজার বা গৃহস্ত বাড়িতে গিয়ে ফেরি করে বিক্রি করার কাজ জুটলো। ক্ষুদ্র শিল্পগুলো কুটির থেকে বের হয়ে কখনো পায়ে পায়ে আবার কখনো সপ্ত ডিঙ্গায় চড়ে সাত সমুদ্র তের নদী পাড়ি দিলো বাণিজ্যের লোভে। যেন এক একটা স্ফুলিঙ্গ জ্বলে উঠলো ঘোর অমানিশার এক সমাজে। শুরু করলো বাঙ্গাল মুলুকে পুঁজিবাদের প্রসার। এই বেনে/বাড়ৈ/বৈষ্য/বনিকরাই বাঙলা বছরের প্রথম দিনে শুরু করলো তাদের বাণিজ্যের এক মহাৎসব। গ্রামে গ্রামে ধান কেটে নেয়া নারা বিছানো ন্যাড়া ক্ষেতে শুরু হলো ‘থৌল’। এ আজকের বৈশাখী মেলা নয়, সে এক অন্য জিনিস। দিগন্ত বিস্তৃত ন্যাড়া ক্ষেতের দু কূল দিয়ে সারি সারি দোকান দিয়ে বসেছে দশ গ্রাম থেকে আসা বাড়ৈরা; কোনটার মাথায় নারা কিংবা হোগলের ছাউনি, কোনটার মাথায় হয়তো তাও জোটেনি। তাতে কি? বেচা-বিক্রি বা আনন্দের কোন কমতি নেই। আর সেখানে কি নেই? নানান ধরনের, নানান রঙের হরেক রকম বাহারি পণ্যের পসরা। আর এই দুই সারি দোকানের মাঝে যে এক মাথা থেকে আরেক মাথা দেখা যায় না এমন লম্বা যায়গাটি সেখানেই হবে এই থৌলের প্রধানতম আকর্ষণ ‘ঘোড়ার দৌড়’। সে এক রুদ্ধশ্বাষ মুহূর্ত- যখন টগবগিয়ে রাঙা ধুলো উড়িয়ে ঘোড়াগুলো ছুটে যেত, যেন এক একটা পঙ্খিরাজ-বাধাহীন হয়ে উড়ে যেতে চায়। সেই রূপকথার পঙ্খিরাজ ঘোড়ার মতোই উড়ে উড়ে বেনেদের এই থৌল ছড়িয়ে পড়লো দিকে দিকে। এখানে শুধুই বাণিজ্য ছিলো না, ছিলো প্রাণের স্পন্দনও, ছিলো মানুষে মানুষে অকৃত্রিম ভালোবাসা। এই ভালোবাসায় ধর্ম-বর্ণ-গোত্র-জাতি ভেদ করেনি, ভেদ করেনি অর্থ-প্রতিপত্তি-সম্মান। ঈর্ষা করি আমাদের পূর্ব পুরুষদের। ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে করে সেই নাম না জানা কিংবদন্তি মেঠো মানুষদের। বৈষম্যহীনতা যাদের রক্তে ছিলো, ছিলো সাম্যের চেতনা।
যে বেনেদের হাতে পুঁজিবাদের উন্মেষ ঘটেছিলো তারা ছিলো মানুষ, আজকের বেনেরা মানুষ না। তবে কি জন্তু না দানব? না, তাও না; যন্ত্র! যন্ত্র থেকে যন্ত্রদানব! Profit Maximization Policy-এর কর্পেোরেট দুনিয়ায় আজ সব কিছু পণ্য। বন্ধু, আজ তুমি-আমি-আমরা যন্ত্রের হাতে পরে এক একটা পণ্যে পরিণত হয়েছি। আমারা সব কিছুই দেখি- বুঝি না, বুঝি- ভাবি না, আর ভাবলেও কিছু করি না। আমরা এখন চোখ বুজে দেখি, কান চেপে শুনি, মুখ বেধে আধো আধো কথা বলি। ভাবি কি? একেবারেই ভাবি না। আমাদের ভাবনাগুলো অন্যরা ঠিক করে দেয়, আমরা কেমন স্বপ্ন দেখবো তাও বাজারে কিনতে পাওয়া যায়। আর এই কর্পোরেট বেনেদের প্রধান লক্ষ্য সমাজের অগ্রবর্তী চিন্তাশীল অংশ মধ্যবিত্তের চেতনা দখল করা এবং বিক্রি করা-চড়া দামে। আজ আমরা তাই একদিনের বাঙ্গালী সাজি, পান্তা-ইলিশ বিলাসিতায় সুখি হয়ে আহা মরি! আহা মরি! ঢেকুর তুলি বাঙ্গালীপনায়। হ্যা, এগুলো বাঙ্গালীপনাই- বাঙ্গালীয়ানা নয়।

আমাদের ইতিহাস আজ পুস্তক বন্দি, তাও কিছুটা বিকৃত-কিছুটা বিক্রিত; আমাদের ঐতিহ্য আজ লটকে আছে জাদুঘরের নোনা দেয়ালে; আমাদের কৃষ্টি নিয়ে চলছে অনাসৃষ্টি; আমাদের সংস্কৃতি আজ মিডিয়া ব্যাপারিদের হাতে পরিচালিত। সেখানে সংস্কৃতি যতটুকু চর্চা করা হয় তার থেকে বেশি পণ্য আকারে প্রচার করা হয় বিজ্ঞাপনে। আম জনতা বাঙ্গালী সংস্কৃতির খোজে দূর দেশে হাতড়ে মরে- স্বস্তি পায় না, শান্তি পায় না। ই-টিভি বাংলার বাঙ্গালীয়ানা যে ষোলআনা নয়- স্বস্তি কেন পাবে? জীবন মানেই যে জি বাংলা নয়- শান্তি কেন পাবে?

আমি জানি আমার ছোট্টবেলাকে কেউ ফিরিয়ে দিতে পারবে না, সেটা জৈবিকভাবেই সম্ভব নয়। কিন্তু ছোট্টবেলায় দেখা লক্ষণ দাসের সার্কাস বা সোহরাব-রুস্তম, মহুয়া পালা যাত্রাগানকে কেন হত্যা করা হলো ধিরে ধিরে। এটা ঠিক যুগ পাল্টাবে, এগিয়ে যাবে; বায়োস্কোপের স্থানে আসবে সিনেপ্লেক্স। তবে তা কি হতে হবে নিজেকে শিকড় ছিন্ন করে। পাখিও তো উড়তে উড়তে কোন এক সময়ে মাটিতে দাঁড়ায়, নিজেদের পায়ের তলার মাটি সরিয়ে দিয়ে আমরা কি সত্যিকারেই উপরে উঠতে পারবো? মাটি সরাতে সরাতে একদিন সেখানে তৈরি হবে অতল গহ্বর, আর একদিন আমরা হুমড়ি খেয়ে পরে যাবো নিজেদেরই তৈরি সেই অতল অন্ধকারে। কর্পোরেট বৈশাখের হর্তা-কর্তারাও সেটাই চায়। তারাই আমাদের শিখাচ্ছে ‘দুনিয়াটা সস্তা বড়/খাও-দাও ফুর্তি কর’, তারাই আমাদের বোঝাচ্ছে ‘টাকা যার শিক্ষা তার’। চারিদিক থেকে চেপে আসছে রক্ত চোষক জোকের মতো। প্রয়োজন এখন জোকের মুখে নুন দেয়ার।

জোকের মুখে নুন নয় আমাদের ইতিহাস সাহসের সাথে খুন দেয়ার। আমাদের শক্তি সোনালী ধানে কৃষক পিতার হাসি, আমাদের সাহস গার্মেন্টস কর্মী বোনের নিঃস্কম্প হাত, আমাদের মনোবল প্রবাসী শ্রমিকের ক্লান্তিহীন ঘাম। রমনার অশ্মত্থ (বটমুল) আমাদের পায়ের নিচের শক্ত মাটি, অপরাজেয় বাংলার বটতলা আমাদের দৃপ্ত স্লোগানের অনুপ্রেরণা, বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রা আমার ক্ষিপ্ত চিৎকার, বাঙ্গালীর উৎসব প্রিয়তা আমাদের অস্ত্র। মোদের আছে গ্রাম বাঙলার লোকায়ত দর্শন, সহজিয়া লালন, হাসন রাজা-শাহ আব্দুল করিমের গান, রবীন্দ্র-নজরুল-সুকান্তের দ্রোহ, রোকেয়া-প্রীতিলতার দিক্ষা, জয়নুল-সুলতানের স্বপ্ন চিত্রকল্প। আর আছে তারুণ্য।
এই তারুণ্যকে লড়তে হবে অনেক কিছুর বিরুদ্ধে। কারণ, আমাদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে লুকিয়ে আছে সামন্তবাদী জীর্ণ মানসিকতা, আমাদের রক্তের স্রোতে মিশে আছে পুঁজির ভোগবাদি জড়তা, আমাদের অস্তি মজ্জায় বিষ ছড়াচ্ছে স্বৈরতান্ত্রিক কপটতার। নতুন করে আমরা ডুবে যাচ্ছি ধার করা পাশ্চাত্য চেতনার গ্লানিতে। আর তাই সকল শক্তি-সাহস-প্রেরণা-দিক্ষা-জ্ঞান-প্রজ্ঞাকে কাজে লাগিয়ে এই জীর্ণতাকে ভাঙতে শুরু হোক নুতনের জয়গান।

গেয়ে ওঠো ঐকতানে-
‘রক্তে আনো লাল-
রাত্রির গভির বৃন্ত থেকে ছিঁড়ে আনো ফুটন্ত সকাল।’
শুভ নববর্ষ।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on “শুরু হোক নুতনের জয়গান…

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

3 + 2 =