ইঞ্জিনিয়ারিং ইজ মাই প্যাশন (২য় পর্ব)- গণিত কাব্য!

গণিতের প্রতি আমার আগ্রহ ছোটবেলা থেকেই। উপমহাদেশে নাকি এক সময় গণিত ছিল একটা ভয়ের নাম! শুনেছি বাঙালিরা, বিশেষতঃ “বাঙালি মুসলিমরা গণিত পড়ে না কারণ তাদের মেধা কম” এরকম একটা ব্যঙ্গার্তক ধারণা বদলে দিতেই শের-এ-বাংলা এ.কে ফজলুল হক প্রথম বাঙালি মুসলিম হিসেবে গনিতে অনার্স মাস্টার্স করেছিলেন। সেই ধ্যান ধারণা যে নব্বইয়ের দশকেও খুব একটা পরিবর্তন হয়েছিল এমন না। ছোটবেলা স্কুলের বা বাড়ির বড়দের ও গৃহশিক্ষকের কাছে বহুবার এরকম কথা শুনেছি- ভাল ছাত্ররা নাকি অংকে ভাল হয়… কিংবা যে অংকে ভাল তার মেধা আছে বুঝতে হবে!

গণিতের প্রতি আমার আগ্রহ কি নিজেকে মেধাবী প্রমাণ করার জন্য শিশু মনে গেঁথে গিয়েছিল কিনা ঠিক জানা নেই তবে ক্লাসে যখন অংক করাতো আমি বরাবরই নিজের জীবনের সাথে সেগুলো মিলিয়ে নিতাম। আর মিলিয়ে নিতে পারতাম বলেই আমার কাছে মনে হতো পড়ালেখার অন্য কোন বিষয় জীবনে কাজে লাগুক না লাগুক অংক অবশ্যই কাজে লাগে! গণিত ভাল লাগতো ঠিক সে কারণেই।

ক্লাস ওয়ান-টুতে থাকতে যোগ বিয়োগের অংক করার সময় আমাকে শেখানো হতো এভাবে- তোমার কাছে ৫টা চকোলেট আছে, আম্মু আরো ২টা দিলে কয়টা হবে?

আমার শিশু মন কল্পনায় এতোগুলো চকোলেট দেখে চোখ চক চক করে গুনে বলতো- ৭টা!
এবার বল- সেখান থেকে ভাইয়াকে ৩টা দিয়ে দিলে কয়টা থাকবে?
দিয়ে দেবার জ্বলুনিতে কিঞ্চিত মন খারাপ করে বলতাম- ৪টা।
অংক করতে করতে সত্যি সত্যি চকোলেট পাইনি বটে কিন্তু যোগ বিয়োগের নিয়মটা মনে গেঁথে গেছে আজীবনের জন্য!

তারপর যত বড় হয়েছি, গুণ-ভাগ, শতকরা, গড় যা-ই শিখেছি, সব সময়ই চেষ্টা করতাম সেটা বাস্তব জীবনের সাথে মিলিয়ে নিয়ে করতে। প্রাইমারী স্কুল জীবনে তাই গণিত নিয়ে ভয় ছিল না কোনদিন। কিন্তু ঝামেলা বাঁধলো ক্লাস সিক্সে উঠে বীজ গণিত নিয়ে! a b c x y z… ছোটবেলায় তো একবার পড়েছি ইংরেজিতে, আবার অংকে কেন!?

সেটাও সহজ হয়ে গেল যখন দেখলাম কিছুই না, শুধু a কে আপেল, b কে কলা আর c কে চকোলেট মনে করে নিলেই হয়, বাকি সব সেই ক্লাস টু-থ্রির নিয়মই। ব্যস, ভেঙ্গে গেল গণিতের ভয়! আর এই ভয় যিনি ভেঙ্গে দিয়েছিলেন তিনি আমার গৃহ শিক্ষক জি.এম. শরীফ স্যার। জীবনে এতোদূর লেখাপড়া করার অভিজ্ঞতা থেকে একটা জিনিস খুব প্রকটভাবে টের পেয়েছি- কোন ছাত্র যদি তার জীবনে উপযুক্ত সময়ে একজন ভাল গণিতের শিক্ষক না পায় তাহলে গণিত-এর দূর্বলতা সে সারাজীবনেও ঘুচাতে পারে না।

শরীফ স্যারের সাথে এখনও কাল ভদ্রে আমার দেখা হয়ে যায়। আমাদের এলাকাতেই থাকেন তিনি। বর্তমানে উনি একটা কিন্ডার গার্টেন স্কুলের প্রধান শিক্ষক। ওনার কাছে আমি প্রাইভেট পড়েছিলাম সর্বসাকুল্যে এক বছর, কিন্তু এখনও দেখা হলে ডেকে খোঁজ খবর নেন। এর একটা বিশেষ কারণও আছে বলে আমার ধারণা… একটা ঘটনা বললে ব্যাপারটা পরিস্কার হবে হয়তো।

হাই স্কুল জীবনে আমি সাইকেল চালিয়ে স্কুলে যেতাম। স্যারের সাথে কখনও রাস্তায় দেখা হয়ে গেলে আমি সাইকেল থেকে নেমে দাঁড়িয়ে সালাম দিতাম এবং যতক্ষণ স্যার দৃষ্টির আড়াল না হতেন ততক্ষণ সাইকেলে উঠতাম না! ব্যাপারটা স্যার প্রথম প্রথম ঠিক খেয়াল করেননি, যেদিন প্রথম খেয়াল করলেন সেদিন ভিষণ অবাক হয়েছিলেন। আমাকে ডেকে বলেছিলেন- তুমি সাইকেলের হ্যান্ডেল ধরে এভাবে হাঁটছো কেন? তোমার দেরী হয়ে যাচ্ছে না! চালিয়ে চলে যাও…

আমি বিনয়ী হেসে বলেছিলাম- সমস্যা নেই স্যার…

– সেদিনও দেখলাম আমি চলে যাবার পর তুমি ঠিকই সাইকেলে উঠলে। কে শিখিয়েছে তোমাকে এটা?

– আম্মু শিখিয়েছে স্যার। আম্মু বলেছে শিক্ষকদের সামনে দিয়ে সাইকেল-রিক্সা বা ঘোড়ায় চড়ে বসে থাকা বেয়াদপির সামিল…
স্যার আর কোন কথা বলেননি। স্নেহবৎসল হাসি দিয়ে চলে গিয়েছিলেন।

সেদিনও অনেকদিন পর স্যারের সাথে অটোতে দেখা। আমার খোঁজ খবর নিলেন, কোথায় চাকরি করি, পড়ালেখা কোন পর্যন্ত কোথায় কিভাবে করেছি এসব জিজ্ঞেস করলেন। নামার সময় আমি তাকে অটোর ভাড়া দিতে দিলাম না, বললাম- স্যার, আপনাদের দোয়া-আশির্বাদে এতোটুকু এসেছি, এইটুকুই নাহয় করি অন্তত…
স্যারের চোখে সেই স্নেহবৎসল হাসিটাই দেখলাম সেদিনও! এই হাসিটার অনেক দাম…

কিছু শিক্ষা কোন প্রতিষ্ঠান থেকে পাওয়া যায় না। এগুলো মানুষ শেখে পরিবার থেকে। আমার মায়ের নিজের খুব একটা একাডেমিক শিক্ষা নেই। কিন্তু উনি আমাদের দুই ভাইকে এমন কিছু বাল্যশিক্ষা ব্রেইনে গেঁথে দিয়েছেন যা আমি আজকাল অনেক শিক্ষিত মায়ের সন্তানদের ভেতরও দেখতে পাই না। MBA ক্লাসে আমার যারা সহপাঠী আছেন তারা একটা ব্যাপার খেয়াল করেছে কিনা জানি না, ঘটনাটা এরকম-আমাদের “ফিন্যান্সিয়াল একাউন্টিং” সাবজেক্টের শিক্ষক এ.সি. সাহা একজন স্বাস্থ্যবান মানুষ। ক্লাস রুমে শিক্ষকদের বসার জন্য চেয়ার আছে কিন্তু কোন শিক্ষকই ক্লাস নেবার সময় তাতে বসেন না। এ.সি. সাহা যে শুধু বসেন তা-ই না, সারা ক্লাস বসে বসেই করান এবং সাধারণ চেয়ারেও ওনার হয় না। ওনার জন্য স্পেশাল (বড়) চেয়ার বরাদ্দ আছে। এই চেয়ারটা উনি যখন যে ক্লাসে যান পিয়নও সেই ক্লাসে ওনার সাথে সাথে নিয়ে যায়। কিন্তু শুক্রবার সন্ধ্যায় যখন উনি আমাদের ক্লাসে আসেন প্রায়ই পিয়নটাকে খুঁজে পাওয়া যায় না অন্য ক্লাস থেকে চেয়ার নিয়ে আসার জন্য! ক্লাস রিপ্রেজেন্টেটিভ হিসেবে এই কাজটা তখন আমিই করি এবং যথেষ্ট আগ্রহ নিয়েই করি। প্রতিবারই স্যার হা হা করে উঠে বলেন- তুমি কেন! পিয়ন নাই?

আমি বিনয়ী হেসে বলি- সমস্যা নেই স্যার! পিয়নকে দেখছি না আশপাশে, তাই…
মজার ব্যাপার, আমি তখন এ.সি. সাহার চোখেও সেই একই রকম স্নেহবৎসল হাসি দেখতে পাই…
এই হাসিটা সত্যি অমূল্য!

আমার ছাত্র জীবনে ২য় যে গণিত শিক্ষকের নাম উল্লেখযোগ্য তিনি হচ্ছেন মমসা কোচিং এর স্বত্বাধিকারী ফরিদ স্যার। ফরিদ স্যারের কোচিং-এ আমার যাত্রা শুরু ক্লাস নাইনে উঠে। এস.এস.সি পর্যন্ত ছিলাম এবং ইনি আমাদের সবার জীবন গণিতের অত্যাচারে ভাজা ভাজা করে দিয়েছিলেন! ওনার বক্তব্য ছিল- ফরিদ স্যারের ছাত্ররা অন্য সব বিষয়ে ফেল করুক কিন্তু অংকে এ প্লাস মিস করা যাবে না।

দুই বছর পড়ানোর পর ভীষণ কৃপণ এই লোকটা আমাদের ভেতর এই বিশ্বাস বদ্ধমূল করতে সক্ষম হয়েছিলেন যে- বাংলাদেশে যদি এবছর এস.এস.সি পরীক্ষায় একটা ছেলেও সাধারণ গণিতে এ প্লাস পায় সে হচ্ছি আমি!

দুই বছরের ১০৪টি শুক্রবারে টেস্ট পেপার থেকে গণিতের ফুল সিলেবাসের ওপর প্রায় ১০০ বার মডেল টেষ্ট দেবার পর যেকোন ছাত্রেরই এরকম আত্মবিশ্বাস তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক। তবে স্যার আমাদের যে জিনিসটা উপলব্ধি করিয়েছিলেন সেটা হলো- অংকে দক্ষ হবার কোন শর্ট-কাট পদ্ধতি নাই। একমাত্র প্রচুর প্রচুর অধ্যাবসায়ই পারে এই বিষয়ে নিজেকে দক্ষ করে গড়ে তুলতে।

গণিত পছন্দের বিষয় বলেই হয়তো বরাবরই গণিত শিক্ষকরা আমার প্রিয় হয়ে ওঠেন। ডিপ্লোমা পড়ার সময়ও এরকম হলো। পরিমিতি আমার বরাবরই প্রিয় কারণ বাস্তব ক্ষেত্রে এর ব্যবহার ব্যাপক! তো ডিপ্লোমা ২য় সেমিস্টারে থাকতে একদিন গণিত শিক্ষক আব্দুর রহমান স্যার ক্লাসে এসে কোন কথা না বলে চুপচাপ ডেস্কে দাঁড়িয়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে রইলেন টানা দুই মিনিট!সাধারণতঃ স্যার ক্লাসে এসে আগে হাজিরা ডাকেন তারপর বোর্ডে চলে যান। আজকে এই ভিন্নরূপ দেখে আমরা সবাই যখন মুখ চাওয়া চাওয়ি করছি তখন উনি শুরু করলেন গল্প!

– বুঝলে? গ্রামের বাড়িতে গিয়েছিলাম একটা কাজে। জমি জমা সংক্রান্ত ঝামেলা! বাপ-দাদার পৈতৃক জমি, এতো বছর ধরে চাষ-বাস করছি কোন সমস্যা নাই… হঠাৎ সেদিন শুনি প্রতিবেশী আমাদের জমির ওপর ক্ষেতের আইল দিয়েছে! গিয়ে তো বিরাট ঝগড়া; কথায় কথায় কথা কাটাকাটি… উনি বলে ওনার জমির সীমানা এই পর্যন্ত, আমরা বলি ঐ পর্যন্ত। এতো দিনের সুসম্পর্ক ভেঙ্গে এক পর্যায়ে মারামারি লাগার জোগাড়!

গল্পের গন্ধ পেয়ে ক্লাসের সবচেয়ে অমনোযোগী ছাত্রটাও বড় বড় চোখ করে বললঃ তারপর?
সবার মনোযোগ আকর্ষণ করতে পেরে স্যার মুচকি হেসে বললেনঃ তারপর আর কী! বিচার সালিশ করে শেষে আমিন ডেকে জায়গা মেপে একটা সুরাহা করা হলো। উনিও খুশি আমরাও খুশি, মারামারি-জখমের হাত থেকে বেঁচে গেলাম দুই পক্ষই।
আমরা সমস্বরে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। যেন মারামারিটা এখানেই লাগতে বসেছিল আরেকটু হলে…!

স্যার আবার শুরু করলেন- কিন্ত… তারপর থেকে একটা কথা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে…
আমরা আবার কৌতুহলী- কী স্যার?

– কথাটা হলো, আমি একজন মাস্টার্স কমপ্লিট গণিতের শিক্ষক, জমির মাপটা আমি বের করতে না পেরে রিতিমত মারামারি করতে যাচ্ছিলাম লুঙ্গি কাছা দিয়ে, সেখানে আমার গ্রামেরই সেদিনকার এক ছ্যাঁমড়া, ইন্টার পাস করে ৩/৪ মাসের একটা “আমিনশীপ” কোর্স করে কী এমন হিসাব নিকাশ শিখে গেল যে আমাদের জমি মেপে দিয়ে ঝামেলা মিটিয়ে গেল, টাকাও নিয়ে গেল এক গোঁছা! এই জিনিসটা শেখা দরকার না?

আমরা সানন্দে হর্ষধ্বণি করে উঠলাম- জ্বি স্যার…!
এবার স্যার চক নিয়ে বোর্ডে গেলেন- আচ্ছা বলতো, জমিটা যদি আয়তাকার হতো, তাহলে এর ক্ষেত্রফল কী হতো?
আমরা কে কার আগে বলবো এরকম একটা প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব নিয়ে বললাম- ভুমি X উচ্চতা!
-গুড! কিন্তু সমস্যা হলো- আমাদের জমিটা তো এরকম পারফেক্ট আয়তাকার না! এক কোণা এরকম বাঁকা… এটার ক্ষেত্রে কী হবে?
আমরা সবাই একে অপরের মুখ চাওয়া চাওয়ি করে মাথা চুলকাতে লাগলাম… এইটা তো স্যার…
স্যার হেসে বললেন- গাণিতিক ভাবে এটাকে বলে ট্রাপিজিয়াম… আজ আমরা ট্রাপিজিয়ামের অংক করবো। জমি নিয়ে মারামারি রোধ করতে হলে এই অংক জানা খুব জরুরি!
পুরো ক্লাসের সবাই হাসিতে ফেটে পড়তে পড়তে খাতা বের করলো এবং অনেকদিন পর এতো আগ্রহ নিয়ে ক্লাসের সবগুলো ছাত্র কোন অংক ক্লাস করলো!

শিক্ষকতা একটা মহান পেশা। কিন্তু আমি মনে করি একজন শিক্ষককে মহৎ হওয়া যতটা জরুরি তারচেয়েও অনেক বেশি জরুরি কৌশলী হওয়া। বিশেষ করে তিনি যদি হন গণিতের মত একটি জটিল বিষয়ের শিক্ষক। ফজলুল হক-এর পর এদেশে আরও হাজার হাজার মানুষ গণিতে অনার্স-মাস্টার্স-পিএইচডি পর্যন্ত করেছে। এদেশে এখন বাচ্চা বাচ্চা ছেলেমেয়েরা গণিত অলিম্পিয়াড-এ গিয়ে সোনার মেডেল জেতে। অনেকের মাথাতেই এখন গণিত বোঝার মত যথেষ্ট মেধা আছে… কিন্তু একজন সম্পূর্ণ শূন্য ধারণা সম্পন্ন ছাত্রকে পরিপূর্ণ মনোযোগ আকর্ষণ করিয়ে স্পষ্ট ভাবে গণিত শেখাতে পারে এমন চৌকষ শিক্ষক কয়জন আছে?

আমি আমার জীবনে এরকম শিক্ষক খুব কমই পেয়েছি। এদের মধ্যে একজনের নাম না বললেই নয়; আব্দুস সাত্তার টিটু স্যার। বি.এস.সি করার সময় আমাদের ম্যাথ রিলেটেড ৪টা সাবজেক্ট এর মধ্যে আমি সৌভাগ্যক্রমে ৩টা সাবজেক্টেই ওনার ক্লাস পেয়েছিলাম। এটা রিতিমত ভাগ্যের ব্যাপার বলা যায়… কারণ একই সেকশনে সাধরণত ওনার ক্লাস একাধিক বার পড়তো না। আমি পেরেছিলাম কারণ আমি একাধিক সেকশন থেকে টীচার দেখে বেছে বেছে সাবজেক্ট নেবার সুযোগ পেয়েছিলাম। এবং ভার্সিটি লাইফের সবচেয়ে বেশি আগ্রহ নিয়ে যে ক্লাসগুলো করেছি তার মধ্যে এই তিনটা সাবজেক্টের ক্লাস অন্যতম…!

সেদিন এক বন্ধুর প্রয়োজনে সার্টিফিকেট সংক্রান্ত কিছু কাজ নিয়ে অনেকদিন পর ভার্সিটিতে গিয়েছি। ফর্মের ওপর ডিপার্টমেন্ট চেয়ারম্যান এর স্বাক্ষর দরকার। চেম্বারে গিয়ে শুনি চেয়ারম্যান স্যার অবসরে আছেন, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান এর কাছে যেতে হবে। তিনি এখন আগের কো-অর্ডিনেটর স্যারের চেম্বারে বসেন। ফেসবুকের কল্যাণে যদিও খবরটা আগেই পেয়েছিলাম, তবু চেম্বারে গিয়ে আরেকবার মনে পড়লো আমাদের প্রিয় টিটু স্যারই এখন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান এর দায়িত্ব পালন করছেন। ঐ চেয়ারটায় স্যারকে দেখে খুব ভাল লেগেছে সত্যি। He Really Deserve It!

ভেতরে লোক ছিল, স্যার তাদের সাথে কথা বলছিলেন। আমি ভেতরে ঢুকার অনুমতি চাওয়ায় প্রথমেই বললেন- একটু পরে আসেন।
তারপরই হঠাৎ মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন- ও আচ্ছা, তুমি বোধহয় কোন ফর্ম নিয়ে আসছো, না? আসো আসো…
আমি সালাম দিয়ে ভেতরে ঢুকতেই আমার হাত থেকে ফর্মটা নিতে নিতে বলল- কী মিয়া, একা একাই সুন্দরবন ঘুরে আসলা, আমাদের সাথে নিলা না!

জীবনে খুব কমই এরকম অনুভূতি হয়েছে আমার। একই সাথে প্রচণ্ড অবাক এবং আনন্দের অনুভূতি… কিছুটা গর্বেরও! দুই বছর আগে পাশ করে বের হয়েছি, তাও আবার ইভেনিং শিফটের ছাত্র! ভার্সিটির যে দারোয়ানের সাথে রোজ দেখা হতো, সেও এখন চেহারা ভুলে গেছে… গেট দিয়ে ঢুকতে গেলে বলে- কোথায় যাবেন? আইডি কার্ড দেখান! সেখানে কত আগে করা ম্যাথ ক্লাসের টিচার এখনও আমাকে মনে রেখেছেন এটাই তো অনেক! তারওপর আবার স্রেফ ফেসবুক স্ট্যাটাস থেকে সুন্দরবন যাবার খোঁজ খবর রাখা… যে লোকটা কিনা বর্তমানে ডিপার্টমেন্ট এর (ভারপ্রাপ্ত) চেয়ারম্যান! স্যার যে ফেসবুকে আদৌ ঢুকে সেটাই বোঝা যায় না ওনার টাইম লাইন দেখে… নিঃসন্দেহে এটা অনেক বড় একটা পাওয়া আমার জন্য। I’m really honored…

গণিত দিয়ে শুরু করে এক বসায় অনেক কথা বলে ফেললাম। শেষ করবো আরেকজন শিক্ষককে দিয়ে। আমাদের MBA প্রোগ্রামের Quantitative Business Analysis কোর্স টিচার ডক্টর নূর হোসেন মোঃ আরিফুল আজিম। সদা হাস্যজ্জ্বোল ছোটখাট মানুষটা খুব ভাল করে জানেন কিভাবে গণিত নিয়ে আলোচনা করতে হয়। উনি ঠিক সেই জিনিসগুলোই আলোচনা করেন যে জিনিসগুলো সম্পর্কে আমাদের ধারণা অস্পষ্ট! নইলে প্রথমদিন যখন ক্লাসে লিনিয়ার ইকুয়েশন পড়াচ্ছিল তখন মনে হয়ে ছিল ইঞ্জিনিয়ারিং এ বি.এস.সি করার পর এই বুড়ো বয়সে আবার এই X অক্ষ Y অক্ষ, বিন্দু গুনে গুনে গ্রাফ পেপারে রেখা আঁকা… এগুলো করতে হবে!? এগুলোতো সেই মেট্রিক পরীক্ষার সময় করে এসেছি! এই লেভেলে এসে আবার কেন? বাস্তব জীবনে কি কাজে আসবে এগুলো আদৌ?

কিন্তু ভুল ভাঙতে সময় লাগেনি। স্যার ঠিক ঠিক সেই বিষয়গুলোই তুলে আনলেন যে প্রশ্নগুলো আমাদের মনে আসি আসি করছিল! ক্লাসে উনি প্রায়ই একটা কথা বলেন- আপনারা নিশ্চয়ই এখন মনে মনে ভাবছেন, এটা কিভাবে হলো? বা এটা কেন দরকার? উত্তরটা হলো…

আমাদের মনের ভাবনা স্যার এতো নিখুঁতভাবে কিভাবে বুঝতে পারে সেটাও বলেদিয়েছেন স্যার নিজেই! সেদিন বললেন- আপনাদের মনে নিশ্চয়ই প্রশ্ন আসে, স্যার আমাদের মনের কথা কিভাবে জানে! তাই না?
আমি জানি কারণ, আমিও ঠিক আপনার জায়গাতেই ছিলাম। হুবহু এই প্রশ্নগুলোই আমার মনেও আসতো কিন্তু আমাকে কোন স্যার সেটার উত্তর স্পষ্ট করে দিতে পারেনি। আর ঠিক সেজন্যই আমি জানি কোন জায়গাটায় আপনাদের ধরিয়ে দেয়া দরকার। নইলে আমি যা পড়াচ্ছি তার সবকিছুই আপনারা অতীতে বহুবার পড়ে এসেছেন! এখন আবার কেন আলোচনা করছি? কারণ আমি জানি অতীতেও আপনারা ঠিক এই জিনিসগুলোই না বুঝে পড়েছেন বলেই এখনও এগুলো সম্পর্কে ধারণা স্পষ্ট না! এখন স্পষ্ট ধারণা নিয়ে যান, জীবনে আর ভুল হবে না!

আরিফ স্যার তাঁর নিজের জীবনের ইতিহাসও বলেছিলেন ক্লাসেই। কিভাবে কেন এতো সাবজেক্ট থাকতে গণিতকেই বেছে নিলেন।

এস.এস.সি-এর টেষ্ট পরীক্ষার সময় স্যার অন্য সব সাবজেক্টে যাও উৎরে গেলেন ম্যাথ-এ পেলেন কোন রকমে পাশ মার্ক! হেড মাস্টার তাঁর গার্ডিয়ানকে ডেকে বললেন, ম্যাথ-এ এতো কম নাম্বার পাওয়া ছেলেকে আমরা এস.এস.সি দিতে দেব না! স্কুলের মান ইজ্জত ডুবাবে…

স্যারের গার্ডিয়ান অনেক বলে কয়ে মিনতি করে কোন রকমে রাজি করালেন। শর্ত হলো মডেল টেষ্টে ভাল মার্কস পেয়ে দেখাতে হবে! বাসায় এসে স্যারের একটা জেদ চেপে গেল- “আমি তো ছাত্র এতো খারাপ না! এমন না যে ম্যাথ বুঝি না, মার্ক কম পাই বরাবরই… বরং ম্যাথ-এ তো সাধারণতঃ লেটার মার্কসই থাকে! আমি কেন ম্যাথ-এ টেনেটুনে পাশ করবো আর সেজন্য আমার গার্ডিয়ান সহ গিয়ে তদবীর করতে হবে স্রেফ এস.এস.সি ফাইনাল দেবার জন্য…!”

সেদিন থেকে উনি সিদ্ধান্ত নিলেন, ম্যাথ-এ কী আছে সেটা উনি দেখে ছাড়বেন। শুরু করলেন গণিত-এর প্রতিটি অধ্যায় রিডিং পড়া! এবং একটা মজার ব্যাপার আবিষ্কার করলেন- অন্য সব সাব্জেক্টে আমরা আগে একটা চ্যাপ্টার-এর টপিক পড়ি, তারপর সেটার অনুশীলনে গিয়ে প্রশ্নোত্তর পড়ি। কিন্তু গণিত হচ্ছে একমাত্র সাবজেক্ট যেখানে টপিক না পড়ে সরাসরি অনুশীলন করানো হয়। এবং এটা আমাদের দেশে খুবই কমন প্র্যাকটিস! এদেশে সম্ভবতঃ একজন ছাত্রও পাওয়া যাবে না যার ক্লাসে আগে গনিত-এর চ্যাপ্টার পড়ানো হয়েছে পরে অংক করতে দেয়া হয়েছে। আমরাও মিলিয়ে দেখলাম- ঘটনা চরম সত্য! আর এজন্যই আমরা শুধু সূত্র মুকস্ত করি আর গাণিতিক সমস্যা সমাধান করি… কিন্তু কখনও বুঝতে পারি না সূত্রটা আসলো কোথা থেকে, কেনই বা আসলো আর এই সূত্র বা অংক আমাদের জীবনে কী কাজেই বা লাগবে!

আরিফ স্যার বলেন- এরপর থেকে আমি জীবনে কখনও কোন ম্যাথ চ্যাপ্টার না পড়ে করিনি। আর সেকারনেই আমি জানি আপনারা কী জানেন না! কারণ আমিও ঠিক ওটাই জানতাম না এক সময়…
আমার মনে আছে, বি.এস.সি করার সময়ও আমি ইন্টিগ্রেশন-এ লিমিট-এর ম্যাথ করেছি এবং তাতে এ-প্লাসও পেয়েছি। তখনও জানতাম ইন্ট্রিগ্রেশন দিয়ে আসলে কোন একটা অজানা ক্ষেত্রের ক্ষেত্রফল বের করা যায়। কিন্তু সেটা কিভাবে তা খাতায় এঁকে দেখিয়ে বুঝিয়ে দেয়নি কেউ কোনদিন। ফেসবুকে একদিন গাজি ফাতিহুন নূর (পুলক)কে দেখলাম এই মর্মে একটা বিরাট জ্ঞান গর্ভ পোস্ট দিল! পোস্টের আগামাথা তেমন না বুঝলেও এটা বুঝলাম যে সে খুব ভাল ভাবে ডিফারেন্সিয়াল ক্যালকুলাস ও ইন্ট্রিগেশন আয়ত্ত্ব করেছে। সাথে সাথে ওকে ফোন দিয়ে বললাম- আমাকে ডিফারেন্সিয়াল-ইন্টিগ্রেশন শেখা!
পুলক বলল- কেরানীগঞ্জ চলে আসেন। প্রকৃতির মধ্যে গণিত শিক্ষা অত্যন্ত ফলপ্রসূ!
শেখার ব্যাপারে আমার আগ্রহ প্রচুর তাই বয়সে ও ক্লাসে ছোট হওয়া সত্যেও প্রচন্ড মেধাবী এই ছেলেটার কাছে গণিত শিখতে আমি সত্যি সত্যি ৩/৪ দিনের জন্য তল্পিতল্পা গুছিয়ে রওয়ানা হলাম কেরানীগঞ্জে ওদের বাসায়! রাসুল (সঃ) বলেছেন- জ্ঞান অর্জনের জন্য সুদূর চীন দেশে যাও… আমি ডিফান্সিয়াল-ইন্ট্রিগেশন শেখার জন্য কেরানীগঞ্জ যেতে পারবো না?

কিন্তু আমার সেই শিক্ষা সফর সাফল্যমন্ডিত হয়নি। ৪ দিন প্রকৃতির মাঝে থেকে ঝড়ের রাতে নদীতে ঝাপিয়ে পরা, সারা দুপুর খড় বিছানো মাঠে চিৎ হয়ে শুয়ে থাকা, সরু নদীতে ঝাপাঝাপি- নৌকা চালানো, রাতে বাউল গানের আসরে মজে যাওয়া… এমনকি আন্টির (পুলকের মা) নষ্ট হয়ে যাওয়া রাইজ কুকার মেরামত সহ সবই হয়েছে… শুধু গণিত শেখা হয়নি! আমি যেদিন গেলাম সেদিন থেকেই পুলকের গার্লফ্রেন্ডের সাথে কী একটা ঝামেলা চলছিল। পরদিন দেখলাম সে ব্রেক-আপ ট্রেক-আপ করে দেবদাস হয়ে বসে আছে, ডিফারেন্সিয়াল নিয়ে বসার মুড নাই! তার পরদিন সে সারাদিন নোটবুকে মুখ গুঁজে থেকে কী একটা উচ্চমার্গিয় গল্প লিখলো! তারও পর দিন মেজাজ একটু ভাল ছিল বলে আমার গণিত জ্ঞান যাচাইয়ের জন্য লীলাবতীর পদ্মপাতা ও পুকুরের পানির গভীরতা সংক্রান্ত একটা অংক করতে দিল… সেটা পারার পর খুশি মনে আমাকে ডিফারেন্সিয়াল ক্যালকুলাস শেখানোর ব্রত নিয়ে আঁট-ঘাট বেঁধে বসে কিছুক্ষণ কী কী সব হাবি জাবি বলে শেষে বলল- সফিক ভাই, আমি আপনারে ডিফারেন্সিয়াল বুঝাতে পারবো না… আমি নিজেও এখনও ভাল বুঝি না! আপনি বিদেয় হন তো…

সেই ডিফারেন্সিয়াল ইকুয়েশন এবং ইন্টিগ্রেশন আমাদেরকে বোর্ডে এঁকে হাতে কলমে শিখিয়েছন আরিফ স্যার। সেই X-অক্ষ Y-অক্ষ গ্রাফ পেপারে স্যার দেখিয়েছেন কিভাবে ইন্টিগ্রেশনের লিমিট দিয়ে একটা অজানা ক্ষেত্রের ক্ষেত্রফল বের করতে হয়! দেখিয়েছেন বাস্তব জীবনের সমস্যাগুলো থেকে ডাটা নিয়ে কিভাবে একটা ডিফারেন্সিয়াল ফাংশন তৈরি করতে হয় এবং কত সহজে ডিফারেন্সিয়াল ইকুয়েশন দিয়ে তা সলভ করা যায়! খুব তীব্রভাবে অনুভব করেছি- ব্যবহার জেনে সঠিক ও স্পষ্টভাবে শেখা গেলে পড়ালেখা জিনিসটা আসলেই কত্ত আনন্দের!!!

এতো কিছুর পর গণিতের প্রতি আমার ভালোবাসা আরো বহুগুণে বেড়ে গেছে। গণিতের জন্য এই ভালবাসা চিরজীবী হোক…!

– সফিক এহসান
১লা বৈশাখ ১৪২৩
(১৪ এপ্রিল ২০১৬)

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 38 = 42