মুক্তচিন্তার ভাইরাস

মুক্তচিন্তার সাধারণ সংজ্ঞায়নে বলা যায়, নিজের চিন্তার স্বাধীনতাকে অবিচ্ছেদ্য বৃত্তায়নে বৃত্তাবদ্ধ না করে এক নমনীয় আবয়বিকতায় বুদ্ধিবৃত্তির উন্মুক্ত চর্চাই হচ্ছে মুক্তচিন্তা । মুক্তচিন্তা ধারনাটি এখন আর নতুন নয়। তবে মাঝে মাঝে মুক্তচিন্তা নিয়ে সংশয়ে ভুগী এই ভেবে যে, মুক্তচিন্তা আবার “মডার্ন মেন্যুপুলেশন” এর অংশ না হয়ে যায় ! এদেশে মুক্তচিন্তার ধারণাটি মোটিমুটি এখন ধর্মের সমালোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। আর এজন্য অনেকাংশে দায়ী এদেশে মুক্তচিন্তার প্রথম প্রজন্ম। যাদের দেখানো পথে মুক্তচিন্তা চর্চায় সবাই অনুপ্রানিত হচ্ছে সেই প্রথম প্রজন্ম আমাদের সামনে সময় উপযোগী চর্চার সামাজিক কাঠামো তুলে ধরতে পারছেন না বা আমাদের শেখাচ্ছেন না। তারা রবীন্দ্রনাথের মত স্কুল পালানো শেখাচ্ছেন কিন্তু স্কুল পালিয়ে ছেলেটি কোথায় যাবে, কি করবে তা বলে দিচ্ছেন না।

এদেশে মুক্তচিন্তার ধারক প্রথম প্রজন্ম ধর্মকে, ধর্মের উগ্রতাকেই আঘাত করেছেন বার বার। আর তাই হয়তো ধর্মের মাঝে মুক্তচিন্তা ধারনাটি কোনঠাসা হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু মুক্তচিন্তা মানেই কি শুধু ধর্মের সমালোচনা নিয়ে পড়ে থাকা ? মুক্তচিন্তা হওয়া উচিৎ সকল বিষয়ের গঠনমূলক সমালোচনা। সেটা হতে পারে অর্থনীতি কিংবা রাজনীতি নিয়ে সমালোচনা বা মত প্রকাশের স্বাধীনতা, হতে পারে গ্রামের হাতুড়ে কবিরাজের সমালোচনা, হতে পারে বউ পেটানো আবুলের সমালোচনা, হতে পারে দেশের শিক্ষাব্যবস্থার সমালোচনা, হতে পারে দেশদ্রোহী বা স্বৈরাচারীর অত্যাচারের বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়ানো কিংবা কঠোর সমালোচনা করা। আবার শুধু সমালোচনাই নিয়ে পরে থাকলেও হয় না। সমস্যা কে বার বার আঘাত না করে সমাধানকে গ্রহনযোগ্য করে তোলা উচিৎ। সমস্যার চেয়ে সমস্যা সমাধানের উপর জোর দেয়া ভালো; সমাধানের উপায়গুলো নিয়ে আলোচনা করা ভালো।

মুক্তচিন্তার চর্চায় অপরিপক্বরা ধর্মের বিরুদ্ধে বলতে গিয়ে ধার্মিকের বিরোধীতা করছে, পাপকে ঘৃণা করতে গিয়ে পাপীকে হত্যা করছে। মানবতার কথা বলতে গিয়ে মনুষ্যত্ব ধ্বংস করে ফেলছে। অথচ মুক্তচিন্তা হওয়া উচিৎ অনিয়ম বা পাপের বিপক্ষে, মনুষ্যত্বের পক্ষে। ধৈর্যহীন হয়ে পড়ছে মুক্তচিন্তার পরবর্তী প্রজন্মের ধারকরা কিংবা নিজের জ্ঞানের জগত কে সীমাবদ্ধ করে ফেলছে তারা। এদেশে ধর্মান্ধতা বেশি তাই মুক্তচিন্তায় এই ধর্মান্ধতাই বেশি বেশি সমালোচিত হচ্ছে। ধরুন, এদেশের সবাই ধর্মহীন হয়ে পড়লো; এখন ধর্মহীনদের আচরণ কি হওয়া উচিৎ, তাদের সমাজ ব্যবস্থা কেমন হওয়া উচিৎ, তাদের শিক্ষা ব্যবস্থা কেমন হওয়া উচিৎ, তাদের অর্থনীতি কেমন হওয়া উচিৎ এসব ব্যাপারে মুক্তচিন্তার চর্চা নেই বললেই চলে বা যতটুকুন চর্চা আছে তা যথেষ্ঠ নয়। মুক্তচিন্তার প্রথম প্রজন্ম আমাদেরকে ধর্মহীন পৃথিবীকে বাসযোগ্য করে তোলার পথ দেখাচ্ছেন না।

এদেশের প্রধান সমস্যা হচ্ছে “দারিদ্র্য” । অভাবগ্রস্থ মানুষকে দিয়ে সবকিছু করিয়ে নেয়া যায়, বিলাসিতার লোভ মানুষকে ধর্মান্ধতার চেয়েও বেশি উগ্র করে তোলে। “দারিদ্র্য” -ই আমাদের ধর্মান্ধ হতে বাধ্য করে আবার কখনো কখনো জোর করে মুক্তচিন্তার ধারক হতে বাধ্য করে। এই দারিদ্র্য কে ঘুচিয়ে তৃণমূল পর্যায়ে মুক্তচিন্তার বিকাশ কিভাবে সম্ভব তা মুক্তচিন্তায় আলোচিত হচ্ছে না।

চিন্তার সাথে বুদ্ধিবৃত্তির অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক রয়েছে। কুশিক্ষার উর্ধ্বে যারা নিজের জ্ঞানের পরিধিকে সমৃদ্ধ করছেন তাদের ক’জনই বা সমাজ পরিবর্তনের দায়ভার নিচ্ছেন ? আর যারা নিচ্ছেন তাদের ক্ষেত্রে, চিন্তার স্বাধীনতা অক্ষরে পরিণত করার ক্ষমতা সমান নয়। চিন্তার পরিশীলতার অভাবে মুক্তচিন্তা ধরনাটি অনেক সময় সুরুচিপূর্ণ হয়ে ওঠে না।

চিন্তাকে মুক্ত আকাশে বিচরণের লোভ দেখানো হচ্ছে কিন্তু তা সমাজ অনুপযোগী হওয়ায় ভাইরাসের মত সেন্ট্রাল মেমরীকে আক্রমণ করছে। তৈরি হচ্ছে মুক্তচিন্তার বিপরীত ধারনা বা বিরোধীতা। বিজ্ঞানমনস্ক বানাতে হলে বিজ্ঞান কে বাণিজ্যের শিক্ষার্থীর কাছে তার মতো করে উপযোগী করে তুলতে হয়। তা না হলে “অন্ধকারে যার থেকে অভ্যাস মৃদু আলোতে তার চোখ ঝলসে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি”। মুক্তচিন্তা চর্চার আগে এর আওতা, পরিধি নির্ধারণ জরুরী। কেবল ধর্মহীনতাকে জোর দিতে গিয়ে যেন মুক্তচিন্তায় অন্ধ না হয়ে যাই ! মুক্ত চিন্তার উম্মতেরা যেন নিজেদের জ্ঞানের চর্চা থেকে বঞ্চিত না করে। জ্ঞানের চর্চাই হোক মুক্তচিন্তার লক্ষ্য; জ্ঞানের চর্চা করেই নিজেকে যোগ্য করে তুলুক আগামী প্রজন্ম।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 4 = 3