শফিক রেহমানের গ্রেফতার এবং সজীব ওয়াজেদ জয় ও ইমরান এইচ সরকারের অনাকাংখিত বিতর্ক

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়কে অপহরণের ষড়যন্ত্রের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে শফিক রেহমানের গ্রেফতার আর ততপরবর্তীতে সজীব ওয়াজেদ জয়ে আর গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ডাঃ ইমরান এইচ সরকারের পাল্টাপাল্টি ফেসবুক ফেসবুক স্ট্যাটাস ছিলো গত দুদিনের সোশ্যাল মিডিয়ার মূল কেন্দ্রবিন্দু। পক্ষে বিপক্ষে স্ট্যাটাসের পর স্ট্যাটাসে সয়লাব হয়ে পড়েছে নিউজফিড। একই অবস্থা ব্লগ আর অনলাইন নিউজ পোর্টালগুলিতেও।কিন্তু কে এই শফিক রেহমান? কেন তাঁকে নিয়ে এতো হইচই??
শফিক রেহমান পেশায় ছিলেন একজন কৃতি চাটার্ড একাউন্ট্যান্ট।প্রখ্যাত চাটার্ড একাউন্টেন্সী ফার্ম রেহমান এণ্ড রহমানের অন্যতম কর্ণাধার ছিলেন তিনি।মুক্তিযুদ্ধকালে কাজ করেছেন বিবিসির সংবাদদাতা হিসেবে লণ্ডনে।দেশে ফিরে প্রথমে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা বের করেন যাতে শহীদ জননী জাহানারা ঈমামের “একাত্তরের দিনগুলি” ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। জীবন যাত্রায় স্বঘোষিত নাস্তিক এই আধুনিক মানুষটি আইকন ছিলেন অনেকের কাছেই।বিশেষ করে তাঁর সম্পাদিত সাপ্তাহহিক “যায় যায় দিন” আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা পায় এরশাদ আমলে।যার কারণে এরশাদ সরকার পত্রিকাটি বন্ধ করে দেয় আর তাঁকে পাঠানো হয় নির্বাসনে।এদেশে প্রথম ভালোবাসা দিবস বা ভ্যালেন্টাইন্স ডের প্রচলন ও করেন তিনি।যদিও ১৪ই ফেব্রুয়ারীর স্বৈরাচার পতন দিবসে এই দিবসের উদযাপন বেশ বিতর্কেরও জন্ম দেয়। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় তার সাপ্তাহিক ‘যায় যায় দিন’ পত্রিকা প্রচুর জনপ্রিয়তা অর্জন করে। এরশাদের শাসনামলে নির্যাতিত হলেও কিছুদিনের মধ্যে এই লোক খালেদা-তারেকের অনুগ্রহভোগী হয়ে ওঠে। তার পত্রিকার ভূমিকা রাতারাতি পাল্টে যায়।

অনেকের অভিযোগ, হাওয়া ভবন ও ডিজিএফআইয়ের অর্থানুকূল্যে নামমাত্র মূল্যে জায়গা জমি কিনে অভিজাত অফিস, ঘর তৈরি করে দৈনিক যায় যায় দিন প্রকাশের ব্যবস্থা করে। পত্রিকায় অসংখ্য স্টাফ নিয়োগ করে প্রায় দুই বছরের মতো বসিয়ে রেখে বেতন দেয়। তারেক রহমানের রাজত্বকালে এই বিপুল অর্থ কোথা থেকে আসত তা কেউ জানেন না, তবে অনুমান করেন।

এরশাদের শাসনামলে শফিক রেহমান লন্ডনে থাকাকালে স্পেক্ট্রাম নামে একটি রেডিও কেন্দ্র স্থাপন করে এবং বাংলাদেশের এক ভয়াবহ ঝড় বন্যার সময়ে চাঁদা তোলার আহ্বান জানিয়ে বিপুল অর্থ সংগ্রহ করে। এই অর্থ প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে দেয়নি। দীর্ঘদিনেও এ অর্থ বন্যার্তদের পুনর্বাসনে ব্যয়িত না হওয়ায় জনমনে সন্দেহ দেখা দেয় এবং এ সময় বিসিসিআই ব্যাংক বন্ধ হয়ে গেলে জানায়, এই টাকা ব্যাংকে গচ্ছিত ছিল, তা আটকে গেছে। স্পেক্ট্র্রাম থেকে বহিষ্কৃত হয়ে ঢাকায় চলে আসার পর বিলেতের বাংলাদেশী ডোনারদের মধ্যে প্রচন্ড ক্ষোভ দেখা যায়। তাদের কেউ কেউ শফিক রহমানকে লন্ডনে পেলে দৈহিক হামলাও চালাবে বলে জানায়। শফিক রেহমান গোপনে লন্ডনে এসে কিছু টাকা ব্যাংক থেকে উদ্ধার করা গেছে এই ঘোষণা দিয়ে তা বাংলাদেশের হাইকমিশনের কাছে তুলে দিয়ে আত্মরক্ষা করে। এই টাকা ছিল সংগৃহীত অর্থের সামান্য অংশ মাত্র। এই বিপুল অর্থ এতদিন বন্যার্তদের জন্য খরচ না করে কেন ব্যাংকে রেখে দিয়েছিল, তার কোন সদুত্তর দিতে পারেনি।

এরপর দেশে ফিরে তার ভাগ্যে আবার কোটিপতির মতো দু’হাতে অর্থ ব্যয় করে এবং অন্যান্য কাগজ থেকে সাংবাদিকদের দ্বিগুণ-ত্রিগুণ বর্ধিত বেতন দিয়ে নিজের কাগজে নিয়ে আসেন এবং একটি দৈনিক বের করেন, যেটি পাঠক প্রিয়তা অর্জনে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়। বিএনপি-জামায়াত সরকারের পতন এবং শফিকুর রেহমানের পতন যেন এক সূত্রে বাঁধা ছিল। কথিত আছে, সেইসময়ে হাওয়াভবনের চাপে বসুন্ধরা গ্রুপ থেকে বিপুল পরিমাণ চাদাবাজি করেন তিনি।পত্রিকা বন্ধ করে, সাংবাদিকদের বেতন পরিশোধ না করে লন্ডনে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু সাংবাদিকরা জানতে পেরে তাকে বিমানবন্দরে গিয়ে বিমান থেকে টেনে নামান।পরে অনেক কস্টে সে যাত্রা রক্ষা পান।
শফিক রেহমানকে গ্রেফতারের কারণ হিসেবে দেখানো হয়, বঙ্গবন্ধুর দৌহিত্র এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একমাত্র পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়কে অপহরণের ষড়যন্ত্রের সাথে জড়িত থাকা। সজীব ওয়াজেদ জয়ের ওপর যুক্তরাষ্ট্রে হামলার বিষয়ে মোহাম্মদউল্লাহ মামুন নামে একজনকে আসামি ও অজ্ঞাতনামাদের বিরুদ্ধে মামলাটি হয়েছিলো। ডিবি পুলিশ মামলাটির তদন্ত করছিলো। তদন্তে যুক্তরাষ্ট্রের ওই হামলার ঘটনায় শফিক রেহমানের সম্পৃক্ততা পাওয়ায় তাকে আসামি তালিকাভুক্ত করে গ্রেফতার করা হয়।পুলিশের উপ কমিশনার মারুফ হোসেন সর্দার বলেন, শফিক রেহমান ২০১৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রে যান এবং সেখানে সেই সময়ে এই ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন। জয়কে অপহরণ এবং হত্যা প্রচেষ্টার অপরাধে দু’জন আমেরিকান এবং একজন বাংলাদেশির জেলদণ্ড হয়েছে আমেরিকাতে সম্প্রতি।

শফিক রেহমানকে গ্রেফতারের পরপরই গণজাগরণমঞ্চের মুখপাত্র ডাঃ ইমরান এইচ সরকার তাঁর ফেসবুক পেইজে লেখেন, “ প্রবীণ (৮১ বছর বয়সী) সাংবাদিক শফিক রেহমানের গ্রেফতার ও রিমান্ডের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি। শফিক রেহমানের রাজনৈতিক আদর্শের সাথে আমি একমত নই। ভিন্নমতের হলেই তাকে দমন করার যে নোংরা রাজনৈতিক অপকৌশল, এর একটা অবসান চাই।
দেশে যখন একের পর এক মানুষ খুন হচ্ছে, লেখক-প্রকাশক-বিদেশী থেকে শুরু করে মসজিদ-মন্দিরে ঢুকে মুয়াজ্জিন-পুরোহিতকে হত্যা করা হচ্ছে তখন খুনীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে অপহরণের বায়বীয় অভিযোগে এমন একজন প্রবীণ সাংবাদিককে গ্রেফতার সত্যিই হতাশাজনক।
আমি প্রত্যাশা করি সরকারের শুভবুদ্ধির উদয় হবে এবং প্রতিপক্ষকে দমনের চেয়ে দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নের দিকে মনোযোগী হবে।”

এই ব্যাপারে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানান সজীব ওয়াজেদ জয়। তিনি তাঁর পেইজে পালটা প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে লেখেন, ““যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস আমাকে অপহরণ ও হত্যার ষড়যন্ত্রে শফিক রেহমানের সরাসরি সংশ্লিষ্টতা উদ্ঘাটন করেছে। তারা এ বিষয়ে প্রমাণাদি আমাদের সরকারের কাছে দিয়েছে। তাকে এই প্রমাণের ভিত্তিতেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আমি এরচেয়ে বেশি কিছু প্রকাশ করতে পারছি না, কিন্তু এই প্রমাণ দ্ব্যর্থহীন এবং অখণ্ডনীয়।

আমি আশাই করেছিলাম বিএনপি এটা নিয়ে মিথ্যা বলার চেষ্টা করবে। যদিও আমি আশ্চর্য হয়েছি ইমরান সরকারের (ডা. ইমরান এইচ সরকার) বিষয়ে। সম্ভবত শেষ পর্যন্ত তার আসল চেহারাটা উন্মোচিত হলো। এটা দেখে মনে হচ্ছে সে আমাদের বেশিরভাগ সুশীলের মতই, আরেকটা সুবিধাবাদী এবং মিথ্যাবাদী। হয়তো বিএনপি তাকে পয়সা দিয়েছে। কে জানে। যেভাবেই হোক, আমি তার প্রতি সব শ্রদ্ধা হারিয়েছি। তাকে তার বক্তব্য প্রত্যাহার করে আমাদের সরকারের কাছে ক্ষমা চাইতে হবে।আমি আমার সকল বন্ধু এবং ভক্তদের কাছে আহ্বান জানাচ্ছি, যারা তাকে অনুসরণ করেন তারা তাকে ফেসবুক থেকে আনফলো/আনফ্রেন্ড করুন। সে একজন অপরাধীর হয়ে কথা বলছে যে আমাকে হত্যার চেষ্টা করেছিল।”

ইমরান সরকারের স্ট্যাটাসটিতে তিনি শফিক রেহমানের গ্রেফতারকে ভিন্নমত দমনের হাতিয়ার হিসেবে বর্ণণা দেয়ার ফলে এই বিতর্ক এতোটুকু গড়ায়। কেননা শফিক রেহমান সাংবাদিক হলেও নিঃসন্দেহে আইনের উর্ধে নিশ্চয় নন।আর যেখানে অপহরণ বা হত্যার ষড়যন্ত্রের মতো গুরুতর অভিযোগ যখন কারো বিরুদ্ধে ওঠে,তখন সেই ব্যক্তি যতই গুরুত্বপূর্ণ হউক না কেন, আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী তকে গ্রেফতার করতেই পারেন।যদিও শফিক সাংবাদিক পরিচয়ে তাঁকে গ্রেফতারের প্রক্রিয়াটি নিতান্ত হাস্যকরই বলা চলে। তবে এই বক্তব্যের ফলে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হলো গণজাগরণ মঞ্চ। ইতিপূর্বেই কয়েকভাগে বিভক্ত হয়ে পড়া গণজাগরণ মঞ্চ থেকে এরপরে নিঃসন্দেহে নিজেদের দূরে সরিয়ে নেবেন সরকারপন্থী এক্টিভিস্টরা।ইতিমধ্যেই ইমরান সরকারের একসময়ের সহযোদ্ধা মাহমুদুল হক মুন্সী,সুইডেন প্রবাসী এক্টিভিস্ট সাব্বির খান সহ অনেকেই ইমরান সরকারের এই বক্তব্যের প্রতি তীব্র ক্ষোভ ব্যক্ত করেছেন। ক্ষোভ ব্যক্ত করেছেন কামাল পাশা চৌধুরী,বাপ্পাদিত্য বসুর মতো মঞ্চের একসময়ের প্রথম সারির এক্টিভিস্টরাও। সাধারণ সমর্থকদের মধ্যেও দেখা দিয়েছে তীব্র বিভক্তি। কেননা বঙ্গবন্ধুর দৌহিত্রকে অপহরণ ও হত্যার ষড়যন্ত্রের অভিযোগ যার বিরুদ্ধে, তাঁকে শুধুই ভিন্নমতের চর্চাকারী বলে দমনের শিকার বলাকে, অনেকের ভাষায় স্রেফ সরলীকরণ।মঞ্চ যে বড় ধরণের আরেকটি ধাক্কা খাবে এতে, সেকথা বুঝতে এরিস্টোটল হতে হয়না।

অপরদিকে ইমরান সরকারকে আনফ্রেণ্ড বা আনফলো করার যে আহ্বান সজীব ওয়াজেদ জয় জানিয়েছেন, তা কোনমতেই গ্রহণযোগ্যতার পর্যায়ে পড়েনা।কেননা কে কার সাথে বন্ধুত্ব রাখবে বা না রাখবে সেটা তাঁর সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত ব্যাপার।এখানে রাস্ট্র বা সরকারের কিছুই বলার থাকতে পারেনা।এছাড়া “ইমরান বিএনপির টাকা খেয়েছেন” বলে যে বক্তব্য তিনি দিয়েছেন, কোনরকম সাক্ষ্যপ্রমাণ ছাড়া এধরণের বক্তব্য দেয়া একজন সাধারণ ফেসবুকারের মুখে মানালেও দেশের ভবিষ্যৎ নেতা হিসেবে তাঁর দলের কাছে যাকে বিবেচনা করা হয় ,তাঁর মুখে অন্তত সুখকর শোনায়না। আর তাতে মনঃক্ষুণ্ণও হয়েছেন সমাজের অনেক বিবেকবান মানুষেরাও।কারণ গণজাগরণের সেই উত্থাল ১৭ দিনে ইমরান এইচ সরকার অনেকটা আইকনিক ফিগারেই পরিণত হয়েছেন অনেকের কাছে। বিরোধীরাও সেটা স্বীকার করেন একবাক্যে।

পরিশেষে শুধু এটাই বলবো প্রগতিশীল শক্তির মাঝে ঐক্যের আজ বড় বেশী প্রয়োজন।প্রতিক্রিয়াশীলদের অশুভ ছায়া দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে প্রতিনিয়তই। ঈষাণকোণে কালো মেঘ দানা বেধে ওঠার আগেই নিজেদের মধ্যে ক্ষুদ্র ভেদাভেদ ভুলে গড়ে তুলতে হবে ইস্পাতকঠিন একতা। আর তাই অনাকাংখিত দ্বন্ধের হউক চিরঅবসান।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

45 − = 43