অণুগল্প- ‘নাহ, এপ্রিলফুল ছিল না’

পাঁচ বছর আগের কথা। স্নিগ্ধার সাথে বেশ কিছুদিন থেকেই মনোমালিন্য চলছিল। অফিসের বাড়তি কাজ করে বসের মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টাটা যেনো রীতিমতো নেশা হয়ে গিয়েছিল। ভালো একটি ক্যারিয়ারের আশায় ছুটতে ছুটতে কবে যে স্নিগ্ধার সাথে সম্পর্কটায় অভিমান জমতে শুরু করেছিল বুঝতেই পারিনি। যেদিন রাতে ঘুমানোর আগে মনে হল, স্নিগ্ধা তো আজ একবারও ফোন করল না আমায়, বুকের বামপাশটা কেমন যেনো ছ্যাঁৎ করে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে এটাও মনে হল, আমিও তো ওর একবারো খোঁজ নেইনি। এক ধরণের অনুতাপে মনটা ভারী হয়ে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে ফোন দিলাম স্নিগ্ধাকে। ফোন রিং হচ্ছে তো হচ্ছেই, ধরার কোন নামগন্ধ নেই। ফোন যতবার রিং হচ্ছে আমার অস্থিরতা ততই বাড়ছে। বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছে স্নিগ্ধার আহ্লাদী কন্ঠটা- ‘এ্যাঁই, তুমি খাওয়ার কথা না বললে আমার খেতেই ইচ্ছে করে না, জানো?’ তাহলে কি স্নিগ্ধা না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়ল? ঘড়ির কাঁটার দিকে তাকালাম। ঘন্টার কাঁটা বারোটা পেরিয়েছে মিনিট বিশেক আগে। এতো রাতে ঘুমিয়ে পড়াটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। তবুও আমি ফোন দিয়েই চলেছি। অনুতাপে ভারী হয়ে ওঠা মনটাকে হালকা করতে পারছি না কিছুতেই। ফোন দিতে দিতে একসময় আমিও ঘুমের ঘোরে তলিয়ে গেলাম।

পরেরদিন ঘুম থেকে উঠেই ভাবলাম আজ অফিস যাবো না। ছুটি নেবো। আজ সারাদিন স্নিগ্ধার সাথে কাটাবো। একসাথে ঘুরব, গল্প করব, আইসক্রীম খাবো, বিকেল বেলা লেকের পানিতে দুজন নৌকা চালাবো। ভাবনায় ছেদ পড়ল মোবাইলের মেসেজ আসার শব্দ শুনে। আমি তড়িঘড়ি করে ফোনটা বালিশের নিচ থেকে বের করে হাতে নিলাম। দেখি স্নিগ্ধার মেসেজ। মেসেজটা খুলে দেখি স্নিগ্ধা লিখেছে ‘তোমার সাথে দেখা করতে চাই।’ আমিও তো তাই-ই চাচ্ছিলাম
আমি স্নিগ্ধাকে কফি শপে আসতে বললাম।

কফি শপে গিয়েই দেখি স্নিগ্ধা বসে আছে। চেহারায় এক ধরণের অস্থির অস্থির ভাব। এ কয়দিনে বেশ শুকিয়েছে। চোখের নিচেও কালি জমেছে। আমার অবহেলাতেই এমন হয়েছে, ভাবতেই ভেতরটা দুমড়েমুচড়ে যেতে লাগল। কোনমতে নিজেকে ঠিক করে স্নিগ্ধার কাছে গিয়ে বসলাম। স্নিগ্ধা আমার দিকে তাকিয়ে চোখ মুখ শক্ত করে বলল, ‘ফয়সাল, আমি আর আমাদের সম্পর্কটা স্থায়ী করতে পারছি না। ভালো থেকো তুমি।’

আমি যেনো আকাশ থেকে পড়লাম! স্নিগ্ধা আমায় এই কথাটা বলবে, আমি কখনো ভাবতেই পারিনি। আমি কিছু বলার জন্য আমতা আমতা করতে লাগলাম। কিন্তু কোন কথাই আসছিল না মুখে। কথা শোনার ইচ্ছেও ছিল না স্নিগ্ধার। সে অপেক্ষা না করে চেয়ার থেকে উঠেই কফি শপ থেকে বেরিয়ে গেলো। কি করব, আমি কিছুই ভেবে পাচ্ছিলাম না। স্নায়ুশক্তি ক্রমেই দুর্বল হয়ে আসতে লাগল।

হঠাৎ মনে পড়ল আজ তো এপ্রিলের এক তারিখ। স্নিগ্ধা মনে হয় আমার সাথে মজা করছে। একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে স্নিগ্ধাকে ফোন দিলাম। ফোন বন্ধ। এবার রীতিমতো রাগ হতে লাগল আমার। কেউ এমন মজা করে নাকি? আমি আবার ফোন দিলাম। নাহ, ফোন বন্ধ।

দেখতে দেখতেই পাঁচ পাঁচটি বছর কেটে গেলো। আজও হঠাৎ হঠাৎই ফোন দেই স্নিগ্ধার নাম্বারে। একটা আশা, একটা বিশ্বাস। হয়তো বা স্নিগ্ধা ফোন ধরবে। ফোন ধরে বলবে, ‘আরে বুদ্ধু, ওটা তো এপ্রিল ফুল ছিল।’ কিন্তু নাহ, স্নিগ্ধা ফোন ধরে না। একবারও না। একবারও বলে না, ‘ওটা এপ্রিলফুল ছিল।’

বিশেষ দ্রষ্টব্য : আমার এই গল্পটি কোনোভাবেই এপ্রিলফুলকে সমর্থন করে না। এপ্রিলফুল গল্পে ব্যবহৃত একটি প্লট মাত্র।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

86 − = 85