রাজীব হায়দার হত্যা মামলা ও জঙ্গিদের জিহাদি জোশ

?resize=354%2C221″ width=”400″ />

২০১৩ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারি রাতে যখন ব্লগার স্থপতি রাজীব হায়দারকে হত্যা করা হয় শাহবাগে তখন রাজাকারের ফাঁসির দাবীতে উত্তাল লাখো জনতা। দেশের বিভিন্ন জায়গায় এমনকি বিদেশেও আন্দোলনের পক্ষে জনমত গড়ে উঠেছে। তার এক সপ্তাহ আগে থেকে জামায়াতের পত্রিকা আমার দেশ, নয়া দিগন্ত, সংগ্রাম ও ইনকিলাবে এই আন্দোলনের সংগঠকদের বিরুদ্ধে কুৎসা রটানো শুরু হয়।

১১ই ফেব্রুয়ারি শিবিরের সোনার বাংলা ব্লগে এই আন্দোলনের সাথে যুক্ত সংগঠকদের নামের তালিকা প্রকাশ করে তাদেরকে নাস্তিক আখ্যা দেয়া হয়। তালিকায় প্রথম নামটি ছিল রাজীবের। প্রতিটি টার্গেটের সাথে তাদের বাসার ঠিকানা, ফেসবুক লিংক দেয়া হয়। রাজীব খুন হবার পর জামায়াত-শিবিরের ফেসবুক পেইজ ও কয়েকটি সাইটে নূরানি চাপা ব্লগে থাবা বাবা’র নামে কিছু লেখা আছে মর্মে খবর বের হয়। পরে দেখা যায় সেসব লেখা রাজীব খুন হবার পর কেউ প্রকাশ করেছে।

১৬ই ফেব্রুয়ারি শাহবাগে হাজারো মানুষের উপস্থিতিতে রাজীবের জানাজা হয়। জানাজা পড়ানোর কারণে ইমামকে হত্যার হুমকি দেয় হিজবুত তাহরীর নেতা শফিউর রহমান ফারাবী।

সেদিন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তখনকার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এম কে আলমগীর রাজীবের বাসায় গিয়ে তার পরিবারের সদস্যদের সমবেদনা জানান। তখন প্রধানমন্ত্রী এই খুনের জন্য জামায়াত-শিবিরকে দায়ী করেন এবং বলেন এই দেশে জামায়াত আর কোনদিন রাজনীতি করতে পারবেনা। ১৭ই ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ শোক প্রস্তাব গ্রহণ করে।

সেসময় দৈনিক ইনকিলাব ও আমার দেশ রাজীবের নামে প্রকাশিত ভুয়া ব্লগ পোস্ট ছাপে। হাইকোর্টের বিচারপতি মিজানুর রহমান ভুঁইয়া সেই সব লেখা আদালতের বিভিন্ন বিচারক ও আইনজীবীদের মধ্যে প্রচার করে।

২২শে মার্চ ঢাকার বায়তুল মোকাররমসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় গণজাগরণ মঞ্চের সমর্থনে গড়ে উঠা মঞ্চে হামলা করে হাজার হাজার মুসুল্লি। তাদের দাবী ইসলাম, আল্লাহ ও নবীকে কটাক্ষকারী নাস্তিক ব্লগারদের ফাঁসি দিতে হবে। এর দুই সপ্তাহের মধ্যে জামায়াত-বিএনপির সহযোগী হেফাজতে ইসলাম অন্যান্য ইসলামী দলগুলোকে সাথে নিয়ে একই দাবীতে মাঠে নামে।

উল্লেখ্য, এসব কওমী মাদ্রাসাপন্থী সংগঠনগুলো যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ব্যাপারে সবসময় নীরব থেকেছে এবং রাজীব হত্যার পর আরো প্রায় এক ডজন ব্লগার ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবীতে সোচ্চার ব্যক্তি উগ্রবাদীদের হাতে খুন হয়েছেন।

দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে রাজীব হত্যা মামলার রায় আসে ২০১৫ সালের ৩১শে ডিসেম্বর। রায়ে একটি বিষয় স্পষ্ট যে, তদন্ত কর্মকর্তারা সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করেননি এবং উস্কানীদাতা হিসেবে অভিযুক্ত জসিম উদ্দীন রাহমানীসহ কোন কোন আসামীকে রক্ষা করতে চেষ্টা করেছেন। রায়ে পরিকল্পনাকারী হিসেবে পায় নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিবির নেতা রানা।

এই রানা আবার আমেরিকায় বোমা হামলার পরিকল্পনা করে ৩০ বছর কারাদণ্ডে দণ্ডিত কাজী মোহাম্মদ রেজওয়ানুল আহসান নাফিসের বন্ধু। তাছাড়া আসিফ মহিউদ্দীনের উপর হামলা এবং অভিজিত রায় ও রাফিদা আহমেদ বন্যার উপর গত বছরের হামলার পরিকল্পনাকারী হিসেবে অভিযুক্ত আসামী। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ তাকে ধরার জন্য ৫লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করলেও তাকে কেউ এখনো গ্রেপ্তার করতে পারেনি।

আসামীদের নাম-ঠিকানা ও শাস্তি:
১) রেদোয়ানুল আজাদ রানা, ৩০, পিতা- আবুল কালাম আজাদ, উত্তর জয়লস্কর, দাগনভুইয়া, ফেনী।
মৃত্যুদণ্ড ও ১০,০০০ টাকা জরিমানা।
২) মোঃ ফয়সাল বিন নাঈম দ্বীপ, ২২, পিতা- মোঃ আবু নাঈম, ৪৪৬/সি খিলক্ষেত চৌধুরীপাড়া, ঢাকা।
মৃত্যুদণ্ড ও ১০,০০০ টাকা জরিমানা।
৩) মোঃ এহসান রেজা রুম্মান, ২৩, পিতা- মোঃ আলী রেজা, পোড়াপাড়া, মহেশপুর, ঝিনাইধ; ৮৪/৩-এ কাকরাইল, ঢাকা।
১০ বছরের জেল ও ৫,০০০ টাকা জরিমানা।
৪) মোঃ মাকসুদুল হাসান অনিক, ২৩, পিতা- মোঃ হাফিজ, ধলেশ্বর, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ, ঢাকা; বাড়ী নং ২০৫, রোড নং ৬, ব্লক বি, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, ভাটারা, ঢাকা।
যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও ১০,০০০ টাকা জরিমানা।
৫) মোঃ নাঈম শিকদার ইরাদ, ১৯, পিতা- মোঃ মুকিম শিকদার, কলেজপাড়া, ব্রাহ্মণবাড়িয়া; বাসা নং ১৮ (তৃতীয়-তলা), শুক্রাবাদ, কলাবাগান, ঢাকা।
১০ বছরের জেল ও ৫,০০০ টাকা জরিমানা।
৬) নাফিজ ইমতিয়াজ, ২২, পিতা- হুমায়ুন কবির, হারামিয়া সন্দ্বীপ, চট্টগ্রাম; রোড নং ১২, ব্লক সি, ভাটারা, ঢাকা।
১০ বছরের জেল ও ৫,০০০ টাকা জরিমানা।
৭) সাদমান ইয়াসির মাহমুদ, ২০, পিতা- হাসিব মাহমুদ, ৬৭/১ নর্থ রোড, ভুতের গলি, কলাবাগান, ঢাকা।
তিন বছরের জেল ও ২,০০০ টাকা জরিমানা
৮) শায়খুল হাদিস মুফতি মোহাম্মদ জসীমউদ্দীন রাহমানী, পিতা- নূর মোহাম্মদ হাওলাদার, হেইউলী বুনিয়া, বরগুনা; মারকাস-উলুম আল ইসলামী মারকাস মাদ্রাসা, মেট্রো হাউজিং, বছিলা ব্রীজ রোড, মোহাম্মদপুর, ঢাকা।
উস্কানির অভিযোগে ৫ বছরের জেল।

রাহমানীর লঘুদণ্ডের বিষয়ে আদালত বলেন তার বিরুদ্ধে এই খুনের সাথে সরাসরি যোগাযোগ প্রমাণিত হয়নি। তদন্ত কর্মকর্তা রাহমানীর কয়েকটি বই আদালতে হাজির করলেও খুতবার অডিও বা ভিডিও আলামত উপস্থাপন করতে পারেনি।

অভিযোগপত্রের বিবরণ:
১৬ই ফেব্রুয়ারি এই মামলায় প্রথমে পল্লবী থানার এসআই শেখ মতিউর রহমান এজাহার তৈরি করেন, লাশের সুরতহাল রিপোর্টে নোট দেন, ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন, আলামত জব্দ করেন, বাদী ও সাক্ষীদের জবানবন্দী ১৬১ ধারায় লিপিবদ্ধ করেন, গুপ্তচর নিয়োগ দেন এবং মামলা তদারকিতে সাহায্য করেন। একই দিন মামলার তদন্তভার পরিদর্শক মোঃ মাইনুল ইসলামের উপর ন্যস্ত হয়। তিনি আগের তদন্ত কর্মকর্তার কার্যক্রম সঠিক পান এবং গোয়েন্দা ও প্রযুক্তির সাহায্যে রানা বাদে বাকিসব আসামীকে গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ করেন এবং আদালতে উপস্থাপন করেন যেখানে তারা ১৬৪ ধারায় জবানবন্দী দেয়। তদন্ত কর্মকর্তা বদলী হয়ে যাওয়ায় ১২ই সেপ্টেম্বর ২০১৩ সালে মামলার দায়িত্ব এসে পড়ে ডিবি পরিদর্শক নিবারণ চন্দ্র বর্মণের উপর।

তদন্তকালে জানা যায় যে, এই মামলার ভিক্টিম মৃত আহমেদ রাজীব হায়দার একজন ব্লগার। তিনি ব্লগে “থাবাবাবা” ছদ্মনামে লিখতেন। মামলার গ্রেপ্তারকৃত আসামী নাঈম/দ্বীপ, এহসান রেজা, রুম্মান, মাকসুদুল হাসান অনিক, নাঈম শিকদার ইরাদ, নাফিজ ইমতিয়াজ, সাদমান ইয়াসির মাহমুদ ও পলাতক আসামী রেদোয়ানুল আজাদ রানাগণ নর্থ সাউথ ইউনিভার্সটির ছাত্র হওয়ায় একে অপরের সাথে পূর্ব পরিচিত ছিল। রানা তাদের মধ্যে সিনিয়র ছিল। রাজীব/থাবা বাবা “ধর্মকারী” ব্লগে ধর্ম, মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সা:) সম্পর্কে অবমাননাকর তথ্য লেখে – এমন ধারণা বা প্রোপাগান্ডার প্রেক্ষিতে আসামীগণ ব্লগার রাজীব/থাবা বাবার প্রতি প্রতিহিংসা পরায়ণ হয়ে উঠে। ইউনিভার্সটির মসজিদে তারা আলোচনা করতো।

আসামীরা রানার নেতৃত্বে মোহাম্মদপুর হাতেমবাগ মসজিদ ও বছিলা রোডের মারকাস মসজিদে আসামী জসীমউদ্দীন রাহমানীর জুম্মার নামাজের খুতবা শুনতে যেত। রাহমানী ব্লগারদের শায়েস্তা করার জন্য জ্বালাময়ী বক্তৃতা করতেন। ইসলাম ও মহানবী সম্পর্কে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করার জন্য ব্লগার ও নাস্তিকদের কতল বা হত্যা করা যাবে মর্মে ফতোয়া দেন। রাহমানী খুতবার বক্তৃতায় জিহাদের প্রতি উৎসাহী হয়ে অনুসারীদের ধর্মের জন্য জিহাদ করার আহবান জানান। আসামীরা মারকাস মসজিদে একাধিকবার রাহমানীর খুতবা শুনে অনুপ্রাণিত হয়ে কিভাবে থাবা বাবাকে সনাক্তসহ হত্যা করা যায় তার পরিকল্পনা করে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী দ্বীপ, অনিক ও রুম্মান মিলে বাড্ডা নতুন বাজার এলাকা হতে মানিক কর্মকারের দোকান থেকে ২৬০০ টাকায় দুইটি চাপাতি ও চারটি ছোরা কেনে। উক্ত টাকা অনিক তার পকেট থেকে প্রদান করে। পরবর্তীতে রানার নেতৃত্বে দ্বীপ, অনিক, রুম্মান, নাফিস, ইরাদ ও সাদমান মালিবাগ চৌধুরীপাড়ায় সিম্ফনি মোবাইল দোকান হতে চারটি মোবাইল ফোন সেট এবং কালাচাদপুর এলাকার ইমি এন্টারপ্রাইজ থেকে চারটি বাংলালিংক সিম কেনে।

আসামীরা দুটি গ্রুপে ভাগ হয়ে ব্লগার রাজীবকে সনাক্ত করার জন্য ইন্টেল গ্রুপ এবং সরাসরি হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয়ার জন্য এক্সিকিউশন গ্রুপ গঠন করে। ইন্টেল গ্রুপের সদস্যরা ০৯/০২/২০১৩ তারিখে শাহবাগে গিয়ে থাবা বাবাকে খুঁজতে শুরু করে। ২/১ দিনের মধ্যেই থাবাবাবার বন্ধুদের মাধ্যমে তাকে চিনতে পারে। ইন্টেল গ্রুপের সদস্য এহসান রেজা সাইকেলে করে বাসে উঠা রাজীবকে অনুসরণ করে মিরপুর ১০ নম্বর গোল চত্ত্বর পর্যন্ত গিয়ে তাকে হারিয়ে ফেলে। সেদিন সে রাজীবের বাসা চিহ্নিত করতে পারেনি।

পুনরায় একইভাবে অনুসরণ করে রাজীবের পল্লবীস্থ পলাশনগরের বাসা চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়। রাজীবের বাসা চিহ্নিত করার পর কয়েকদিন ধরে আসামীরা তাকে রেকি করা শুরু করে এবং তার সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করে। প্রস্তুতি শেষে আসামীরা ক্রিকেট ব্যাট-বল নিয়ে রাজীবের বাসার সামনে খালি জায়গায় ক্রিকেট খেলে কৌশলে রেকি করার জন্য ইচ্ছে করে রাজীবের বাসায় বল ফেলে দেয়। দ্বীপ বলটি কুড়িয়ে নিয়ে আসে এবং বাসার মধ্যে কে কে আছে তা রেকি করে আসে।

ঘটনার দিন চাপাতি ও ছোরা নিয়ে কেউ সাইকেলে কেউ বাসে চড়ে বিকেল চারটার সময় রাজীবের বাসার সামনে অবস্থান নেয় এবং স্কুল ব্যাগ, ক্রিকেট ব্যাট ও বল সাথে রাখে। আসামীরা সবাই মিলে গলিতে ক্রিকেট খেলে এবং রাজীবের ফেরার অপেক্ষায় থাকে। তার আটটা বিশ মিনিটের দিকে রাজীব যখন পল্লবীস্থ বাইশটেকি হয়ে বাসার দিকে আসছিলেন তখন ইন্টেল গ্রুপের সদস্যরা তাকে অনুসরণ করতে থাকে এবং বাসার গেটের কাছাকাছি আসার পর অন্য গ্রুপের দ্বীপ, অনিক ও রানা চাপাতি ও ছোরা দিয়ে রাজীবকে হত্যার প্রস্তুতি নেয়।

অনিক তার ব্যাগ থেকে একটি চাপাতি বের করে দ্বীপের হাতে দেয়, একটি ছোরা অনিক নিজে রাখে। রাজীব গেটের সামনে আসামাত্র রানা দ্বীপকে ধাক্কা দিয়ে তাকে দেখিয়ে দেয়। দ্বীপ চাপাতি দিয়ে থাবাবাবার ঘাড় থেকে মাথা আলাদা করার উদ্দেশ্যে তার ঘাড়ে কোপ দেয়। কোপ খেয়ে রাজীব অনুচ্চারিত শব্দ করে দেয়ালের পাশে পড়ে যায়। দ্বীপ আবার আঘাত করলে তা অনিকের কেডসে লাগে। দ্বীপ পরপর ২/৩টি চাপাতির কোপ দেয়। দূর থেকে “মানুষ খুন করছে” চিৎকার শুনতে পেয়ে দ্বীপ, অনিক ও রানা ঘটনাস্থল থেকে বাইশটেকির দিকে পালানোর সময় দ্বীপের হাত থেকে চাপাতি পড়ে যায়। অন্যান্যরা যার যার মতো পালিয়ে যায়।

অনিকের জুতা রুম্মান ও অনিক মিলে জাতীয় চলচ্চিত্র প্রকাশনা অধিদপ্তরের পুকুর পারে ফেলে দেয়। ব্যাগে থাকা অন্য চাপাতি ও চারটি চোরা শেরেবাংলা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের রাস্তার ড্রেনে ফেলে দেয়। চাপাতির আঘাতে রাজীব ঘটনাস্থলেই মারা যান।

তদন্তকালে রাহমানীর লেখা উন্মুক্ত তরবারি সহ একাধিক উগ্র-ধর্মান্ধ বই মামলার আলামত হিসেবে জব্দ করা হয়েছে। এই বইয়ের বাইশ থেকে ছাপ্পান্ন পৃষ্ঠা পর্যন্ত “বর্তমান যুগের কিছু জ্ঞানপাপী নাস্তিক-মুরতাদ ও ব্লগারদের ধৃষ্টতা,” “কোরআনের আয়াত ও ইসলাম নিয়ে আসিফ মহিউদ্দীনের কটাক্ষ,” “আল্লাহর রসুলকে নিয়ে কটুক্তিকারীদের ব্যাপারে শরীয়া বিধান,” “তাদেরকে হত্যা করতে হবে,” “জনৈক অন্ধ সাহাবী কর্তৃক নিজ দাসীকে হত্যা,” “রসুলুল্লাহ (সা:)-এর অবমানকারীদের হত্যা করার নির্দেশ” ইত্যাদি শিরোনামে ইসলাম, আল কোরআন, মহানবীকে কটাক্ষ ও তুচ্ছতাচ্ছিল্য করার জন্য উক্ত নাস্তিক ব্লগারদের হত্যা করার কথা লিখেছেন।

অন্য আসামীদের জবানবন্দীতে জানা যায় যে, “উন্মুক্ত তরবারী” বইটি রাজীব হত্যাকাণ্ডের পর প্রকাশিত হলেও এ ঘটনার বহু আগে থেকেই তারা প্রতি শুক্রবার ঐ মসজিদে গিয়ে রাহমানীর জ্বালাময়ী জেহাদি বক্তব্য শুনত। তারা রাহমানীর খুতবা সিডিতে ধারণ করে এবং সেগুলি একে অপরের কাছে প্রচার করতো।

রাহমানীর জবানবন্দীতে নাস্তিকদের প্রতি হুংকার:
আমি বরগুনা ইসলামিয়া মাদ্রাসায় দুই ক্লাস পড়ার পর চাঁদপুর কচুয়া মাদ্রাসায় দুই ক্লাস পড়ি। এরপর লালবাগ মাদ্রাসায় দুই বছর পড়ি। লালবাগ মাদ্রাসা বন্ধ হয়ে গেলে মোহাম্মদপুরের জামিয়া রাহমানীয়া আরাবীয়া মাদ্রাসা থেকে ১৯৮৯-৯০ শিক্ষাবর্ষে দাওয়া হাদিসে মাস্টার্স সম্পন্ন করি। পরের বছর দেওবন্দ মাদ্রাসা থেকে ডাবল দাওয়া এবং এরপর হায়দ্রাবাদের আবিলুস সালাম মাদ্রাসা থেকে মুফতি কোর্স সম্পন্ন করি। ১৯৯২ সালের শেষ দিকে বাংলাদেশে এসে বরিশাল মাহমুদিয়া মাদ্রাসায় মোহাদ্দিস হিসেবে যোগদান করি। পাশাপাশি উক্ত মাদ্রাসায় শিক্ষা সচিবের দায়িত্ব পালন করি।

ঐ সময় আমি চরমোনাই পীর সাহেবের দল ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনে বরিশাল জেলার সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করি। কিন্তু পরবর্তীতে পীর সাহেবদের লিখিত ও প্রকাশিত বইয়ে কোরআন-সুন্নাহ বিরোধী বক্তব্য পরিলিখিত হওয়ায় আমি উক্ত দল ত্যাগ করে ১৯৯৬ সালে মক্কা গিয়ে কয়েক বছর অবস্থান করি এবং মদিনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আরবি ভাষা ও আকীদা বিষয়ে বিশেষ কোর্স সম্পন্ন করি।

আমি ২০০০ সালে ঢাকা জামেয়া আরাবীয়া রাহমানীয়া মাদ্রাসায় যোগদান করি। পাশাপাশি পশ্চিম ধানমন্ডির হাতেমবাগ মসজিদের ইমাম ও খতিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করি। ২০০৫ সালে জামেয়া আরাবীয়া রাহমানীয়া মাদ্রাসায় ছেড়ে হাতেমবাগ মসজিদে পেশ ইমাম হিসেবে দায়িত্ব পালন করি। এই সময়ে এজাজ, মাইনউদ্দীন শরীফ, রেজওয়ান রানা ও জুনুন শিকদারসহ বিভিন্ন প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক ও আমজনতা আমার খুতবা শুনতে মসজিদে আসতো।

২০১২ সালে হাতীমবাগ মসজিদ কমিটির সাথে বিরোধ হওয়ায় আমি মারকাজুল উলুম আল ইসলামিয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করি এবং মাদ্রাসার অধ্যক্ষ ও মসজিদের খতিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করি। পাশাপাশি ইসলামী বই রচনায় মনোনিবেশ করি। বিভিন্ন সময়ে সময় উপযোগী খুতবা ও ইসলামী শিক্ষার বক্তব্য প্রদান করি।

এই সময় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মুসলমানদের উপর অত্যাচার এবং আমাদের দেশে আল্লাহ ও রসুলকে কটাক্ষ ও তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যকারীদের বিরুদ্ধে মুসলিম জাহানকে সোচ্চার হওয়ার জন্য বক্তব্য প্রদান করি। পরবর্তীতে নাস্তিক, মুরতাদ ও আল্লাহ-রসুলের কটাক্ষকারী ব্লগারদের শাস্তির দাবীতে ইসলামী শরীয়তের বিধান মোতাবেক ফয়সালার বিষয়ে বক্তব্য প্রদান করি ও বই রচনা করি। রাজীব হত্যার পর নাস্তিক, মুরতাদ, আল্লাহ ও রসুলের কটাক্ষকারীদের বিষয়ে কোরআন সুন্নাহর দর্শন সম্বলিত বই “উন্মুক্ত তরবারি” রচনা করি।

উল্লেখ্য যে, রাহমানীর মতো আরো শত শত ইসলামী চিন্তাবিদ ও শিক্ষকরা প্রতিনিয়ত মসজিদ, মাদ্রাসা আর ওয়াজ মাহফিলে নাস্তিক, অমুসলিমদের বিরুদ্ধে বিষেদাগার করে যাচ্ছে; ইসলামের জিহাদ বিষয়টিকে সহিংসতার মাধ্যমে ব্যাখ্যা করছে। কিন্তু প্রশাসন কোন ব্যবস্থা নিচ্ছে না। তাদের এসব বক্তব্য ফেসবুক, ইউটিউব ও সংগঠনের বিভিন্ন ওয়েবসাইটে পাওয়া গেলেও বিটিআরসি কোন আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়নি। এমনকি নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠনগুলোর ওয়েবসাইটও চালু আছে।

রাহমানীর সমর্থকরা ছাড়াও হেফাজতে ইসলামের হাটহাজারী মাদ্রাসার দুই ছাত্রকে গত বছর আটক করা হয়। তারা ওয়াশিকুর বাবুকে খুন করে পালানোর সময় দুইজন শিখণ্ডীর হাতে ধরা পড়ে এখন জেল হাজতে আছে। মামলাটিতে চার্জশীট দেওয়া হলেও হাটহাজারী মাদ্রাসার কোন শিক্ষক/হুজুরকে খুনের উস্কানি দেওয়ার অপরাধে আসামী করা হয়নি।

(প্রথম প্রকাশ Norrfika.se মতামত প্রকাশ)

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on “রাজীব হায়দার হত্যা মামলা ও জঙ্গিদের জিহাদি জোশ

  1. রাহমানীর জবানবন্দী অনুযায়ী
    রাহমানীর জবানবন্দী অনুযায়ী জানা গেলো তিনি ইসলামী বিষয়ে যথেষ্ট পড়াশুনা করেছেন এবং তিনি পণ্ডিত বাক্তি, তিনি যে কাজ করেছেন সবই ইসলামী বিঁধান মেনে । তাকে জঙ্গি বলা কি ঠিক ?
    “আল্লাহর রসুলকে নিয়ে কটুক্তিকারীদের ব্যাপারে শরীয়া বিধান,” অনুযায়ীই রাজীব শাস্তি পেয়েছে ।

  2. যে মুসলিম কাফিরকে হত্যা করে
    যে মুসলিম কাফিরকে হত্যা করে তার মর্যাদা।
    ২৪৮৭. মুহাম্মদ ইবন সাববাহ আল বাযযার ………… আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলূল্লাহ্ (সাঃ) বলেছেন, কাফির এবং তার হত্যাকারী মুসলিম চিরস্থায়ী দোযখে একত্রিত হবে না।
    Abu Hurairah reported the Apostle of Allaah(ﷺ) as saying “An infidel and the one who killed him will never be brought together in Hell.”

    باب فِي فَضْلِ مَنْ قَتَلَ كَافِرًا
    حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ الصَّبَّاحِ الْبَزَّازُ، حَدَّثَنَا إِسْمَاعِيلُ، – يَعْنِي ابْنَ جَعْفَرٍ – عَنِ الْعَلاَءِ، عَنْ أَبِيهِ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏ “‏ لاَ يَجْتَمِعُ فِي النَّارِ كَافِرٌ وَقَاتِلُهُ أَبَدًا ‏”‏ ‏.‏
    ইসলাম শান্তির ধর্ম , কোন হত্যা সমর্থন করে না ।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

66 − = 59